বাংলাদেশের ফুটবল আজ এমন এক সংকটের মুখোমুখি, যেখানে মাঠের পরাজয় আর মাঠের বাইরের বিতর্ক পরস্পরকে ছাপিয়ে যাচ্ছে। ফুটবল শুধু ৯০ মিনিটের খেলা নয়। এটি দেশের কোটি মানুষের কাছে একটি আবেগ, স্বপ্ন, উচ্ছ্বাস আর বুকের ভেতর লুকিয়ে থাকা অদৃশ্য এক গর্বের নাম। সবুজ ঘাসে বাংলাদেশের ফুটবলাররা যখন লাল-সবুজ জার্সি পরে এগিয়ে যান,তখন তাঁদের পায়ের সঙ্গে যেন ছুটে চলে দেশের কোটি মানুষের প্রত্যাশা। গ্যালারিতে ওড়ে লাল-সবুজের পতাকা, গলা ফাটিয়ে সমর্থকেরা চিৎকার করেন—‘বাংলাদেশ, বাংলাদেশ!’ একটি গোলের মুহূর্তে অচেনা মানুষও পরস্পরের আপন হয়ে যায়, একটি জয়ে পুরো দেশ যেন একসঙ্গে হাসে, আর একটি পরাজয়ে অসংখ্য হৃদয়ে নেমে আসে বিষণ্নতার নীরব ছায়া। কিন্তু সেই প্রত্যাশার জায়গায় যখন একের পর এক ব্যর্থতা সামনে আসে, তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে—বাংলাদেশের ফুটবল কোথায় যাচ্ছে, এই ব্যর্থতার দায় কার, আর জবাবদিহির ব্যবস্থা কোথায়?
সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ফিফা আসিয়ান কাপের প্রথম আসরে বাংলাদেশ ফুটবল দল যে পারফরম্যান্স প্রদর্শন করেছে, তা এক কথায় হতাশাজনক ও জাতীয় মর্যাদার জন্য চরম মানহানিকর। পুরো টুর্নামেন্টে জয়ের মুখ দেখা তো দূরের কথা, মাঠের পারফরম্যান্সে কোনো ন্যূনতম লড়াইয়ের মানসিকতাও খুঁজে পাওয়া যায়নি। টুর্নামেন্টের শেষ ম্যাচে স্বাগতিক ইন্দোনেশিয়ার বিরুদ্ধে থমাস ডুলির শিষ্যরা যখন ৯-২ গোলের বিশাল ব্যবধানে বিপর্যস্ত হলো, তখন তা কেবল একটি ম্যাচের হার ছিল না; বরং তা ছিল বাংলাদেশের ফুটবল কাঠামোর চরম ব্যর্থতার এক বেদনাদায়ক প্রতিচ্ছবি।
তবে এই জাতীয় ট্র্যাজেডির শেষ এখানেই হয়নি। ৯টি গোল হজম করে দেশের ফুটবলপ্রেমীদের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ ঘটানোর পরপরই দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে অন্য এক অনাকাঙ্ক্ষিত কেলেঙ্কারী। দলের দুই সিনিয়র খেলোয়াড়—সাদ উদ্দিন ও জুনিয়র সোহেল রানার—নাইটক্লাবের ভিডিও ও ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ৯ গোলের বিশাল লজ্জার ক্ষত শুকাতে না শুকাতেই জাতীয় দলের পোশাক গায়ে জড়ানো ফুটবলারদের এমন উদাসীন ও অনৈতিক আচরণের দৃশ্য দেখে পুরো জাতি স্তম্ভিত, বাকরুদ্ধ ও ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে।
এক নারী 'আলানা' নামের তাঁর সামাজিক মাধ্যম 'এক্স' অ্যাকাউন্ট থেকে একাধিক ছবি ও ভিডিও পোস্ট করেন, যেখানে দেখা যায় সাদ উদ্দিন ও জুনিয়র সোহেল রানা তিনজন নারীর সঙ্গে উল্লাসে মেতে আছেন এবং বাদ্যযন্ত্রের তালে নাচছেন। দেশবাসী যখন ৯ গোলের হার ও টুর্নামেন্টের বিপর্যয় কিছুতেই সহ্য করতে পারছিল না, ঠিক সেই মুহূর্তে জাতীয় দলের দুই দায়িত্বশীল খেলোয়াড়ের এমন দৃশ্য দেখে ফুটবলাশ্রয়ী মানুষের মনে তীব্র ক্ষোভের সঞ্চার করে।
আরো দুঃখজনক হচ্ছে,বিতর্ক সামনে আসতেই ফুটবলারদের পক্ষ থেকে আত্মপক্ষ সমর্থনের যে চেষ্টা চালানো হয়েছে, তা সাধারণ মানুষের ক্ষোভের আগুনে যেন ঘি ঢেলে দেওয়ার নামান্তর। সাদ ও সোহেল রানার ভাষ্য অনুযায়ী, মোহামেডানে সই করার পর তারা ফ্রি ছিলেন এবং জাতীয় দলের ক্যাম্প শুরু হওয়ার আগে নেপালে ঘুরতে গিয়েছিলেন। সেখানে একটি ক্লাবে আলানার সঙ্গে তাদের দেখা ও পরিচয় হয়েছিল এবং এই ঘটনাটি জাকার্তা বা ইন্দোনেশিয়ায় ঘটেনি।
কিন্তু তাঁদের এই দাবিকে মিথ্যা ও বানানো বলে ইঙ্গিত দিচ্ছে আলানার নিজের এক্স হ্যান্ডেলের তথ্যবহুল পোস্ট। আলানা সেখানে স্পষ্টভাবে লিখেছেন যে, বাংলাদেশের ফুটবলারদের সঙ্গে তাঁদের ক্লাবেই দেখা হয়েছিল এবং খেলোয়াড়েরা তাঁকে বাংলাদেশ-ইন্দোনেশিয়া ম্যাচ দেখার জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। আলানা আরও মন্তব্য করেন, খেলা দেখে নিজের জাতীয় দলের বদলে বাংলাদেশের পক্ষে গলা ফাটালে বিষয়টি বেশ মজার হতো।
ইন্দোনেশিয়ান এই নারীর প্রত্যক্ষ পোস্ট এবং আমাদের দেশীয় ফুটবলারদের আত্মরক্ষামূলক বক্তব্যের এই চরম বিপরীতমুখী অবস্থান স্পষ্ট করে দেয় যে, কোথাও একটা সত্যকে জোরপূর্বক আড়াল করার চেষ্টা চলছে। তবে ঘটনা জাকার্তাতেই ঘটুক কিংবা নেপালেই ঘটুক, মূল প্রশ্নটি থেকে যায় জাতীয় দলের প্রতি খেলোয়াড়দের শৃঙ্খলা, দায়িত্ববোধ ও নৈতিক মানদণ্ড নিয়েও। জাতীয় দলের জার্সি গায়ে জড়িয়ে আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে খেলতে গিয়ে গভীর রাতে বাদ্যযন্ত্রের তালে ডুবে থাকা কি কোনো পেশাদার অ্যাথলেটের আচরণ হতে পারে?
যেকোনো পেশাদার ফুটবল দলের সঙ্গে প্রশাসনিক কর্মকর্তা, ম্যানেজার এবং নির্দিষ্ট ডিসিপ্লিনারি কোড সংযুক্ত থাকে। কিন্তু এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা নিয়ে দলীয় ম্যানেজার আমিরুল ইসলাম বাবুর বক্তব্য ছিল অনভিপ্রেত। ম্যানেজার বাবু জানিয়েছেন, ইন্দোনেশিয়ার বিপক্ষে বিপর্যয়ের পর রাতের খাবার শেষে খেলোয়াড়দের নিজ নিজ কক্ষে ফিরে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। তাঁর ভাষ্য ছিল, রাতের খাবারের পর খেলোয়াড়েরা ঘুমাতে গেছে এবং ম্যানেজমেন্ট তো সারা রাত তাদের দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না।
খেলোয়াড়দের আচরণ, বাইরের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ এবং সার্বিক শৃঙ্খলার কঠোর তদারকি করা কি টিম ম্যানেজমেন্টের দায়িত্বের আওতায় পড়ে না? যদিও তিনি পরবর্তীতে তদন্ত কমিটি ও ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেছেন, কিন্তু আমাদের দেশের অতীত ইতিহাস বলে যে, এমন তদন্ত কমিটি ও শাস্তির আশ্বাস প্রায়শই লাল ফিতার দৌরাত্ম্যে ঢাকা পড়ে বাফারিং ফাইলে হারিয়ে যায়।
আজকের এই ৯ গোলের বড় হার কিংবা নাইটক্লাবের এই ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন কিছু নয়। এটি বাংলাদেশ ফুটবলের গত কয়েক দশকের দীর্ঘমেয়াদী অবক্ষয়, চরম অব্যবস্থা এবং প্রশাসনিক দেউলিয়াত্বের এক বাধ্যতামূলক পরিণতি। একসময় যে ফুটবল নিয়ে এ দেশের গ্রাম-গঞ্জে ও শহরে উন্মাদনা ছিল, আবাহনী-মোহামেডান ম্যাচ ঘিরে দেশজুড়ে যে আবেগ সৃষ্টি হতো, সেই গৌরবময় ফুটবল সংস্কৃতি আজ পুরোপুরি ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। গত কয়েক দশকে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে) তৃণমূল পর্যায় থেকে উদীয়মান ফুটবলার তুলে আনার কোনো স্থায়ী ও কার্যকর পরিকাঠামো গড়ে তুলতে পারেনি সেভাবে।
একইসঙ্গে আমাদের ঘরোয়া প্রিমিয়ার লিগের মান প্রায় তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। ম্যাচ ফিক্সিং, বাজে পিচ, নিম্নমানের রেফারিং এবং অকার্যকর বিদেশি খেলোয়াড়দের সমাবেশ ঘটিয়ে কেবল নামমাত্র লিগ আয়োজন করা হয়, যার সঙ্গে আন্তর্জাতিক ফুটবলের মানের আকাশ-পাতাল ব্যবধান। জাতীয় দলের কোচিং ও রণকৌশলের দিকে তাকালেও দেখা যায় একই ধরনের বিশৃঙ্খলা। বারবার কোচ বদলানো হলেও ফুটবলারদের বেসিক পাসিং, ফিটনেস, টেকটিক্যাল অ্যাওয়ারনেস এবং ডিফেন্সিভ অর্গানাইজেশনের উন্নতি খুব একটা ঘটেনি। ফলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যেকোনো গতিসম্পন্ন ও সুসংগঠিত দলের মুখোমুখি হলেই তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে আমাদের দেশের রক্ষণভাগ।
সবচেয়ে বড় অভাব ফুটে উঠেছে খেলোয়াড়দের পেশাদারিত্ব ও লাইফস্টাইলের জায়গায়। আধুনিক আন্তর্জাতিক ফুটবল যেখানে কড়া ডায়েট, নিখুঁত ফিটনেস, নিয়মিত ঘুম এবং মনস্তাত্ত্বিক প্রস্তুতির ওপর দাঁড়িয়ে, সেখানে আমাদের দেশের ফুটবলাররা কোটি টাকার ক্লাবে চুক্তি সই করেই সন্তুষ্ট থাকেন যেন।
এর পেছনে বাফুফের রাজনৈতিকীকরণ ও প্রশাসনিক অকর্মণ্যতাও দায়ী। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর কাছ থেকে আসা অর্থ কোথায় কীভাবে খরচ হয়, তার সঠিক উত্তর মেলে না; অথচ জাতীয় দল যখন আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে খেলতে যায়, তখন সঠিক প্রস্তুতি কিংবা উন্নত সুযোগ-সুবিধার অভাবে আমাদের চরম ব্যর্থ হতে হয়। আন্তর্জাতিক ফুটবল র্যা ঙ্কিংয়ে বাংলাদেশ তলানি স্পর্শ করলেও কর্তাব্যক্তিদের মধ্যে কোনো অনুশোচনা বা জবাবদিহি দেখা যায়নি।
ফুটবলাররা যখন জাতীয় দলের জার্সি গায়ে মাঠে নামেন, তখন তারা কেবল ১১ জন খেলোয়াড় থাকেন না, বরং তারা পুরো ১৮ কোটি মানুষের একটি দেশের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিনিধিত্ব করেন। প্রতিটি গোল হজম করার সঙ্গে সঙ্গে দেশের লাখো ফুটবলপ্রেমীর হৃদয় ক্ষতবিক্ষত হয়। দেশবাসীর সেই অপরিসীম ভালোবাসা ও সমর্থনের সম্মান রক্ষার ন্যূনতম দায়বদ্ধতা কি এই খেলোয়াড়দের থাকা উচিত নয়? ৯টি গোল খাওয়ার পর যে খেলোয়াড়দের রাতে ঘুমানোর কথা নয়, আত্মগ্লানি ও অনুশোচনায় দগ্ধ হওয়ার কথা—তারা যখন কোনো বিদেশি শহরের নাইটক্লাবে গিয়ে আনন্দ-উল্লাসে মেতে ওঠেন, তখন বুঝতে হবে ফুটবলীয় নীতিবোধের চরম পচন ধরেছে।
এই জাতীয় বিপর্যয় ও অপেশাদার কেলেঙ্কারির পর বাফুফে ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়কে আর কোনো অজুহাত না দিয়ে কঠোরতম পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। লোকদেখানো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য দিয়ে এই মারাত্মক ব্যাধিকে ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করা হলে তা হবে দেশের ফুটবলের কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দেওয়ার শামিল। একটি স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সাদ উদ্দিন ও জুনিয়র সোহেল রানার অপরাধ ও দায়িত্বজ্ঞানহীনতা প্রমাণিত হলে তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। শুধু খেলোয়াড়দের ওপর দোষ চাপিয়ে পার পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই; দায়িত্বে চরম গাফিলতির কারণে সংশ্লিষ্ট পুরো ম্যানেজমেন্টকে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।
একইসঙ্গে জাতীয় দলের খেলোয়াড়দের জন্য কঠোর শৃঙ্খলামূলক নীতিমালা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের কোড অফ কন্ডাক্ট প্রণয়ন করা এখন সময়ের দাবি, যা আন্তর্জাতিক সফর ও ক্যাম্প চলাকালীন সময় বাধ্যবাধকতার সঙ্গে প্রয়োগ করতে হবে। তবে সবচেয়ে বড় প্রয়োজন বাফুফের প্রশাসনিক আমূল সংস্কার। তৃণমূল পর্যায়ে অর্থ বিনিয়োগ, আধুনিক একাডেমি গড়ে তোলা এবং যোগ্য ব্যক্তিদের হাতে ফুটবলের দায়িত্ব তুলে দেওয়ার মাধ্যমেই কেবল আমরা এই অচলাবস্থা থেকে মুক্তি পেতে পারি।
পরিশেষে বলতে চাই, বাংলাদেশের মানুষ চিরকালই ফুটবলকে ভালোবেসে এসেছে। তারা ভোরের ঘুম হারাম করে ব্রাজিল বা আর্জেন্টিনার ম্যাচ দেখে ঠিকই, কিন্তু দিনশেষে তাদের হৃদয়ের সবচেয়ে গহীন স্থানটি দখল করে রাখে লাল-সবুজের নিজের ওই জাতীয় দলটিই। সেই অকৃত্রিম ভালোবাসার জবাবে যখন কেবলই ৯ গোলের হারের লজ্জা আর নাইটক্লাবের কেলেঙ্কারী উপহার আসে, তখন তা সাধারণ ক্রীড়াপ্রেমীদের পক্ষে মেনে নেওয়া অত্যন্ত কষ্টদায়ক। এই ঘটনার সঠিক তদন্ত ও দৃষ্টান্তমূলক সংস্কার না হলে লাল-সবুজের ফুটবল কেবলই অতীত ইতিহাসের পাতায় স্মৃতি হয়ে থাকবে, আর বাস্তবে পড়ে থাকবে কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমীর দীর্ঘশ্বাস। যা কিছুতেই কাম্য হতে পারে না। সুতরাং কাল বিলম্ব না করে সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহির আওতায় আনা অত্যন্ত জরুরী। মহান আল্লাহ সুবহানাতায়ালা আমাদের সহায় হোন।
লেখক:সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সম্পাদক, আমার দিন।
ই-মেইল:[email protected]
৯ গোলের লজ্জা ও নাইট ক্লাব বিতর্ক, জবাবদিহি কোথায়?
আহসান হাবিব বরুন
মত-মতান্তর
৫৭ মিনিট আগে
৩ অক্টোবর (শনিবার), ২০২৬, ১০ঃ০৭ (পূর্বাহ্ণ)
লিংক কপি হয়েছে!
ফন্ট সাইজ:
100%
