লতাপাতা দিয়ে ঝোপ বানিয়ে তার ওপরে জাল দিয়ে তৈরি করা হয় ফাঁদ। এর সঙ্গে চিকন সুতা দিয়ে পা বেঁধে রাখা হয় পাখিকে। হাতে থাকা বাঁশের লম্বা কঞ্চি দিয়ে সেই পাখির ফাঁদ রাখা হয় কোনো একটি গাছের মগডালে। বাঁধা পাখি যখন ডাকাডাকি করে, তখন অন্য পাখি এসে জালের ফাঁদে আটকা পড়ে। ঠিক এভাবেই ধানক্ষেত থেকে পাখি শিকার করছেন শিকারিরা। সম্প্রতি চলনবিল অধ্যুষিত সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলার পাটগাড়ি পাড়া মৌজার ধানক্ষেতে ফাঁদ পাতার জন্য ঘুরছিলেন নয়ন হোসেন ও সাগর। তখন এই দু’জনের সঙ্গে আলাপকালে এসব বিষয় জানা যায়। দু’জনের হাতে বড়বড় পাতা দিয়ে তৈরি দু’টি ফাঁদসহ বেঁধে রাখা দু’টি পাখি। নিচে আবার কলাপাতায় তৈরি আরেকটি খাঁচা। সেখানে রাখা হয়েছে শিকার করা একাধিক পাখি।
পরে ২০০ থেকে ২৫০ টাকা করে প্রতিটি পাখি বিক্রি করেন তারা। পাখি শিকারি মোতালেব সেখ বলেন, শখের বশে তিনি এলাকার বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে ঘুরে পাখি শিকার করেন। ৩-৪ বছর ধরে তিনি এভাবেই পাখি শিকার করে আসছেন। তাকে কেউ কোনো দিন বাধা দেননি। নাম প্রকাশ না শর্তে আরেক পাখিশিকারি বলেন, এভাবে ফাঁদে ফেলে পাখি দিয়ে যে পাখি শিকার অন্যায়, সেটা তার জানা নেই। প্রতিদিন নিজ
এলাকাসহ আশপাশে ঘুরে ছয়-সাতটি পাখি শিকার করেন। পরে সেগুলো ২০০ থেকে ২৫০ টাকায় বিক্রি করেন। স্থানীয়দের ভাষ্য, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত, এসব অসাধু পাখি শিকারির বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া। তবে চলনবিল অধ্যুষিত সিরাজগঞ্জের তাড়াশ, উল্লাপাড়া, নাটোরের সিংড়া, গুরুদাসপুর, পাবনার চাটমোহর ও ভাঙ্গুড়া এলাকায় পাখি শিকার বন্ধে নিয়মিত কাজ করছেন ‘চলনবিল জীববৈচিত্র্য রক্ষা কমিটি’— নামের একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন।
তারা বলছেন, স্থানীয় প্রশাসনের জোরালো কোনো উদ্যোগ না নেওয়ায় বন্ধ করা হচ্ছে না এসব পাখি শিকার। চলনবিলে অবাধে পাখি নিধনের বিষয়ে মুঠোফোনে কথা হয় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. নজরুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি মানবজমিনকে বলেন, খাদ্য ও নিরাপত্তার জন্য পরিযায়ী ও দেশীয় পাখি চলনবিলে আসে। এসব পাখি পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা ও ক্ষতিকারক পোকামাকড় খেয়ে পরিবেশকে রক্ষা করে। তাই পাখি শিকার বন্ধে প্রত্যেকের সোচ্চার হওয়া উচিত। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নুসরাত জাহান পাখি শিকারের তথ্য পেলে অভিযান পরিচালনা করে পাখি শিকার বন্ধের চেষ্টা করা হচ্ছে বলে তিনি দাবি করেন। রাজশাহী বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা নিয়ামুর রহমান মানবজমিনকে বলেন, পাখি শিকার বন্ধে তাদের পক্ষ থেকে নানা সচেতনতামূলক প্রচার-প্রচারণা চালানো হচ্ছে। সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে তারা অসাধু পাখি শিকারিদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিয়ে থাকেন।
