প্রস্তাবিত সাইবার সুরক্ষা আইনের সংশোধনী নিয়ে পর্যালোচনা ও প্রস্তাবনা তুলে ধরেছে ব্রডকাস্ট জার্নালিস্ট সেন্টার (বিজেসি)। গণমাধ্যমকর্মীদের দক্ষতা উন্নয়ন, কল্যাণ ও পেশাগত সুরক্ষায় কাজ করা সাংবাদিকদের পেশাজীবী সংগঠনটি আইনের নানা দিক তুলে ধরেছে। একইসঙ্গে আইনটি যেন গলার কাঁটা না হয় সেই বিষয়ে এবং পাশাপাশি উদ্বেগের কথা তুলে ধরেছে।
বিজেসি’র পর্যালোচনা ও প্রস্তাবনাটি নিম্নরূপ—
প্রস্তাবিত সাইবার সুরক্ষা আইনের সংশোধনী: বিজেসি'র পর্যালোচনা ও প্রস্তাবনা
বাংলাদেশে ৭৫ শতাংশ পরিবার স্মার্ট ফোন ব্যবহার করে। এটি পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ তথ্য। তার মানে বাংলাদেশে ইন্টারনেটের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ১৫ কোটি। এটি জীবনকে যেমন সহজ করেছে তেমনি জটিল করেছে সামাজিক পরিপ্রেক্ষিতও। যোগাযোগ থেকে শুরু করে শিক্ষা, বিনোদন, বাণিজ্য, আর্থিক লেনদেন সবকিছুই এখন ইন্টারনেট নির্ভর। অন্যদিকে সাইবার স্পেসকে ঘিরে গড়ে উঠেছে অপরাধী চক্র। হয়ে উঠেছে জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসবাদ প্রসারের সহজ মাধ্যম। সামাজিক ঘৃণা ছড়ানো, নারীকে হেয় প্রতিপন্ন করা, প্রতিপক্ষের প্রতি কুৎসা রটানো, গুজব, ভুল তথ্য, অপতথ্য ছড়িয়ে বিশৃঙ্খলা ঘটানোর জন্যও ব্যবহৃত হচ্ছে ইন্টারনেট নির্ভর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। ডিজিটাল দুনিয়া নিরাপদ রাখতে তাই একটি যথাযথ আইন জরুরি হয়ে পড়ে।
আইন যেন না হয় গলার কাঁটা
বাংলাদেশে ইন্টারনেটের প্রসারের কালে ২০০৬ সালে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন করা হয়। ২০১৩ সালে আইনটি সংশোধন করে কঠোর করে আওয়ামী লীগ সরকার। মানহানি, রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করে বা আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটায়, এমন কিছু অনলাইনে লেখা, বলাকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয় ৫৭ ধারায়। সরকারের সমালোচকদের মামলা ও কারাগারে পাঠানোর কারণে ধারাটি ‘কুখ্যাত’ হয়ে ওঠে।
দেশ-বিদেশে ব্যাপক সমালোচনার মুখে ওই সরকার ২০১৮ সালে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন প্রণয়ন করে। এই আইনের ২১ ধরায় মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, জাতির পিতা, জাতীয় সংগীত বা জাতীয় পতাকার বিরুদ্ধে ‘প্রোপাগান্ডা বা প্রচারণা’ চালালে ১০ বছর কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছিল।
সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজের (সিজিএস) গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী, ডিজিটাল ও সাইবার নিরাপত্তা আইনে ২০১৮ থেকে ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১ হাজার ৪৩৬টি মামলায় ৪ হাজার ৫২০ জনকে অভিযুক্ত করা হয়। এসব মামলার ৬০ শতাংশের বাদী ছিলেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য বা আওয়ামী লীগ সংশ্লিষ্ট নেতাকর্মীরা।
সিজিএস ৮৫৯টি মামলার বাদীর পরিচয় শনাক্ত করেছিল। ২৬৩টি মামলাই করেছিলেন তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের কর্মীরা। শেখ মুজিবুর রহমান, শেখ হাসিনা, সজীব ওয়াজেদ জয়, ওবায়দুল কাদেরসহ আওয়ামী লীগের মন্ত্রী, এমপি, নেতাদের নিয়ে কটূক্তির মাধ্যমে মানহানি করার অভিযোগে এসব মামলায় ৮৮৭ জনকে আসামি করা হয়েছিল। অধিকাংশ আসামি ছিলেন বিএনপির নেতাকর্মীরা। এর পরেই ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মী এবং ফেসবুকের সাধারণ ব্যবহারকারীরা।
শেখ হাসিনা ও ব্যবসায়ী নাফিজ শারাফাতকে বিদ্রূপ করে আঁকা কার্টুন ফেসবুকে পোস্ট করায় ২০২০ সালের মে মাসে লেখক মুশতাক আহমেদকে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে গ্রেপ্তার করেছিল র্যাব। তার জামিন আবেদন ছয়বার নাকচ হয়। ২০২১ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি কারাগারেই মৃত্যু হয় মুশতাক আহমেদের।
সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ-আইন-সংশোধনী
কর্তৃত্ববাদী সরকার পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার পতিত সরকারের সাইবার সুরক্ষা আইন বাতিল করে সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ জারি করে। নির্বাচিত সরকার সেই অধ্যাদেশকে বৈধতা দিয়ে এপ্রিল মাসে সাইবার সুরক্ষা আইন পাস করে। আইন পাসের ৫ মাস পরেই তা সংশোধনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। ডিজিটাল দুনিয়ার দ্রুত পরিবর্তনের সাথে আইনও পাল্লা দিচ্ছে।
এবারেও উঠেছে নানা প্রশ্ন ও উদ্বেগ
সাইবার সুরক্ষা আইন সংশোধনের জন্য সরকার যে খসড়া প্রস্তুত করেছে তার বিধান নিয়ে এরই মধ্যে আপত্তি জানাতে শুরু করেছে মানবাধিকার সংস্থা, রাজনৈতিক দল, নাগরিক প্লাটফর্মসহ বিভিন্ন সংস্থা। তাদের অনেকের মতে প্রস্তাবিত সংশোধনীতে এমন কিছু বিধান আছে যা কর্তৃত্ববাদী মনোভাবের, এতে উদ্বেগ জানিয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশাল বাংলাদেশ (টিআইবি) বলেছে, খসড়াটি পাস হলে সাইবার জগৎ নিপীড়নের ভুবনে পরিণত হবে। এমনকি সংসদে বিরোধী দলের পক্ষ থেকে অভিযোগ করে বলা হয়েছে, ‘বিরোধী দলমত দমন করতে এবং সরকারের দুর্নীতি, দলীয়করণ প্রকাশ যাতে না হয় সেজন্য মিডিয়াকে দমন করতে সরকার সাইবার সুরক্ষা আইন সংশোধনের পথে হাঁটছে।’ অপরাপর সংস্থাগুলোরও শঙ্কা-প্রস্তাবিত সংশোধনী পাস হলে তা মত প্রকাশের স্বাধীনতার জন্য বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
বিজেসির পর্যালোচনা
সম্প্রচার মাধ্যমে কর্মরতদের সবচেয়ে বড় সংগঠন হিসেবে ব্রডকাস্ট জার্নালিস্ট সেন্টার-বিজেসিও প্রস্তাবিত সংশোধনীর বেশ কিছু ধারা নিয়ে উদ্বিগ্ন না হয়ে পারছে না। এর আগেও বিজেসি কর্তৃত্ববাদী সরকারের আমলের সাইবার সুরক্ষা আইন নিয়ে তাদের উৎকণ্ঠা, আপত্তি ও প্রতিবাদ জানিয়েছিলো বারবার।
শঙ্কা-১:
প্রস্তাবিত ধারা ২৬ক: ‘‘গুজব ও অপতথ্য’’ সাংবাদিকতার ঝুঁকি
প্রস্তাবিত সংশোধনীর সবচেয়ে উদ্বেগজনক ধারা ২৬ক। এই ধারাটি বিদ্যমান আইনে নেই। প্রস্তাবিত এই ধারায় বলা হয়েছে, যদি কেউ সাইবার স্পেসে গুজব বা অপতথ্য প্রকাশ বা প্রচার করেন, তা হলে তা হবে একটি অপরাধ।
গুজবের সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, গুজব হলো এমন কোনো অসমর্থিত বা অযাচাইকৃত তথ্য, সংবাদ বা দাবি যা জনমনে বিভ্রান্তি, আতঙ্ক, উত্তেজনা সৃষ্টি করে বা করতে পারে।
আর অপতথ্য অর্থ এমন কোনো মিথ্যা, বিকৃত বা বিভ্রান্তিকর তথ্য যা ব্যক্তি, জনসাধারণ, প্রতিষ্ঠান বা রাষ্ট্রকে বিভ্রান্ত প্রতারিত, ক্ষতিগ্রস্ত করার উদ্দেশ্যে ইচ্ছাকৃতভাবে তৈরি।
এখন আমাদের প্রশ্ন:
তথ্যের সত্যাসত্য কীভাবে নির্ধারিত হবে?
প্রকাশকারীর ইচ্ছাকৃত প্রতারণামূলক অভিপ্রায় প্রমাণ করা হবে কি?
সাংবাদিক, গবেষক বা নাগরিকের তাৎক্ষণিক প্রতিবেদন কি অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে?
তথ্য প্রকাশের সময় স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব না হলে দায় কার ওপর বর্তাবে?
জরুরি পরিস্থিতি, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, সংঘাত, মানবাধিকার সংকট, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বা দ্রুত পরিবর্তনশীল ঘটনার ক্ষেত্রে তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে সম্পূর্ণ যাচাই অনেক সময় করা সম্ভব নাও হতে পারে। অযাচাইকৃত তথ্য মানেই সবসময় মিথ্যা তথ্য নয়। ফলে এই ধরনের অস্পষ্ট বিধান স্বাধীন সাংবাদিকতা, অনুসন্ধানী প্রতিবেদন, মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ, প্রত্যক্ষদর্শীর তথ্য এবং জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট তথ্য প্রকাশকে ভীতির মধ্যে ফেলতে পারে। এই ধারায় অপরাধের শাস্তি হিসেবে সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ড বা ৪০ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। এটি গুরুতর উদ্বেগের বিষয়।
শঙ্কা ২- ধারা ২৫: একই পাল্লায় নারী ও শিশু সুরক্ষার বিধান ও মানহানি
বর্তমান আইনের ২৫ ধারায় ধারায় বলা হয়েছে, যদি কোনো ব্যক্তি সাইবার স্পেস অন্য কোনো ব্যক্তিকে ব্ল্যাকমেইলিং বা যৌন হয়রানি বা রিভেঞ্জ পর্ন বা ডিজিটাল শিশু যৌন নিপীড়নে কনটেন্ট রাখে, যা প্রকাশ, প্রচারের হুমকি দেন বা যা ক্ষতিকর বা ভীতি প্রদর্শক, তাহলে তা অপরাধ হবে।
প্রস্তাবিত সংশোধনীতে এরসঙ্গে ‘মানহানি বা হেয় প্রতিপন্ন বা বুলিং’ শব্দগুলো যুক্ত করা হয়েছে।
অনলাইন যৌন হয়রানি, ব্ল্যাকমেইল, রিভেঞ্জ পর্ন, শিশু যৌন নিপীড়ন ও গুরুতর ডিজিটাল সহিংসতার বিরুদ্ধে কঠোর সুরক্ষা আমাদের অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে। তবে এসব গুরুতর অপরাধের সঙ্গে ‘‘মানহানি’’ ও ‘‘হেয়প্রতিপন্ন করা’’ একই ধারায় যুক্ত করার প্রস্তাব যুক্তিসঙ্গত নয়।
মানহানি ও গুরুতর অনলাইন যৌন সহিংসতার প্রকৃতি, ক্ষতির ধরন, অপরাধের উপাদান এবং ভুক্তভোগী সুরক্ষার দিক থেকে ভিন্ন বিষয়। এগুলোকে একই ধারায় অন্তর্ভুক্ত করলে-
নারী ও শিশু সুরক্ষার আইন রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত বিরোধে ব্যবহৃত হতে পারে।
বৈধ সমালোচনা ও অপরাধমূলক হয়রানির সীমারেখা অস্পষ্ট থাকায় অপব্যবহার বাড়তে পারে।
পরিচিত ব্যক্তি বা রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের সমালোচনা ফৌজদারি মামলার ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
গুরুতর অনলাইন সহিংসতা মোকাবিলার মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হতে পারে।
১৮৬০ সালের দণ্ডবিধির ৪৯৯ ধারায় মানহানির যে সংজ্ঞা সেই সংজ্ঞাকেই প্রস্তাবিত আইনে মানহানি হিসেবে স্বীকার করা হয়েছে। এর পর বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তির সুনাম, মর্যাদা বা চরিত্র ক্ষুণ্ণ করার উদ্দেশ্যে প্রচারিত বা প্রদর্শিত এমন যে কোনো তথ্য, উপাত্ত, বক্তব্য, অডিও, ভিডিও, অডিও-ভিজুয়াল চিত্র, স্থিরচিত্র বা গ্রাফিক্সও অন্তর্ভুক্ত হবে। যা মিথ্যা, বিকৃত, বিভ্রান্তিকর, অপমানজনক বা ক্ষতিকর এবং যা ডিজিটাল বা ইলেকট্রনিক মাধ্যমে ধারণকৃত, সম্পাদিত বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি।
দণ্ডবিধিতে মানহানির সর্বোচ্চ সাজা দুই বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ড বা অর্থদণ্ড। সংশোধনীতে মানহানির সাজা করা হয়েছে ৫ বছরের কারাদণ্ড ও ২০ লক্ষ টাকা। একই অপরাধে দুই আইনে দুই সাজা আইনের সমানাধিকারের নীতির পরিপন্থী হিসেবে গণ্য হয়। আর এখনো পর্যন্ত সরকার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহার সংক্রান্ত কেনো নীতিমালা প্রণয়ন করেনি। ফলে এটিও আরেক দফা আইনটি সংশোধনের পথ খোলা রাখলো।
অনিয়ম/ দুর্নীতির সংবাদ হলে কি ‘হেয় প্রতিপন্ন’ গণ্য হবে?
সংশোধনীর খসড়ায় হেয় প্রতিপন্নের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তির মর্যাদা, সম্মান, সুনাম বা সামাজিক অবস্থানকে কোনো কথা, আচরণ, প্রকাশনা, ইঙ্গিত বা কার্যকলাপের মাধ্যমে ক্ষুণ্ণ করা, যা ওই ব্যক্তি অন্যের কাছে অপমানিত, তুচ্ছ, নিকৃষ্ট বা অসম্মানজনক করে তোলে। এ ব্যাখ্যা উদ্বেগজনক। কেননা অনিয়ম বা দুর্নীতির অভিযোগে কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে তার অপকর্মের তথ্য যদি সংবাদ মাধ্যমের অনলাইনে উন্মোচিত হয়, তাহলে তিনি এই আইন অনুযায়ী ‘হেয় প্রতিপন্ন’ মামলা করে দিতে পারেন।
কনটেন্ট ব্লক করা যাবে অনুমতি ছাড়াই
বিদ্যমান আইনের ৮ ধারায় নিরাপত্তা ক্ষুণ্ণ হলে সরকার কোনো কনটেন্ট ব্লক করতে পারে। সংশোধনীতে বলা হয়েছে, নিরাপত্তা ক্ষুণ্ণ হবে আশঙ্কা থাকলেও কনটেন্ট ব্লক করতে পারবে সরকার। জানাতে হবে না-কী কারণে কোন কোন কনটেন্ট ব্লক করা হয়েছে। বিদ্যমান আইনে অনুমতি ছাড়া কনটেন্ট ব্লক করার পর কারণ উল্লেখ না করলে ৩ দিনের মধ্যে তা উন্মুক্ত করার বিধান আছে। কিন্তু সংশোধনীতে বলা হয়েছে এর জন্য আদালতে আপিল করতে হবে। বাংলাদেশের আদালতের যে গতিপ্রকৃতি তাতে এই আপিল সহসা নিষ্পত্তি যে হবে না তা অনুমেয়।
বেসরকারি গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানও কোম্পানি
বিদ্যমান আইনের ২৯ ধারায় বলা হয়েছিলো যে, যদি কোনো কোম্পানি আইনের কোনো ধারায় অপরাধ করে তাহলে অর্থদণ্ড দিতে হবে। সেখানে কোম্পানি বলতে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, অংশীদারি কারাবার, সমিতি, সংঘ বা সংগঠনও অন্তর্ভূক্ত। সংশোধনীতে কোম্পানির আওতা বাড়িয়ে ট্রাস্ট, সংবিধিবদ্ধ সংস্থা বা অন্য কোনো আইনগত ব্যক্তিসত্ত্বাসম্পন্ন প্রতিষ্ঠানকেও অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছে।
বিদ্যমান আইনে অপরাধ হলে কেবল অর্থদণ্ডের বিধান আছে। কিন্তু সংশোধনীতে কোম্পানির নিবন্ধন ও লাইসেন্স স্থগিত, বাতিল বা নিষিদ্ধ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানও কোম্পানি আইনে নিবন্ধিত। ফলে ২৫ বা ২৬ ধারায় কোন অপরাধ প্রমাণিত হলে কোন গণমাধ্যমের লাইসেন্স বাতিল করা হবে না এমন আশঙ্কা উড়িয়ে দেয়া যায় না।
সাইবার সুরক্ষা কাউন্সিল: নেই গণমাধ্যমের প্রতিনিধি
বিদ্যমান আইনের ১২ ধারায় প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে সাইবার সুরক্ষা কাউন্সিল গঠন করা রয়েছে। সংশোধনীতে এই কাউন্সিলে স্বরাষ্ট্র এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে সদস্য করার প্রস্তাব করা হয়েছে। কিন্তু মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যানকে বাদ দেয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। ২৯ সদস্যের সাইবার সুরক্ষা কাউন্সিলে সরকারের বাইরের প্রতিনিধি মাত্র ২ জন। নেই গণমাধ্যমের কোনো প্রতিনিধি। ডিজিটাল মাধ্যমে সবচেয়ে বেশি কনটেন্ট তৈরি করে সম্প্রচার মাধ্যম। কাউন্সিলে নেই তাদেরও কোনো প্রতিনিধি। যদিও আইন মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধির সংখ্যা ৩। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে গঠিত গণমাধ্যম সংস্কার কমিশন একটি গণমাধ্যম কমিশন গঠনের প্রস্তাব দিয়েছিলো। সেই লক্ষ্যে আইনের একটি খসড়াও জমা দিয়েছিলো তারা। সাইবার সুরক্ষা কাউন্সিলের সংশোধনীতে গণমাধ্যম কমিশনের প্রতিনিধির অনুপস্থিতিতে এই শঙ্কা তৈরি যে, করে এই কমিশন সহসা আলোর মুখ দেখবে না।
‘সরল বিশ্বাসে’ কর্মকর্তার দায়মুক্তি: সব দায় নাগরিকদের প্রস্তাবিত সংশোধনীতে কর্মকর্তাদের "সরল বিশ্বাসে' সম্পাদিত কাজের জন্য দায়মুক্তির সুযোগ রাখা হলেও ভুলভাবে কনটেন্ট ব্লক, তথ্য অপসারণ, নজরদারি বা গ্রেপ্তারের শিকার নাগরিকদের জন্য সুস্পষ্ট ক্ষতিপূরণ বা প্রতিকার নেই। সরকারি কর্মকর্তাদের এই দায়মুক্তি ভারসাম্যহীনতা তৈরি করবে।
এই পরিস্থিতিতে সংশোধনীর সার্বিক পর্যালোচনায় আমাদের প্রস্তাবনা:
১. ধারা ২৬ক পুনর্বিবেচনা: "গুজব" বা "অযাচাইকৃত তথ্য"-কে ঢালাওভাবে ফৌজদারি অপরাধ না বানিয়ে সরকারি তথ্যের স্বচ্ছতা, ফ্যাক্ট-চেকিং এবং দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা জোরদার করতে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
২. মানহানি আলাদা করা: নারী ও শিশু সুরক্ষার ধারা থেকে "মানহানি" ও "হেয় প্রতিপন্ন করা" অংশ পুরোপুরি বাদ দিয়ে এটিকে রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত উদ্দেশ্যে অপব্যবহারের পথ বন্ধ করতে হবে।
৩. কনটেন্ট ব্লক করার ক্ষমতার সীমা: কনটেন্ট সরাতে হলে লিখিত কারণ, নোটিশ ও স্বাধীন বিচারিক পর্যালোচনার একটা প্রক্রিয়া রাখতে হবে।
৪. ভুক্তভোগীর ক্ষতিপূরণ: বেআইনি গ্রেপ্তার, নজরদারি বা কনটেন্ট সরানোর শিকার নাগরিকদের জন্য সুস্পষ্ট ক্ষতিপূরণ ও প্রতিকারের ব্যবস্থা রাখতে হবে।
৫. অংশীজনদের সাথে আলোচনা: সংশোধনী চূড়ান্ত করার আগে নাগরিক সমাজ, সাংবাদিক সংগঠন ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সাথে আরও অর্থবহ উন্মুক্ত আলোচনা নিশ্চিত করতে হবে।
বাংলাদেশের আগের আইনগুলোর অপব্যবহারের অভিজ্ঞতা ইতোমধ্যে দেখিয়েছে যে অস্পষ্ট, অতিবিস্তৃত ও বিচারিক তদারকিবিহীন বিধান কীভাবে সাংবাদিক, মানবাধিকারকর্মী, গবেষক, রাজনৈতিক কর্মী এবং সাধারণ নাগরিকের মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারে।
প্রস্তাবিত সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইন, ২০২৬ এমনভাবে সংশোধন করতে হবে, যাতে এটি প্রকৃত সাইবার অপরাধ মোকাবিলায় কার্যকর হয়, কিন্তু বৈধ মতপ্রকাশ, সাংবাদিকতা, মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ ও গণতান্ত্রিক জবাবদিহিকে অপরাধে পরিণত না করে।
