তত্ত্বাবধায়কের গ্রহণযোগ্য রূপরেখার প্রস্তাব চেয়েছে বিশেষ কমিটি

ফন্ট সাইজ:

প্রিন্ট মিডিয়ার পর এবার ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার ঊর্ধ্বতন দায়িত্বশীল প্রতিনিধিদের সঙ্গে মতবিনিময় করেছেন সংবিধান সংশোধনে গঠিত বিশেষ কমিটি। সভায় ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার প্রতিনিধিদের কাছে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতির জন্য গ্রহণযোগ্য রূপরেখার উন্মুক্ত প্রস্তাব চেয়েছে বিশেষ কমিটি। এছাড়া বিরোধী দলকে বিশেষ কমিটিতে অংশ নেয়ার আহ্বান জানিয়ে কমিটির চেয়ারম্যান ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, জুলাই সনদের কোনো বিষয়ে তাদের ভিন্নমত থাকলে সমঝোতার ভিত্তিতে তা আলোচনা করা যেতে পারে। তবে ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার প্রতিনিধিদের পক্ষ থেকে প্রস্তাব দেয়া হয়েছে, টেকসই গণতন্ত্র ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়তে সংবিধান সংশোধন প্রক্রিয়ায় বিরোধী দলগুলোকে যেন সম্পৃক্ত করা হয়। একইসঙ্গে সবার ঐকমত্যের ভিত্তিতে একটি গ্রহণযোগ্য সংশোধনী আনা হয়। এছাড়া তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনা এবং নির্বাচন কমিশন ও দুদকের মতো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্বাধীন ও শক্তিশালী করার ওপর জোর দেন তারা।

গতকাল জাতীয় সংসদে সংবিধান সংশোধন বিষয়ক বিশেষ কমিটির চতুর্থ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে টেলিভিশন ও অনলাইন সংবাদমাধ্যমের প্রধান নির্বাহী, সম্পাদক, হেড অব নিউজ এবং টকশো ব্যক্তিত্বরা অংশ নেন। বৈঠক শেষে সংসদের মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত পৃথক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা জানান সালাহউদ্দিন আহমদ ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার প্রতিনিধিরা।

সংবাদ সম্মেলনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, গত রোববার ও মঙ্গলবার দুইদিন গণমাধ্যমের সম্পাদক, টিভি চ্যানেল ও অনলাইন পোর্টালের বার্তা ব্যবস্থাপক, মিডিয়া ব্যক্তিত্ব এবং সাংবাদিক নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় করেছে বিশেষ কমিটি। সেখান থেকে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ও বিস্তর প্রস্তাব পাওয়া গেছে। সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সর্বোচ্চ ১০ বছর করার বিষয়ে অনেকে মত দিয়েছেন যে এটি অগণতান্ত্রিক এবং জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকারের পরিপন্থি। কিন্তু আমাদের দলের পক্ষ থেকে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী প্রস্তাব করেছিলেন যেন কোনো ব্যক্তি ১০ বছরের বেশি প্রধানমন্ত্রী পদে না থাকেন। স্বৈরতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হওয়া ঠেকাতেই এই প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। আমরা আমাদের সেই অবস্থান থেকে এখনো সরিনি। তবে সংসদে বিরোধী দল বা অন্য কারও পক্ষ থেকে কোনো প্রস্তাব এলে তা নিয়ে আলোচনা হতে পারে।

সংবিধানের অন্যান্য সংশোধনীর প্রস্তাব সম্পর্কে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বৈঠকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি, বিচার বিভাগের বিকেন্দ্রীকরণ ও স্বাধীনতা এবং সংবিধানের প্রস্তাবনা ও রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতিতে পরিবর্তনের প্রস্তাব এসেছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাঠামো ও রূপরেখা কী হবে সে বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। এ নিয়ে আরও উন্মুক্ত আলোচনা ও প্রস্তাব প্রয়োজন। আমরা গণমাধ্যম প্রতিনিধিদের কাছে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি গঠনের গ্রহণযোগ্য রূপরেখার প্রস্তাব চেয়েছি। গ্রহণযোগ্য প্রস্তাব পেলে পর্যালোচনা করে পরবর্তীতে পার্লামেন্ট সিদ্ধান্ত নেবে।

দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট পার্লামেন্ট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সংবিধানে বলা আছে বাংলাদেশ একক রাষ্ট্র (ইউনিটারি গভর্মেন্ট)। এখানে অঙ্গরাজ্যের কোনো সিস্টেম নেই। তাই দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট পার্লামেন্টের আদৌ প্রয়োজন আছে কিনা, সে বিষয়ে কেউ কেউ মতামত দিয়েছেন। তবে ‘জুলাই জাতীয় সনদে’ দ্বিকক্ষ পার্লামেন্টের বিষয়ে ঐকমত্য থাকায় আমরা সেভাবেই এগোতে চাই। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত পার্লামেন্টই নেবে।

সংবিধান সংশোধনে বিরোধী দলের অংশগ্রহণ ও ‘জুলাই সনদে’ তাদের ‘নোট অব ডিসেন্ট’ প্রসঙ্গে বিশেষ কমিটির সভাপতি বলেন, আমাদের আলোচনার দ্বার উন্মুক্ত। আমরা আপনাদের (গণমাধ্যম) মাধ্যমে বিরোধী দলকে আহ্বান জানাই, তারা যেন সংবিধান সংশোধন কমিটিতে নাম অন্তর্ভুক্ত করেন এবং আলোচনায় আসেন। জুলাই সনদের কোনো বিষয়ে তাদের ভিন্নমত থাকলে সমঝোতার ভিত্তিতে তা আলোচনা করা যেতে পারে, তবে তার জন্য তো তাদের আলোচনায় আসতে হবে।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরে সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ, সংবিধান বিশেষজ্ঞ, আইনজীবী, বিচারক, শিক্ষাবিদ, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সঙ্গে সম্পর্কিত সামাজিক শক্তি, জুলাই অভ্যুত্থানে শহীদদের পরিবার এবং গত ১৭ বছরে গুমের শিকার হওয়া ব্যক্তিদের পরিবারের সঙ্গে আলোচনা করবে কমিটি। এছাড়া, ড. আলী রীয়াজের নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সঙ্গেও শেষের দিকে বৈঠক করা হবে। সবার মতামতের ভিত্তিতে একটি রিপোর্ট প্রণয়ন করে তা পার্লামেন্টে উপস্থাপন করা হবে এবং তার ভিত্তিতেই সংসদে বিল পাসের মাধ্যমে একটি গ্রহণযোগ্য সংবিধান সংশোধনী আনা হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

বিরোধী দলকে সম্পৃক্ত করার অনুরোধ গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বদের: টেকসই গণতন্ত্র ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়তে সংবিধান সংস্কার প্রক্রিয়ায় বিরোধী দলগুলোকে সম্পৃক্ত করার আহ্বান জানিয়েছেন টেলিভিশন সম্পাদক ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বরা। একইসঙ্গে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনা এবং নির্বাচন কমিশন ও দুদকের মতো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্বাধীন ও শক্তিশালী করার ওপর জোর দিয়েছেন তারা। সংবাদ সম্মেলনে ব্রডকাস্ট জার্নালিস্ট সেন্টারের চেয়ারম্যান ফাহিম আহমেদ বলেন, স্বাধীনতার পর থেকে বহুবার সংবিধান কাটাছেঁড়া হয়েছে কিন্তু এবার জুলাইয়ের চেতনা ধারণ করে আমরা যেন একটি বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়তে পারি সেই লক্ষ্যে ঐকমত্যের ভিত্তিতে সংবিধান সংশোধনের অনুরোধ করেছি। তিনি আরও বলেন, সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে অবশ্যই বিরোধী দলগুলোকে রাখার চেষ্টা করতে হবে। তাদের কনভিন্স করে আলোচনায় আনতে হবে তবেই এটি সারা দেশের মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে। এছাড়া নির্বাচন কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও গণমাধ্যমকে শক্তিশালী করার বিষয়গুলো সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে বলেও জানান- তিনি।

বাংলাভিশনের প্রধান সম্পাদক ও হেড অব নিউজ ড. আবদুল হাই সিদ্দিক বলেন, আমাদের সাংবিধানিক সংস্কারের মূল লক্ষ্য হলো- গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করা। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো, বিশেষ করে নির্বাচন কমিশন যেন সত্যিকার অর্থে স্বাধীন থাকে এবং তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থার মাধ্যমে গণতন্ত্রের ভিত্তি যেন মজবুত হয় সেই বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে।
সংবিধান সংশোধন যেন টেকসই ও দীর্ঘমেয়াদি হয় সে বিষয়ে জোর দিয়ে টকশো ব্যক্তিত্ব ডা. সাখাওয়াত হোসেন সায়ন্থ বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রক্রিয়া নিয়ে সবার কাছে সুচিন্তিত লিখিত মতামত চেয়েছে কমিটি। সংবিধানের এই সংশোধনটা যেন টেকসই হয়, বারবার যেন পরিবর্তন করতে না হয় সে বিষয়ে সবাই একমত হয়েছেন। বিরোধী দলসহ সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী সব রাজনৈতিক দল একসঙ্গে থেকে এই সংশোধন করলে তা কম বিতর্কিত হবে।

দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট পার্লামেন্ট প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে ডা. সায়ন্থ বলেন, উচ্চকক্ষের প্রয়োজন আছে কি না তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এটি দেশের আর্থিক ব্যয় বাড়াবে কি না তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এছাড়া উচ্চকক্ষ হলে সেখানে সিভিল সোসাইটির (সুশীল সমাজ) নামে দলীয় লোকজন ঢুকে যাবে কি না-ফলে নন-পার্টিজান সিভিল সোসাইটি অস্তিত্ব হারাবে কি না সেসব উদ্বেগও তুলে ধরা হয়েছে। বৈঠকে কমিটির সদস্য ও জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি, কমিটির সদস্য ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি জয়নুল আবেদীন, কমিটির সদস্য ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি, কমিটির সদস্য ও প্রবাসী কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক, কমিটির সদস্য ও ভূমি প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন, কমিটির সদস্য ও সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমীন এবং কমিটির সদস্য মো. মাহমুদুল হক রুবেল উপস্থিত ছিলেন।