প্রিন্ট মিডিয়ার পর এবার ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার ঊর্ধ্বতন দায়িত্বশীলদের সঙ্গে মতবিনিময় করেছেন সংবিধান সংশোধনে গঠিত বিশেষ কমিটি। সভায় ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার প্রতিনিধিদের কাছে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতির জন্য গ্রহণযোগ্য রূপরেখার উন্মুক্ত প্রস্তাব চেয়েছে বিশেষ কমিটি। এছাড়া বিরোধী দলকে বিশেষ কমিটিতে অংশ নেয়ার আহ্বান জানিয়ে কমিটির চেয়ারম্যান ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, জুলাই সনদের কোনো বিষয়ে তাদের ভিন্নমত থাকলে সমঝোতার ভিত্তিতে তা আলোচনা করা যেতে পারে। তবে ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার প্রতিনিধিদের পক্ষ থেকে প্রস্তাব দেয়া হয়েছে, টেকসই গণতন্ত্র ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়তে সংবিধান সংশোধন প্রক্রিয়ায় বিরোধী দলগুলোকে যেন সম্পৃক্ত করা হয়। একইসঙ্গে সবার ঐকমত্যের ভিত্তিতে একটি গ্রহণযোগ্য সংশোধনী আনা হয়। এছাড়া তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনা এবং নির্বাচন কমিশন ও দুদকের মতো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্বাধীন ও শক্তিশালী করার ওপর জোর দেন তারা।
মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদে সংবিধান সংশোধন বিষয়ক বিশেষ কমিটির চতুর্থ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে টেলিভিশন ও অনলাইন সংবাদমাধ্যমের প্রধান নির্বাহী, সম্পাদক, হেড অব নিউজ এবং টকশো ব্যক্তিত্বরা অংশ নেন। বৈঠক শেষে সংসদের মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত পৃথক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা জানান সালাহউদ্দিন আহমদ ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার প্রতিনিধিরা।
সংবাদ সম্মেলনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, গত রোববার ও মঙ্গলবার দুই দিন গণমাধ্যমের সম্পাদক, টিভি চ্যানেল ও অনলাইন পোর্টালের বার্তা ব্যবস্থাপক, মিডিয়া ব্যক্তিত্ব এবং সাংবাদিক নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় করেছে বিশেষ কমিটি। সেখান থেকে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ও বিস্তর প্রস্তাব পাওয়া গেছে। সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সর্বোচ্চ ১০ বছর করার বিষয়ে অনেকে মত দিয়েছেন যে এটি অগণতান্ত্রিক এবং জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকারের পরিপন্থি। কিন্তু আমাদের দলের পক্ষ থেকে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী প্রস্তাব করেছিলেন যেন কোনো ব্যক্তি ১০ বছরের বেশি প্রধানমন্ত্রী পদে না থাকেন। স্বৈরতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হওয়া ঠেকাতেই এই প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। আমরা আমাদের সেই অবস্থান থেকে এখনো সরিনি। তবে সংসদে বিরোধী দল বা অন্য কারও পক্ষ থেকে কোনো প্রস্তাব এলে তা নিয়ে আলোচনা হতে পারে।
সংবিধানের অন্যান্য সংশোধনীর প্রস্তাব সম্পর্কে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বৈঠকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি, বিচার বিভাগের বিকেন্দ্রীকরণ ও স্বাধীনতা এবং সংবিধানের প্রস্তাবনা ও রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতিতে পরিবর্তনের প্রস্তাব এসেছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাঠামো ও রূপরেখা কী হবে সে বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। এ নিয়ে আরও উন্মুক্ত আলোচনা ও প্রস্তাব প্রয়োজন। এ বিষয়ে সুশীল সমাজসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের কাছ থেকে লিখিত প্রস্তাব ও গঠনমূলক পরামর্শ চাওয়া হচ্ছে। পাওয়া প্রস্তাবগুলোর মধ্যে জাতির জন্য সবচেয়ে উপযুক্তটিকে বিবেচনায় নিয়ে জাতীয় সংসদে পর্যালোচনার পর আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করা হবে।
তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের প্রক্রিয়া ও ধাপ নিয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে আসা সম্ভব হয়নি। জুলাই জাতীয় সনদে এ বিষয়ে কিছু স্পষ্ট প্রস্তাবের পাশাপাশি বিভিন্ন ক্ষেত্রে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ বা ভিন্নমতও রয়েছে। প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় কিংবা চতুর্থ-কোন ধাপে কীভাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকার কাঠামো রূপ পাবে, সে বিষয়ে একাধিক বিকল্প উন্মুক্ত রাখা হয়েছে।
দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট পার্লামেন্ট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সংবিধানে বলা আছে বাংলাদেশ একক রাষ্ট্র (ইউনিটারি গভর্মেন্ট)। এখানে অঙ্গরাজ্যের কোনো সিস্টেম নেই। তাই দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট পার্লামেন্টের আদৌ প্রয়োজন আছে কিনা, সে বিষয়ে কেউ কেউ মতামত দিয়েছেন। তবে ‘জুলাই জাতীয় সনদে’ দ্বিকক্ষ পার্লামেন্টের বিষয়ে ঐকমত্য থাকায় আমরা সেভাবেই এগোতে চাই। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত পার্লামেন্টই নেবে।
সংবিধান সংশোধনে বিরোধী দলের অংশগ্রহণ ও ‘জুলাই সনদে’ তাদের ‘নোট অব ডিসেন্ট’ প্রসঙ্গে বিশেষ কমিটির সভাপতি বলেন, আমাদের আলোচনার দ্বার উন্মুক্ত। আমরা আপনাদের (গণমাধ্যম) মাধ্যমে বিরোধী দলকে আহ্বান জানাই, তারা যেন সংবিধান সংশোধন কমিটিতে নাম অন্তর্ভুক্ত করেন এবং আলোচনায় আসেন। জুলাই সনদের কোনো বিষয়ে তাদের ভিন্নমত থাকলে সমঝোতার ভিত্তিতে তা আলোচনা করা যেতে পারে, তবে তার জন্য তো তাদের আলোচনায় আসতে হবে।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরে সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ, সংবিধান বিশেষজ্ঞ, আইনজীবী, বিচারক, শিক্ষাবিদ, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সঙ্গে সম্পর্কিত সামাজিক শক্তি, জুলাই অভ্যুত্থানে শহীদদের পরিবার এবং গত ১৭ বছরে গুমের শিকার হওয়া ব্যক্তিদের পরিবারের সঙ্গে আলোচনা করবে কমিটি। এছাড়া, ড. আলী রীয়াজের নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সঙ্গেও শেষের দিকে বৈঠক করা হবে। সবার মতামতের ভিত্তিতে একটি রিপোর্ট প্রণয়ন করে তা পার্লামেন্টে উপস্থাপন করা হবে এবং তার ভিত্তিতেই সংসদে বিল পাসের মাধ্যমে একটি গ্রহণযোগ্য সংবিধান সংশোধনী আনা হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
