সিলেটের ভয়ঙ্কর অপরাধী ‘টাইগার’ জামাল। লেবাস পাল্টিয়েছে বার বার। আওয়ামী লীগের সময় স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা। পরে ছাত্রদল, এখন যুবদল নেতা। নগরের ঘাসিটুলার এক কলোনিতে গড়ে তুলেছে অপরাধ সাম্রাজ্য। সব অপরাধের হেডকোয়ার্টার ছিল তার আস্তানা। সন্ধ্যা নামলেই শতশত তরুণের ভিড়। হাত বাড়ালেই মিলে মাদক। গ্যাং দিয়ে গোটা এলাকা নিয়ন্ত্রণ করে সে। সেই টাইগার জামালের আস্তানা খুঁজে পেয়েছে পুলিশ। এক রাতের অভিযানেই তছনছ করে দেয়া হয়েছে তার অপরাধ সাম্রাজ্য। শুধু তাই নয়, টাইগার জামাল ও তার দুই সহযোগীকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
অভিযানের পর টনক নড়েছে সিলেট নগর বিএনপি নেতাদের। অপরাধ আস্তানাকে নিরাপদ রাখার জন্য স্থানীয় বিএনপির কার্যালয় হিসেবে তার আস্তানাকে ঘোষণা দিয়ে দলীয় নেতাদের ছবি টাঙিয়ে রেখেছিলো জামাল। অভিযানের পর গতকাল দুপুরে নগর বিএনপি’র সাধারণ সম্পাদকের নেতৃত্বে বিএনপি’র নেতারা গিয়ে সেই ছবি সরিয়ে নিয়েছেন। নগরের ঘাষিটুলা। পাশেই শামীমাবাদ। প্রবাহিত ছড়ার কাছাকাছি একটি কলোনিতে আস্তানা গেড়েছিলো টাইগার জামাল। সিলেট মহানগর পুলিশ রোববার রাত থেকে কিশোরগ্যাং সহ অপরাধীদের ধরতে সাঁড়াশি অভিযানে নামে। এ অভিযানে নেতৃত্ব দিচ্ছেন নগর পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তারা। উত্তরের ডিসি মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম। তার নেতৃত্বেই নগরের পশ্চিম অংশে অন্তত ৫-৬টি স্থানে সন্ধ্যার পর থেকে শুরু হয় সাঁড়াশি অভিযান। ঘাষিটুলার ওই আস্তানার খবর পুলিশের কাছে আগেই ছিল। রাত ১০টার পর পুলিশের একাধিক টিম একযোগে চালায় অভিযান। আস্তানাতেই ছিল টাইগার জামাল। পুলিশ গিয়ে অফিস দেখে হতবাক। বিএনপি’র কার্যালয় ঘোষণা দিয়ে সেখানে টাঙিয়ে দেওয়া হয়েছে সাবেক রাষ্ট্র্রপতি শহীদ জিয়াউর রহমান, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ছবি। আর ওই অফিসকেই সে তার অপরাধ আস্তানা হিসেবে ব্যবহার করতো। রাতে পুলিশ শুরু করে তল্লাশি। মাদক বিক্রি ও সেবনের নানা উপকরণ তারা ওই আস্তানা থেকে উদ্ধার করে। জামাল প্রথমে পুলিশের সঙ্গে তর্কে জড়ালেও পরে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। চারদিকে পুলিশ ঘেরাও করে রাখায় সে পালাতে পারেনি।
সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের উত্তরের ডিসি মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম মানবজমিনকে জানিয়েছেন- টাইগার জামাল তার আস্তানাতে বসেই সব অপরাধ করে। আর ওই আস্তানাকে সে দলীয় কার্যালয় হিসেবে ব্যবহার করতো। তার কার্যালয় থেকে মাদক সেবনের নানা সরঞ্জাম সহ অপরাধের আলামত সংগ্রহ করা হয়েছে। একই সঙ্গে দুই সহযোগী সহ তাকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে জানান তিনি। কে এই টাইগার জামাল, কেনই বা তার নাম টাইগার জামাল হলো? সিলেটের অপরাধ আস্তানায় প্রায় দেড় যুগ আগে থেকেই পদচারণা টাইগার জামালের। তার মুল বাড়ি কুমিল্লায়। কাজের সন্ধানে আসা পিতা-মাতার সঙ্গে সিলেটে পাড়ি জমায়। নগরের কলাপাড়ার কালা মিয়া, সৈয়দুর মিয়ার কলোনিতে বসবাসের সময় তার বেড়ে ওঠা। পড়ালেখা না করলেও সে এক সময় নিজেকে ছাত্রদল নেতা হিসেবে পরিচয় দিতো। তখন থেকেই তার অপরাধের সঙ্গে সংখ্য। মেডিকেল, ঘাষিটুলা, কলাপাড়া, মজুমদার পাড়ায় অপরাধ করে বেড়াতো সে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় নগরের খুলিয়াটুলা এলাকায় সোহান হত্যা মামলায় সরাসরি সে অংশ নিয়েছিলো। স্থানীয়রা জানিয়েছেন- ওই মামলার আসামি হওয়ার পর সে জেলও খেটেছে। তখন মেডিকেল এলাকার স্বেচ্ছাসেবকলীগের নেতা হয়ে উঠেছিলো। খুনের পর তার নামের সঙ্গে যুক্ত হয় ‘টাইগার’। এরপর থেকে সে টাইগার জামাল। নগরের অপরাধ সাম্রাজ্যে তার নামও ছড়িয়ে পড়ে। শামীমাবাদ, ঘাষিটুলা, মজুমদারপাড়া সহ নগরের পশ্চিম অংশে তার অপরাধের বিস্তৃতি ঘটে। প্রায় এক যুগ আগে ওই এলাকায় দলীয় শেল্টারে অস্ত্রবাজি হতো বেশি। তখন অত্যাধুনিক একটি অস্ত্র সহ কোতোয়ালি থানা পুলিশ তাকে আটক করেছিলো।
পুলিশ জানিয়েছে- টাইগার জামালের বিরুদ্ধে খুন, অস্ত্রবাজি, ছিনতাই, জমি দখল, মাদক সহ ১০ থেকে ১২টি মামলা রয়েছে। বর্তমানে তার আস্তানা সহ ওই এলাকায় মাদকের সাম্র্রাজ্য গড়ে তুলেছিলো জামাল। তার ঘনিষ্ঠজন হিসেবে চাপাতি কবির, শাহান সহ কয়েকজন রয়েছে। ওই এলাকার জাকির নামের এক ব্যক্তির শেল্টারে সে বেপরোয়া হয়ে উঠেছিলো। তাকে গ্রেপ্তারের পর এলাকায় স্বস্তি ফিরেছে। ঘাষিটুলা এলাকার লোকজন জানিয়েছেন- টাইগার জামাল এলাকার মানুষের কাছে এক মুর্তিমান আতঙ্ক। মাঠ পর্যায়ের পুলিশ সদস্যরাও সিভিল ড্রেসে এসে তার আস্তানায় আড্ডা দিতেন। বখরাও নিতেন। এতে করে সে আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। সন্ধ্যা নামলেই তার আস্তানায় শতশত যুবক মাদক সেবনের জন্য ছুটে আসতো। ইয়াবা বিক্রি তার মূল ব্যবসা। তবে হেরোইন, মদ, গাঁজা, ফেনসিডিলও সে বিক্রি করতো। তার ভয়ে এলাকার মানুষ অভিযোগ দিতেও সাহস পাননি বলে জানান তারা। এদিকে পুলিশের অভিযানে জামালের আস্তানা খুঁজে পাওয়ায় টনক নড়েছে নগর বিএনপি’র। গতকাল ওই আস্তানা পরিদর্শন করেছেন দলের নগর সাধারণ সম্পাদক এমদাদ হোসেন চৌধুরী। তার উপস্থিতিতে ওই কক্ষ থেকে শহীদ জিয়া, খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের ছবি নামানো হয়েছে। এমদাদ চৌধুরী মানবজমিনকে জানিয়েছেন- জামাল বিএনপি’র কেউ নয়। সে বিএনপি’র নাম ব্যবহার করে অপকর্ম করতো। তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য পুলিশকে বলে দেয়া হয়েছে।
একই সঙ্গে স্থানীয় বিএনপিকে বলা হয়েছে জামালও তার অনুসারীরা এলাকায় অপরাধ না করতে পারে সে ব্যাপারে সতর্ক থাকতে। ১০ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপি’র সভাপতি আব্দুল হাকিম জানিয়েছেন- এভাবে আস্তানা খুলে অপরাধ করার খবর তাদের জানা ছিল না। পুলিশের অভিযানের পর বিষয়টি জেনেছেন। শেল্টারদাতা হিসেবে দলের কেউ জড়িত থাকার প্রমাণ মিললে তাকেও শাস্তির আওতায় নিয়ে আসা হবে বলে জানান তিনি।
