‘এটা আমার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে কষ্টের দিন’

‘এটা আমার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে কষ্টের দিন’

ফন্ট সাইজ:

বিশ্ব ফুটবলের এক বর্ণাঢ্য অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটলো। দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে জাদুকরী পারফরম্যান্সে ফুটবল বিশ্বকে মাতিয়ে রাখার পর আন্তর্জাতিক ফুটবলকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিদায় জানালেন লিওনেল মেসি। বাংলাদেশ সময় গতকাল ভোরে বুয়েনস আয়ার্সের ঐতিহাসিক মনুমেন্তাল স্টেডিয়ামে বেনিনের বিপক্ষে ৩-০ গোলের জয় দিয়ে নিজের বর্ণিল আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের ইতি টানলেন এই মহাতারকা। ম্যাচ শেষে স্টেডিয়ামের গ্যালারিভর্তি ৮০ হাজারেরও বেশি উল্লাসিত ও বেদনাহত দর্শকের সামনে আবেগঘন এক বিদায়ী ভাষণ দেন মেসি। আর্জেন্টিনার জার্সিতে তার ২১ বছরের দীর্ঘ পথচলা এবং ত্যাগের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, এটি তার জীবনের সবচেয়ে কঠিন এবং বিষাদময় মুহূর্ত। বিদায়ী ভাষণে আবেগ আপ্লুত মেসি বলেন, ‘আজ আমার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে কষ্টের দিন, যেদিন আমাকে জাতীয় দল এবং আপনাদের সবাইকে বিদায় জানাতে হচ্ছে।

এই জার্সি গায়ে জড়ানো আমার জন্য ২০ বছরেরও বেশি সময় ধরে গর্বের বিষয় ছিল। এমনকি আমরা যে সমস্ত কঠিন মুহূর্তগুলোর মধ্যদিয়ে গিয়েছি, তাতেও আমি কখনো লড়াই করা বা এখানে থাকা বন্ধ করিনি। জাতীয় দলের হয়ে খেলা যেকোনো খেলোয়াড়ের জীবনের সবচেয়ে সুন্দর বিষয়। আমি কসম কেটে বলছি, সারাজীবন খেলে যেতে ইচ্ছা করে। কারণ আর্জেন্টিনার হয়ে মাঠে নামার চেয়ে সুন্দর অনুভূতি আর হতে পারে না।’
বিদায়ের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে মেসি জানান, গত কয়েক বছরের শারীরিক ও মানসিক ধকল তার ওপর প্রভাব ফেলেছে। বিশেষ করে ২০২৬ সালের বিশ্বকাপ এবং সাম্প্রতিক ম্যাচগুলোর কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘যদিও আমি সারাজীবন এখানে থাকতে চাই, তবুও আমি মনে করি এটাই সঠিক সময়। শেষ বিশ্বকাপ এবং বিগত টুর্নামেন্টগুলোতে আমাদের ওপর দিয়ে বিশাল ঝড় বয়ে গেছে। বিশেষ করে সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচটি আমাদের শারীরিক ও মানসিকভাবে মারাত্মক ক্লান্ত করে তোলে। তবে এই বিদায়ের পরও দেশের মানুষের ভালোবাসা এবং এই জার্সির প্রতি আমার টান কখনো কমবে না। মাঠের বাইরে থেকে সব সময় এই দলের প্রতিটি অর্জনে আমি গলা ফাটাবো।’

নিজের সব প্রাপ্তির জন্য সতীর্থদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে ভোলেননি এলএম ১০। সতীর্থদের ‘যোদ্ধা’ হিসেবে আখ্যায়িত করে মেসি বলেন, ‘আমি আমার সতীর্থদের ধন্যবাদ জানাই, যারা আমাকে আমার শৈশবের স্বপ্ন-বিশ্বকাপ জয়, কোপা আমেরিকা এবং ফিনালিসিমা জয়ের স্বাদ পাইয়ে দিয়েছেন। আমি জানতাম, আমার আশপাশে এমন কিছু যোদ্ধা ছিল, যারা দেশের জন্য নিজেদের সব উজাড় করে দিতে প্রস্তুত ছিল। ভক্তদের কাছ থেকে পাওয়া ভালোবাসা এবং প্রতিটি স্টেডিয়ামে পূর্ণ গ্যালারির সমর্থন আমাদের সব সময় ঘরের মাঠে খেলার অনুভূতি দিয়েছে।’ মেসি তার এই বিদায়ের পরও জাতীয় দলের প্রতি অগাধ ভালোবাসার কথা জানিয়ে সমর্থকদের উদ্দেশ্যে ঐক্যের বার্তা দেন। তিনি অত্যন্ত জোরালো কণ্ঠে বলেন, ‘এটি প্রমাণিত হয়েছে যে যখন আমরা ঐক্যবদ্ধ থাকি, তখন আমরা যেকোনো শক্তির চেয়ে শক্তিশালী এবং যেকোনো বাধা অতিক্রম করতে পারি। কিছু মানুষ আছে যারা জাতীয় দলের পতন দেখতে চায়, কিন্তু আমাদের সেই সুযোগ দেয়া উচিত নয়। তাই আমাদের সব সময় এক থাকতে হবে।’

বিদায়ী ভাষণের শেষটা মেসি করেন এভাবে, ‘আমি
আজ একটু বেশিই কথা বলছি, কারণ আমি এই মাঠ ছেড়ে যেতে চাই না। বিদায় বলতে আমার মন সায় দিচ্ছে না। শুধু আপনাদের একটি কথাই বলতে চাই- আমি আপনাদের সবাইকে অন্তরের গভীর থেকে ভালোবাসি এবং আপনাদের ভীষণ মিস করবো। আজ ঈশ্বরের কাছে আমি অসীম কৃতজ্ঞতা জানাই যে, তিনি আমাকে একজন আর্জেন্টাইন হিসেবে জন্ম দিয়েছেন। আমি আর্জেন্টাইন, এটাই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় গর্ব। আর আপনাদের সবার সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে আমার শৈশবের সমস্ত স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে পেরেছি- এটাই আমার ক্যারিয়ারের পরম প্রাপ্তি ও গৌরবের অধ্যায়। আপনাদের সবাইকে আমার হৃদয়ের গভীর থেকে অনেক অনেক ধন্যবাদ।’