আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের দেয়া রায়ে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সভাপতি হাসানুল হক ইনুর ১০ বছরের কারাদণ্ডকে অপর্যাপ্ত ও ত্রুটিপূর্ণ উল্লেখ করে সাজা বাড়িয়ে মৃত্যুদণ্ড চেয়ে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে আবেদন করেছে প্রসিকিউশন। গতকাল আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের এক প্রেস ব্রিফিংয়ে প্রসিকিউটর গাজী এম এইচ তামিম সাংবাদিকদের এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। গাজী তামিম জানান, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের অধীন নির্ধারিত ৩০ দিনের মধ্যেই ইনুর সাজা বৃদ্ধির জন্য এই আপিল করা হয়েছে। প্রসিকিউশন পক্ষ আবেদনে সুনির্দিষ্টভাবে ১১টি আইনি গ্রাউন্ড (যুক্তি) তুলে ধরেছে। একইসঙ্গে ট্রাইব্যুনাল-২-এ কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ সহ চার আসামির সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানানো হয়েছে।
আপিলে উল্লিখিত ১১টি গ্রাউন্ড: ১) ১৯৭৩ সালের ট্রাইব্যুনাল আইনের অধীন কোনো ব্যক্তি দোষী সাব্যস্ত হলে মৃত্যুদণ্ড প্রদানই মূল নীতি এবং লঘু কারাদণ্ড কেবল ব্যতিক্রম হিসেবেই বিবেচিত হতে পারে। মানবতাবিরোধী অপরাধের ক্ষেত্রে সমাজের ন্যায়বিচারের প্রত্যাশাকে গুরুত্ব দিতে হয়। তাই ট্রাইব্যুনাল-২ কর্তৃক চার্জ ৩, ৬ ও ৭-এ দেয়া ১০ বছরের কারাদণ্ড ও ১ লাখ টাকার ক্ষতিপূরণ আইনগতভাবে ত্রুটিপূর্ণ। প্রসিকিউশন ইনুর মৃত্যুদণ্ড, তার সমুদয় সম্পত্তির মূল্যের সমপরিমাণ অর্থ জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের শহীদ-ভুক্তভোগীদের ক্ষতিপূরণ হিসেবে প্রদান এবং যেসব অভিযোগ (চার্জ ১, ২, ৪, ৫ ও ৮) থেকে খালাস দেয়া হয়েছিল, তা বাতিল করে মৃত্যুদণ্ডের আবেদন জানিয়েছে। ২) আন্তর্জাতিক অপরাধ আইনতত্ত্ব (International Criminal Jurisprudence) অনুযায়ী, যারা আদেশ ও নেতৃত্ব দেন তাদের অপরাধের দায় মাঠপর্যায়ের অনুসারীদের চেয়ে অনেক বেশি। সামরিক নেতৃত্বের চেয়েও একজন বেসামরিক বা রাজনৈতিক নেতার নির্দেশনা অনেক বেশি প্রভাবশালী ও শক্তিশালী বিবেচিত হওয়ায় এ ক্ষেত্রে দণ্ড আরও কঠোর হওয়া আবশ্যক। ৩) বেসামরিক ও রাজনৈতিক নেতারা সরাসরি অংশ না নিলেও তাদের অধস্তনদের ওপর সুপিরিয়র কমান্ড সরাসরি অপরাধ সংঘটন ও দায়মুক্তির সংস্কৃতিকে প্রশ্রয় দেয়।
তাদের খ্যাতি ও অনুসারীদের ওপর বিশেষ প্রভাবের কারণে আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী তাদের কঠোর শাস্তির আওতায় আনা প্রয়োজন। ৪) ট্রাইব্যুনাল আইনের ধারা ২০(২) অনুযায়ী মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ডই মূল সাজা; কেবল বিশেষ লঘুকরণমূলক পরিস্থিতির সুনির্দিষ্ট কারণ দেখিয়ে এর ব্যতিক্রম হতে পারে, যা ট্রাইব্যুনাল তার রায়ে স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করতে ব্যর্থ হয়েছে। ৫) চার্জ ৩, ৬, ৭ (যেগুলোতে দোষী সাব্যস্ত) এবং চার্জ ১, ২, ৪, ৫, ৮ (যেগুলোতে খালাস দেয়া হয়েছে) এর প্রতিটি অপরাধই বেসামরিক জনগণের ওপর পদ্ধতিগত ও পরিকল্পিত হামলার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন, যা সর্বোচ্চ শাস্তির যোগ্য। ৬) ডিজিটাল ও দালিলিক প্রমাণাদি এবং সাক্ষীদের জবানবন্দিতে ইনুর মানবতাবিরোধী অপরাধ পড়হপষঁংরাবষু প্রমাণিত হয়েছে। অপরাধের ভয়াবহতা ও গভীরতা বিবেচনায় ইনুর মৃত্যুদণ্ডই একমাত্র উপযুক্ত সাজা। ৭) ট্রাইব্যুনাল-২ অপরাধের গুরুত্ব ও ব্যাপকতা অনুধাবন করতে আইনি ভুল করেছে, যার ফলে সর্বোচ্চ দণ্ড প্রযোজ্য হলেও তা দেয়া হয়নি। ৮) সাজা নির্ধারণের সময় কেবল আসামির অধিকার নয়, বরং অপরাধের শিকার ভুক্তভোগী পরিবার এবং চরম নৃশংসতার বিরুদ্ধে সমাজের ন্যায্য প্রত্যাশা ও ন্যায়বিচারের নীতি বিবেচনায় নিতে হবে। ৯) ট্রাইব্যুনাল অপরাধের ভয়াবহতা ও আসামির দায়ের মধ্যকার আনুপাতিকতার মানদণ্ড যথাযথভাবে প্রয়োগ করতে পারেনি।
চার্জ ৩, ৬ ও ৮-এ সংঘটিত অপরাধগুলো ছিল অত্যন্ত নৃশংস, ঠান্ডা মাথার ও পৈশাচিক, যার একমাত্র উপযুক্ত সাজা হলো সর্বোচ্চ শাস্তি। ১০) জুলাই-আগস্ট ২০২৪-এ আন্দোলনকারীদের হত্যার সরাসরি নির্দেশ এবং উস্কানির মাধ্যমে তিনি এক ত্রাসের রাজত্ব সৃষ্টি করেছিলেন, যার ফলশ্রুতিতে বহু নিরীহ মানুষের প্রাণহানি ঘটে। ১১) ট্রাইব্যুনাল-২ তার রায়ের পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণের অংশে যে প্রমাণাদি অকাট্য বলে গ্রহণ করেছে, রায়ের শেষাংশে সাজা ঘোষণার সময় সেই পর্যবেক্ষণের প্রতিফলন ঘটেনি; ফলে রায়টি পরস্পরবিরোধী রূপ নিয়েছে।
হানিফের সর্বোচ্চ সাজা চেয়েছে প্রসিকিউশন: এদিকে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফের মামলার বিষয়ে প্রসিকিউটর গাজী তামিম জানান, প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে যুক্তি-তর্ক উপস্থাপন শেষ করে হানিফসহ চারজনের সর্বোচ্চ শাস্তি প্রার্থনা করা হয়েছে।
তিনি বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দমনে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়নে হানিফ সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। দলের অন্যান্য শীর্ষ ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে পাওয়া রায় ও পর্যবেক্ষণের ওপর ভিত্তি করে এবং এসপিসহ মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের কাছে টেলিফোনে সহিংস নির্দেশ দেয়ার অকাট্য অডিও ও ডিজিটাল প্রমাণ ট্রাইব্যুনালে দাখিল করা হয়েছে। এ মামলায় আসামিপক্ষের যুক্তিতর্কের জন্য পরবর্তী দিন ধার্য করা হয়েছে আগামী ৭ই অক্টোবর। এ ছাড়া এনটিএমসি থেকে তথ্য পাওয়ার জটিলতা প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের জবাবে প্রসিকিউটর জানান, গণ-অভ্যুত্থানের পরপর তদন্তের প্রাথমিক পর্যায়ে সংশ্লিষ্ট কিছু কর্মকর্তা অসহযোগিতা করেছিলেন এবং কিছু গুরুত্বপূর্ণ কল রেকর্ড মুছে ফেলার অপচেষ্টা হয়েছিল। তবে পরবর্তীতে আদালতের হস্তক্ষেপে ও নির্দেশনায় সেগুলো উদ্ধার এবং নিখুঁত ফরেনসিক পরীক্ষার মাধ্যমে ট্রাইব্যুনালে প্রমাণ হিসেবে দাখিল করা সম্ভব হয়েছে। বর্তমানে সব রাষ্ট্রীয় দপ্তর থেকে প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহযোগিতা পাওয়া যাচ্ছে বলেও তিনি জানান।
