নির্বাচনের আর মাত্র একদিন বাকি। আগামী ১২ই ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও জুলাই সনদ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে আয়োজিত গণভোটের আনুষ্ঠানিক প্রচার-প্রচারণা শেষ হচ্ছে আজ সকাল সাড়ে ৭টায়। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, নির্ধারিত সময়ের পর রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীরা কোনো ধরনের সভা-সমাবেশ, মিছিল, প্রচারপত্র বিতরণ কিংবা গণমাধ্যমে প্রচারণা চালাতে পারবেন না। তাই শেষ মুহূর্তে দেখা গেছে, কেউ কাউকে ছাড় দিচ্ছেন না। প্রচারণার মাঠে কৌশলে নিজের পক্ষে টানার চেষ্টা করছেন ভোটারদের। দলের প্রার্থী, নেতা থেকে কর্মী- সবাই বিরামহীন ছুটছেন ভোটারদের দ্বারে দ্বারে। প্রার্থীদের পরিবারের সদস্য ও স্বজনরাও ছুটছেন অলিগলিতে। মাঠের প্রচারের সঙ্গে সোশ্যাল মিডিয়ায়ও চালানো হচ্ছে সরব প্রচারণা।
লোহাগাড়া ও সাতকানিয়া উপজেলা নিয়ে গঠিত চট্টগ্রাম-১৫ আসনটি জামায়াতের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে দেশব্যাপী পরিচিতি রয়েছে। দীর্ঘ সময় জোটবদ্ধ হয়ে রাজনীতির মাঠে থাকলেও ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। অতীতে বিএনপি সাধারণত জামায়াতে ইসলামীর জন্য আসনটি ছেড়ে দিত। তবে দীর্ঘদিনের জোট রাজনীতির সমীকরণ ভেঙে যাওয়ায় এবার বিএনপি ও জামায়াত আলাদাভাবে নির্বাচনে অংশ নিয়েছে। আওয়ামী লীগ মাঠে না থাকায় হারানো আসনটিতে প্রত্যাবর্তন করতে জোর চেষ্টা চালাচ্ছে জামায়াত। আর বিএনপি চায় ভোটের জোয়ারে জয় পেতে।
এ আসনে একাধিক প্রার্থী মাঠে থাকলেও বাস্তব চিত্রে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে উঠেছে জামায়াতে ইসলামীর দাঁড়িপাল্লা ও বিএনপি’র ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থীদের মধ্যে। কাগজ-কলমে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের হাতপাখা প্রতীকের প্রার্থী থাকলেও মাঠে তাদের উপস্থিতি চোখে পড়ছে কম।
অতীতের প্রায় সব নির্বাচনে নারী ভোটের একটি বড় অংশ পড়েছে দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে। বিশেষ করে, ২০০১ সালের নির্বাচনে নারী বুথে দাঁড়িপাল্লা বিপুল ভোট পায়। যার ফলে, হেভিওয়েট প্রার্থী কর্নেল (অব.) অলি আহমদ (বীর বিক্রম) জামায়াত প্রার্থী শাহজাহান চৌধুরীর কাছে পরাজিত হন। প্রতিবারের ন্যায় এবারো জামায়াত নারী ভোটারদের গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে। অন্যদিকে, বিএনপিও মহিলা ভোট টানতে তৎপর। আবার এই আসনে ফ্যাক্টর হতে পারে নিবন্ধিত ১৪ হাজার ২৭২ পোস্টাল ভোট।
জামায়াত ও এলডিপি একই জোটবদ্ধ হওয়ায় এ আসনে কর্নেল (অব.) অলির অনুসারীদের বড় একটি অংশ দাঁড়িপাল্লার পক্ষে কাজ করছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। অন্যদিকে, বিএনপি আওয়ামী লীগের সাধারণ ভোটার ও সনাতনী ধর্মাবলম্বীদের ভোট টানতে মরিয়া। দীর্ঘদিন বিএনপি-জামায়াত এক জোটে থাকায় ধানের শীষে ভোট দিতে না পারার বিষয়টিও বিএনপি নেতাকর্মীদের মধ্যে আবেগ তৈরি করেছে।
এ আসনে অতীতে বেশির ভাগ সময় সাতকানিয়ার বাসিন্দারাই সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। প্রায় ৪০ বছর পর এবার বিএনপি প্রার্থী নাজমুল মোস্তফা আমিন লোহাগাড়া উপজেলার বাসিন্দা হওয়ায় বিএনপি বিষয়টি আঞ্চলিকতার দিক থেকে গুরুত্ব দিয়ে প্রচার চালাচ্ছে। এ আসনে আওয়ামী লীগের প্রায় ৩০ শতাংশ ভোট রয়েছে। এবার আওয়ামী লীগের প্রার্থী না থাকায় সেই ভোট কোনদিকে যাবে সেটিই হয়ে উঠতে পারে জয়-পরাজয়ের টার্নিং পয়েন্ট।
শাহজাহান চৌধুরী বিভিন্ন গণসংযোগে দেয়া বক্তব্যে বলেন, ‘আমি শাহজাহান চৌধুরী, আমি বড় মজলুম, নির্যাতিত। সময়ে সময়ে ৯টি বছর আমি কারাগারে কাটিয়েছি। আমি জেলে থাকা অবস্থায় আমার মা আমাকে ছেড়ে পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন। আমি বড় ছেলে হিসেবে নিজের মাকে কবরে দেয়ার সুযোগ পাইনি। আমাদের নেতারা ফাঁসির কাষ্ঠে গিয়েছেন। আল্লামা সাঈদীকে বিষ প্রয়োগ করে হত্যা করা হয়েছে। আমি রাজপথে রক্ত দিয়েছি। আমি আপনাদের দুয়ারে এসেছি। আপনারা আমাকে ফেরত দেবেন না। অতীতে যেভাবে দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে আপনারা ভোট দিয়ে আমাকে জয়ী করেছিলেন, আমি আবারো আপনাদের কাছে একটি ভোট ভিক্ষা চাই। আগামীদিনে আমি নিরাপদ, শান্তির সাতকানিয়া-লোহাগাড়া গড়ে তুলবো। ব্রিজ, কালভার্ট, রাস্তাঘাট- আপনাদের যা যা প্রয়োজন, আমি আপনাদের পাশে থাকবো।
অন্যদিকে, নাজমুল মোস্তফা আমিনও বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাজপথে আন্দোলন-সংগ্রামের কথা তুলে ধরে ভোটারদের নিজের দিকে টানার চেষ্টা করছেন। পাশাপাশি সন্ত্রাসমুক্ত সাতকানিয়া-লোহাগাড়া গড়ার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। তবে ব্যক্তিগত আক্রমণ থেকে উভয় প্রার্থীই বিরত আছেন বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। বিভিন্ন এলাকায় গণসংযোগে গিয়ে নাজমুল মোস্তফা আমিন বলেন, ১৬ বছর আমি রাজপথে ছিলাম। আওয়ামী লীগ আমার ওপর অনেক জুলুম করেছে। আমি ঘরে থাকতে পারিনি। রাজনীতিতে আমার ত্যাগের জন্য দেশনায়ক তারেক রহমান আমাকে এ আসনে প্রার্থী করেছেন। সাতকানিয়া ও লোহাগাড়াবাসীর কাছে আমার আকুল আবেদন, আপনারা গত ৩৬ বছরে এখানে বিভিন্ন প্রতীকের অনেক প্রার্থীকে দেখেছেন। এবার ধানের শীষে আপনাদের ভোট চাই।
চট্টগ্রাম ১৫
লড়াই হবে দ্বিমুখী
এইচএম জসিম উদ্দীন, লোহাগাড়া (চট্টগ্রাম) থেকে
১০ ফেব্রুয়ারি (মঙ্গলবার), ২০২৬
লিংক কপি হয়েছে!
ফন্ট সাইজ:
100%
