প্রকৃতির কোলে মনোমুগ্ধকর ‘ইত্যাদি’

প্রকৃতির কোলে মনোমুগ্ধকর ‘ইত্যাদি’

ফন্ট সাইজ:

জেলাভিত্তিক অনুষ্ঠানের ধারাবাহিকতায় এবারের ‘ইত্যাদি’ ধারণ করা হয়েছে জামালপুরে। পর্বটি দেখলেই এই ঐতিহ্যবাহী জেলা সম্পর্কে পুরো ধারণা পাওয়া যাবে। এবারের পর্ব জামালপুর নিয়ে হলেও অনুষ্ঠানটি ধারণ করা হয়েছে শহর থেকে প্রায় ৫৫ কিলোমিটার দূরে বকশীগঞ্জ উপজেলার লাউচাপড়া নামক স্থানে। সবুজ বনানী-লেক-ওয়াচ টাওয়ার ও পাহাড়ঘেরা অসাধারণ সৌন্দর্যের প্রাকৃতিক পর্যটন স্থান এই ‘লাউচাপড়া অবসর বিনোদন কেন্দ্র’। এটি মেঘালয় সীমান্তের কাছে গারো পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত। মূলত এই অঞ্চলে গারো সম্প্রদায়ের কিছু পরিবার বসবাস করে। পাহাড়ের কোলঘেঁষে হাজার হাজার মানুষের এই স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতিই প্রমাণ করে মানসম্পন্ন অনুষ্ঠানের প্রতি মানুষের ক্ষুধা কতোখানি।

হানিফ সংকেতের মঞ্চে আগমনের সময় হাজার হাজার দর্শকের করতালি, চিৎকার আর বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাসে গারো পাহাড় এলাকা যেন উৎসবস্থলে পরিণত হয়। প্রতিবারের মতো এবারো হানিফ সংকেত জামালপুরকে নিয়ে রচিত চারলাইন কবিতা দিয়ে শুরু করলেন অনুষ্ঠান। সবুজ পাহাড়, লেক আর অরণ্য বেষ্টিত এই প্রকৃতি ঘেরা স্থানে চিত্রায়িত ‘ইত্যাদি’ ইতিহাস, ঐতিহ্য, প্রাকৃতিক রূপ আর নকশিকাঁথাকে যেন একই সুতোয় গেঁথেছে। শুরুতেই ছিল স্থানীয় শিল্পী রাজিব ও সিঁথি সাহার কণ্ঠে পরিবেশিত জেলা পরিচিতিমূলক গানের সঙ্গে বাঙালি ও গারো শিল্পীদের চিত্ত দোলানো চমৎকার নৃত্য। মূল গান গেয়েছেন পান্থ কানাই ও তসিবা। জামালপুরের ওপর নির্মিত প্রতিবেদনে ছিল নকশিকাঁথার নিপুণ বুনন, সুস্বাদু খাবার মিল্লির পরিচিতি, লাউচাপড়ার নৈসর্গিক সৌন্দর্যের চিত্রায়ণ, ওয়াচ টাওয়ার থেকে মেঘালয়ের সবুজ পাহাড়ের সারি সবকিছু মিলিয়ে শুরুর অংশটুকু ছিল বেশ প্রকৃতিময়। যমুনার ভাঙনে একাধিকবার ভিটেহারা কিছু অসহায় মানুষের সাক্ষাৎকার এবং ভিটেহারা হতদরিদ্র মরিয়ম বেগমের আকুতি, ‘ভাবছিলাম এই ভিটায় মরমু কিন্তু যেমনে ভাঙতেছে, কোন ভিটায় যে মরুম সেইটা কইতে পারি না বাবা’। মরিয়ম বিবির এই আর্তনাদ হয়তো যমুনার স্রোতকে বাধা দিতে পারে না। ইত্যাদি’র সবচেয়ে বড় শক্তি এর সামাজিক সমালোচনা ও বার্তা। প্রতিটি নাট্যাংশেই ফুটে উঠেছে সময়ের নানা অসঙ্গতি, মিডিয়ার অপব্যবহার, মূল্যবোধের অবক্ষয়, চাটুকারদের ভণ্ডামি, চিহ্নিত কিছু চ্যানেলের বেহায়াপনা, অত্যন্ত তীক্ষ্ণ বিদ্রূপে বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়েছে; যা দর্শককে বিনোদনের পাশাপাশি ভাবায়ও।

বিশেষ করে, একালের আর সেকালের সংগীতের তুলনা, যে গান হারিয়ে যায় আর যে গান অন্তরে গেঁথে থাকে, বিচার বুদ্ধিহীন যেকোনো ব্যক্তির দলকে সমর্থন করা, আত্মপ্রদর্শনের উদ্দেশ্যে নিজস্ব চ্যানেলের ফ্লপ অনুষ্ঠান নিয়েও পূর্তি উৎসব করা, শিষ্টাচার বহির্ভূত আচরণ ও নৈতিক শিক্ষার অভাব, ফেসবুক কমিউনিটি বিয়ানস্ গ্রুপের কাণ্ডকীর্তি, নিজের ওপর আস্থার অভাবে এই বিয়ানস্ নামক রাস্তার ওপর নির্ভর করা, চাটুকারিতার প্রশিক্ষণ কেন্দ্র নাট্যাংশে তেলবাজদের চরম ধিক্কার, নাতি ও রিপোর্টারের পর্বে সাংবাদিক নামক অপসাংবাদিকদের বাস্তবমুখী চিত্র তুলে ধরা, চাঁদাবাজ ক্রেতাসহ বিভিন্ন নাট্যাংশ ছিল অত্যন্ত ধারালো, বাস্তবসম্মত ও সময়োপযোগী। ঘোড়া ও ঘোড়ার হাটের ওপর নির্মিত তথ্যচিত্রটি বেশ ব্যতিক্রমী। অনেকে জানেনই না, জামালপুরে এ ধরনের একটি ঘোড়ার হাট রয়েছে। বিদেশি প্রতিবেদনে চীনের প্রাচীন নগরী সুজৌর ওপর নির্মিত তথ্যচিত্রটি তথ্যসমৃদ্ধ ও শিক্ষণীয়। সবচেয়ে ভালো লেগেছে আমাদের দেশের খ্যাতিমান সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের স্মরণের পর্বটি। জামালপুরের কৃতী সন্তান অভিনেতা আনোয়ার হোসেন, নাট্যব্যক্তিত্ব আবদুল্লাহ আল-মামুন, চলচ্চিত্র পরিচালক আমজাদ হোসেন, গীতিকবি নজরুল ইসলাম বাবুর সংক্ষিপ্ত জীবনী তুলে ধরে তাদের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপনের বিষয়টি অত্যন্ত প্রশংসনীয়। এই গুণী মানুষগুলোকে স্মরণ করার জন্য হানিফ সংকেতকে বিশেষভাবে ধন্যবাদ। দর্শক পর্বে লটারির মাধ্যমে গানে গানে জমজমাট প্রতিযোগিতা ছিল বেশ উপভোগ্য। অনুষ্ঠানের শেষে তুলে ধরা হয়েছে জীবনের কাছে হার না মানা এক প্রতিবন্ধী লড়াকু দম্পতিকে। শারীরিক সীমাবদ্ধতার পাশাপাশি দারিদ্র্যতা সত্ত্বেও তারা ভিক্ষা করেন না। স্বামী-স্ত্রী দু’জন মিলে রোজগার করে সংসার চালান। কষ্ট হয় তবুও তাদের মনে সুখ আছে, কারণ কোনো বাধাই তাদের দমিয়ে রাখতে পারেনি। ইত্যাদিকে ধন্যবাদ বাপ্পী ও ওসনাই দম্পতিকে তাদের পরিকল্পিত ব্যবসার জন্য দু’লাখ টাকা অনুদান দিয়ে সহায়তা করার জন্য। সময়ের পরিক্রমায় হারিয়ে গেছে অনেক অনুষ্ঠান কিন্তু ইত্যাদি’র স্থান একটুও টলেনি। সুস্থ সংস্কৃতির চর্চা এবং সমাজ সংস্কারের এই অবিরাম যাত্রায় ‘ইত্যাদি’ কেবল একটি অনুষ্ঠান নয়, একটি সামাজিক বিপ্লব।