ফ্যাসিবাদী ও স্বৈরাচারী শাসনের পতনের পর যেকোনো রাষ্ট্রের পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া অর্থনৈতিক খাতকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা। বাংলাদেশে বিগত শেখ হাসিনা সরকারের প্রায় সাড়ে ১৫ বছরের শাসনামলে দেশের আর্থিক খাত, বিশেষ করে ব্যাংকিং খাত যেভাবে লুটপাট, জালিয়াতি ও প্রাতিষ্ঠানিক দখলদারত্বের কবলে পড়েছিল, তা ছিল নজিরবিহীন। বাংলাদেশ ব্যাংক, যা দেশের পুরো মুদ্রাবাজার ও আর্থিক ব্যবস্থার অভিভাবক এবং প্রধান নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে দায়িত্ব পালন করার কথা, স্বৈরাচারী শাসনামলে তা পরিণত হয়েছিল রাজনৈতিক ক্ষমতার এক আজ্ঞাবহ পুতুলে।
ক্ষমতার শীর্ষকেন্দ্র ও তৎকালীন শাসকগোষ্ঠীর আশীর্বাদপুষ্ট বিশেষ গোষ্ঠীর ইশারায় পরিচালিত হতো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতি ও সিদ্ধান্ত। দেশের স্বাধীনতার পর ব্যাংকিং খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থার এমন অভূতপূর্ব নৈতিক ও পেশাগত অধঃপতন আর কখনো দেখেনি বাংলাদেশ। স্বৈরাচারী আমলের প্রায় সব গভর্নরই স্বাধীন সত্তা হারিয়ে শাসকদলের হাতের পুতুলে পরিণত হয়েছিলেন।
ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরির পর দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতিকে টেনে তোলা এবং ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফেরানো ছিল সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা। এই সংকটময় মুহূর্তে মোস্তাকুর রহমানকে গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হলে নানা দিক থেকে সমালোচনার ঝড় ওঠে। তিনি পেশাদার ব্যাংকার বা আমলা নন, বরং ব্যবসায়িক পটভূমির মানুষ হওয়ায় অনেকেই তাঁর সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। কিন্তু গভর্নর পদে একজন অ-ব্যাংকার নিয়োগ পেলেই যে নীতিগত দৃঢ়তা ব্যাহত হয় না, বরং সঠিক মানসিকতা ও সাহসিকতা থাকলে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনা সম্ভব, তা মোস্তাকুর রহমান দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রতিনিয়ত প্রমাণ করে চলেছেন। গভর্নর নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর তারেক রহমানের দূরদর্শিতা ও প্রজ্ঞার বিষয়টিও এই সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে আবারও দেশবাসীর সামনে ফুটে উঠেছে।
বিগত স্বৈরাচারী সরকারের আমলে ব্যাংকিং খাতকে ব্যবহার করা হয়েছিল দেশের অর্থ পাচার এবং ক্ষমতাসীনদের স্বার্থসিদ্ধির হাতিয়ার হিসেবে। হাজার হাজার কোটি টাকার খেলাপি ঋণ ঢাকা পড়েছিল তথাকথিত ঋণ পুনর্গঠন ও জালিয়াতির চাদরে। ভুয়া কাগজপত্র, অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠান এবং রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে ব্যাংকগুলো থেকে অবাধে অর্থ বের করে নেওয়া হয়েছিল। নস্ট্রো হিসাব কিংবা বৈদেশিক লেনদেনের প্রতিটি স্তরে জেঁকে বসেছিল অনিয়ম।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক তখন নীরব দর্শক হয়ে অপরাধীদের সুবিধা দিয়েছে। এর সরাসরি আঘাত এসে পড়েছিল আমাদের জাতীয় মুদ্রা টাকার ওপর। আন্তর্জাতিক বাজারে দেশীয় মুদ্রার সম্মান চরমভাবে ক্ষুণ্ণ হয়েছিল, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ তলানিতে ঠেকেছিল এবং মার্কিন ডলারের বিপরীতে টাকার ধারাবাহিক দরপতনে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় অসহনীয় হয়ে উঠেছিল।
তবে নতুন গভর্নর মোস্তাকুর রহমানের নেতৃত্বে এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গতিশীল পদক্ষেপে সেই আঁধার কেটে এখন নতুন ভোরের সূচনা হয়েছে। দীর্ঘ প্রায় সাড়ে পাঁচ বছর পর বাংলাদেশি টাকা যে সম্মান ও মর্যাদা হারিয়েছিল, তা আবারও ফিরে পেতে শুরু করেছে।
ডলারের বিপরীতে টাকার মান প্রতিনিয়ত শক্তিশালী হচ্ছে এবং বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে ফিরে এসেছে কাঙ্ক্ষিত স্থিতিশীলতা। ব্যাংকিং খাতের অনিয়ম, দুর্নীতি ও নিয়োগের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনতে বাংলাদেশ ব্যাংক একের পর এক কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করছে, যা সংশ্লিষ্ট সব মহলের প্রশংসা কুড়াচ্ছে। পেশাদার আমলা না হয়েও মোস্তাকুর রহমান যেভাবে নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিরপেক্ষতা ও কঠোর ভূমিকা পুনরুদ্ধার করেছেন, তা দেশের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত আনন্দের ও স্বস্তির বার্তা বহন করে।
গভর্নর মোস্তাকুর রহমানের আপসহীন ও সাহসী নীতির সবচেয়ে বড় প্রমাণ মিলেছে রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংকের সাম্প্রতিক অনিয়ম তদন্ত ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার গৃহীত ঐতিহাসিক পদক্ষেপে। বাংলাদেশের ব্যাংকিং ইতিহাসে এই প্রথম কোনো সরকারি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনা কমিটি একসঙ্গে ভেঙে দেওয়ার কঠোর ও অভূতপূর্ব সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। জনতা ব্যাংকে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ অনিয়ম ও জালিয়াতির চিত্র প্রকাশ্যে আসার পর এমন চরম পদক্ষেপ নেওয়া ছাড়া উপায় ছিল না। অনিয়মে ডুবে ব্যাংকটির মোট ঋণের প্রায় ৭৫ শতাংশই এখন খেলাপি হয়ে পড়েছে। ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় থেকে শুরু করে প্রান্তিক উপশাখা, এমনকি বিদেশে থাকা শাখাগুলোতেও পাওয়া গেছে লোপাটের ভীতিপ্রদ তথ্য।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, রেমিট্যান্সের প্রণোদনা আত্মসাৎ, এলসির ভুয়া কমিশন, কেন্দ্রীয়ভাবে স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রের ঝুঁকিপূর্ণ ব্যবহার, অস্তিত্বহীন ল্যাপটপ কেনা, বৈদেশিক হিসাবে লেনদেনে সমন্বয়হীনতার মাধ্যমে শত শত কোটি টাকা লোপাট এবং হাজারো গ্রাহকের অদাবিকৃত বিপুল অর্থ কুক্ষিগত করার মতো গুরুতর অপরাধ ঘটেছে ব্যাংকটিতে। সিবিএস বা কোর ব্যাংকিং সফটওয়্যারের ত্রুটির কারণে প্রায় ১০ বছরের বেশি সময় ধরে অলস পড়ে থাকা প্রায় ৯৪ কোটি টাকারও বেশি অদাবিকৃত আমানত সঠিকভাবে চিহ্নিত করতে ব্যর্থ হয়েছে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ, যা বড় ধরনের জালিয়াতি ও অর্থ পাচারের পথ সুগম করে রেখেছিল। ২০০৯ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত সময়ের সঠিক তথ্য সংরক্ষিত না থাকা পরিচালনা পর্ষদের মারাত্মক অদক্ষতা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অবহেলাকেই নির্দেশ করে।
শুধু দেশেই নয়, বিদেশে লেনদেনের ক্ষেত্রেও জনতা ব্যাংকে অনিয়মের যে চিত্র উঠে এসেছে, তা আঁতকে ওঠার মতো। নস্ট্রো হিসাব থেকে উত্তোলিত অর্থের বিপরীতে যথাসময়ে ডিমান্ড লোন সৃষ্টি না করায় ব্যাংক কোটি কোটি টাকার সুদের আয় থেকে বঞ্চিত হয়েছে। বিশেষ করে ওরিয়ন অয়েল অ্যান্ড শিপিং লিমিটেড এবং বেক্সিমকো গ্রুপের মতো প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রে সময়মতো সঠিক ব্যাংকিং নিয়ম না মানায় প্রায় ৮,২৭০ কোটি টাকার সুদ আদায়ের সুযোগ হাতছাড়া হয়েছে। একইভাবে সংযুক্ত আরব আমিরাতে জনতা ব্যাংকের শাখাগুলোতে কোটি কোটি দিরহামের শ্রেণিকৃত ঋণ ও অবৈধ অবলোপন দেখা গেছে। দুবাই কার্যালয়ে অনুমোদন ছাড়া বিদেশি নাগরিক নিয়োগ, ইতালির রোমে অযৌক্তিকভাবে দুটি আলাদা কার্যালয় খুলে রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় এবং ইউএই কার্যালয়ের জন্য অস্তিত্বহীন ল্যাপটপ কেনার ভাউচার তৈরির মতো ঘটনা প্রমাণ করে, অনিয়মের শিকড় কত গভীরে ছড়িয়ে ছিল।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শক দল জুনে এই তদন্ত শুরু করার পর দফায় দফায় অনুসন্ধানের মাধ্যমে পুরো দুর্নীতির চিত্র উন্মোচন করে। এরপর জনতা ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনা কমিটির সঙ্গে একাধিক বৈঠক করা হয়। কিন্তু ব্যাখ্যার জবাবে তারা কোনো যৌক্তিক কারণ দেখাতে ব্যর্থ হয়। গভর্নর বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে ফের বোর্ডকে জবাব দেওয়ার জন্য ১৫ দিনের সময় বেঁধে দেন। কিন্তু এবারও ব্যাংক কর্তৃপক্ষ সন্তোষজনক উত্তর দিতে ব্যর্থ হলে অনুসন্ধান দল পুরো পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনা কমিটি ভেঙে দেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। যদিও ব্যাংক ব্যবস্থাপনা এখনো বিষয়টিকে সিস্টেমের ত্রুটি বলে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে, কিন্তু কেন্দ্রীয় ব্যাংক কঠোর অবস্থানের বার্তা পরিষ্কার করে দিয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র স্পষ্ট জানিয়েছেন, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পূর্ববর্তী বা পরবর্তী যেকোনো সময়ের অনিয়মই হোক না কেন, কোনো অপরাধী পার পাবে না এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংক ব্যক্তির পরিচয় না দেখে কেবল আইন মেনেই ব্যবস্থা নেবে।
জনতা ব্যাংকের ওপর নেওয়া এই ঐতিহাসিক পদক্ষেপ প্রমাণ করে, বাংলাদেশ ব্যাংক আর কোনো নখদন্তহীন নিয়ন্ত্রক সংস্থা নয়।
গভর্নর মোস্তাকুর রহমানের হাত ধরে দেশের ব্যাংকিং খাতে যে ঐতিহাসিক পরিবর্তনের সূচনা হয়েছে, তা দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত জঞ্জাল সাফ করতে সহায়ক ভূমিকা রাখবে। বিগত স্বৈরাচারী আমলের চরম লুণ্ঠন ও অরাজকতার হাত থেকে দেশকে উদ্ধার করে সুশাসনের পথে ফিরিয়ে আনার এই দূরদর্শী প্রক্রিয়ার জন্য বর্তমান সরকার এবং বিশেষ করে গভর্নর নিয়োগে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ভূয়সী প্রশংসা প্রাপ্য। এই ইতিবাচক পরিবর্তনের গতি বজায় থাকলে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত খুব শিগগিরই আন্তর্জাতিক মানের সুশাসন ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জনে সক্ষম হবে ইনশাআল্লাহ। মহান আল্লাহ সুবহানাতায়ালা আমাদের সহায় হোন।
