ভারতীয় কৃষক আন্দোলনের খ্যাতিমান গবেষক সুপ্রকাশ রায় লিখেছেন, “নীল বপন করিতে অস্বীকার করিলে চাষীর উপর চলিত অবর্ণনীয় উৎপীড়ন। নীল বপনে স্বীকৃত না হওয়া পর্যন্ত তাহাকে নীলকরের কারাগারে আবদ্ধ হইয়া অশেষ শারীরিক যন্ত্রণা সহ্য করিতে হইতো, তাহার গৃহ ভস্মীভূত হইতো, তাহার স্ত্রী-পুত্র পথের ভিখারী হইতো।”১০০
ইংরেজ নীলকর সাহেবদের জন্য নীল চাষ লাভজনক হওয়ার কারণে তারা বাংলার কৃষককে ধানের জমিতেও নীল চাষ করতে বাধ্য করতো। ফলে, বাংলায় চালের উৎপাদন কমতে থাকে, যার পরিণাম হলো কৃষকের আহারে ঘাটতি বেড়ে যাওয়া। সমসাময়িক পত্র-পত্রিকায় বিচ্ছিন্নভাবে হলেও এই সমস্যাটির পরিচয় মেলে। হিন্দু ধর্ম-সংস্কার আন্দোলনের খ্যাতিমান নেতা রাজা রামমোহন রায়ের (১৭৭২-১৮৩৩) মালিকানাধীন সাপ্তাহিক ‘সংবাদ-কৌমুদী’তে ১৮২৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত একটি নিবন্ধে বলা হয় যে, “ইতিমধ্যে নীলকররা ধানের জমি দখল করে সেখানে নীল চাষ করছে এবং তার ফলে দেশের চালের উৎপাদন কমে যাচ্ছে, জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যাচ্ছে, সঙ্গে সঙ্গে দেশে দুঃখ কষ্টও বেড়ে যাচ্ছে।”১০১
কিন্তু সেদিন ইংরেজি-শিক্ষিত ও ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সঙ্গে ব্যবসা বা চাকরিসূত্রে জড়িত প্রভাবশালী বাঙালির অনেকেই কৃষকের স্বার্থের বিরুদ্ধে নীলকরদের ঔপনিবেশিক স্বার্থের তরফে দাঁড়িয়েছিলেন। এসব প্রভাবশালী ব্যক্তির মধ্যে রাজা রামমোহনের বন্ধু প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুরও (১৭৯৪-১৮৪৬) অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। তিনি সংবাদ-কৌমুদীর উপরোল্লিখিত নিবন্ধের প্রতিক্রিয়ায়, একই মাসে, একই পত্রিকায়, নীলকরদের সমর্থনে এক চিঠিতে লেখেন, “পূর্বে যেখানে চাষীদের জমিদারের জন্য বেগার খাটতে হ’তো, সেখানে নীলকরদের কাছ থেকে ভালো টাকা পাওয়া যাচ্ছে। মাসে ৪ টাকা করে, যার ফলে তারা স্বাধীনভাবে আছে, সুখে দিন কাটাচ্ছে। [...] নীল চাষ বেড়ে গেলে নীল চাষীদের আরও উন্নতি হয়।১০২
পরের বছর, ১৮২৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে, কলকাতায় অনুষ্ঠিত এক সভায় দ্বারকানাথ ঠাকুর ও রামমোহন রায় যৌথভাবে দাবি করেন যে, “নীলচাষ-বিহীন এলাকার কৃষকদের তুলনায়, নীলচাষ অঞ্চলের চাষিদের অবস্থা অপেক্ষাকৃত ভালো; কোনো কোনো ক্ষেত্রে চাষিরা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও মোটের ওপর বেশির ভাগ ক্ষেত্রে নীলচাষের দ্বারা কৃষকরা ও জনসাধারণ উপকৃত হয়েছে।”১০৩
অথচ বাস্তব অবস্থা ছিল ঠিক উল্টো, যা এমনকি কোনো কোনো ইংরেজের বস্তুনিষ্ঠ বয়ানেই তা ফুটে ওঠে।
ঔপনিবেশিক ভারতের একজন ইংরেজ কর্মকর্তা, জর্জ গ্রাহাম, যিনি ১৮৬০-এর দশকে বাংলা প্রদেশে সরকারি চাকরিতে নিয়োজিত ছিলেন, নীলচাষ সম্পর্কে যে বয়ান লিখে গেছেন, তা থেকেও ইংরেজ বণিকদের উপনিবেশবাদী নির্মমতার অভিন্ন পরিচয় মেলে। ১৮৭৮ সালে ‘অ্যান এক্স-সিভিলিয়ান’ নামের আড়ালে প্রকাশিত তার লাইফ ইন দ্য মোফস্বিল: অর, দ্য সিভিলিয়ন ইন লোয়ার বেঙ্গল গ্রন্থে গ্রাহাম লিখেছেন, “ইউরোপীয় পুঁজিপতিরা দেখতে পেলো, সরাসরি নিজেরা নীলচাষ না করে [...] ঠিকাদারি পদ্ধতিতে নীলচাষ করা সস্তা। নির্দিষ্ট এলাকায় নীলচাষ করে উৎপন্ন ফসল ইউরোপীয় নীলকর সাহেবদের কুঠিকে বুঝিয়ে দেয়ার জন্য চুক্তিবদ্ধ রায়তকে ‘দাদন’ বা অগ্রিম টাকা দেয়া হতো। [...] ফসল কাটার পর আঁটি আকারে সেগুলো নীলকুঠিতে আনা হলে কুঠির আমলারা দুটো আঁটিকে, ঘের মাপার রশি দিয়ে কষিয়ে টেনে ধরে, একটিতে রূপান্তরিত করে হিসেব করত; কেবল ঘুষের বিনিময়েই মোটামুটি সঠিক পরিমাপ পাওয়া সম্ভব ছিল। ওদিকে, নীলকরদের প্রদত্ত নীলের দর এতই কম ছিল যে, রায়তের পক্ষে তার উৎপন্ন ফসল থেকে লাভ করা ছিল অসম্ভব।”১০৪
এই দুর্বিষহ পরিস্থিতিতে অনেক তরুণ রায়ত, ‘বিশেষত যাদের ঘাড়ে নীলকরদের কাছে পিতার আমলের ঋণের দায় থাকতো না, তারা নীল চাষের জন্য ইংরেজ নীলকরদের কাছ থেকে দাদন নিতে প্রায়শই অনীহা প্রকাশ করতো’। কিন্তু সেক্ষেত্রে, ‘অনিচ্ছুক রায়তকে অপহরণ করে নিয়ে গিয়ে নীলচাষের জন্য দাদন নিতে রাজি না হওয়া পর্যন্ত নীলকুঠিসংলগ্ন কোনো দালানে আটকে রাখা হতো’। এ ব্যাপারে ইংরেজ নীলকররা আইনকানুনের তোয়াক্কা করতো না। কেননা, ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ সরকারের কর্মকর্তা গ্রাহাম নিজেও যেমন বিশ্বাস করতেন, “একটি বিজয়ী জাতির জন্য বিজিতের প্রতি কর্তৃত্বপরায়ণ আচরণ করাই স্বাভাবিক”। ফলে, গ্রাহামের ভাষায়, “এদেশীয় কোনো ব্যক্তি যে তার সমান, সেটা কোনো ইউরোপীয়কে বোঝানো সম্ভব ছিল না। সে কারণে, দাদন নিতে অনিচ্ছুক কোনো রায়তকে হীন প্রকৃতির এক অবাধ্য প্রাণী হিসেবে বিবেচনা করা হতো— যাকে বল প্রয়োগের মাধ্যমে বশীভূত করতে হয়। ফলে, তার তেল, বীজ কিংবা জমিতে পূর্বাহ্ণে বপনকৃত অন্য ধরনের ফসল উপড়ে ফেলা হতো, জোর করে তার গবাদিপশু নিয়ে যাওয়া হতো, কখনো আবার খোদ রায়তও অপহরণের শিকার হতো, কখনো কখনো এমনকি পুরো গ্রাম পুড়িয়ে দেয়ার মতো ঘটনাও ঘটতো।”১০৫
নীলচাষিরা বিভিন্ন সময়ে এই নির্মম শোষণ-নিপীড়নের বিরুদ্ধে ক্ষোভ-বিক্ষোভ প্রদর্শন করেছেন বটে, কিন্তু ‘নীলকর দস্যুদের আজ্ঞাবহ ইংরেজ সরকারের পুলিশ ও মিলিটারি’ তা নির্মমভাবে দমন করেছে। শেষ পর্যন্ত, ১৮৫৯-১৮৬০ সালে, বাংলায় সর্বত্র, বিশেষত নদিয়া ও যশোর অঞ্চলে, সংঘটিত নীলচাষিদের সংঘবদ্ধ রক্তাক্ত সংগ্রামের পরিপ্রেক্ষিতে এসব অঞ্চলে জবরদস্তিমূলক নীলচাষ বন্ধ হয়।
যা-ই হোক, এতক্ষণ ধরে আফ্রিকা ও এশিয়া সম্পর্কে ইউরোপের বাঘা বাঘা দার্শনিক ও বুদ্ধিজীবীদের বর্ণবাদী ও উপনিবেশবাদী দৃষ্টিভঙ্গি ও তার অন্তঃসারশূন্যতার সঙ্গে পরিচয় লাভের পর, আমরা এবার তার খোদ ইতিহাসবিদদের দৃষ্টিভঙ্গি যাচাই করে দেখতে পারি।
উপনিবেশবাদী পশ্চিমা ইতিহাসবিদগণ আফ্রিকার বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর, এমনকি কোনো কোনো বিশাল জনগোষ্ঠীর, নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা ‘জাতিগত’ পরিচয়ের স্বীকৃতি দেননি — তাদের উল্লেখ করেছেন ‘ট্রাইব’ বা ‘গোত্র’ হিসেবে। পশ্চিমা আধুনিক নৃতাত্ত্বিক ও রাজনীতিবিজ্ঞানের বিবেচনায়, ‘গোত্রের’ মর্যাদা ‘জাতির’ তুলনায় হীন প্রকৃতির। নগুগি অতএব যথার্থই প্রশ্ন তুলেছেন, “আইসল্যান্ডের আড়াই লাখ অধিবাসীকে একটি ‘জাতি’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়, তাহলে এক কোটি ইবো জনগোষ্ঠীকে ‘ট্রাইব’ হিসেবে কেন?১০৬ ডেনমার্কের চল্লিশ লক্ষ অধিবাসী একটি ‘জাতি’, তাহলে দুই কোটির জোরুবাস জনগোষ্ঠী একটি ‘ট্রাইব’ কেন?” এই প্রশ্নের উত্তরটি মোটেও জটিল নয়— ইউরোপের অধিকাংশ উপনিবেশবাদী নৃতাত্ত্বিক ও ইতিহাসবিদের বর্ণবাদী রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিই এর জন্য প্রধানত দায়ী। তাদের মতে, কোনো ‘গোত্র’কে, আকারের দিক থেকে তা যত বড়ই হোক না কেন, আধুনিক ‘জাতি’ হয়ে উঠতে হলে, তার রাজনৈতিক চেতনার ‘উন্নত’ বিকাশ প্রয়োজন হয়—যা আফ্রিকার এই সব জনগোষ্ঠীর ভেতর অনুপস্থিত।
ভারতবর্ষের ক্ষেত্রে ইংরেজ ইতিহাসবিদগণ প্রায় অভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় দিয়েছেন। ভারত নানা জাতি ও জনগোষ্ঠীর দেশ, কিন্তু ইউরোপীয় ইতিহাসবিদগণ, যেমন বিশ্ববিখ্যাত লন্ডনবাসী স্কটিশ ইতিহাসবিদ, জেমস মিল (১৭৩৩-১৮৩৬), ভারতীয়দের ‘আধুনিক’ জাতিগত পরিচয়ে নয়, ‘অনাধুনিক’ ধর্মগত পরিচয়ের ভিত্তিতে বিবেচনা করেছেন।
মিল নিজেই লিখেছেন যে, তিনি কখনোই ভারতে পদার্পণ করেননি, ভারতীয় কোনো ভাষা সম্পর্কেও তার কোনো সম্যক ধারণা ছিল না,১০৭ অথচ তিনি ১৫২৭ সাল থেকে ১৮০৫ সাল পর্যন্ত বিস্তৃত সময়কালের ভারতবর্ষের ওপর ছয়টি বিশাল খণ্ডে ইতিহাস রচনা করেছেন এবং সেই প্রক্রিয়ায় প্রাচীন ভারতের বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী নানা রাজবংশ ও তাদের আইনকানুন, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির ওপর নানা মন্তব্য করেছেন। প্রাচীনকাল থেকে সেই প্রাক-ঔপনিবেশিক সময় পর্যন্ত ভারতীয় ইতিহাসের কিছু কিছু বৈশিষ্ট্যের ওপর জেমস মিল কিছু প্রণিধানযোগ্য পর্যবেক্ষণ হাজির করলেও, শেষ বিচারে, তার নির্মিত ‘ব্রিটিশ-ভারতের ইতিহাস’, প্রাক-ব্রিটিশ যুগে ভারতের করুণ অবস্থা ও ব্রিটিশ শাসনাধীন ভারতের উন্নতি সাধনের বিভ্রান্তিকর তুলনামূলক বয়ান হাজির করার মাধ্যমে, ভারতে ব্রিটিশ শাসনের ‘ঐতিহাসিক ন্যায্যতা’ প্রতিষ্ঠার ঔপনিবেশিক রাজনীতিকেই সহযোগিতা করেছে।
মিল প্রাক-ঔপনিবেশিক ভারতীয় ইতিহাসের কালবিভাজন করেছেন ‘ধর্মীয় সভ্যতার’ ভিত্তিতে, ভারতীয় রাজবংশগুলোর ধর্ম পরিচয় দিয়ে—হিন্দু যুগ ও মুসলিম যুগ হিসেবে; কিন্তু ব্রিটিশ শাসনাধীন ভারতের কালপর্বকে শাসকদের ধর্মপরিচয়ের ভিত্তিতে ‘খ্রিষ্টান যুগ’ হিসেবে চিহ্নিত করেননি—বলেছেন ‘ব্রিটিশ যুগ’। ভারতীয় ইতিহাসের এই ধর্মভিত্তিক কালবিভাজন ভারতীয় ইতিহাস রচনা ও ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে যে ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গির সূত্রপাত ঘটায়, ভারতীয় ইতিহাস চর্চায় তা পরবর্তীকালের দেশি-বিদেশি ইতিহাসবিদদের বিপুলভাবে প্রভাবিত করে। আধুনিক ভারতের বিখ্যাত ইতিহাসবিদ রোমিলা থাপারের (জন্ম-১৯৩১) মতে, ভারতীয় ইতিহাসের মিলকৃত এই কালবিভাজন পরবর্তীকালে প্রায় এক ‘স্বতঃসিদ্ধ পদ্ধতি’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়, এবং বহুকাল ধরে তা দেশি-বিদেশি ইতিহাসবিদদের ভেতর বিদ্যমান থাকে।
তথ্যসূত্র:
১০০. সুপ্রকাশ রায়, ভারতের কৃষক বিদ্রোহ ও গণতান্ত্রিক সংগ্রাম, পৃষ্ঠা ৮৮
১০১. সংবাদ-কৌমুদীর উদ্ধৃতির জন্য দেখুন, অমিতাভ চক্রবর্তী, আব্দুস সাত্তার খান: জীবন ও সংগ্রাম, প্রকাশকের (রবীন দাস) কথা, পৃষ্ঠা: ১৪
১০২. প্রাগুক্ত
১০৩. প্রাগুক্ত
১০৪. G. Graham, Life in the Mofussil: Or, The Civilion in Lower Bengal, Vol-II, p. 4-5
১০৫. প্রাগুক্ত, pp. 6-7
১০৬. Ngugi Wa Thiong’o, “Macarere Dreams”, Decolonizing Language and Other Revolutionary Ideas, p. 68
১০৭.James Mill, History of British India, London, 1817, Vol.-1, Preface, p. xii
১০৮. রোমিলা থাপার, “ভারতবিদ্যায় ডি ডি কোসাম্বির অবদান”, (অনু.) চৌধুরী মুফাদ আহমেদ, ‘নতুন দিগন্ত’, সম্পা., সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, ঢাকা, জুলাই-সেপ্টেম্বর, ২০২৫, পৃষ্ঠা: ৮৪-১১০
উপনিবেশবাদ ও বাঙালির সংস্কৃতি, পৃষ্ঠা: ৭৯
৯৯. আমজাদ হোসেন, বাংলাদেশের কৃষক আন্দোলনের ইতিহাস, পৃষ্ঠা: ১৫
