বিশ্বমঞ্চে ট্রাম্পের ক্ষমতার আসল চিত্র প্রকাশ্যে

রয়টার্সের বিশ্লেষণ

বিশ্বমঞ্চে ট্রাম্পের ক্ষমতার আসল চিত্র প্রকাশ্যে

ফন্ট সাইজ:

বিশ্বমঞ্চে নিজের প্রভাব নতুন করে জানান দিতে ব্যস্ত ছিলেন বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে কড়া ভাষণের পর চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে হোয়াইট হাউসে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক করেছেন তিনি। তবে ব্যস্ত কূটনৈতিক তৎপরতার পরও দেশে-বিদেশে নানা সংকট সামাল দিতে ট্রাম্পের সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়ে উঠছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

ইরানের সঙ্গে প্রায় সাত মাস ধরে চলা যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি বাজারে চাপ তৈরি করেছে এবং ট্রাম্পের জনপ্রিয়তায় প্রভাব ফেলেছে। একই সময়ে ইউরোপ ও এশিয়ার মিত্রদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কেও টানাপড়েন বাড়ছে। চীনের সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রতিযোগিতাও তীব্র হচ্ছে।

গত মঙ্গলবার জাতিসংঘে দেয়া ভাষণে ট্রাম্প ইরানকে চুক্তিতে রাজি করাতে কঠোর হুঁশিয়ারি দেন। তিনি বলেন, ইরান সমঝোতায় না এলে দেশটিকে ‘ধ্বংস’ করা হবে।
ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে তাঁর কঠোর নীতির পক্ষে সাফাই দিয়ে তিনি বলেন, ‘বিজয়ীরাই লুটের মাল পায়।’ আন্তর্জাতিক লক্ষ্য অর্জনে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি ব্যবহারের সম্ভাবনাও তিনি উড়িয়ে দেননি।

শি-ট্রাম্প বৈঠকে সীমিত অগ্রগতি
বৃহস্পতিবার শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠকে ট্রাম্প এমন এক চীনা নেতার মুখোমুখি হন, যাঁর দেশ বিশ্ববাণিজ্যে শক্ত অবস্থানে রয়েছে। বিপরীতে ইরান যুদ্ধের অর্থনৈতিক চাপ সামলাতে হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রকে।

শির রাষ্ট্রীয় সফরে ছিল ব্যাপক আয়োজন। কিন্তু এআই, বাণিজ্য, তাইওয়ান ও ইরানের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে বড় কোনো সমাধান সামনে আসেনি। সবচেয়ে দৃশ্যমান ফল হলো দুই দেশের বাণিজ্যযুদ্ধের বিরতি আরও দুই মাস বাড়ানো।

চীনা রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, রুদ্ধদ্বার বৈঠকে শি ট্রাম্পকে তাইওয়ানের স্বাধীনতার বিরোধিতা করার আহ্বান জানিয়েছেন। তাইওয়ানকে চীন নিজেদের ভূখণ্ড বলে দাবি করে। ওয়াশিংটন-বেইজিং সম্পর্কের সবচেয়ে স্পর্শকাতর বিষয়গুলোর একটি এটি।

ট্রাম্পের আগের কঠোর শুল্কনীতির তুলনায় শির সঙ্গে বৈঠকে তাঁর অবস্থান ছিল অনেক বেশি সংঘাত এড়ানোর মতো। বিশ্লেষকেরা এর পেছনে চীনের বিরল খনিজের ওপর নিয়ন্ত্রণকে একটি কারণ হিসেবে দেখছেন। প্রযুক্তি ও গাড়ি শিল্পে গুরুত্বপূর্ণ এসব খনিজের সরবরাহ চীন প্রয়োজনে সীমিত করতে পারে।
ইরান যুদ্ধেই সবচেয়ে বড় অচলাবস্থা
ট্রাম্পের কূটনৈতিক সপ্তাহজুড়ে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল ইরান যুদ্ধ। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরাইলের সঙ্গে শুরু হওয়া এই সংঘাত প্রায় সাত মাস ধরে চলছে। এতে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে এবং মধ্যপ্রাচ্যের অন্য এলাকাতেও সংঘাত ছড়িয়ে পড়েছে।
গাজায় যুদ্ধবিরতির মতো কিছু কূটনৈতিক সাফল্য পেলেও ইরান ইস্যুতে ট্রাম্প এখনো বড় কোনো সমাধানে পৌঁছাতে পারেননি। যুদ্ধটি তাঁর রাজনৈতিক ভিত্তির মধ্যেও বিভাজন তৈরি করেছে। নভেম্বরে মধ্যবর্তী নির্বাচনে এর প্রভাব পড়তে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে ইরান যুদ্ধে সহায়তার জন্য ট্রাম্পের আহ্বানে ইউরোপ ও এশিয়ার অধিকাংশ মিত্র সাড়া দেয়নি। জাতিসংঘে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ ক্ষমতা ও জবরদস্তির বদলে ‘সভ্য আন্তর্জাতিক সমাজের’ প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভাও বিদেশি হস্তক্ষেপের সমালোচনা করেছেন।
ইউক্রেন যুদ্ধেও রাশিয়া ও ইউক্রেনকে সীমিত জ্বালানি যুদ্ধবিরতিতে রাজি করানোর ট্রাম্পের উদ্যোগ খুব একটা এগোয়নি।
ইউরেশিয়া গ্রুপের প্রেসিডেন্ট ইয়ান ব্রেমার এক্সে লিখেছেন, এক বছর আগের তুলনায় এখন কানাডা, ইউরোপ, চীন, ইরান ও রাশিয়াসহ অনেক দেশ ট্রাম্পকে ‘না’ বলতে বেশি প্রস্তুত।
জাতিসংঘে ট্রাম্প নিজেও যেন তাঁর প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেছিলেন, ‘দেখি আমার কোনো ক্ষমতা আছে কি না। হয়তো আছে, হয়তো নেই। খুব শিগগিরই তা জানা যাবে।’