৮৩ লাখ মানুষের জন্য জেনেভার বিপদসংকেত

টাকা ফুরোলে মানবতাও কি ফুরিয়ে যাবে?

৮৩ লাখ মানুষের জন্য জেনেভার বিপদসংকেত

ফন্ট সাইজ:

যুদ্ধ থামছে না, বাস্তুচ্যুতি কমছে না। অথচ শরণার্থীদের রক্ষায় আন্তর্জাতিক অর্থায়ন কমছে দ্রুত। জেনেভা থেকে জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআর সতর্ক করেছে পর্যাপ্ত অর্থ না এলে চলতি বছর প্রায় ৮৩ লাখ শরণার্থী, বাস্তুচ্যুত ও রাষ্ট্রহীন মানুষ জরুরি সুরক্ষা ও সহায়তা হারাতে পারেন।

ইউএনএইচসিআরের হাতে থাকা অর্থ ২০২৪ সালের ৫.২ বিলিয়ন ডলার থেকে ২০২৫ সালে ৩.৯ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে। ২০২৬ সালে সংস্থাটির প্রয়োজন প্রায় ৮.৫ বিলিয়ন ডলার। জুলাইয়ের শেষ পর্যন্ত মিলেছে প্রয়োজনের মাত্র ৩২ শতাংশ।

এই ঘাটতি শুধু হিসাবের খাতায় সীমাবদ্ধ নেই। এর অর্থ শরণার্থী নিবন্ধন বন্ধ বা বিলম্বিত হওয়া, নারী ও শিশুর নিরাপদ আশ্রয় সংকুচিত হওয়া, আইনি সহায়তা হারানো এবং দেশে ফেরা পরিবারগুলোর পুনর্বাসন থমকে যাওয়া।

অর্থ কমছে, সুরক্ষাও সরে যাচ্ছে

শরণার্থী সহায়তা মানে শুধু খাবার, তাঁবু বা কম্বল নয়। নিবন্ধন ও পরিচয়পত্র থেকে শুরু করে শিশু সুরক্ষা, মানবপাচার প্রতিরোধ, যৌন সহিংসতার শিকার নারীদের সহায়তা এবং আইনি সুরক্ষা সবই এই ব্যবস্থার অংশ। অর্থায়ন কমলে তাই শুধু ত্রাণ কমে না; মানুষের চারপাশের নিরাপত্তাবলয়ও দুর্বল হয়।

চাঁদে প্রায় ৩ লাখ ১৯ হাজার শরণার্থীর নিবন্ধন বিলম্বিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। প্রায় দুই লাখ নারী ও কিশোরী নিরাপদ স্থান ও সহিংসতা প্রতিরোধমূলক সেবা হারাতে পারেন। অথচ দেশটি ইতিমধ্যেই সুদানের যুদ্ধ থেকে পালিয়ে আসা বিপুলসংখ্যক মানুষের আশ্রয়স্থল।
বিশ্বের অন্যতম দরিদ্র একটি দেশ যখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের হয়ে লাখ লাখ শরণার্থীর দায়িত্ব বহন করছে, তখন অর্থদাতাদের পিছু হটা একটি বড় বৈপরীত্য। সুদান, সিরিয়া ও ইরাকেও অর্থসংকটের প্রভাব পড়ছে। কোথাও নিবন্ধন ও সুরক্ষা কার্যক্রম সংকুচিত হচ্ছে, কোথাও দেশে ফেরা মানুষের পুনর্বাসন সহায়তা ঝুঁকিতে পড়ছে।

পাঁচ হাজার চাকরি মানে শুধু পাঁচ হাজার চাকরি নয়

ইউএনএইচসিআর নিজেও বড় ধরনের সংকোচনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। প্রায় পাঁচ হাজার পদ ইতিমধ্যে বাদ পড়েছে বা প্রভাবিত হয়েছে; বহু স্থানে মাঠপর্যায়ের উপস্থিতিও কমানো হয়েছে। এর মানবিক মূল্য সরাসরি।

শরণার্থী নিবন্ধনের কর্মকর্তা না থাকলে পরিচয়পত্র আটকে যায়। শিশু সুরক্ষা কর্মকর্তা কমলে পরিবারবিচ্ছিন্ন শিশুকে শনাক্ত করা কঠিন হয়। নারী সুরক্ষা কার্যক্রম বন্ধ হলে সহিংসতার শিকার মানুষ চিকিৎসা, আশ্রয় ও আইনি সহায়তার পথ হারান। অর্থাৎ চাকরি কমার সঙ্গে সঙ্গে কমছে মাঠে সুরক্ষা দেওয়ার সক্ষমতাও।

সহায়তা কমিয়ে অভিবাসন ঠেকানো যাবে?

ইউরোপসহ বিশ্বের বহু দেশে অনিয়মিত অভিবাসন এখন বড় রাজনৈতিক ইস্যু। সীমান্ত নিয়ন্ত্রণে বিপুল অর্থ ব্যয় হচ্ছে। অথচ যে দেশগুলো যুদ্ধ ও সংঘাতের সবচেয়ে কাছাকাছি থেকে শরণার্থীদের আশ্রয় দিচ্ছে, সেখানে সহায়তা কমছে। এই নীতির মধ্যে একটি মৌলিক অসঙ্গতি আছে।

শরণার্থী শিবিরে খাবার, শিক্ষা, চিকিৎসা ও নিরাপত্তা সংকুচিত হলে মানুষ আরও মরিয়া হয়ে ওঠে। দীর্ঘদিন ভবিষ্যৎহীন অবস্থায় থাকা জনগোষ্ঠীর মধ্যে মানবপাচারকারী ও অপরাধী চক্রের সুযোগ বাড়ে। কেউ কেউ দ্বিতীয়বার বাস্তুচ্যুত হয়ে আরও দূরের দেশে যাওয়ার ঝুঁকি নেয়। ফলে আজ যে অর্থ মানবিক সহায়তায় বাঁচানো হচ্ছে, কাল তার চেয়ে বেশি অর্থ সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ, আশ্রয়প্রক্রিয়া ও নিরাপত্তায় ব্যয় করতে হতে পারে। মানবিক সহায়তা তাই শুধু দয়া নয়; সংকট বিস্তার ঠেকানোরও একটি উপায়।

বাংলাদেশের জন্য দূরের সতর্কতা নয়

বাংলাদেশের জন্য জেনেভার এই বিপদসংকেত বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। দেশটি প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গার ভার বহন করছে। ২০১৭ সালের বড় ঢলের পর প্রায় এক দশক হতে চললেও মিয়ানমারে তাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের পরিবেশ তৈরি হয়নি। আন্তর্জাতিক অর্থায়ন কমলে কক্সবাজারের শিবিরগুলোতে খাবার, চিকিৎসা, শিক্ষা ও সুরক্ষা কার্যক্রমে চাপ আরও বাড়বে।

এর প্রভাব শুধু শরণার্থীদের মধ্যে সীমিত থাকবে না। স্থানীয় জনগোষ্ঠীও দীর্ঘদিন ধরে ভূমি, পরিবেশ, শ্রমবাজার ও অবকাঠামোর ওপর চাপ বহন করছে। সহায়তা কমলে শরণার্থী ও স্থানীয় মানুষের মধ্যে সীমিত সম্পদ নিয়ে প্রতিযোগিতা বাড়তে পারে। আর দীর্ঘস্থায়ী হতাশা, কর্মহীনতা ও নিরাপত্তাহীনতা মানবপাচার ও অপরাধী নেটওয়ার্কের জন্য সুযোগ তৈরি করে। রোহিঙ্গা সংকট তাই শুধু মানবিক সমস্যা নয়; বাংলাদেশের অর্থনীতি, সামাজিক স্থিতিশীলতা, সীমান্ত নিরাপত্তা ও কূটনীতির সঙ্গেও জড়িত।

ঢাকার জন্য বার্তাটি পরিষ্কার রোহিঙ্গা সহায়তায় আন্তর্জাতিক অর্থায়ন ধরে রাখতে জেনেভা, নিউইয়র্ক, ব্রাসেলস, ওয়াশিংটন, লন্ডন, টোকিও ও উপসাগরীয় দেশগুলোতে কূটনৈতিক চাপ বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্রে রাখতে হবে মূল সমস্যাটি: রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসনের পরিবেশ মিয়ানমারকেই তৈরি করতে হবে।

অর্থ নেই, নাকি অগ্রাধিকার বদলেছে?

এই সংকটের সবচেয়ে অস্বস্তিকর প্রশ্ন এখানেই। বিশ্বে কি সত্যিই অর্থের অভাব, নাকি বদলে গেছে অগ্রাধিকার? বিশ্বজুড়ে প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ছে। অস্ত্র, সীমান্ত সুরক্ষা, প্রযুক্তি ও ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতায় বিপুল অর্থ ঢালা হচ্ছে। অথচ যুদ্ধ ও নিপীড়নের সরাসরি শিকার মানুষের সুরক্ষায় অর্থ কমছে।

রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা ব্যয় প্রয়োজনীয়। কিন্তু নিরাপত্তাকে শুধু অস্ত্র ও সীমান্ত দিয়ে মাপা যায় না। লাখ লাখ মানুষের দীর্ঘস্থায়ী বাস্তুচ্যুতি, শিক্ষাহীন শিশু, মানবপাচার, অনিয়মিত অভিবাসন এবং দরিদ্র আশ্রয়দাতা দেশের ওপর অসহনীয় চাপ এসবও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার অংশ। শরণার্থীদের জন্য অর্থ কমিয়ে সেই ঝুঁকি বিলীন করা যায় না। শুধু খরচটি এক খাত থেকে অন্য খাতে ঠেলে দেওয়া হয়।

বক্তৃতা দিয়ে শরণার্থী রক্ষা হয় না

নিউইয়র্ক ও জেনেভায় বিশ্বনেতারা নিয়মিত মানবাধিকার, শরণার্থী সুরক্ষা ও আন্তর্জাতিক সংহতির কথা বলেন। কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতির মূল্য শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত হয় মাঠে। শরণার্থীর নিবন্ধনে লোক লাগে। শিশু সুরক্ষায় প্রশিক্ষিত কর্মী লাগে। চিকিৎসাকেন্দ্র, আশ্রয় ও আইনি সহায়তায় অর্থ লাগে।

রাষ্ট্রগুলো যদি আন্তর্জাতিক শরণার্থী সুরক্ষার নীতিতে সমর্থন জানায়, কিন্তু সেই ব্যবস্থা চালানোর অর্থ না দেয়, তাহলে প্রতিশ্রুতি আর বাস্তবতার ব্যবধান বাড়তেই থাকবে। আজ সেই ব্যবধানের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে প্রায় ৮৩ লাখ মানুষ।

সংখ্যাটি বিশাল। কিন্তু এর ভেতরে আছে আলাদা আলাদা মুখ পরিবারহীন শিশু, সহিংসতা থেকে পালানো নারী, পরিচয়পত্রহীন শরণার্থী, দেশে ফিরে নতুন জীবন শুরু করতে চাওয়া পরিবার এবং কক্সবাজারের সেই রোহিঙ্গা বাবা, যিনি জানেন না আগামী মাসে সন্তানের খাবার কিংবা চিকিৎসার ব্যবস্থা আগের মতো থাকবে কি না।

জেনেভার সতর্কবার্তা তাই আরেকটি তহবিল সংগ্রহের আবেদনমাত্র নয়। এটি আন্তর্জাতিক শরণার্থী সুরক্ষাব্যবস্থার ভিত দুর্বল হয়ে যাওয়ার সংকেত।

বিশ্ব শরণার্থীদের পেছনে আজ কম অর্থ খরচ করতে পারে। কিন্তু সেই খরচ মুছে যাবে না। পরে তা ফিরে আসতে পারে মানবপাচার, অনিয়মিত অভিবাসন, সীমান্ত সংকট ও আঞ্চলিক অস্থিরতার বড় বিল হয়ে। প্রশ্নটি তাই খুব সরল সংকট বিস্ফোরিত হওয়ার পর তার মূল্য দেওয়া হবে, নাকি আগেই মানুষকে রক্ষার খরচটুকু বহন করা হবে? জেনেভা বিপদের ঘণ্টা বাজিয়েছে। এবার বিশ্বের জবাব দেওয়ার পালা।

লেখক: জেনেভাভিত্তিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক, প্রাইভেট ব্যাংকিং ফিন্যান্সিয়াল ক্রাইম কমপ্লায়েন্স বিশেষজ্ঞ, কলামিস্ট ও কবি। দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতি, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, বৈশ্বিক আর্থিক স্বচ্ছতা ও কৌশলগত বিষয় নিয়ে নিয়মিত লেখেন।
ই-মেইল: [email protected]