কৃষক দাঁড়িয়ে আছেন বৃষ্টিতে দীর্ঘ লাইনে। কারও জমি ৩ কানি, কারও ৫ কানি, কারও ১০ কানি। অথচ প্রয়োজনের তুলনায় মিলছে সামান্য সার। উখিয়ায় এমন পরিস্থিতির মধ্যেই সরকারি ভর্তুকির ইউরিয়া সার মিয়ানমারে পাচারের অভিযোগ থামছে না। অভিযোগ রয়েছে, মিয়ানমারে প্রতিটি বস্তা ৬ থেকে ৭ হাজার টাকায় বিক্রির লোভে একটি চক্র কৃষকের চাহিদামতো সার না দিয়ে মজুত করে সীমান্তের দিকে সরিয়ে দিচ্ছে। গত বুধবার সকালেও বৃষ্টি উপেক্ষা করে উখিয়া ফরেস্ট রোডের মেসার্স পাঁচতারা সার ডিলারের দোকানে কৃষকদের দীর্ঘ লাইন দেখা গেছে। কৃষকদের অভিযোগ, ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও অনেকে চাহিদা অনুযায়ী সার পাচ্ছেন না।
অন্যদিকে, গত ৬ই সেপ্টেম্বর উখিয়ার মরিচ্যা চেকপোস্ট এলাকায় ৩০০ বস্তা বা ১৫ টন ইউরিয়া সার জব্দ করে প্রশাসন, বিজিবি ও কৃষি বিভাগ। এ ঘটনায় ৫০ হাজার টাকা জরিমানাও করা হয়। এরপর ১৯শে সেপ্টেম্বর পালংখালীর পৃথক দুই স্থান থেকে ৭৭ বস্তা ইউরিয়া সার জব্দ করা হয়। এর মধ্যে পশ্চিম পালংখালীর চিতাখোলা এলাকায় পরিত্যক্ত অবস্থায় পাওয়া যায় ৭৫ বস্তা। কৃষি বিভাগের কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম থেকে সার এনে একটি সংঘবদ্ধ চক্র পালংখালীর আঞ্জুমানপাড়া সীমান্ত দিয়ে মিয়ানমারে পাচার করে আসছে। এদিকে, কৃষকদের চাহিদামতো সার না পাওয়ার অভিযোগের সঙ্গে এসব পাচারের ঘটনা নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।
স্থানীয় একাধিক সূত্রের দাবি, কয়েকজন ডিলার কৃষকদের মধ্যে পুরো বরাদ্দ বিতরণ না করে একটি অংশ রেখে দিচ্ছেন। পরে বেশি দামে পাচারকারীদের কাছে তা বিক্রি করা হচ্ছে। মিয়ানমারের বাজারে একটি বস্তা ৬ থেকে ৭ হাজার টাকায় বিক্রি হয় এমন তথ্যও স্থানীয়ভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। আরও গুরুতর অভিযোগ, সার পাচার নির্বিঘ্ন করতে ডিলার ও পাচারকারী চক্রের সঙ্গে কৃষি বিভাগের এক কর্মকর্তার যোগাযোগ রয়েছে এবং তাকে ‘ম্যানেজ’ করার চেষ্টা করা হয়। তবে এ অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত করা যায়নি। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বক্তব্য ছাড়া এমন অভিযোগকে সত্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। তবে সার সংকট নিয়ে কৃষি কর্মকর্তার বক্তব্যের সঙ্গে মাঠের চিত্রের পার্থক্য নিয়েই এখন প্রশ্ন উঠেছে। কৃষি কর্মকর্তা কামনাশীষ সরকার এর আগে সার সংকটের আলোচনাকে ‘গুজব’ বলে দাবি করেছেন এবং বলেছেন, উখিয়ায় পর্যাপ্ত সার রয়েছে। প্রশ্ন উঠছে, যদি বরাদ্দ অনুযায়ী পর্যাপ্ত সার থাকে, তাহলে কৃষককে চাহিদামতো সার দেয়া হচ্ছে না কেন? কৃষকের জন্য বরাদ্দ সার কোথায় যাচ্ছে? ডিলারদের গুদাম থেকে কতো সার বের হচ্ছে, কতো সার কৃষকের কাছে বিক্রি হচ্ছে এবং কতো সার সীমান্তমুখী হচ্ছে, এসব হিসাব কি নিয়মিত যাচাই করা হচ্ছে। চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার ড. মুহাম্মদ জিয়াউদ্দিনও ২৪শে সেপ্টেম্বর উখিয়ায় সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময়ে সীমান্ত দিয়ে সারসহ বিভিন্ন পণ্য পাচার রোধে কঠোর মনিটরিংয়ের নির্দেশ দিয়েছেন। কৃষকের অভিযোগ, শুধু কাগজে সার বরাদ্দের হিসাব দেখালেই সংকটের প্রকৃত চিত্র বোঝা যাবে না। ডিলারভিত্তিক বরাদ্দ, মজুত, বিক্রি ও কৃষক পর্যায়ে সরবরাহের হিসাব প্রকাশ্যে এনে তদন্ত করা হলে সার সংকটের আসল কারণ বেরিয়ে আসবে।
