আবার, যদুনাথ সরকার যে বছর তার গ্রন্থটি প্রকাশ করেন, ১৯৪৩ সাল, ঠিক সে বছরেই গোটা বাংলা আরেকটি নির্মম দুর্ভিক্ষের শিকার হয়, এবং কয়েক লক্ষ মানুষের অকালমৃত্যু ঘটে। এই বেদনাদায়ক প্রাণহানির জন্যও বাংলার জনগণের জীবন-জীবিকার প্রতি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন ব্রিটিশ সরকার ও তার ভারত প্রশাসনের নির্বিকারত্ব দায়ী।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ফ্যাসিবাদী জার্মানি ও ইতালির মিত্র জাপান ভারতের পার্শ্ববর্তী মিয়ানমার দখল করার পর, বাংলা হয়ে ভারতে প্রবেশ করার সম্ভাবনাকে রোধ করার জন্য, ১৯৪২ সালের মার্চে ব্রিটিশ সরকার জাপানের ব্যাপারে একটি ‘ডিনায়াল স্কিম’ গ্রহণ করে— ‘অগ্রসরমাণ’ জাপানি বাহিনীকে খাদ্য ও যানবাহন থেকে বঞ্চিত রেখে তার অগ্রযাত্রা রোধ করার কৌশল হিসেবেই এ প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। কিন্তু এই পরিকল্পনার অধীনে, এপ্রিলেই বাংলায় উৎপাদিত ‘উদ্বৃত্ত চাল’ ক্রয় করার নামে, সরকার সারা বাংলার কৃষকদের কাছ থেকে ‘উদ্বৃত্ত মজুত চাল’ সংগ্রহ অভিযান শুরু করে এবং পরের মাসে এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে পণ্য চলাচলের জন্য ব্যবহৃত ছোট-বড় হাজার হাজার নৌযান বাজেয়াপ্ত, ধ্বংস কিংবা ডুবিয়ে দেয়।১২৬ জাপানি সৈন্যবাহিনী ভারতে প্রবেশ করেনি, বা করতে পারেনি ঠিকই, কিন্তু এই ‘ডিনায়াল স্কিম’ মাসের পর মাস অব্যাহত থাকার ফলে, বাংলার স্বাভাবিক বাজারব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম ২৫০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পায় এবং ১৯৪৩ সালে তা ব্যাপক বিধ্বংসী দুর্ভিক্ষ সৃষ্টি করে। বাংলার ‘প্রাদেশিক কিষান সভার’ হিসাব অনুযায়ী, “দুর্ভিক্ষের কারণে সারা বাংলায় প্রায় এক কোটি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়, তাদের মধ্যে প্রায় ৩৫ লক্ষ অনাহার ও অপুষ্টিজনিত রোগে মৃত্যুবরণ করে, আর অবশিষ্ট ৬৫ লক্ষ মানুষ সারা জীবনের জন্য গৃহহীন ও ভূমিহীন হয়ে বাংলার ৯০ হাজার গ্রামে ঘুরে বেড়িয়ে মানবেতর জীবনযাপনে বাধ্য হয়।”১২৭ এই ভয়াবহ অবস্থা থেকে পরিত্রাণলাভের আশায় ভারতবর্ষের তৎকালীন গভর্নর জেনারেল এ পি ওয়াভেল (১৮৮৩-১৯৫০) অন্য কোনো দেশ থেকে ১০ লাখ টন চাল কিনে ভারতে পাঠানোর জন্য ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিলের (১৮৮৬-১৯৫৭) সরকারকে অনুরোধ জানালে, চার্চিলের মন্ত্রিসভা, বিশেষ করে চার্চিলের উপদেষ্টা ও ‘পে-মাস্টার জেনারেল’, লর্ড শেরওয়েল (১৮৮৬-১৯৫৭), বাংলার খাদ্য সমস্যার গভীরতাকে ‘পরিমাণগতভাবে তাৎপর্যহীন’ বলে আখ্যায়িত করে, ওয়াভেলের অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেন। অথচ, ১৯৪৩ সালে সংঘটিত বাংলার দুর্ভিক্ষ ছিল, ওয়াভেলেরই ভাষায়, ‘ব্রিটিশ শাসনাধীন কোনো জনগোষ্ঠীর ওপর নেমে আসা সবচেয়ে বড় বিপর্যয়’।১২৮ এখানে স্পষ্ট করে বলা প্রয়োজন, বাংলার মানুষের ওপর এই ভয়াবহ ‘বিপর্যয়’ কোথাও থেকে অলৌকিকভাবে ‘নেমে’ আসেনি, বরং, ব্রিটিশ সাংবাদিক লিও আমেরির (১৮৭৩-১৯৫৫) ব্যক্তিগত ডায়েরিতে লেখা মন্তব্য অনুযায়ী, এটা ছিল ‘ভারতের প্রতি, উইনস্টনের মতোই, লর্ড শেরওয়েলের ঘৃণা’র কুফল।১২৯ উপনিবেশিত জনগণের প্রতি ঔপনিবেশিক শাসকদের এই বর্ণবাদী ঘৃণা যদুনাথ সরকারদের মতো ‘উপনিবেশবাদী’ ঐতিহাসিকদের চোখ এড়িয়ে যায়— যেতে বাধ্য, কেননা, উপনিবেশবাদ উপনিবেশিত ভূখণ্ডের অসতর্ক বুদ্ধিজীবীদের মন, মনন ও দৃষ্টিভঙ্গির উপনিবেশায়নের মাধ্যমে তাকে আপন দেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও স্বার্থবোধ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে।
যা-ই হোক, আমরা জেমস মিলের ভারত-সংক্রান্ত আলোচনায় ফিরে আসি। মিল ইসলাম ধর্মাবলম্বী দিল্লি-বিজেতাদের শিক্ষা, সংস্কৃতি ও দক্ষতার অনেক প্রশংসা করেছেন। তিনি লিখেছেন, ‘গজনির [সুলতান] মাহমুদ, যিনি হিন্দুস্তানে প্রথম মুসলিম রাজবংশ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, এশিয়ার সবচেয়ে সংস্কৃতিবান রাজন্য ছিলেন। তার রাজদরবারে বহু গুণী-জ্ঞানী মানুষের সমাহার ঘটেছিল। এশিয়ার মহত্তম কবি [ফেরদৌসী] তারই রাজধানীতে বাস করে, তারই আর্থিক পৃষ্ঠপোষকতায়, কাব্য সাধনা করেছেন। মাহমুদ ও তার চারপাশে সমবেত অভিজাতবর্গ গজনিকে সাজিয়ে তুলতে এমন স্থাপত্যকলা ব্যবহার করেছিলেন যে, তা গজনিকে পুবের দুনিয়ার সবচেয়ে সুন্দর নগরীর মর্যাদা দান করেছিল। তিনি অনেক সম্পদ ব্যয় করে সেখানে একটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করেছিলেন, যা তৎকালীন পুবের জগতে অন্যতম প্রধান বিদ্যাপীঠের খ্যাতি অর্জন করেছিল।’১৩০ মিলের মতে, গজনির মাহমুদ ‘তার শাসনব্যবস্থার ভেতর পারস্য সভ্যতায় বিকশিত শ্রেষ্ঠ সব সুকুমার উপাদান যুক্ত করেছিলেন’।
ভারতের শেষ মুসলিম রাজবংশ মুঘলদের ব্যাপারেও জেমস মিল অত্যুচ্চ প্রশংসা করেছেন। তিনি লিখেছেন, “এ কথা অস্বীকার করার জো নেই যে, ভারত বিজয়ের বহু পূর্বেই মুঘলরা ট্রানসোস্কিয়ানা [অর্থাৎ বর্তমানের উজবেকিস্তান, তাজিকিস্তান, দক্ষিণ কাজাখস্তান আর তুর্কমেনিস্তান ও কিরগিজস্তানের অংশবিশেষ নিয়ে গঠিত মধ্য এশিয়া নামে পরিচিত অঞ্চল] ও পার্সিয়ায় বসবাসের মাধ্যমে এই দু’টি অঞ্চলে বিকশিত সভ্যতার সারাৎসার আত্মস্থ করেছিলেন। তারা পার্সিয়ার ভাষা ব্যবহার করতেন, পার্সিয়ার আইন ও ধর্মকে বরণ করেছেন, তারা পার্সিয়ার সাহিত্যের অনুরাগী ছিলেন এবং হিন্দুস্তানে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করার সময় তারা পার্সিয়ার শিল্পকলা ও জ্ঞানের পরিপূর্ণ ঐশ্বর্য সঙ্গে নিয়ে এসেছিলেন।”১৩১
মিল লিখেছেন, মুঘলরা বহিরাগত হলেও, ভারতকে তারা বিদেশিদের মতো শাসন করেননি, কেননা তারা এদেশে স্থায়ীভাবে বসবাস করেছেন, আপন দেশের মতো করেই রাষ্ট্র পরিচালনা করেছেন। সেক্ষেত্রে, তিনি মনে করেন, ‘মুসলিম শাসনের অনেক ত্রুটি ছিল বইকি, কিন্তু সেগুলো কোনোভাবেই হিন্দু শাসনের ত্রুটির সঙ্গে তুলনীয় নয়।’১৩২ মিলের মতে, হিন্দু ধর্মের বৈষম্যমূলক ‘বর্ণপ্রথা-বিবর্জিত মুসলিম শাসন সকলের, প্রায় আধুনিক রিপাবলিকের নাগরিকদের মতো, সমান মর্যাদা কবুল করতো’। সরকার পরিচালনার ক্ষেত্রে, ‘হিন্দুশাসনের বিভ্রান্তিমূলক বিশৃঙ্খলার বিপরীতে, মুসলিম শাসনে রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তাদের ভেতর সুস্পষ্ট শ্রমবিভাজন বিদ্যমান ছিল’।
ভারতে হিন্দু শাসকদের রাষ্ট্রচিন্তা, আইন, প্রশাসন, করব্যবস্থা, ইতিহাসচেতনা, বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক মান ইত্যাদি মুসলমান শাসকদের সঙ্গে তুলনামূলক বিশ্লেষণ শেষে, জেমস মিল এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, ইসলাম ধর্মাবলম্বী ‘মুঘলদের শাসনশৈলী হিন্দুদের তুলনায় অনেক অগ্রসর ছিল’, ফলে ‘ভারতীয় ক্ষমতার রজ্জু মুসলমান শাসকদের হস্তগত হওয়ার কারণে হিন্দুদের কোনো ক্ষতি হয়নি’, বরং ‘ক্ষমতার এই পালাবদল থেকে হিন্দুদের অনেক কিছু অর্জন করার ছিল’।১৩৩
ভারতীয় ইতিহাসের ‘হিন্দু যুগ’ ও ‘মুসলিম যুগ’ সম্পর্কে তুলনামূলক বিশ্লেষণ ও মূল্যায়নের পাশাপাশি, জেমস মিল ভারতে প্রচলিত মুসলিম আইন ও শাসনপদ্ধতির সঙ্গে সাধারণভাবে ব্রিটিশ আইনের এবং বিশেষভাবে ভারতে প্রবর্তিত ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক প্রশাসনের তুলনামূলক আলোচনা করে, উভয় ক্ষেত্রেই ব্রিটিশদের উৎকৃষ্টতা দাবি করেছেন। অতঃপর, ১৭৭২ সালে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট-প্রণীত‘ রেগুলেটিভ অ্যাক্ট’-এর অধীনে, ভারতে প্রবর্তিতকর সংগ্রহ ব্যবস্থাপনা ও বিচার প্রশাসন সংস্কার কর্মসূচির ভূয়সী প্রশংসা করে জেমস মিল লিখেছেন, “এটা ছিল একটা বিপ্লব, যা অতীতে সংঘটিত যেকোনো পবির্তনের চেয়ে, এমনকি হিন্দুদের কাছ থেকে ক্ষমতার রজ্জু মুসলমানের কাছে হস্তান্তরিত হওয়ার মাধ্যমে সৃষ্ট পরিবর্তনের চেয়েও, বড় পরিবর্তন সংঘটিত করেছিল। হিন্দু শাসকদের কাছ থেকে মুসলমান শাসকদের কাছে ক্ষমতা যাওয়ার ঘটনাটি শুধু ক্ষমতার হাতই বদল করেছিল, যে হাত তরবারি চালনায় কিংবা বদান্যতা বিতরণে ব্যবহৃত হতো—প্রশাসনযন্ত্রের কিংবা, আরও যা গুরুত্বপূর্ণ, সামাজিক গঠনের ভেতর তা অতি সামান্যই পরিবর্তন সাধন করেছিল। মুসলিম শাসনামলে, সুবিধার বিবেচনায়, গোটা দেওয়ানি প্রশাসন তো হিন্দুদের হাতেই ন্যস্ত ছিল। আর বর্তমান ক্ষেত্রে, কর-ব্যবস্থাপনার পরিপূর্ণ পরিবর্তন ভারতীয় জনগণকে ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক — উভয়ভাবে আরও গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল।[...] এ ছিল এক সৃজনশীল উদ্ভাবন— যা দেশটির গোটা সম্পত্তি ব্যবস্থাপনাকে, এবং একই সঙ্গে বিচার প্রশাসনকে, একটি নতুন ভিত্তির ওপর দাঁড় করিয়েছিল।”১৩৪
স্পষ্টতই, মুসলিম শাসন সম্পর্কে আপন পুস্তকের প্রথম খণ্ডে প্রদত্ত মিলের প্রশংসাসূচক বয়ান তৃতীয় খণ্ডে এসে খানিকটা ফিকে হয়ে পড়েছে। এখন তিনি ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের জয়গানে নিজেকে নিয়োজিত করেছেন। একই সঙ্গে তিনি বাংলায় ব্রিটিশ শাসনের কিছু কদর্য কুফলের প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নীরবতা অবলম্বনের মাধ্যমে ঔপনিবেশিক শাসনের কৃত্রিম ন্যায্যতা জারি রাখার প্রয়াস গ্রহণ করেছেন। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, তিন কোটি মানুষ অধ্যুষিত তৎকালীন বাংলায় ১৭৬৯-১৭৭০ সালে সংঘটিত পৃথিবীর অন্যতম কুখ্যাত দুর্ভিক্ষের, যা ব্রিটিশ শাসকদেরই হিসাব অনুযায়ী ‘মোট জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশ’ মানুষকে বিলীন করে দিয়েছিল, বর্ণনা দিতে মিল তার বিশাল পুস্তকে একটি মাত্র বাক্য ব্যয় করেছেন, আর সেই একমাত্র বাক্যটিতে আবার এই ভয়াল দুর্ভিক্ষের কারণ হিসেবে, লন্ডন-ভিত্তিক ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির একদা বেতনভুক ‘উপদেষ্টা’ জেমস মিল কোম্পানির নির্বিচার লুটতরাজ ও বিশৃঙ্খল প্রশাসনিক ব্যবস্থার দায় উল্লেখ না করে, নিছক ‘ভারতের বিভিন্ন প্রদেশে প্রায়শ সংঘটিত প্রাকৃতিক দুর্যোগ’কে, বর্তমান ক্ষেত্রে খরাকে, দায়ী করেছেন।১৩৫
প্রকৃত সত্য হলো, বাংলায় এই বিধ্বংসী দুর্ভিক্ষের জন্য প্রধানত প্রাকৃতিক বিপর্যয় নয়, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দুঃশাসন, নির্বিচার অর্থনৈতিক লুণ্ঠন ও কৃষকদের ওপর ভয়াবহ নিপীড়নই প্রধানত দায়ী ছিল। উল্লেখ্য যে, দিল্লির সম্রাট কর্তৃক বাংলায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে, ১৭৬৫ সালে, বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার, ফৌজদারি এখতিয়ারসহ ‘দেওয়ানি’, মঞ্জুর করার পর এই অঞ্চলের মুর্শিদাবাদ-ভিত্তিক স্থানীয় শাসনকর্তা, কার্যত, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ‘বৃত্তিধারী’ এক নামসর্বস্ব নবাবে পরিণত হন এবং সকল প্রকার ‘প্রকৃত ক্ষমতা’ ক্রমশ কোম্পানি কর্তৃপক্ষের কুক্ষিগত হয়ে পড়ে। কোম্পানি কর্তৃক এই কুক্ষিগত ক্ষমতার নির্বিচার অপব্যবহার ও তার পরিণাম কীভাবে বাংলায় দুর্ভিক্ষ সৃষ্টিতে ভূমিকা রেখেছিল, তা উপলব্ধি করার জন্য, এমনকি, ১৯৩০-এর দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘ব্রিটিশের ধামাধরা ও স্বাধীনতা আন্দোলনের ঘোরতর বিরোধী বলে সুপরিচিত’১৩৬ বাঙালি ইতিহাসবিদ রমেশচন্দ্র মজুমদারের (১৮৮৮-১৯৮০) বয়ানই যথেষ্ট। মজুমদার লিখেছেন, “[জন] কার্টিয়ার ১৭৬৯ সনে ইংরেজ কোম্পানির গভর্নর হইলেন। এই সময়ে ইংরেজ কর্মচারীরা নানা অসৎ উপায়ে প্রজাগণকে উৎপীড়িত করিয়া নিজেদের জন্য বহু অর্থ উপার্জন করিতে ব্যস্ত ছিলেন— দেশ শাসনের কোনো দায়িত্বই তাঁহারা পালন করিতেন না। [...] বাঙ্গালীর দুঃখ-দুর্দশা চরমে পৌঁছিল।”১৩৭ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির লন্ডনস্থ কর্তৃপক্ষের কাছে ১৭৬৯ সনের মে মাসে লেখা কোম্পানিরই একজন উচ্চপদস্থ স্থানীয় কর্মকর্তা রিচার্ড বেচারের এক চিঠির উদ্ধৃতি দিয়ে মজুমদার অতঃপর লিখেছেন যে, “কোম্পানির দেওয়ানি লাভের ফলে [বাংলার] প্রজাসাধারণের যে দুর্দশা হইয়াছে, পূর্বে কখনও সেরূপ হয় নাই। বহু স্বেচ্ছাচারী নবাবের আমলেও যে দেশ অতুল সুখ সম্পদের অধিকারী ছিল, তাহা ধ্বংসের সীমানায় পৌঁছিয়াছে।”১৩৮ তারপর, মজুমদার লিখেছেন, “এই উক্তি যে কতোদূর সত্য শীঘ্রই তাহা প্রমাণ হইল। বাংলা ১১৭৬ সালে (১৭৬৯-৭০ খ্রিষ্টাব্দে) বাংলা দেশে এক ভীষণ দুর্ভিক্ষ হইল। ইহার ফলে প্রায় এক কোটি অর্থাৎ মোট অধিবাসীর এক-তৃতীয়াংশ লোক অনাহারে ও পীড়ায় মৃত্যুমুখে পতিত হয় এবং কৃষিযোগ্য জমির এক-তৃতীয়াংশ জঙ্গলে পরিণত হয়। [...] এই দুর্ভিক্ষপীড়িত লোকদের নিকট হইতে জোরজবরদস্তি করিয়া খাজনা আদায় করা হইয়াছিল। [...] বহু সম্ভ্রান্ত পরিবার ও সাধারণ গৃহস্থ সর্বস্বান্ত হইয়াছিল। প্রায় বিশ-ত্রিশ বৎসর পর্যন্ত বাংলা দেশে এই দুর্ভিক্ষের চিহ্ন লোপ পায় নাই।”১৩৯ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সম্পর্কে স্বাধীন ভারতের একজন গবেষক, তীর্থংকর রায়, মন্তব্য করেছেন, বাংলায় ‘১৭৭০ সালে সংঘটিত নির্মম দুর্ভিক্ষ [কোম্পানি পরিচালিত] রাষ্ট্রের অযোগ্যতা ও সংশ্লিষ্ট জনগণের স্বার্থের প্রতি তার নিস্পৃহতার পরিচায়ক’।১৪০ সর্বোপরি, বাংলায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির গভর্নর লর্ড কর্নওয়ালিসের লিখিত ১৭৮৪ সালের এক রিপোর্টেও ‘প্রায় এক-তৃতীয়াংশ জমির চাষাবাদের অভাবে জঙ্গলাকীর্ণ’ হয়ে পড়ার জন্য ‘দুর্ভিক্ষের’ পূর্বে, ‘কোম্পানির দুঃশাসন’কে দায়ী করা হয়েছিল।১৪১
তথ্যসূত্র:
১২৬ বিস্তৃত বিবরণের জন্য দেখুন, Janam Mukherjee, Hungry Bengal, pp. 58-65
১২৭ প্রাগুক্ত, p. 191
১২৮ প্রাগুক্ত
১২৯ প্রাগুক্ত, p. 185
১৩০ প্রাগুক্ত James Mill, History of British India, Vol. III, p. 462
১৩১ প্রাগুক্ত
১৩২ প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা: ৬২৮
১৩৩ প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা: ৬৩৫
১৩৪ James Mill, History of British India, Vol. III, p. 462
১৩৫ প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা: ৪৩১-৪৩২
১৩৬ খোকা রায়, সংগ্রামের তিন দশক, পৃষ্ঠা: ১০। উল্লেখ্য, রমেশচন্দ্র মজুমদার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগে ১৯২১ সাল থেকে ১৯৪২ সাল পর্যন্ত অধ্যাপনা করেছেন। তাছাড়া, তিনি ১৯২৪ থেকে ১৯৩৬ সাল পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলের প্রভোস্ট এবং ১৯৩৭ থেকে ১৯৪২ সাল পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। জগন্নাথ হলের প্রভোস্ট হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় জগন্নাথ হলের মাঠে ‘ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস’ ঘোষিত ‘স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম করার প্রকাশ্য ঘোষণা প্রদান দিবসে’, ১৯৩০ সালের ২৬ জানুয়ারি, স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলনের ‘অপরাধে’, সেই ছাত্রাবাসের দুজন শিক্ষার্থী হরেশ ভট্টাচার্য্য ও খোকা রায়কে তিনি ছাত্রাবাস থেকে বহিষ্কার করেছিলেন। পৃষ্ঠা : ৯
১৩৭ শ্রী রমেশচন্দ্র মজুমদার, বাংলাদেশের ইতিহাস, তৃতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা: ২১
১৩৮ প্রাগুক্ত
১৩৯ প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা : ২১-২২
১৪০ Tirthankar Roy, The East India Company: The World’s Most Powerful Corporation, p. 173
১৪১ সিরাজুল ইসলাম, “চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত ও কৃষি অর্থনীতি’, বাংলাদেশের ইতিহাস: ১৭০৪-১৯৭১, (সম্পা) সিরাজুল ইসলাম, বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি, ঢাকা, ১৯৯৩, পৃষ্ঠা: ২৬৪
