রাজধানীর মতিঝিলে ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালে কিশোরী মাহিমার মৃত্যুকে কেন্দ্র করে হামলা-ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। এ সময় রোগীর স্বজন ও হাসপাতালের কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষে অন্তত ৩০ জন আহত হয়েছেন। সংবাদ সংগ্রহের সময় সাংবাদিকের ওপর হামলার ঘটনাও ঘটে। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। রোববার রাত ১০টার দিকে শাহজাহানপুরের ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালের ১ নম্বর ভবনে এ ঘটনা ঘটে ।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দাবি, শুক্রবার সন্ধ্যায় প্রচণ্ড পেট ব্যথা নিয়ে মাহিমাকে মতিঝিল ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালে নেয়া হয়। জরুরি বিভাগে চিকিৎসকের পরামর্শে আলট্রাসনোগ্রাফি করা হলে তার অ্যাপেনডিক্স ফেটে যাওয়ার বিষয়টি ধরা পড়ে। পরে অস্ত্রোপচারের প্রস্তুতি নেয়া হলেও অপারেশন থিয়েটারে নেয়ার আগেই শনিবার সকালে তার মৃত্যু হয়। অন্যদিকে রোগীর স্বজনদের অভিযোগ, অ্যাপেনডিক্স ফেটে যাওয়ার পর তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হলেও সময়মতো অস্ত্রোপচার না করায় তার মৃত্যু হয়।
কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, রোগীর স্বজনরা ভুল চিকিৎসার অভিযোগ তুললে কর্তৃপক্ষ তাদের আইনি ব্যবস্থা নেয়ার পরামর্শ দেন। রোগীর মৃত্যুর পরের দিন শাহরিয়ার সবুজ নামে একজন রোগীর স্বজন পরিচয় দিয়ে ক্ষতিপূরণ হিসেবে ১০ লাখ টাকা দাবি করেন। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে হাসপাতালে ভাঙচুর চালানো হয়। এই ঘটনায় হাসপাতালের ১৫ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী আহত হয়।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, রোববার সন্ধ্যা থেকেই হাসপাতালের আশপাশে বিভিন্ন জায়গায় দল বেঁধে অবস্থান নেয় স্থানীয়রা। এদিকে হাসপাতালে স্টাফরা লাঠিসোটা নিয়ে ধাওয়া দিতে থাকেন তাদের। ফলে তাৎক্ষণিকভাবে তারা হাসপাতালের সামনে জড়ো হতে পারেননি। একপর্যায়ে লোকজন হাসপাতালের ভেতরে ঢুকে পড়লে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।
মতিঝিল ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালের সুপারিনটেনডেন্ট ডা. হারুনুর রশীদ বলেন, আমাদের হাসপাতালে অ্যাপেন্ডিসাইটিসের সমস্যা নিয়ে ওই রোগী ভর্তি হয়েছিলেন। আমরা পর্যবেক্ষণ করারও সময় পাইনি তার আগেই রোগীর মৃত্যু হয়। এরপর স্বজনরা ভুল চিকিৎসার অভিযোগ তুললে আমরা জানাই— যদি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ভুল হয়ে থাকে তাহলে আপনারা আইনি পদক্ষেপ নিতে পারেন। একপর্যায়ে শাহরিয়ার সবুজ নামে এক যুবক রোগীর আত্মীয় পরিচয় দিয়ে ১২-১৫ জন লোক নিয়ে এসে ক্ষতিপূরণ হিসেবে ১০ লাখ টাকা দাবি করেন। জবাবে আমরা জানাই— চাইলেই তো এভাবে টাকা দেয়া সম্ভব নয়। সেই সময় উনি খারাপ আচরণ করতে থাকেন। একপর্যায়ে হাসপাতালে ভাঙচুর চালায় তারা। এতে হাসপাতালের ১৫-২০ জন কর্মচারী আহত হন।
নিহত মাহিমার বাবা মকবুল বলেন, ভুুল চিকিৎসার কারণে আমার মেয়ে মারা গেছে। আমরা বিচার চাইছি। এজন্য হাসপাতালের লোকজন লাঠি দিয়ে আমাদের মারধর করেছেন। আমরা এর বিচার চাই।
এদিকে নিহতের আত্মীয় শাহরিয়ার সবুজ টাকা দাবি করার অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনায় আমরা ভুক্তভোগীর নিকটাত্মীয় হিসেবেই উপস্থিত ছিলাম। আমাদের বিরুদ্ধে ১০ লাখ টাকা দাবির যে অভিযোগ তোলা হচ্ছে, তা পুরো ভিত্তিহীন।
এ বিষয়ে শাহজাহানপুর থানার ওসি মোহাম্মদ আমিরুল ইসলাম বলেন, একজন নারী রোগীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে রোগীর স্বজন ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এ সময় সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে বলে জেনেছি। খবর পেয়ে পুলিশ গিয়ে দুই পক্ষকে ধাওয়া দিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। বর্তমানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক আছে এবং নিরাপত্তার জন্য হাসপাতালের সামনে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও রোগীর স্বজনদের পক্ষ থেকে থানায় অভিযোগ করা হয়েছে।
ওদিকে ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালে ঘটা এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করেছে বাংলাদেশ প্রাইভেট হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক এসোসিয়েশন (বিপিএইচসিডিএ) ও ন্যাশনাল ডক্টর্স ফোরাম।
সোমবার যৌথ বিবৃতিতে বিপিএইচসিডিএ-এর সভাপতি ডা. মো. মোসাদ্দেক হোসেন বিশ্বাস ডাম্বেল ও মহাসচিব ডা. এ এম শামীম ১৩ বছর বয়সী চিকিৎসাধীন কিশোরীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে হাসপাতালটিতে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায় প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটনে নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও নিখুঁত তদন্তের আহ্বান জানান।
ন্যাশনাল ডক্টর্স ফোরামের ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সভাপতি ডাক্তার মোহাম্মদ মারুফ শাহরিয়ার মানবজমিনকে বলেন, দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে দুর্বৃত্তায়ন ঘটছে এবং মব সৃষ্টি করে চিকিৎসাসেবা বিঘ্নিত করার বিষয়টি আমাদের উদ্বেগের।
