সুনামগঞ্জের ১২০ প্রার্থীর বাদ পড়ার কারণ কী

প্রাথমিকের শিক্ষক নিয়োগ

সুনামগঞ্জের ১২০ প্রার্থীর বাদ পড়ার কারণ কী

ফন্ট সাইজ:

লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ। এরপর মৌখিক পরীক্ষাতেও মেধার প্রমাণ দিয়েছেন। সব ধাপ পেরিয়ে যখন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক হিসেবে যোগদানের স্বপ্ন দেখছিলেন, ঠিক তখনই যেন মাথায় আকাশ ভেঙে পড়েছে সুনামগঞ্জের ১২০ চাকরিপ্রার্থীর। চূড়ান্ত নিয়োগের জন্য যোগদানপত্র দাখিলের অফিস আদেশ জারি হলেও তালিকায় নেই তাদের নাম। বলা হচ্ছে, সর্বশেষ যাচাই-বাছাইয়ে তারা বাদ পড়েছেন। তবে কী কারণে বাদ পড়েছেন, তার সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা মিলছে না। চাকরি পাবেন কি না- সেটিও নিশ্চিত করে বলতে পারছে না প্রাথমিক শিক্ষা বিভাগ। ফলে চাকরির বয়সসীমা শেষের দিকে থাকা এসব প্রার্থী এখন চরম অনিশ্চয়তা ও হতাশায় দিন কাটাচ্ছেন।

শনিবার দুপুরে সরকারি বন্ধ থাকায় প্রাইমারি শিক্ষক নিয়োগে বাতিল হওয়া এ জেলার ১২০ প্রার্থী জেলা প্রশাসকের বাসভবনের সামনে জড়ো হতে দেখা গেছে। কী কারণে তাদের বাতিল করা হলো তা জানার জন্য জেলা প্রশাসকের মূল ফটকে অবস্থান নেন। গত বৃহস্পতিবার রাতে চূড়ান্তভাবে নিয়োগপ্রাপ্তদের যোগদানপত্র দাখিলের জন্য অফিস আদেশ জারি করা হয়। সেখানে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ৬১৭ জনের মধ্যে শুধু সুনামগঞ্জের ১২০ জনের নাম নেই। অথচ এই প্রার্থীদের অনেকেই লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর নিয়োগ পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত ধরে নিয়েছিলেন। শান্তিগঞ্জ উপজেলার জয়কলস ইউনিয়নের মির্জাপুর গ্রামের মনোজ কান্তি দাস সিলেটের এমসি কলেজ থেকে অর্থনীতিতে অনার্স ও মাস্টার্স করেছেন। বাবা মনোরঞ্জন দাস ছিলেন দর্জি। ছেলেকে পড়াতে গিয়ে নানা কষ্ট করলেও সরকারি চাকরির স্বপ্ন দেখতেন। কিন্তু ছেলের চাকরি পাওয়ার খবর শোনার কিছুদিন পরই মারা যান তিনি।

মনোজ বলেন, আমি একমাত্র সন্তান। বাবার সামর্থ্য ছিল না সিলেটে রেখে পড়াশোনা করানোর। তিনি বলেন, লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার ১৮ দিনের মাথায় বাবা মারা যান। আমি চাকরি পেয়েছি শুনে বাবা খুব খুশি হয়েছিলেন। তার ইচ্ছা ছিল আমি যেন সরকারি চাকরি পাই। এখন শুনছি সর্বশেষ যাচাইয়ে আমি অযোগ্য হয়েছি। আমার নিয়োগপত্র আসবে না। কেন বাদ পড়লাম, সেটাই বুঝতে পারছি না। ফতেহপুর গ্রামের সামন্ত কুমার দাসের অবস্থাও একই। লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর নিজের ফেসবুক আইডিতে তিনি লিখেছিলেন, নতুন পরিচয় সহকারী শিক্ষক (প্রাথমিক)। কিন্তু বৃহস্পতিবার রাত ১০টার দিকে সেই আইডিতেই লিখেছেন, নিয়োগপত্র নেবার লিস্টে আমার নাম নেই, আমার নামে নিয়োগপত্র আসবে না।

কেন? এ কেমন প্রহসন? জয়কলস ইউনিয়নের শিবপুর গ্রামের জয় তালুকদার বলেন, তার বাবা অনিভূষণ তালুকদার ২০১৬ সালে মারা যাওয়ার পর দুই ভাই ও দুই বোনের পরিবারের ভরসা তিনি। টিউশনি করে সংসারের খরচ চালান। জয় বলেন, এভাবে বাদ পড়লে সরকারি চাকরি তো আর হবেই না। এতদিন পড়াশোনা ও পরিশ্রম করে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পরও যদি চাকরি না হয়, তাহলে আমাদের যাওয়ার জায়গা কোথায়। চলতি বছরের ২রা জানুয়ারি সারা দেশের সঙ্গে সুনামগঞ্জেও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। জেলার বিভিন্ন কেন্দ্রে পরীক্ষায় অংশ নেন ১৪ হাজার ৪৮৯ জন। লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন ২ হাজার ১৫৯ জন। এরপর ২৮শে জানুয়ারি থেকে ২রা ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মৌখিক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়।

এতে অংশ নেন ২ হাজার ৯৯ জন। লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন ৬৩৭ জন। এর মধ্যে ২০ জন প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা না দেয়ায় তাদের নিয়োগ প্রক্রিয়ায় রাখা হয়নি। বাকি ৬১৭ জনের নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরে চিঠি পাঠায় জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস। কিন্তু সর্বশেষ যাচাই-বাছাইয়ের পর ১২০ জনের নাম চূড়ান্ত যোগদানের তালিকায় রাখা হয়নি। জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোহন লাল দাস বলেন, সুনামগঞ্জে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ৬১৭ জনের মধ্যে ১২০ জনের যোগদানপত্র আপাতত দেয়া হচ্ছে না। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের পরবর্তী নির্দেশনার প্রেক্ষিতে এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেয়া হবে। সুনামগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মশিউর রহমান বলেন, শনিবার দুপুরে বাদ পড়া প্রার্থীরা জেলা প্রশাসক মহোদয়ের বাসভবনে দেখা করতে এসেছিলেন। প্রার্থীরা লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর সর্বশেষ যাচাইয়ে কেন বাদ পড়লেন, এ বিষয়ে জেলা কমিটির সদস্য সচিব জেলা শিক্ষা কর্মকর্তাকে গুরুত্বসহকারে দেখার জন্য নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।