অন্যদিকে, শ্বেতাঙ্গদের মধ্যে যারা সবচেয়ে স্থ্থূল ও বর্বর, যেমন ধরুন প্রাচীন জার্মান জনগোষ্ঠী কিংবা বর্তমান তাতার জাতি, তাদেরও শৌর্যের প্রশ্নে, বা সরকারের পরিগঠন সম্পর্কিত, কিংবা অন্য কোনো ব্যাপারে, কিছু না কিছু বিশিষ্টতা রয়েছে। প্রকৃতি যদি সাদা ও কালো মানুষের ভেতর কোনো মৌলিক পার্থক্য আরোপ না করতো, তা হলে এত দেশে এত যুগ ধরে এই দুই বর্ণের মানুষের মধ্যে এমন অভিন্ন ও স্থির পার্থক্য বিদ্যমান থাকতো না। আমাদের নিজেদের উপনিবেশের কথা বাদ দিলেও, ইউরোপের সর্বত্র ছড়িয়ে থাকা নিগ্রো দাসদের ভেতর একজনের মধ্যেও প্রতিভার তিলমাত্র লক্ষণও কোথাও খুঁজে পাওয়া যায়নি, অথচ আমাদের ভেতরকার অশিক্ষিত নিম্ন শ্রেণির লোকও আমাদের যেকোনো পেশায় নিজেদের বিশিষ্টতা তুলে ধরতে সক্ষম।”৫২
নিজের এই অনুচ্ছেদটি শেষ করার আগে হিউম ‘জ্যামাইকাতে একজন প্রতিভাসম্পন্ন বিদ্বান নিগ্রোর’ উপস্থিতির কথা শুনেছেন বলে উল্লেখ করেন, কিন্তু সেই জনশ্রুতির সত্যতার ওপর তার কোনো ভরসা ছিল না। ফলে, এ ব্যাপারে তার ভিত্তিহীন মন্তব্য হলো, “এই লোকটি সম্ভবত যৎসামান্য কোনো অর্জনের জন্যই সেখানে প্রশংসিত হয়ে থাকবে, কোনো টিয়া পাখির মতোই তার অর্জন, যে পাখিটি সহজভাবে কিছু শব্দ আওড়াতে পারে।”৫৩
এখানে উল্লেখযোগ্য যে, কালোদের সম্পর্কে অষ্টাদশ শতকীয় ইউরোপীয় শ্বেতাঙ্গ বুদ্ধিজীবীদের এই বর্ণবাদী দৃষ্টিভঙ্গি বিংশ শতাব্দীর অনেক শ্বেতাঙ্গ বুদ্ধিজীবীদের ভেতরও অপরিবর্তিত থেকেছে। উদাহরণ হিসেবে বিখ্যাত ফরাসি একাডেমির সুবিখ্যাত ফরাসি সাহিত্যিক লুই ফারিওগুল (১৮৮৫-১৯৭২), যিনি জুলস রোমেইন ছদ্মনামেও লিখেছেন, ১৯৫০ সালে প্রকাশিত একটি পুস্তকে দাবি করেছেন, “কৃষ্ণ-জাতটি এখনো কোনো আইনস্টাইন, স্ট্র্যাভিনস্কি বা গ্রেশউইন পয়দা করতে পারেনি, কোনোদিন পারবেও না।”৫৪
একথা সত্য যে, জার্মান বংশোদ্ভূত আমেরিকান নাগরিক আলবার্ট আইনস্টাইন (১৮৭৯-১৯৫৫) একজন অনন্য প্রতিভাবান পদার্থ বিজ্ঞানী ছিলেন, রাশিয়ান বংশোদ্ভূত ফরাসি-আমেরিকান নাগরিক ইগোর স্ট্র্যাভিনস্কি (১৮৮২-১৯৭১) ছিলেন একজন অসাধারণ সংগীত ও সুরস্রষ্টা, আর আমেরিকার জর্জ গ্রেশউইন (১৮৯৮-১৯৩৭) ছিলেন এক মহান সুরকার ও পিয়ানোবাদক। শ্বেতাঙ্গ ইউরোপ এমন আরও অনেক প্রতিভাবান গুণী মানুষ পৃথিবীকে উপহার দিয়েছে। কিন্তু, ‘কালো জাতটি’ কখনো কোনো অসাধারণ বিজ্ঞানী, সংগীতশিল্পী বা সুরস্রষ্টা জন্ম দিতে পারেনি, কস্মিনকালেও পারবে না- এই ধরনের বক্তব্য অত্যন্ত নিকৃষ্টমানের বর্ণবাদী চিন্তারই বহিঃপ্রকাশ মাত্র। কেননা, কয়েকশ’ বছর ধরে বর্ণবাদী শ্বেতাঙ্গ উপনিবেশবাদের নির্মম শিকার হওয়া সত্ত্বেও, বিভিন্ন কৃষ্ণাঙ্গ জনগোষ্ঠী অসংখ্য বিজ্ঞানী, সংগীতশিল্পী ও সুরস্রষ্টা জন্ম দিয়েছে, যারা আপন আপন পরিসরে অনন্য অবদানের মাধ্যমে পৃথিবীকে সমৃদ্ধ করেছেন।
বিশ্ববিখ্যাত কালো বিজ্ঞানীদের কথা উঠলে প্রথমেই মার্কিন কৃষিবিদ ও পরিবেশ বিজ্ঞানী জর্জ ডব্লিউ. কার্ভারের (১৮৬৪-১৯৪৩) কথা ওঠে, যিনি জমিতে একই ফসল বারংবার চাষের ফলে হ্রাসকৃত মাটির উর্বরতা পুনরুদ্ধারের পদ্ধতি আবিষ্কার করে কৃষি ব্যবস্থার প্রভূত উন্নয়নসহ লক্ষ লক্ষ কৃষকের ফসলবৈচিত্র্য ও জীবনমান বৃদ্ধিতে মৌলিক অবদান রেখেছেন। আবার, কৃষ্ণাঙ্গ মার্কিন মহাকাশ বিজ্ঞানী ক্যাথরিন জনসন (১৯১৮-২০২০) ছিলেন একজন অসাধারণ গণিতজ্ঞ, যিনি অংক কষে মহাশূন্যে প্রথম মানুষবাহী আমেরিকান নভোযান উৎক্ষেপণ ও চাঁদে অবতরণের পথরেখা নির্ণয় করেছিলেন। তাছাড়া, গ্ল্যাডিস ওয়েস্ট (১৯৩০-২০২৬) নাম্নী একজন কালো আমেরিকান পদার্থবিজ্ঞানী গোটা পৃথিবীর নিখুঁত গাণিতিক মডেল তৈরি করে অত্যাধুনিক গ্লোবাল পজিশনিং সিস্টেম (জিপিএস) প্রযুক্তির ভিত্তি নির্মাণ করেন।
সংগীতের ক্ষেত্রে, এই ‘কালো জাতটা’ ল্যুই ড্যনিয়েল আর্মস্ট্রং থেকে মাইকেল জ্যাকসন পর্যন্ত অসাধারণ প্রতিভাবান অসংখ্য শিল্পীর জন্ম দিয়েছে, যারা সংগীতের জগতে নতুন নতুন ঘরানার সৃষ্টি করে জগৎ বিখ্যাত হয়ে রয়েছেন। কণ্ঠশিল্পী ও ভেরী বাদক হিসেবে খ্যাতিমান লুই আর্মস্ট্রং (১৯০১-১৯৭১) একদা দলবদ্ধভাবে পরিবেশিত লোকায়ত জাজ সংগীতকে ‘ব্যক্তিক অনুভূতি’ প্রকাশের এক অনন্য আধুনিক শিল্পমাধ্যম হিসেবে বিকশিত করে, ১৯৫০ এর দশকে, সংগীত জগতে আন্তর্জাতিক আইকনে পরিণত হয়েছিলেন। রেই চাল্স রবিনসন (১৯৩০-২০০৪) ছিলেন এক অসাধারণ সৃষ্টিশীল কণ্ঠশিল্পী, গীতিকার, সুরস্রষ্টা ও পিয়ানোবাদক- যিনি তার সমসাময়িক সংগীত জগতে অত্যন্ত প্রভাবশালী সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে বিবেচিত ছিলেন। আবার একাধারে অসাধারণ কণ্ঠশিল্পী, গীতিকার ও গীটার বাদক হিসেবে বিশ্ব জোড়া খ্যাতিমান রবার্ট নেষ্টা মারলে (১৯৪৫-১৯৮১), যিনি পৃথিবীর সংগীত জগতে বব মারলে নামে সমধিক খ্যাত ছিলেন, তিনি বিশ্বসংগীতে ‘রেগে’ নামক সংগীতের একটি নতুন ধারার প্রবর্তনে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। আর মাইকেল জ্যাকসন (১৯৫৮-২০০৯), যিনি আধুনিক ‘পপ সংগীতের রাজা’ হিসেবে বিশ্বব্যাপী সম্মান কুড়িয়েছিলেন, তিনি কণ্ঠ, সুর, সংগীত ও নৃত্যের অপূর্ব সমন্বয় সাধনের মাধ্যমে, বিংশ শতাব্দীর একজন অন্যতম প্রধান সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে জগৎজোড়া প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলেন। ওদিকে, বিশ্বজোড়া খ্যাতিমান চিরায়ত পিয়ানোবাদকের কথা উঠলে সংগীতের ইতিহাস সম্পর্কে সাধারণ ধারণা আছে, এমন ব্যক্তি মাত্রই জন্মান্ধ থমাস উইগিনসের (১৮৪৯-১৯০৮) নাম উচ্চারণ করতে বাধ্য। এসব মহান পুরুষ শিল্পীদের পাশাপাশি, এই ‘কালো জাতটি’ অসাধারণ সব নারী শিল্পীও জগৎকে উপহার দিয়েছে- বিলি হলিডে (১৯১৫-১৯৫৯), এলা ফিটজারেল্ড (১৯১৭-১৯৯৬), টিনা টারনার (১৯৩৯-২০২৩), আরেথা ফ্রাঙ্কলিন (১৯৪২-২০১৮), হুইনি হিউসটন (১৯৬৩-২০১২) যাদের মধ্যে অন্যতম।
লক্ষণীয় যে, উপরোক্ত খ্যাতিমান কৃষ্ণাঙ্গ বিজ্ঞানী ও শিল্পীদের অধিকাংশই ল্যুই ফারিওগুলের জীবদ্দশাতেই আপন আপন ক্ষেত্রে অনন্য অবদান রেখেছেন, অথচ শ্বেতাঙ্গ ফারিওগুল তাদের অবদানকে ধর্তব্যের মধ্যেই গণ্য করেন নি- যা তার বর্ণবাদী বুদ্ধিবৃত্তিক অন্ধত্ব দিয়েই কেবল ব্যাখ্যা করা সম্ভব।
যাই হোক, আমরা এবার অসাধারণ প্রতিভাধর ইউরোপীয় ‘এনলাইটেনমেন্ট দার্শনিকদের’ বর্ণবাদী দৃষ্টিভঙ্গির আলোচনায় ফিরে আসি। ডেভিড হিউমের পর, ইউরোপের আরেক অষ্টাদশ শতকীয় প্রভাবশালী দার্শনিক, ইম্যানুয়েল কান্ট (১৭২৪-১৮০৪), যিনি ‘যুক্তি’র প্রকার, প্রকরণ ও তার ক্রিয়াশীলতার পদ্ধতি বিশ্লেষণ করে পশ্চিমা দর্শনে অনন্য অবদান রেখেছেন, যাকে নৈতিকতার দার্শনিক হিসেবে গোটা পশ্চিমা দুনিয়া সম্মান করে, তিনি কালো আফ্রিকাকে হেয় করার জন্য তার অবজারভেশনস অন দ্য বিউটিফুল অ্যান্ড সাবলাইম গ্রহভুক্ত দ্য ডিফারেন্স বিটুইন দ্য রেইসেস প্রবন্ধে হিউমের উপরোল্লিখিত অনুচ্ছেদটি উদ্ধৃত ও সমর্থন করে, সেই অনুচ্ছেদের আগে ও পরে দু’টি আফ্রিকা-বিদ্বেষী অযৌক্তিক ও অনৈতিক বাক্য যোগ করেছেন। প্রথমটি হলো, “আফ্রিকার নিগ্রোদের মধ্যে প্রকৃতি এমন কোনো অনুভূতি দান করেনি, যা অর্থহীন বোকামোপনার উপরে উঠতে সক্ষম।” আর শেষে সংযুক্ত বাক্যটি হলো, “কালো ও সাদা বর্ণের মানুষদের ভেতরকার পার্থক্য এতই মৌলিক যে, গাত্রবর্ণের মতো তাদের মানসিক সক্ষমতার ভেতরও সেই পার্থক্য বিদ্যমান।”৫৫ অর্থাৎ, এই নৈতিকতার জার্মান দার্শনিকের মতে, আফ্রিকার কালো মানুষেরা প্রকৃতিগতভাবেই ইউরোপের শ্বেতাঙ্গদের তুলনায় নিকৃষ্ট এবং একই কারণে শ্বেতাঙ্গরা বুদ্ধিবৃত্তিকভাবেও কৃষ্ণাঙ্গদের তুলনায় উৎকৃষ্ট!
একই প্রবন্ধে কান্ট মানুষের ত্বকের রং ও ভৌগোলিক অবস্থানের পার্থক্যের ভিত্তিতে গোটা মানবজাতিকে চারটি বর্ণে (জধপব) ভাগ করেছিলেন- সাদা (ইউরোপীয় ), হলুদ (এশীয়), কালো (আফ্রিকান) ও লাল (রেড ইন্ডিয়ান) এবং এই ক্রমানুসারেই তিনি এইসব জনগোষ্ঠীর স্তরানুক্রমিক মানবিক মর্যাদা স্থির করেছিলেন। কান্টের বিবেচনায় আফ্রিকার জনগণ তৃতীয় স্তরভুক্ত মানুষ।
কান্ট মনে করতেন, আফ্রিকার এই কালোদের কেবল ‘চাকর’ বা দাস হিসেবেই প্রশিক্ষিত করা সম্ভব। এই কালোদের ‘চাকর’ হিসেবে পরিপূর্ণভাবে বশীভূত করার জন্য প্রদেয় প্রশিক্ষণ প্রক্রিয়ায় কান্ট আবার তাদের ওপর শারীরিক নির্যাতনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছেন, আর ‘দক্ষতার সঙ্গে’ সেই নির্যাতন চালানোর জন্য ‘চাবুক ব্যবহার না করে বরং দ্বিখণ্ডিত বাঁশের অমসৃণ কঞ্চি’ ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছেন। কেননা, তাতে ‘মারের চোটে শরীরের ভেতর ক্ষরিত রক্ত নিগ্রোর মোটা চামড়ার ক্ষত দিয়ে বেরিয়ে যাবে’, ফলে, ‘ভেতরে রক্ত জমাট বেঁধে গিয়ে শরীরে পচন ধরার সম্ভাবনা থাকবে না’।৫৬ গাত্রবর্ণের ভিত্তিতে শ্রেণিকৃত মানুষের এই বর্ণবিন্যাস ও স্তরানুক্রম নির্ণয়ের তত্ত্ব কান্ট তার প্রায় ৭০ বছর বয়স পর্যন্ত লালন ও চর্চা করেছিলেন-এবং ৭০তম জন্মদিনের প্রাক্কালে নিজের নির্মিত এই তত্ত্ব থেকে তিনি সরে এসেছিলেন’।৫৭ কিন্তু বুড়ো বয়সে তিনি নিজে এই তত্ত্ব ত্যাগ করলেও, তার লেখার নেতিবাচক প্রভাব বহুকাল সক্রিয় থেকে যায়-আফ্রিকায় ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শাসন-শোষণ ও নিপীড়নের ‘ন্যায্যতা’ জুগিয়ে চলে।
ভারতবর্ষের হিন্দু ধর্মাবলম্বী বিশাল জনগোষ্ঠী সম্পর্কেও কান্ট অত্যন্ত নেতিবাচক মন্তব্য করেছেন। কান্টের মতে, ‘হিন্দুদের পক্ষে সর্বোচ্চ পর্যায়ের শিক্ষা অর্জন করা সম্ভব বটে, তবে তা শুধু শিল্পকলার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য, বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে মোটেও নয়’। কান্ট মনে করতেন, ‘হিন্দুরা অনেক আগে শিক্ষা-দীক্ষার কার্যক্রম শুরু করলেও, তারা সবসময় একই অবস্থায় স্থিত থাকে, কখনোই সামনের দিকে এগোতে পারে না’।
তথ্যসূত্র:
৫২. পুরো প্রবন্ধটির জন্য দেখুন, https://davidhume.org/texts/empl1/nc
৫৩. প্রাগুক্ত
৫৪. [লুই ফারিওগুন] জুলস্ রোমেইনের উদ্ধৃতির জন্য দেখুন, Aimé Césaire, Discourse on Colonialism, p. 51
৫৫. Immanul Kant, ‘The Difference between the Races’, Isaac Kramnic (ed.), The Portable Enlightenment Reader, pp. 637-638
৫৬. Chikwado P. Ejeh, Kant’s Racial Views and the Categorical Imperative. https:// medwinpublishers.com/PhIJ/kants-racial-views-and-the-categorical-imperative.pdf
৫৭. Pauline Kleingeld, ‘Kant’s Second Thoughts on Race’. Also, The Philosophical Quarterly, Vol. 57, No. 229, 2007, PP. 573-592
