উখিয়া-টেকনাফে সক্রিয় মাদক-মানব পাচার সিন্ডিকেট

ফন্ট সাইজ:

কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফে থামছে না মাদক ও মানব পাচার। সীমান্তের ওপার থেকে ইয়াবাসহ মাদক ঢোকার পাশাপাশি রোহিঙ্গা ক্যাম্প ও উপকূলকে ঘিরে সক্রিয় রয়েছে মানব পাচারের দালাল চক্র। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একের পর এক অভিযানে ইয়াবা, অস্ত্র ও পাচারের শিকার ব্যক্তিরা ধরা পড়লেও নেপথ্যের বড় কারবারিরা অনেক ক্ষেত্রেই থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। সর্বশেষ টেকনাফের দক্ষিণ লম্বরী থেকে সাগরপথে বিদেশে পাচারের উদ্দেশ্যে একটি বসতঘরে আটকে রাখা ১৭ জনকে উদ্ধারের ঘটনায় ফের সামনে এসেছে উখিয়া-টেকনাফের পাচার নেটওয়ার্কের শক্তির বিষয়টি। অনুসন্ধানে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, উখিয়া-টেকনাফের সীমান্ত, রোহিঙ্গা ক্যাম্প ও উপকূলকে ঘিরে মাদক ও মানব পাচারের আলাদা আলাদা চক্র সক্রিয় থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে তাদের ব্যবহৃত পথ, দালাল ও পরিবহন ব্যবস্থার মধ্যে যোগসূত্র রয়েছে। সীমান্ত দিয়ে মাদক আনা, ক্যাম্প বা আশপাশের এলাকায় তা মজুত ও সরবরাহ এবং পরে দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঠানোর জন্য একাধিক স্তরে কাজ করে কারবারিরা।

একইভাবে মানব পাচারের ক্ষেত্রে ক্যাম্প ও স্থানীয় এলাকা থেকে লোক সংগ্রহ, নিরাপদ স্থানে রাখা, উপকূলে নেয়া এবং নৌযানে তুলে দেয়ার জন্য রয়েছে আলাদা নেটওয়ার্ক। রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোকে ঘিরে মাদক কারবারের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। উখিয়ার কুতুপালং, বালুখালী, থাইংখালী ও পালংখালীর বিভিন্ন এলাকা থেকে শুরু করে টেকনাফের হ্নীলা, লেদা, জাদিমোরা, সাবরাং ও শাহপরীরদ্বীপ পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে ইয়াবাসহ মাদক উদ্ধারের ঘটনা ঘটেছে। বিজিবি, এসআরবি, পুলিশ, এপিবিএন ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অভিযানে নিয়মিত চালান উদ্ধার ও কারবারি গ্রেপ্তার হলেও স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব অভিযানে মূলত বাহক ও ছোট পর্যায়ের কারবারিরাই বেশি ধরা পড়ছে। বড় কারবারিরা নেপথ্যে থেকে পুরো নেটওয়ার্ক নিয়ন্ত্রণ করছে বলে তাদের অভিযোগ। স্থানীয়দের অভিযোগ, মাদক কারবারের টাকা দিয়ে উখিয়া-টেকনাফে কিছু ব্যক্তি অল্প সময়ে বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন। তবে কারও সম্পদের উৎস মাদক কারবার এমন অভিযোগ তদন্ত বা প্রমাণ ছাড়া নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। মাদকের পাশাপাশি নতুন করে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে মানব পাচার। শুক্রবার দক্ষিণ লম্বরী এলাকায় একটি বসতবাড়িতে অভিযান চালিয়ে ১৭ জনকে উদ্ধারের ঘটনা তারই সাম্প্রতিক উদাহরণ।

সংশ্লিষ্টদের মতে, মানব পাচারের ক্ষেত্রে রোহিঙ্গারা দালালদের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ টার্গেট। ক্যাম্পে দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তা, সীমিত জীবিকার সুযোগ এবং তৃতীয় দেশে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষাকে কাজে লাগিয়ে দালালরা নানা প্রলোভন দেখায়। শাহপরীরদ্বীপ ও সাবরাংয়ের উপকূলীয় এলাকা মানব পাচারের সম্ভাব্য রুট হিসেবে অতীতেও আলোচনায় এসেছে। স্থানীয় সূত্রের জানা যায়, ছোট নৌযানে করে লোকজনকে উপকূল থেকে গভীর সাগরে নিয়ে বড় নৌযানে তুলে দেয়ার চেষ্টা করা হয়। এ ধরনের তৎপরতায় শুধু রোহিঙ্গা নয়, বাংলাদেশি নাগরিকরাও প্রতারিত ও পাচারের শিকার হয়েছেন বলে বিভিন্ন সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে উঠে এসেছে।

এদিকে মাদক কারবারের ক্ষেত্রেও উখিয়া-টেকনাফের ভৌগোলিক অবস্থান বড় সুবিধা দিচ্ছে পাচারকারীদের। একদিকে মিয়ানমার সীমান্ত, অন্যদিকে বিস্তীর্ণ উপকূল ও পাহাড়ি এলাকা। এর সঙ্গে রয়েছে বিশাল রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বসতি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষে পুরো এলাকায় একই মাত্রায় নজরদারি রাখা কঠিন হওয়ায় অপরাধীরা পথ পরিবর্তন করে বারবার সক্রিয় হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা।