‘লাশও পাবেন না, দ্রুত হাসপাতালে যান’—জুলাই আন্দোলনে ভাই হারানোর রক্তক্ষয়ী জবানবন্দি দিলেন সেবন্তী

‘লাশও পাবেন না, দ্রুত হাসপাতালে যান’—জুলাই আন্দোলনে ভাই হারানোর রক্তক্ষয়ী জবানবন্দি দিলেন সেবন্তী

ফন্ট সাইজ:

“এই ফোনটি যার, সে পুলিশের গুলিতে মারা গেছে। দ্রুত সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে যান, অন্যথায় লাশও পাবেন না”—ফোনের ওপার থেকে আসা একটি কথাই স্তব্ধ করে দিয়েছিল পুরো পরিবারকে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে পুলিশের গুলিতে নির্মমভাবে প্রাণ হারান মোহাম্মদপুরের তরুণ শিক্ষার্থী মাহামুদুর রহমান সৈকত। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দেয়া জবানবন্দিতে ঘটনার লোমহর্ষক বর্ণনা তুলে ধরেন শহীদ সৈকতের বোন, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটির ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী সাবরিনা আফরোজ সেবন্তী।

বুধবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ তিনি এই জবানবন্দি দেন। এদিন প্রসিকিউশনের পক্ষে ট্রাইব্যুনালে উপস্থিত ছিলেন প্রসিকিউটর তারেক আব্দুল্লাহ্। তিনি মানবজমিনকে বলেন, এ মামলার ২৮ আসামির মধ্যে জাহাঙ্গীর কবির নানক, শেখ ফজলে নূর তাপসসহ ২৪ জন পলাতক। চার আসামি গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে আছেন। সাক্ষী সাবরিনা সেবন্তী মামলায় সাক্ষ্য দিয়ে আসামিদের সর্বোচ্চ শাস্তি ফাঁসি চেয়েছে। আমরাও ট্রাইব্যুনালের কাছে ন্যায় বিচার ও আসামিদের সবোচ্চ শাস্তি চাই ।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকায় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের ঘটনায় সাবেক মন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপসসহ ২৮ আসামির বিরুদ্ধে করা মামলায় সাবরিনা আক্তার সেবন্তী ৯ নাম্বার সাক্ষী হিসেবে এ জবানবন্দি দেন। সাক্ষ্যগ্রহনের এক পর্যায়ে ভাই হত্যার বিচার চেয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে সেবন্তী বলেন, আমার ভাই শহীদ মাহামুদুর রহমান সৈকতসহ জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রতিটি হত্যাকাণ্ডে জড়িত খুনি ও নির্দেশদাতাদের সর্বোচ্চ শাস্তি ফাঁসি চাই।

জবানবন্দিতে সেবন্তী জানান, ১৮ই জুলাই ২০২৪ তারিখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তন্নীর ওপর ছাত্রলীগের নৃশংস হামলার ছবি ফেসবুকে দেখে ক্ষোভে ফেটে পড়েছিলেন সৈকত। ছাত্রদের যৌক্তিক দাবির প্রতি একাত্মতা প্রকাশ করে মায়ের বারণ সত্ত্বেও তিনি আন্দোলনে যোগ দেন। সেদিন বিকেলে মোহাম্মদপুর এলাকায় পুলিশ ও আওয়ামী লীগ-যুবলীগের সশস্ত্র ক্যাডারদের দফায় দফায় গুলির মুখে পড়ে মাকে ফোন করে ঘরের জানালা-দরজা বন্ধ রাখতে বলেন তিনি। রাতে শহীদ ফারহান ফাইয়াজের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে সৈকত আরও আবেগাপ্লুত ও সংকল্পবদ্ধ হয়ে পড়েন।

পরের দিন ১৯শে জুলাই জুমার নামাজ শেষে দুপুরের খাবার খেয়ে নূরজাহান রোডের দক্ষিণ মাথায় আন্দোলনে যোগ দিতে যান সৈকত। বিকেল ৩টা ২৬ মিনিটে বোনের সঙ্গে শেষবার কথা হয় তার। সৈকত জানিয়েছিলেন, তিনি দ্রুতই বাসায় ফিরবেন। কিন্তু এর কিছুক্ষণ পরই তার নম্বরে বাবার ফোন রিসিভ করেন এক সহযোদ্ধা এবং সৈকতের গুলিবিদ্ধ হওয়ার খবর দেন।

পরবর্তীতে স্বজনরা শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে মর্গের সামনে স্ট্রেচারে সৈকতের নিথর, রক্তাক্ত দেহ পড়ে থাকতে দেখেন। ঘাতকের বুলেট তার মাথার বাম কানের ওপর দিয়ে ঢুকে ডান পাশ দিয়ে বের হয়ে গিয়েছিল।

সেবন্তী জানান, পরবর্তীতে বিষয়টি আমি আমার মায়ের নিকট থেকে শুনে দ্রুত সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের উদ্দেশ্যে রওনা করি। আমি হাসপাতালে যাওয়ার পথে অনেক জায়গায় আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের লক্ষ্য করে পুলিশকে গুলি করতে দেখি। হাসপাতালে গিয়ে আমি মর্গের ভিতরে আমার ভাইয়ের লাশ দেখতে পাই এবং তার পাশেই শহীদ রাজুর মরদেহসহ আরো ৫ টি লাশ দেখতে পাই। তাদের শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুলির চিহ্ন দেখতে পাই। শহীদ রাজু ছিলো মোহাম্মদপুরের একজন আন্দোনলকারী। রাত ৯ টার দিকে মোহাম্মদপুরের মারকাজুল ইসলামে লাশ গোসল করিয়ে লাশ সেখানেই রেখে দেই। আমার ফুফাত ভাই জানায় আমার বাসার নিচে পুলিশ ও ছাত্রলীগ, যুবলীগের সশস্ত্র ক্যাডাররা অবস্থান করছিলো। রাতে কারফিউ জারী হয়। পরের দিন বেলা ১১ টায় কারফিউ শিথিল থাকায় লাশ বাসায় নিয়ে আসি। অতপর মোহাম্মদপুর জামে মসজিদ কবরস্থানে দাফন করি। তৎকালে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কোনো ডেথ সার্টিফিকেট না দিলেও গণঅভ্যুত্থানের পর স্বৈরাচার সরকারের পতনের পর প্রাপ্ত মৃত্যু সনদে মৃত্যুর কারণ হিসেবে ‘গানশট’ (গুলির আঘাত) উল্লেখ করা হয়।

জবানবন্দিতে সেবন্তী এই বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের জন্য শেখ হাসিনাসহ তৎকালীন সরকারের শীর্ষ ব্যক্তি ও পুলিশ কর্মকর্তাদের সরাসরি দায়ী করেন। তিনি সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, সাবেক আইজিপি চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন, তৎকালীন ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান, অতিরিক্ত ডিআইজি প্রলয় কুমার জোয়াদ্দার, যুগ্ম কমিশনার বিপ্লব কুমার সরকার, এডিসি রওশানুল হক সৈকত, স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা শেখ বজলুর রহমান, জাহাঙ্গীর কবির নানকের এপিএস বিপ্লবসহ হামলায় জড়িত ক্যাডারদের নাম উল্লেখ করেন।

জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে সব অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণের দাবি প্রসিকিউশনের: গত দেড় দশকের শতাধিক গুম, খুন ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে আনীত প্রতিটি অভিযোগ প্রসিকিউশন সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রসিকিউটর গাজী এম এইচ তামিম। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে এ মামলার ১৫তম তথা সর্বশেষ সাক্ষী হিসেবে আংশিক সাক্ষ্য দিয়েছেন তদন্তকারী কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম। আগামী রবিবার তাঁর সাক্ষ্যের বাকি অংশ গ্রহণ করা হবে। তদন্ত কর্মকর্তার সাক্ষ্য শেষ হলে প্রসিকিউশন পক্ষের সাক্ষ্যগ্রহণ কার্যক্রম সমাপ্ত হবে। এরপর আসামি পক্ষ সাফাই সাক্ষী উপস্থাপনের সুযোগ পাবে এবং উভয় পক্ষের যুক্তিতর্ক শেষে মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রাখা হবে।

আদালতের কার্যক্রম শেষে প্রেস ব্রিফিংয়ে প্রসিকিউটর তামিম জানান, জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে সাবেক সেনাপ্রধান ইকবাল করিম ভূঁইয়াসহ মোট ১৫ জন সাক্ষী সাক্ষ্য দিয়েছেন। সাবেক সেনাপ্রধান তাঁর জবানবন্দিতে তুলে ধরেন—কীভাবে একজন সেনা কর্মকর্তা থেকে জিয়াউল আহসান তৎকালীন সরকারকে ক্ষমতায় রাখার উদ্দেশ্যে একটি অপরাধী চক্র গড়ে তুলেছিলেন এবং র‌্যাব কীভাবে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েছিল।
তিনি আরও জানান, র‌্যাবে কর্মরত থাকাকালে সাধারণ মানুষকে তুলে নিয়ে কীভাবে তথাকথিত ‘বন্দুকযুদ্ধের’ নাটক সাজিয়ে হত্যা করা হতো, সে বিষয়ে ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্য, প্রত্যক্ষদর্শী ও র‌্যাবের সাবেক কর্মকর্তারা আদালতে বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছেন। এমনকি সুন্দরবনে নিয়ে যাওয়ার কাজে ব্যবহৃত ট্রলারের মাঝিরাও ট্রাইব্যুনালে এসে সাক্ষ্য দিয়েছেন। এসব সাক্ষ্য ও দালিলিক প্রমাণের ভিত্তিতে প্রসিকিউশন তাদের প্রতিটি অভিযোগ প্রমাণ করতে পেরেছে বলে দাবি করেন তিনি।