জাতিসংঘে দাঁড়িয়ে ইরানকে ‘নিশ্চিহ্ন’ করার হুমকি দিয়েছেন বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। কিন্তু সামরিক শক্তির প্রদর্শন করলেও দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির চাপ থেকে নিজেকে মুক্ত রাখতে পারছেন না তিনি। দ্বিতীয় মেয়াদের ২০ মাসের মাথায় ট্রাম্পের অজেয় ভাবমূর্তি ও বাস্তব রাজনৈতিক প্রভাবের মধ্যে ব্যবধান ক্রমেই বাড়ছে।
নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘের ভবনে প্রবেশের সময় ট্রাম্পকে প্রশ্ন করেন সিএনএনের উপস্থাপক কেইটলান কলিন্স। এর আগে ট্রাম্প সিএনএনকে হোয়াইট হাউসে নিষিদ্ধ করেছিলেন। আদালত সেই সিদ্ধান্ত আটকে দেয়ার পর আবার সংবাদমাধ্যমটির সাংবাদিকদের সেখানে দেখা যাচ্ছে।
কলিন্সকে দেখে ক্ষুব্ধ ট্রাম্প বলেন, ‘সিএনএন এখানে আমার খবর করছে দেখে আমি অবাক হয়েছি। আপনাদের এখানে আমার খবর করা উচিত নয়।’ এই প্রতিক্রিয়াকে ট্রাম্পের ক্রমহ্রাসমান নিয়ন্ত্রণের একটি দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখছেন সমালোচকেরা।
মার্কিন ফেডারেল আদালত তার প্রশাসনের বিভিন্ন পদক্ষেপে বাধা দিচ্ছে। কংগ্রেসের রিপাবলিকানদের মধ্যেও আগের মতো আনুগত্য দেখা যাচ্ছে না। একই সময়ে মূল্যস্ফীতি, জ্বালানির দাম এবং ইরান যুদ্ধ নিয়ে অসন্তোষ তার জনসমর্থনে চাপ তৈরি করছে।
দীর্ঘদিনের রিপাবলিকান কৌশলবিদ রিক উইলসনের ভাষায়, ‘এটাই শেষের শুরু। এটাই পতনের সূচনা।’ তার দাবি, ভোটারদের মধ্যে নেতিবাচকতা ও হতাশা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা জিমি কার্টারের সময়ের পর আর দেখা যায়নি।
গত এক মাসে ট্রাম্প কয়েকটি বড় ধাক্কা পেয়েছেন। সুদের হার নিয়ে তার চাপের কাছে নতি স্বীকার করেনি ফেডারেল রিজার্ভ। নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডাকযোগে ভোটের ওপর নতুন বিধিনিষেধ আরোপের উদ্যোগও সুপ্রিম কোর্ট আটকে দিয়েছে।
আরেক বিচারক কেনেডি সেন্টারে ট্রাম্পের নাম যুক্ত করার উদ্যোগ ঠেকিয়েছেন। অন্য এক বিচারক সিএনএন, এমএস নাও ও পলিটিকোকে হোয়াইট হাউস প্রাঙ্গণ থেকে নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত বাতিল করে তাদের প্রবেশাধিকার ফিরিয়ে দিতে নির্দেশ দিয়েছেন।
এদিকে রিপাবলিকান পার্টিতেও দেখা যাচ্ছে পরিবর্তনের ইঙ্গিত। নির্বাচনে ট্রাম্পের কারণে দলটি কংগ্রেসে আসন হারাতে পারে -এমন আশঙ্কায় কয়েকজন রিপাবলিকান প্রার্থী তার থেকে দূরত্ব তৈরি করছেন। ফ্লোরিডার গভর্নর পদপ্রার্থী বায়রন ডোনাল্ডস তার প্রচার ওয়েবসাইট থেকে ট্রাম্পের অধিকাংশ উল্লেখ সরিয়ে দিয়েছেন।
কংগ্রেসওম্যান মারিয়া এলভিরা সালাজারের প্রচার বিজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, ফেডারেল অভিবাসন আইন প্রয়োগ ‘অতিরিক্ত মাত্রায়’ চলে গেছে এবং লাতিনো ভোটাররা ‘বিশ্বাসঘাতকতার’ অনুভূতি পোষণ করছেন।
উইলসনের মতে, এতদিন রিপাবলিকানরা ট্রাম্পের প্রতি আনুগত্য দেখিয়েছেন সম্ভাব্য প্রাইমারি প্রতিদ্বন্দ্বী কিংবা ট্রাম্পের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আক্রমণের ভয়ে। কিন্তু নির্বাচন যত এগিয়ে আসছে, দলের সদস্যদের কাছে রাজনৈতিক আত্মরক্ষাই এখন বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
তার ভাষায়, যত বেশি তিনি রাজনৈতিক বোঝা হয়ে উঠছেন, তত বেশি তিনি আক্রমণাত্মক আচরণ করছেন। ভোটাররা এখন যুদ্ধ, জ্বালানির দাম ও নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে ট্রাম্পকে যুক্ত করছেন।
এই পরিস্থিতিতে ট্রাম্প সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে সংঘাত, সাংস্কৃতিক ইস্যুতে উত্তেজনা এবং রাজনৈতিক প্রদর্শনীর পুরোনো কৌশলে ফিরছেন বলে মনে করছেন সমালোচকেরা। তবে হোয়াইট হাউস এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বলেছে, ট্রাম্পের নীতিতে অর্থনীতি, সীমান্ত, কর্মসংস্থান ও জ্বালানি খাতে বড় সাফল্য এসেছে।
এদিকে ট্রাম্পের সামনে আরও বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে। ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ নিলে ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগে তদন্ত শুরু করতে পারে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক মনোযোগ ধীরে ধীরে ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন ও সম্ভাব্য উত্তরসূরিদের দিকে সরে যাবে।
ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের জ্যেষ্ঠ ফেলো বিল গ্যালস্টন বলেন, ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স বা পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর মতো সম্ভাব্য প্রার্থীদের দিকে মনোযোগ সরে যাওয়া ট্রাম্পের জন্য অস্বস্তিকর হতে পারে।
‘আলোটা তার ওপর থেকে সরে যাওয়ার চেয়ে আর কিছুই তাকে বেশি ক্ষুব্ধ করবে না,’ বলেন তিনি।
ইতিহাসেও দ্বিতীয় মেয়াদ অনেক মার্কিন প্রেসিডেন্টের জন্য কঠিন হয়ে ওঠার উদাহরণ আছে। ইতিহাসবিদ অ্যালান লিচম্যান এটিকে ‘দ্বিতীয় মেয়াদের অভিশাপ’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
রক্ষণশীল লেখক চার্লি সাইকসের মতে, ট্রাম্প প্রাসঙ্গিকতা হারানোকে সবচেয়ে বেশি ভয় পান। তার ভাষায়, ‘তিনি চুপচাপ সরে যাবেন- এমনটা ভাবা অত্যন্ত সরলতা হবে।’
সাইকসের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্যটি হলো, ‘এর পরিহাস হচ্ছে, তিনি যত দুর্বল হচ্ছেন, ততই বিপজ্জনক হয়ে উঠছেন।’
