যুক্তরাজ্য থেকে হজ করাটা অনেক বৃটিশ-বাংলাদেশি মুসলমানদের জন্য দূরুহ হয়ে গেছে। তার কারণ দুটি। প্রথমত: বৃটিশ মুসলমানদের জন্য হজের সীমিত কোটা থাকে যা দ্রুত পূরণ হয়ে যায়। দ্বিতীয়ত: খুবই ব্যয়বহুল যা বাংলাদেশ থেকে যাওয়া হজযাত্রীদের চেয়ে প্রায় আড়াই থেকে তিন গুণ বেশি খরচ হয়। ফলে বৃটিশ-বাংলাদেশি দ্বৈত নাগরিক মুসলমানদের মধ্যে হজে যেতে ইচ্ছুক অনেকে যুক্তরাজ্য থেকে বাংলাদেশে গিয়ে যান। বাংলাদেশের কোটা অনেক বেশি এবং প্রতি বছর অপূরণীয় থাকে। খরচও হয় অনেক কম যুক্তরাজ্যের চেয়ে। দ্বৈত নাগরিক হিসেবে তারা বাংলাদেশের পূর্ণ নাগরিক। সে হিসেবে তারা এই সুযোগ-সুবিধা নিতেই পারেন। এতে আইনে কোনো বাধা নেই।
দ্বৈত নাগরিক (বৃটিশ-বাংলাদেশি নাগরিক) হিসেবে আপনি দুটি পাসপোর্ট (যেমন বৃটিশ পাসপোর্ট ও বাংলাদেশি পাসপোর্ট) রাখতে পারেন, বহন করতে পারেন ও ব্যবহার করতে পারেন। তাতে কোন অসুবিধা নেই। আইনে এটি সম্পূর্ণ অনুমোদিত। তবে পাসপোর্ট ব্যবহার হতে হবে সামঞ্জস্যপূর্ণ (consistent)। ভ্রমণের একটি পর্যায়ে (One leg of the journey) এক পাসপোর্ট ব্যবহার করবেন। অর্থাৎ বহির্গমন (Departure) ও আগমন (Arrival) স্ট্যাম্প একই পাসপোর্টে থাকবে। নতুবা অহেতুক ঝামেলায় পড়তে হতে পারে। বিশ্বের প্রায় ৯০টি দেশ ভ্রমণে একাধিকবার আমাকে ঝামেলা পোহাতে হয়েছে পাসপোর্ট ব্যবহারে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হওয়ায়।
যুক্তরাজ্যের এয়ারপোর্টগুলোতে বৃটিশ পাসপোর্টধারীদের যুক্তরাজ্য ত্যাগ বা ফিরে আসার সময় বৃটিশ পাসপোর্টে কোন ধরনের স্ট্যাম্প বা সিল দেয়া হয় না, কারণ বৃটিশ অভিবাসন আইন অনুযায়ী “British Citizens are not subject to the UK immigration control” (অর্থাৎ “ বৃটিশ নাগরিকরা যুক্তরাজ্যের অভিবাসন নিয়ন্ত্রণের আওতাভুক্ত নন”)। পাতাল রেলের (Underground) ট্রাভেল কার্ড বা টিকেট বা ওস্টার কার্ডের মতো বৃটিশ পাসপোর্ট ইলেকট্রনিক মেশিনে ব্যবহার করে এয়ারপোর্ট থেকে অনায়াসে বের হওয়া যায়। বৃটিশ নাগরিকরা যারা ট্রাভেল করেন তারা তা ভালো করে জানেন।
বাংলাদেশ থেকে সৌদিতে “রিটার্ন টিকেট” নিয়ে হজে যেতে হয়, কারণ ওয়ান ওয়ে টিকেটে হজ ভিসা পাওয়া যায় না। এর মানে কী? এর মানে হচ্ছে আপনি সৌদিতে হজে যাবেন এবং তা সম্পন্ন করে পূর্বের করা রিটার্ন টিকেট দিয়ে বাংলাদেশে ফিরবেন। কিন্তু অনেকে কর্তৃপক্ষকে না জানিয়ে গোপনে আরেকটি ওয়ান ওয়ে টিকেট করেন সৌদি থেকে লন্ডন। আপনি বোর্ডিং পাস নিলেন বৃটিশ পাসপোর্ট দিয়ে। কিন্তু চেক ইন করার পর ইমিগ্রেশনে দেখালেন বাংলাদেশি পাসপোর্ট যেটাতে আপনার আগমন (Arrival) স্ট্যাপ আছে। মাঝখানে কিছু অস্পষ্ট ক্ষেত্র (grey area) থাকলো। এভাবে ইমিগ্রেশন অফিসারকে অন্ধকারে রাখা বা (একটু শক্ত ভাষায়) তাকে মিসলিড করা বা না জানানো পবিত্র হজ পালনকারী সম্মানিত হাজিদের জন্য নৈতিকভাবে কতটুকু সঠিক? সবকিছু সঠিকভাবে ঘোষণা দিয়ে ইউকে-বাউন্ড রিটার্ন টিকেট করে যদি আসেন বা আসতে পারেন তাহলে ঠিক আছে। তাতে আইন বা নৈতিকতার কোনো ব্যত্যয় ঘটবে না।
ঢাকা থেকে সৌদি এয়ারপোর্টে আসার পর বাংলাদেশি পাসপোর্ট সৌদি কর্তৃপক্ষ নিয়ে নেয়। এটাই সব হজযাত্রীদের জন্য নিয়ম। যতদিন আপনি সৌদিতে থাকবেন পাসপোর্ট আপনার সাথে সাথে বিভিন্ন শহর ঘুরবে, কিন্তু পাসপোর্ট আপনার হাতে দেয়া হবে না। পাসপোর্ট আপনার হাতে ফিরত দেয়া হবে সৌদি থেকে বের হবার সময় এয়ারপোর্টে। এমতাবস্থায়, আপনি লুকিয়ে বা কর্তৃপক্ষকে না জানিয়ে গোপনে আরেকটি পাসপোর্ট অর্থাৎ বৃটিশ পাসপোর্ট আপনার কাছে রেখে দিলেন। এটা কতটুকু সঠিক ও যুক্তিযুক্ত? কর্তৃপক্ষ জানলে বরং দুটি পাসপোর্টই এয়ারপোর্ট রেখে দিত।
অপরদিকে, বৃটিশ পাসপোর্ট লুকিয়ে নিজের কাছে রাখাও ঝুঁকিপূর্ণ। Random বা কোন জরুরি দুর্ঘটনাজনিত কারণে তাৎক্ষণিক চেক ইন বা স্পট ভেরিফিকেশনে ধরা পড়লে বিড়ম্বনার শিকার হবেন না এর নিশ্চয়তা কী? তখন আপনি ব্যাখ্যা করার কোনো সুযোগ পাবেন না বা আরবিতে ব্যাখ্যা করতেও পারবেন না। ব্যাখ্যা করলেও হজ মৌসুমে প্রচণ্ড চাপের মুখে মিলিয়ন মিলিয়ন হাজিদের সামলানোর দায়িত্বে থাকা অনেকটা অ্যারগেন্ট অফিসার শুনবেন না বা শুনতে চাইবেন না।
একজন লোকের বা কিছু লোকের কিছুই হয় নাই, তারা চলে এসেছেন তার মানে কোনো সমস্যা হবে না - এ কথার বা এমন উপসংহার টানার কোনো যুক্তি নেই।
যারা বৃটেনে রাষ্ট্র প্রদত্ত সোশ্যাল বেনিফিটে আছেন তারা বেনিফিট কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য (যেমন ২৮ দিন) যুক্তরাজ্যের বাইরে যেতে পারেন ও থাকতে পারেন। এটা খোদ আইনেই আছে। কিন্তু অনেকে না জানিয়েও দীর্ঘদিন দেশের বাইরে থেকেও বেনিফিট নিয়ে পার পেয়ে যাচ্ছেন। তাই বলে এটা নিয়ম বা আইন নয়। ধরা পড়লে বা কর্তৃপক্ষ জানলে ঝামেলায় পড়তে হবে, এতোদিন ধরে নেয়া বেনিফিট ফেরত দিতে হবে ওভারপেমেন্ট হিসেবে। এমনকি প্রসিকিউটও করতে পারে।
ইমিগ্রেশন ও আইনসংক্রান্ত বিষয়ে হজ ব্যবসায়ীদের কথায় আপনি চলবেন না বা আপনার কর্মপন্থা ঠিক করবেন না। আপনি চলবেন আপনার বিবেক, বুদ্ধি ও আইন অনুযায়ী। আইনি ব্যাপারে প্রয়োজনে দক্ষ ও অভিজ্ঞ আইনজীবীর কাছ থেকে পরামর্শ নেবেন।
হজ একটি গুরুত্বপূর্ণ ফরজ ইবাদত। সামর্থ্যবানদের জীবনে একবার হজ করা ফরজ, অবশ্যই পালনীয়। হজে যাওয়া মানে মহান আল্লাহপাকের ঘরের মেহমান হচ্ছেন আপনি। এই গুরুত্বপূর্ণ আমল করতে যেকোনো ধরনের (যে পরিমাণই বা যে মাত্রায়ই হোক) শঠতা, মিথ্যা, ট্রিকস, লুকানো ও মিসলিডেং করা থেকে বিরত থাকুন। বরং নিজের সবকিছু ডিকলেয়ার ও খোলাসা করবেন যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে। মহান আল্লাহপাক আমাদের সহায় হোন।
হজ সংক্রান্ত বিষয়ে সম্পৃক্ত ট্রাভেল এজেন্সি, হজ ব্যবসায়ী এবং দ্বৈত নাগরিক হজ যাত্রীদের উচিৎ সৌদি হজ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে জোরালো লবিং করা যেন তারা দ্বৈত নাগরিকদের ক্ষেত্রে তারা স্ট্রিমলাইন অ্যাপ্রোচ গ্রহণ করে। বৃটিশ-বাংলাদেশি হজযাত্রীরা যারা বাংলাদেশ হয়ে বাংলাদেশি কোটায় হজ করছেন তাদের জন্য যেন পাসপোর্ট ব্যবহারের বিষয়ে পরিস্কার লিখিত নির্দেশনা এয়ারপোর্টগুলোতে পাঠিয়ে দেয়। বিশেষ করে, ঢাকা-সৌদি রিটার্ন টিকিট নয় বরং ঢাকা-সৌদি-লন্ডন ওয়ান ওয়ে টিকেটে যেন তারা হজ ভিসা পান সে ব্যাপারে শক্তিশালী রিপ্রেজেনটেশন যাওয়া দরকার।
নাজির আহমদ: বিশিষ্ট আইনজীবী, সংবিধান ও অভিবাসন বিশেষজ্ঞ এবং ইংল্যান্ডের প্র্যাকটিসিং ব্যারিস্টার।
Email:
[email protected]
