জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ২০২৬ অধিবেশনে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ, অর্জন ও চ্যালেঞ্জ নিয়ে গোলটেবিল আলোচনায় পররাষ্ট্রনীতিতে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতির ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন বক্তারা। তারা বলেছেন, জ্বালানি, বিনিয়োগ, জলবায়ু পরিবর্তন ও রোহিঙ্গা সংকটসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ইস্যুতে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
শনিবার রাজধানীর আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটে ‘জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ ২০২৬-এ বাংলাদেশ: কূটনীতি, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও অর্জনের গতিধারা’ শীর্ষক এ গোলটেবিল আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশ সেন্টার ফর অ্যাডভান্সড ইনিশিয়েটিভস (বিসিএআই) ও সিটিজেনস’ ফোরাম, বাংলাদেশ (সিএফবি) যৌথভাবে এ আয়োজন করে।
বাংলাদেশের কূটনীতি ও পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে অবহিত আলোচনা এগিয়ে নেয়ার ধারাবাহিক উদ্যোগের অংশ হিসেবে এ গোলটেবিলের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানের সঞ্চালনা করেন বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিন ড. সাখাওয়াত হোসেন সায়ান্থ।
পবিত্র কোরআন তিলাওয়াতের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠান শুরু হয়। এরপর সভাপতির বক্তব্য ও অতিথি পরিচিতি পর্ব অনুষ্ঠিত হয়। দুই পর্বে বিভক্ত আলোচনার শেষে ছিল উন্মুক্ত আলোচনা পর্ব। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, গবেষক, সম্পাদক, সাবেক কূটনীতিক ও একজন সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী অংশ নেন। জাতিসংঘে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ থেকে অর্জন এবং ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক পরিসরে দেশের কণ্ঠস্বর আরও জোরালো করার উপায় নিয়ে আলোচনা করেন বক্তারা।
আলোচনার সূচনা করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. তানভীর হাবিব। তিনি বলেন, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব’ থেকে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতির দিকে এগিয়েছে। তাই জ্বালানি, বিনিয়োগ, জলবায়ু পরিবর্তন ও রোহিঙ্গা ইস্যুতে সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. তাজমেরী এস এ ইসলাম বলেন, ১৭ বছরের ফ্যাসিবাদী সরকারের পর জাতিসংঘের মতো একটি ফোরামে বাংলাদেশের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরা ছিল একটি চ্যালেঞ্জ। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কোনো কিছু গোপন না করে সাহসের সঙ্গে তার বক্তব্য উপস্থাপন করেছেন এবং শান্তির কথা বলেছেন।
আলোচনায় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পায় রোহিঙ্গা সংকট। বেশ কয়েকজন বক্তা রোহিঙ্গা সংকটকে শুধু জাতীয় নয়, অর্থনৈতিক সমস্যাও হিসেবে উল্লেখ করেন। তারা রোহিঙ্গাদের নিরাপদে মিয়ানমারে প্রত্যাবাসন এবং পররাষ্ট্রনীতিতে বাংলাদেশের দর-কষাকষির সক্ষমতা বাড়ানোর আহ্বান জানান।
সাধারণ পরিষদে বাংলাদেশের দৃশ্যমানতাকে একটি চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করেন নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. বুলবুল সিদ্দিকী। তিনি বলেন, আমরা একটা ছোট রাষ্ট্র হিসেবে সবসময় অংশগ্রহণ করেছি। এবার আমরা আমাদের বক্তব্য বিশ্বদরবারে উপস্থাপন করতে সক্ষম হয়েছি।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের (বিআইআইএসএস) গবেষণা পরিচালক ড. মাহফুজ কবির বলেন, সফরকালে প্রধানমন্ত্রী জেপি মরগ্যান ও বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট অজয় বঙ্গের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। বিশেষত জ্বালানি খাতে বাংলাদেশ পরবর্তী বিনিয়োগ-কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
আলোচনায় কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের প্রসঙ্গও উঠে আসে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভাইস চ্যান্সেলর ড. কামরুল আহসান বলেন, বাংলাদেশের উচিত শক্তি প্রদর্শনের ওপর নির্ভর না করে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের মাধ্যমে সক্ষমতা গড়ে তোলা।
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব ল-এর সহকারী অধ্যাপক মো. মোস্তফা হোসাইন রোহিঙ্গা সংকট, ফিলিস্তিনের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও জলবায়ু পরিবর্তনকে জাতিসংঘের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হিসেবে চিহ্নিত করেন। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক আদালতে বাংলাদেশকে আরও সক্রিয় হতে হবে।
ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটির গ্লোবাল স্টাডিজ অ্যান্ড গভর্ন্যান্স বিভাগের প্রভাষক খন্দকার তাহমিদ রেজওয়ান বলেন, ছোট রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ বহুপাক্ষিকতার ওপর জোর দিয়েছে। ব্রিকসসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক জোট ও সংস্থার সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার পরামর্শ দিয়ে তিনি রোহিঙ্গা সংকটকে একটি অর্থনৈতিক সমস্যা হিসেবে অভিহিত করেন। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের দর-কষাকষির সক্ষমতা বাড়ানোর কথাও বলেন তিনি।
বক্তারা চীন ও পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক নিয়েও আলোচনা করেন এবং আগেভাগে পদক্ষেপ নেওয়ার তাগিদ দেন। ব্লু ইকোনমি ও তিস্তা প্রকল্পসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে চীনের ক্রমবর্ধমান ভূমিকার প্রসঙ্গও আলোচনায় উঠে আসে।
আলোচনায় আরও অংশ নেন ঢাকা স্ট্রিমের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সোহেল রানা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক প্রো- ভাইস চ্যান্সেলর ইমেরিটাস অধ্যাপক ইউসুফ হায়দার, রাষ্ট্রদূত মাহবুব উজ জামান, সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আবুল হাসান চৌধুরী এবং আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি-বাংলাদেশের (এআইইউবি) রেজিস্ট্রার ড. মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম খান। সভাপতির বক্তব্যে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ জ্ঞানগর্ভ ও বহুমাত্রিক আলোচনার জন্য সব বক্তা ও অংশগ্রহণকারীদের ধন্যবাদ জানান।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশন নিয়ে গোলটেবিল বৈঠক
পররাষ্ট্রনীতিতে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতির ওপর জোর
স্টাফ রিপোর্টার
অনলাইন
৫১ মিনিট আগে
৩ অক্টোবর (শনিবার), ২০২৬, ১০ঃ৪৮ (অপরাহ্ণ)
লিংক কপি হয়েছে!
ফন্ট সাইজ:
100%
