পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভাইস চ্যান্সেলর (ভিসি) নিয়োগ নিয়ে জটিলতা থামছেই না। একের পর এক নিয়োগ ঘিরে তৈরি হয়েছে বিতর্ক, সমালোচনা। নিয়োগ প্রত্যাখ্যান করে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে টানা আটদিন ধরে অচল চট্টগ্রাম প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়। আন্দোলনের জেরে ভিসিকে সরিয়ে নতুন ভিসি নিয়োগ দেয়ার ঘটনাও ঘটছে। ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি ও সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোতে একই ধরনের চিত্র দেখা যাচ্ছে। এর আগেও কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে দেখা দেয় অচলাবস্থা। ফলে প্রশ্ন উঠছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক পদে নিয়োগ দেয়ার আগে প্রার্থীদের বিষয়ে যথেষ্ট যাচাই-বাছাই ও তথ্য যাচাই করা হচ্ছে কিনা। নিয়োগের পর আন্দোলন, বিতর্ক কিংবা অভিযোগ সামনে আসার পর ব্যবস্থা নেয়ার বদলে কেন এসব বিষয় নিয়োগের আগেই শনাক্ত করা যাচ্ছে না- এখন সেই প্রশ্নই সামনে এসেছে।
বর্তমানে দুই বিশ্ববিদ্যালয়ে চলছে আন্দোলন। চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (চুয়েট) শিক্ষার্থীরা লাগাতার আন্দোলন করে যাচ্ছেন। সাবেক ভিসি অধ্যাপক ড. আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে পুনর্বহালের দাবিতে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা আন্দোলন করছেন। স্থবির হয়ে পড়েছে একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম। অষ্টম দিনের মতো চলা এই আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের দাবির পক্ষে যোগ দিয়েছেন শিক্ষক, কর্মকর্তারাও। এরই মধ্যে অনলাইনে যোগ দিয়ে দায়িত্ব পালন করছেন বলে জানান তিনি। এতে বিষয়টি সুরাহা হওয়া নিয়ে দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা। মাত্র ৫৬ দিন দায়িত্ব পালনের পর আগের ভিসি অধ্যাপক ড. আবু সাদাত মো. সায়েমকে বদলি করে অধ্যাপক ড. শেখ শরিফুল আলমকে নিয়োগ দেয় সরকার। আগের ভিসিকে দক্ষ ও চুয়েট বান্ধব দাবি করে প্রজ্ঞাপন বাতিলের দাবিতে আন্দোলন শুরু হয়।
ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটিতে নতুন ভিসি অধ্যাপক মো. লুৎফর রহমানের নিয়োগ বাতিলের দাবিতে আন্দোলনে রয়েছেন শিক্ষার্থীরা। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভিসি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের এই অধ্যাপককে গত ২৬শে সেপ্টেম্বর ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির ভিসি নিয়োগ দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। সেদিন থেকেই আন্দোলনে নামেন শিক্ষার্থীরা। তারা জানান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেট থেকে তারা ভিসি চান না। এরই মধ্যে রোববার শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মধ্যেই তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের বারিধারার অস্থায়ী কার্যালয়ে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে এক বছরে দু’বার ভিসি নিয়োগ দেয়া হলো।
এদিকে, সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ড. আলিমুল ইসলামের পদত্যাগ ও অপসারণের দাবিতে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে আন্দোলন করেন শিক্ষক-কর্মকর্তাদের একটি অংশ। ৭ই সেপ্টেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন প্রশাসনিক দায়িত্ব থেকে পাঁচ শিক্ষকসহ এগার শিক্ষক-কর্মকর্তা পদত্যাগ করেন। পরে ভিসি’র পদত্যাগের দাবিতে মানববন্ধন, অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন তারা।
বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসি নিয়োগ দেয়া হয়। যা নিয়ে নিয়মিতই হয়ে আসছে অসন্তোষ। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগ দেয়ার কয়েকদিন পরই সরিয়ে নেয়ার ঘটনা ঘটেছে। আবার নিয়োগের পর দেখা দিয়েছে অসন্তোষ। বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসি নিয়োগের পর ঘটে নজিরবিহীন ঘটনা। গত ১৪ই মে দেশের ১১টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে একযোগে ভিসি নিয়োগ দেয়া হয়। এতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আনিসুর রহমানকে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্ব দেয়া হয়। নিয়োগের ঘণ্টা না পেরোতেই অন্য এক প্রজ্ঞাপনে তার নিয়োগ বাতিল করে সরকার।
সরকার নিযুক্ত ভিসিকে প্রত্যাখ্যান করে আন্দোলন করেছিলেন গাজীপুরের ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (ডুয়েট) শিক্ষার্থীরা। ‘ডুয়েট ব্লকেড’ কর্মসূচি পালিত হয়েছিল ক্যাম্পাসে। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা মূল ফটকে তালা ঝুলিয়ে দিয়েছিলেন। ১৪ই মে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ইকবালকে ডুয়েটের নতুন ভিসি হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছিল। প্রজ্ঞাপন জারির পর শিক্ষার্থীদের একটি অংশ এর বিরোধিতা করে আন্দোলনে নামে। এমনি পরিস্থিতি দাঁড়ায় যে, ভিসি যোগদান করার পরও ক্যাম্পাসে ঢুকতে বাধা দেয়া হয়েছিল। তাদের দাবি ছিল ক্যাম্পাস থেকেই ভিসি নিয়োগ। এরই ধারাবাহিকতায় ‘নতুন ভিসিকে লাল কার্ড’ কর্মসূচির ডাক দেয়া হয়।
এ নিয়ে পক্ষে ও বিপক্ষে অবস্থান নেয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে পাল্টাপাল্টি ধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এ সময় অন্তত ২০ জন আহত হন।
গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়েও ঘটেছে দ্রুত পরিবর্তনের ঘটনা। গত ১৯শে জুলাই খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মো. নাজমুস সাদাতকে ভিসি হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। মাত্র ৩৭ দিন পর ২৫শে আগস্ট তাকে ওই পদ থেকে সরিয়ে নারায়ণগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ভিসি করা হয়। আবার একই নামে দুই ভিসি; ২৩ দিনের মাথায় জামালপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবিপ্রবি) ভিসি বদল নিয়ে শিক্ষাঙ্গনে নতুন আলোচনার সৃষ্টি হয়েছিল। ১৪ই মে জাবিপ্রবি’র ভিসি হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছিল জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আমির হোসেন ভূঁইয়াকে। নিয়োগের দুইদিনের মধ্যে তিনি যোগদানও সম্পন্ন করেন। ৬ই জুন শিক্ষা মন্ত্রণালয় বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মো. আমির হোসেনকে জাবিপ্রবি’র নতুন ভিসি নিয়োগ দিয়ে আবার নতুন করে প্রজ্ঞাপন জারি করে।
সে সময় চাউর হয়েছিল টাইপিং মিসটেকের কারণে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছিল।
দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসি নিয়োগ হয় সার্চ কমিটির মাধ্যমে। সবশেষ ১লা এপ্রিল সার্চ কমিটিতে রাখা হয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেককে। আর সদস্য সচিব করা হয় মাধ্যমিক উচ্চশিক্ষা বিভাগের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার অতিরিক্ত সচিবকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি প্রফেসর ড. এবিএম ওবায়দুল ইসলাম, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি প্রফেসর ড. মো. ফরিদুল ইসলাম, বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) সদস্য (পাবলিক ইউনিভার্সিটি) প্রফেসর মোহাম্মদ তানজীমউদ্দিন খান (বর্তমানে নাই), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের প্রফেসর ড. মো. মোর্শেদ হাসান।
বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগের পর ভিসি’র বিরুদ্ধে অভিযোগ আসে। এখন প্রশ্ন উঠছে সার্চ কমিটির কর্মপরিধি এবং গোয়েন্দা তথ্যের ব্যাপকতার উপর। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন সাবেক ভিসি বলেন, নিয়োগের পর আমার পূর্বের কিছু কর্মকাণ্ডের ছবি সামনে আনা হলো। আমার প্রশ্ন হলো-এসব বিষয় যদি যাচাই-বাছাইয়ের প্রয়োজন থাকে, তাহলে নিয়োগের আগে সেগুলো যাচাই করা হলো না কেন? নিয়োগ দেয়ার পর আবার সরিয়ে দেয়ার এই প্রক্রিয়া শুধু অযৌক্তিক নয়, একজন শিক্ষকের জন্য অপমানজনকও। আমি একজন শিক্ষক। ভিসি হতে চেয়েছিলাম, কারণ এটি একটি সম্মানজনক একাডেমিক পদ। কিন্তু আমাকে নিয়োগ দিয়ে আবার সরিয়ে দেয়া হলে সেটি আমার জন্য উল্টো অপমানের। সরকার যদি কাউকে এই পদে রাখতেই না পারে, তাহলে তাকে নিয়োগ দেয়ার প্রয়োজনটাই বা কী?
তিনি বলেন, দলীয় বিবেচনায় নিয়োগ দেয়া দেশে নতুন কিছু নয়। তবে দলীয় লোকদের মধ্য থেকেও যোগ্য, দক্ষ ও গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিকে খুঁজে বের করা সম্ভব। সে ক্ষেত্রে নিয়োগের আগে যথাযথ যাচাই-বাছাই ও ক্রেডিবল মূল্যায়ন জরুরি। সরকারকে বুঝতে হবে, ভিসির পদ কোনো রাজনৈতিক পদ নয়। শুধু তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক সুবিধা বা পপুলিস্ট ডিসিশনের ভিত্তিতে নিয়োগ দেয়া হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন ও ভাবমূর্তি-দুটিই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ভবিষ্যতে সরকারকে এ ধরনের পপুলিস্ট ডিসিশন থেকে সরে এসে একটি স্বচ্ছ, গ্রহণযোগ্য ও ক্রেডিবল নিয়োগপ্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে হবে।
ইউজিসি’র সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এ এস এম ফায়েজ বলেন, কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সিদ্ধান্ত সাম হাউ শিক্ষার্থীদের ডিপ্রেসড করেছে। এই বিষয়গুলো নিয়ে সরকারের আরেকটু সচেতন হওয়া উচিত ছিল। কিছু স্থানে শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ হয়তো স্বাভাবিকও ছিল। এই নিয়োগগুলো হয়তো সার্চ কমিটির মাধ্যমে হয় নাই। কিন্তু কোনো শিক্ষক ভিসি হওয়ার যোগ্য বা শিক্ষার্থী-শিক্ষকরা পছন্দ করবেন তা যাচাই করা খুব কঠিন কিছু না। আরেকটু সিনসিয়ারলি কাজ করলে হয়তো এই বিষয়গুলো সামনে আসতো না।
তিনি আরও বলেন, আমি মনে করি কোনো শিক্ষক যদি ভিসি হওয়ার জন্য লবিং করে থাকেন; তাহলে তিনি শুরুতেই অযোগ্যতার পরিচয় দিলেন। তাই সরকারকে বলবো, পরবর্তীতে কোনো শিক্ষক যদি লবিং করেন ভিসি হওয়ায় জন্য শুরুতেই তার আবেদন বাতিল করা উচিত।
এ বিষয়ে সাম্প্রতিক এক অনুষ্ঠানে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেছিলেন, পুরো প্রক্রিয়াটিই একটা নিয়মের মধ্যে চলে। সার্চ কমিটি কাজ করে, তারা সুপারিশ করে এরপর তা চ্যান্সেলরের কাছে যায়।
