যুদ্ধে মৃত রাজপুত্র ও সাধুদের দেহাবশেষ পাঠাচ্ছে রাশিয়া, নেপথ্যে?

যুদ্ধে মৃত রাজপুত্র ও সাধুদের দেহাবশেষ পাঠাচ্ছে রাশিয়া, নেপথ্যে?

ফন্ট সাইজ:

ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রে রুশ সেনাদের পাশে এবার ‘লড়ছে’ ছয় শতাব্দী আগের এক মৃত রাজপুত্র। ১৩৮০ সালের কুলিকোভোর যুদ্ধে মস্কোর হয়ে লড়া দিমিত্রি দনস্কয়ের দেহাবশেষের একটি অংশ সম্মুখসারিতে পাঠিয়েছে রাশিয়া।
ক্রেমলিনপন্থী রুশ অর্থোডক্স চার্চ বলছে, এই ‘সন্ত সেনাপতি’ অদৃশ্যভাবে রুশ সেনাদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে থাকবেন। ২০২২ সালে ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন শুরুর পর থেকেই রাশিয়া যুদ্ধের পক্ষে ধর্মীয় প্রতীক ও ঐতিহ্যকে ব্যবহার করছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এর মাধ্যমে যুদ্ধকে ‘ন্যায়সঙ্গত’ এবং ঈশ্বরের অনুমোদিত হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা চলছে। একই সঙ্গে ক্রেমলিন ও রুশ অর্থোডক্স চার্চের সম্পর্কও আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় ঘনিষ্ঠ হয়েছে।

ফোর্ডহ্যাম ইউনিভার্সিটির ধর্মবিষয়ক গবেষক সের্গেই চাপনিন বলেন, ‘চার্চ কার্যত রাষ্ট্রের সঙ্গে এমনভাবে একীভূত হয়ে গেছে যে দুটিকে আলাদা করে চেনাই কঠিন।’
অর্থোডক্স খ্রিস্টধর্মে পবিত্র ব্যক্তিদের দেহাবশেষ সেনাদের কাছে নিয়ে যাওয়ার প্রথা অবশ্য পুরোনো। তবে চাপনিনের মতে, দনস্কয়ের দেহাবশেষের সঙ্গে সমসাময়িক রাজনৈতিক বার্তাও যুক্ত হয়েছে।

তিনি বলেন, দনস্কয়কে ‘আগ্রাসী নয়, মাতৃভূমির রক্ষক’ হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। তাঁর ভাষায়, এটি ‘জনমতকে সংগঠিত করার একটি মিথ’, যা বিভিন্ন যুগকে যুক্ত করে মানুষের মনে শক্তিশালী প্রভাব ফেলতে পারে।
দনস্কয়ই প্রথম নন। চলতি বছরের শুরুতে মধ্যযুগীয় শাসক ও রুশ সামরিক গৌরবের প্রতীক প্রিন্স আলেকজান্ডার নেভস্কির দেহাবশেষও সেনাদের কাছে নেয়া হয়েছিল।
গত আগস্টে ক্রেমলিনের আর্চেঞ্জেল ক্যাথেড্রালে সংস্কারকাজের সময় দনস্কয়ের দেহাবশেষ উদ্ধার করা হয়। রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ঘটনাটিকে ‘অসাধারণ আবিষ্কার’ এবং প্যাট্রিয়ার্ক কিরিল ‘ঈশ্বরের বিশেষ ইচ্ছার নিদর্শন’ বলে বর্ণনা করেন।

তবে অর্থোডক্স ধর্মযাজক ও ইতিহাসবিদ ফাদার আলেকজান্ডার জানেমোনেতস বলেন, এর সঙ্গে খ্রিস্টধর্মের সম্পর্ক নেই। তাঁর মতে, ‘দেশপ্রেমিক’ উদ্দেশ্যে খ্রিস্টধর্ম ও চার্চকে ব্যবহার করা হচ্ছে।
তবে সম্মুখসারিতে থাকা অনেক রুশ সেনা ধর্মীয় সহায়তাকে গুরুত্ব দিচ্ছেন। এক সাবেক রুশ সেনাসদস্য বলেন, যুদ্ধক্ষেত্রে অস্থায়ী গির্জা তৈরি হয়, অভিযানের আগে সেনারা প্রার্থনা করেন এবং ধর্মযাজকেরা নিয়মিত ইউনিট ও হাসপাতালে যান।
তাঁর ভাষায়, ‘সবকিছু ভালো থাকলে সবাই ঈশ্বরের সঙ্গে কথা বলে না, কিন্তু পরিস্থিতি খারাপ হলে সবাই কথা বলে।’
রাষ্ট্রীয় জরিপকারী প্রতিষ্ঠান ভিসিআইওএমের ২০২৬ সালের জরিপে দেখা যায়, প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ রুশ নিজেদের অর্থোডক্স খ্রিস্টান হিসেবে পরিচয় দেন। তবে গবেষকদের মতে, নিয়মিত ধর্মীয় আচার পালন করেন মাত্র প্রায় ২ শতাংশ।

ধর্মীয় প্রভাব বাড়াতে চার্চ ক্রেমলিনের কাছ থেকে অর্থ ও রাজনৈতিক সমর্থন পায়, আর রাষ্ট্রীয় বয়ানকে সমর্থন করে চার্চ রাষ্ট্রের কাছ থেকে রাজনৈতিক বৈধতা পায়- এমন মত দিয়েছেন ইতিহাসবিদ কনস্তানতিন মিখাইলভ।
রুশ অর্থোডক্স চার্চের যুদ্ধ-সমর্থন নিয়ে বিতর্কও রয়েছে।
২০২২ সালে প্যাট্রিয়ার্ক কিরিল বলেছিলেন, সামরিক দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে কোনো সেনা মারা গেলে তাঁর আত্মত্যাগ ‘সব পাপ ধুয়ে দেয়’।
ইউক্রেন ২০১৯ সালে রুশ অর্থোডক্স চার্চ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে স্বাধীন অর্থোডক্স চার্চ প্রতিষ্ঠা করে। সমালোচক ধর্মযাজক গ্রিগরি মিখনভ-ভাইতেনকোর ভাষায়, চার্চের কাজ হওয়া উচিত মানুষকে আধ্যাত্মিক সহায়তা দেয়া, ‘কোনো বিভ্রমের মধ্যে ঠেলে দেয়া নয়’।

তবে দনবাসে থাকা এক রুশ সেনাসদস্য দেহাবশেষ পাঠানোর বিষয়টিকে বলেছেন ‘একবিংশ শতাব্দীর সমস্যার জন্য খুবই অপ্রচলিত একটি সমাধান’। তার মন্তব্য, আমার মনে হয়, এই দেহাবশেষগুলো সামরিক অভিযানে নিহত ছেলেদের মায়েদেরই বেশি প্রয়োজন।