জাতিসংঘে তারেক রহমানের ভাষণ: ‘সবার জন্য বাংলাদেশ’

জাতিসংঘে তারেক রহমানের ভাষণ: ‘সবার জন্য বাংলাদেশ’

ফন্ট সাইজ:

নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভাষণ বাংলাদেশের নতুন সরকারের আন্তর্জাতিক অভিষেক। ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর ক্ষমতায় আসা বিএনপি সরকারের সামনে এখন একসঙ্গে কয়েকটি বড় চ্যালেঞ্জ—গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করা, অর্থনীতি ঘুরিয়ে দাঁড় করানো, বিনিয়োগের আস্থা ফেরানো, রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলা এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের অবস্থানকে নতুন বাস্তবতায় সাজানো। ১৭ ফেব্রুয়ারি তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। প্রায় দুই দশক পর বিএনপি আবার সরকারে ফেরে।

এই প্রেক্ষাপটে জাতিসংঘে দেয়া ভাষণটি শুধু পররাষ্ট্রনীতির বক্তব্য নয়। বরং এটি নতুন সরকারের রাজনৈতিক অগ্রাধিকার ও উন্নয়ন ভাবনার একটি সারসংক্ষেপ। ভাষণের শুরুতেই তিনি মুক্তিযুদ্ধের শহীদ, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে নিহত ও আহতদের স্মরণ করেছেন। বলেছেন, বাংলাদেশ গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার পথে এগোচ্ছে। ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে জনগণ বিএনপিকে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছে, এ কথাও জোর দিয়ে বলেছেন।

গণতন্ত্রের এই বার্তা আন্তর্জাতিক মঞ্চে গুরুত্বপূর্ণ। তবে এর সঙ্গে দেশের ভেতরের বাস্তবতার যোগটিও গুরুত্বপূর্ণ। নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠন গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার একটি অংশ। এর পরের পরীক্ষা হয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে—সংসদ কতটা কার্যকর, বিরোধী মত কতটা নিরাপদ, প্রশাসন কতটা জবাবদিহিমূলক, বিচারব্যবস্থা কতটা স্বাধীন এবং নাগরিক অধিকার কতটা সুরক্ষিত। জাতিসংঘের মঞ্চে দেয়া প্রতিশ্রুতির সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা তাই শেষ পর্যন্ত দেশের ভেতরেই।

এবারের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের সঙ্গে বাংলাদেশের একটি বাড়তি সম্পর্ক রয়েছে। ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি বাংলাদেশের ড. খলিলুর রহমান। ২ জুন ২০২৬ তিনি নির্বাচিত হন। অধিবেশনের প্রতিপাদ্য—‘Restoring Trust, Managing Transformation: A United Nations That Delivers for All’। ৮ সেপ্টেম্বর অধিবেশন শুরু হয়েছে।

ফলে প্রধানমন্ত্রী যখন আস্থা পুনর্গঠন, বহুপাক্ষিকতা ও কূটনীতির কথা বলেছেন, তখন সেটি অধিবেশনের মূল ভাবনার সঙ্গেও মিলে যায়। সংঘাতের সমাধান আলোচনা ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে হওয়া উচিত—এ অবস্থানও বাংলাদেশের প্রচলিত বহুপাক্ষিক কূটনীতির ধারাবাহিকতা।

বিশ্ব এখন এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে আছে যখন যুদ্ধ শুধু যুদ্ধক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ থাকে না। জ্বালানি, খাদ্য, বাণিজ্য, মূল্যস্ফীতি ও সরবরাহব্যবস্থায় তার প্রভাব পড়ে। তারেক রহমানের ভাষণেও সেই বাস্তবতার কথা এসেছে। তিনি বলেছেন, সংঘাতের কারণে বহু মানুষ বাস্তুচ্যুত হচ্ছে, মানবিক সংকট বাড়ছে এবং বিশ্ব অর্থনীতি চাপের মুখে পড়ছে।

ফিলিস্তিন প্রশ্নেও বাংলাদেশ তার আগের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছে। আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার ও স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রতি সমর্থন জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার রোধ, নিরস্ত্রীকরণ এবং অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের পক্ষে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরা হয়েছে।

তবে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে জরুরি আন্তর্জাতিক প্রশ্ন সম্ভবত রোহিঙ্গা সংকট। ভাষণে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে আসছে। তাদের নিরাপদে নিজ দেশে ফিরিয়ে নেয়াকেই তিনি সমস্যার একমাত্র টেকসই সমাধান হিসেবে তুলে ধরেছেন।

জাতিসংঘের সাম্প্রতিক হিসাবও বলছে, বাংলাদেশে প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা রয়েছে। মে ২০২৬-এ জাতিসংঘ ও সহযোগী সংস্থাগুলো রোহিঙ্গা শরণার্থী ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য ৭১০.৫ মিলিয়ন ডলারের সহায়তা চেয়েছে। মিয়ানমারের সংঘাত অব্যাহত থাকায় নতুন করে মানুষ পালিয়ে আসার চাপও রয়েছে।

এখানে বাংলাদেশের দাবি স্পষ্ট, কিন্তু বাস্তবতা কঠিন। প্রত্যাবাসনের জন্য শুধু আন্তর্জাতিক আহ্বান যথেষ্ট নয়। মিয়ানমারের রাখাইন পরিস্থিতি, নিরাপত্তা, নাগরিকত্ব, অধিকার এবং প্রত্যাবাসনকারীদের ভবিষ্যৎ—সবগুলো বিষয় একসঙ্গে সমাধান করতে হবে। ফলে রোহিঙ্গা প্রশ্নে ঢাকার কূটনীতির সামনে এখন দুটি কাজ—আন্তর্জাতিক অর্থায়ন ধরে রাখা এবং নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য চাপ বাড়ানো।

জলবায়ু পরিবর্তনও ভাষণের বড় অংশজুড়ে ছিল। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণে বাংলাদেশের অবদান কম হলেও জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত বাংলাদেশকে বহন করতে হচ্ছে। জলবায়ু ন্যায়বিচার, অর্থায়ন ও অভিযোজন সহায়তার দাবি তিনি পুনর্ব্যক্ত করেছেন।

বাংলাদেশের জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দাবি। কিন্তু আন্তর্জাতিক সম্মেলনে দাবি জানানোর পাশাপাশি দেশের ভেতরের পরিবেশনীতি কতটা বাস্তবসম্মত হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। ভাষণে ২৫ কোটি গাছ লাগানো, খাল খনন, সৌর ও পরিচ্ছন্ন জ্বালানির ব্যবহার, তিস্তা মহাপরিকল্পনা এবং পদ্মা ব্যারেজের কথা এসেছে।

এগুলো বড় পরিকল্পনা। বড় পরিকল্পনার সঙ্গে বড় প্রশ্নও থাকে, অর্থায়ন কোথা থেকে আসবে, বাস্তবায়ন কতটা স্বচ্ছ হবে, পরিবেশগত প্রভাব কী হবে এবং প্রকল্পগুলো শেষ পর্যন্ত মানুষের জীবনে কতটা পরিবর্তন আনবে। অর্থনীতির ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশকে ‘ম্যানুফ্যাকচারিং হাব’ হিসেবে গড়ে তোলার কথা বলেছেন। তরুণদের দক্ষ মানবসম্পদে পরিণত করা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং তরুণ উদ্যোক্তা ও গবেষকদের জন্য স্টার্টআপে অর্থ বরাদ্দের কথাও বলেছেন। নারী উদ্যোক্তা, শিক্ষা ও সামাজিক সুরক্ষার বিষয়েও বেশ কিছু উদ্যোগের কথা এসেছে।

এখানে সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় বাস্তবতা কর্মসংস্থান। তরুণ জনগোষ্ঠী বাংলাদেশের বড় সম্পদ হতে পারে, আবার পর্যাপ্ত কাজের সুযোগ তৈরি না হলে সেটিই চাপ হয়ে উঠতে পারে। দক্ষতা উন্নয়ন, শিল্পায়ন, বিনিয়োগ এবং রপ্তানি বহুমুখীকরণ—সবগুলো বিষয় তাই একই সূত্রে বাঁধা।

‘অর্থনীতির গণতন্ত্রায়ন’ কথাটিও ভাষণে এসেছে। ফ্যামিলি কার্ড, ফার্মার্স কার্ড, স্পোর্টস কার্ড ও ই-হেলথ কার্ডের মতো সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির মাধ্যমে পিছিয়ে পড়া মানুষের কাছে রাষ্ট্রীয় সহায়তা পৌঁছে দেয়ার কথা বলা হয়েছে।

সামাজিক সুরক্ষা যত বিস্তৃত হবে, ততই প্রয়োজন হবে স্বচ্ছ তথ্যভান্ডার, সঠিক সুবিধাভোগী নির্বাচন এবং দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ। নইলে ভালো উদ্যোগও রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক সুবিধাবণ্টনের অভিযোগে প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে।

বাংলাদেশের সামনে আরেকটি বড় পরিবর্তন—স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণ। জাতিসংঘের বর্তমান তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের LDC উত্তরণের নির্ধারিত তারিখ ২৪ নভেম্বর ২০২৬। তবে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশ প্রস্তুতি পর্ব বাড়ানোর অনুরোধ করেছে। জাতিসংঘের উন্নয়ন নীতি কমিটি বলেছে, কাঠামোগত দুর্বলতা মোকাবিলায় উল্লেখযোগ্য সংস্কারের অগ্রগতি থাকলে প্রস্তুতি পর্ব বাড়ানো যুক্তিযুক্ত হতে পারে; জুলাইয়ে ECOSOC এ বিষয়ে সাধারণ পরিষদের পদক্ষেপের সুপারিশ করেছে।

অর্থাৎ ভাষণে প্রধানমন্ত্রী যখন বাজারে প্রবেশাধিকার, অর্থায়ন, প্রযুক্তি হস্তান্তর ও সক্ষমতা বৃদ্ধির কথা বলেছেন, তার পেছনে বাস্তব অর্থনৈতিক প্রয়োজন রয়েছে। LDC উত্তরণ বাংলাদেশের জন্য মর্যাদার বিষয় যেমন, তেমনি বাণিজ্য সুবিধা ও প্রতিযোগিতার নতুন বাস্তবতাও। উত্তরণের পর রপ্তানি সক্ষমতা ধরে রাখতে হলে উৎপাদনশীলতা, অবকাঠামো, দক্ষতা এবং পণ্যের বহুমুখীকরণে জোর দিতে হবে।

প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়েও প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের একটি ছবি পাওয়া যায়। তিনি বলেছেন, আজকের ডিজিটাল বিভাজন যেন আগামী দিনের AI বিভাজনে পরিণত না হয়। উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য প্রযুক্তি হস্তান্তর, দক্ষতা বৃদ্ধি ও সাশ্রয়ী প্রযুক্তি প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন।

এটি সময়োপযোগী কথা। কিন্তু AI যুগে প্রবেশের জন্য শুধু প্রযুক্তি কেনা যথেষ্ট নয়। মানসম্মত শিক্ষা, গবেষণা, ডেটা অবকাঠামো, বিদ্যুৎ, দক্ষ জনবল এবং উদ্ভাবনের পরিবেশ দরকার। বাংলাদেশকে এখানেই দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ করতে হবে।
সব মিলিয়ে জাতিসংঘে তারেক রহমানের ভাষণে বাংলাদেশের জন্য একটি বিস্তৃত রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক রূপরেখা পাওয়া গেছে। গণতন্ত্র, শান্তি, রোহিঙ্গা, জলবায়ু, নারী ক্ষমতায়ন, কর্মসংস্থান, সামাজিক সুরক্ষা, প্রযুক্তি ও LDC উত্তরণ প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ই এসেছে।
কিন্তু ভাষণের পরের গল্পটাই আসল। আন্তর্জাতিক মঞ্চে প্রতিশ্রুতি দেয়া সহজ; রাষ্ট্র পরিচালনায় সেই প্রতিশ্রুতির হিসাব দেয়া কঠিন। নির্বাচনী ম্যান্ডেট একটি সরকারকে রাজনৈতিক বৈধতা দিতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি আস্থা তৈরি করে কর্মদক্ষতা, জবাবদিহি ও দৃশ্যমান ফলাফল।
প্রধানমন্ত্রীর ভাষণের শেষের বার্তা ছিল ‘সবার আগে বাংলাদেশ : সবার জন্য বাংলাদেশ’। এখন বাংলাদেশের মানুষ স্বাভাবিকভাবেই দেখতে চাইবে, এই ‘সবার জন্য’ কথাটি রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান, অর্থনীতি, নাগরিক অধিকার, কর্মসংস্থান ও সামাজিক নিরাপত্তায় কতটা বাস্তব হয়ে ওঠে।
নিউইয়র্কের বক্তৃতা তাই শেষ কথা নয়। বরং এটি নতুন সরকারের সামনে দেয়া এক দীর্ঘ তালিকার প্রতিশ্রুতি। এখন শুরু হবে সেই প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নের পরীক্ষা।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট
email: [email protected]