এআই বিষয়ে পরাশক্তি হওয়ার উচ্চাকাঙ্ক্ষা যুক্তরাষ্ট্র-চীনের

এআই বিষয়ে পরাশক্তি হওয়ার উচ্চাকাঙ্ক্ষা যুক্তরাষ্ট্র-চীনের

ফন্ট সাইজ:

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই উন্নয়ন প্রতিযোগিতায় মুখোমুখি অবস্থানে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন। দৃশ্যত দুই পক্ষই এআই প্রযুক্তিতে পরাশক্তি হওয়ার উচ্চাকাঙ্ক্ষা পোষণ করে। যুক্তরাষ্ট্র চায় এ প্রযুক্তিতে নিয়ন্ত্রণ বা কর্তৃত্ব থাকবে তার হাতে। এক্ষেত্রে চীন প্রকাশ্যে কিছু না বললেও তারা ভিতরে ভিতরে অনেক দূর এগিয়ে গেছে। এমন প্রেক্ষাপটে বৃহস্পতিবার রাতে যুক্তরাষ্ট্রে মুখোমুখি আলোচনায় বসার কথা যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের। এ বিষয়ে অনলাইন বিবিসিতে সাইবার প্রতিনিধি জো টাইডি এবং বিজনেস রিপোর্টার ওসমন্ড চিয়া একটি দীর্ঘ প্রতিবেদন লিখেছেন। তাতে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প এআই নিয়ে নিজের উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে কাকে দেখেন? যদি এই প্রশ্ন করা হয়, তাহলে দুই বিষয়েই বেশ স্পষ্ট উত্তর হতে পারে চীন। ট্রাম্পের চীনা প্রতিপক্ষ শি জিনপিং অবশ্য এতটা সরাসরি কিছু বলেননি। তবে মনে হচ্ছে, তিনিও একই ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করেন।

চীনবিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান মারকাটর ইনস্টিটিউট ফর চায়না স্টাডিজের রেবেকা আরচেসাতি বলেন, চীন এটিকে খুব স্পষ্টভাবেই একটি প্রতিযোগিতা হিসেবে দেখে। তারা মনে করে, এআইয়ে নেতৃত্ব দেয়া উচিত চীনের। তারা নিজেদের ক্ষমতা সর্বাধিক বাড়ানোর একটি হাতিয়ার হিসেবে এআইকে দেখে। শুধু কথাবার্তার বাইরে তাকালেও এর প্রমাণ পাওয়া যায়। শি প্রকাশ্যে বিষয়টি যতটা গুরুত্ব দিয়েই বলুন বা না বলুন, এক দশকেরও বেশি সময় ধরে চীনের প্রযুক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষার অন্যতম ভিত্তি হয়ে আছে এআই। ট্রাম্পের ক্ষেত্রে এআই ইস্যুতে চীনকে পেছনে ফেলে আধিপত্য অর্জন করাকে প্রযুক্তিটির মানবজাতির জন্য সম্ভাব্য ঝুঁকির চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হয়। তিনি এসব ঝুঁকিকে ‘প্রতারণা’ বলে বর্ণনা করেছেন।

চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সতর্ক করে বলেছে, ‘হুমকির ধরন’ এবং সংঘাত বিশ্বব্যাপী এআই ব্যবস্থাপনায় বাধা সৃষ্টি করে। সবার উপকার নিশ্চিত করতে সহযোগিতার আহ্বান জানিয়েছে তারা। এর ফলে বৃহস্পতিবার দুই প্রেসিডেন্ট যখন বৈঠকে বসেন, তখন তাদের এআই সংক্রান্ত উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং এ বিষয়ে তারা কী বলেন ও কী সিদ্ধান্ত নেন, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় খুব বেশি থাকবে না। আর তাদের সিদ্ধান্তের প্রভাব পড়তে পারে পুরো বিশ্বেই। কারণ, এখন বিশ্ব ব্যবস্থায় বিশাল অংশ দখল করে আছে এআই প্রযুক্তি। এমনকি আদালতের রায় এআই দিয়ে লেখা হবে কিনা, তা নিয়েও আছে বিতর্ক।

এআইয়ের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন যে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় দুই শক্তি, তা নিয়ে সন্দেহ নেই। তবে কে এগিয়ে রয়েছে, তা নির্ভর করে সাফল্য কীভাবে পরিমাপ করা হচ্ছে তার ওপর। তথাকথিত ‘ফ্রন্টিয়ার মডেল’-এর ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলো এগিয়ে। অধিকাংশ বেঞ্চমার্কে সবচেয়ে বেশি সক্ষমতার মডেলগুলো তৈরি করেছে অ্যানথ্রপিক, গুগল ও ওপেনএআইয়ের মতো প্রতিষ্ঠান। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে চীনের ডিপসিকের একটি এআই মডেল ‘অল্প সময়ের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ মডেলের সমকক্ষ হয়ে ওঠে। আর ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত অ্যানথ্রপিকের শীর্ষ মডেল মাত্র ২ দশমিক ৭ শতাংশ ব্যবধানে সবার চেয়ে এগিয়ে ছিল বলে স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির গবেষকরা জানিয়েছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের এই সুবিধার একটি কারণ হলো শীর্ষস্থানীয় এআই কোম্পানিগুলোতে বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগ। নতুন মডেল প্রশিক্ষণের অবকাঠামো তৈরিতে ফ্রন্টিয়ার ল্যাবগুলো বিপুল অর্থ ব্যয় করছে। শেয়ারবাজারে ব্যাপক উত্থান চলছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির সম্প্রসারণের বড় একটি অংশ নির্ভর করছে এআই কোম্পানিগুলোর বিপুল প্রবৃদ্ধি ও ভবিষ্যৎ মুনাফার সম্ভাবনার ওপর। এ কারণেই হয়তো প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের সাফল্যের জন্য এআইকে এতটা গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন।

আরেকটি বিষয় চীনের সক্ষমতাকে সীমিত করছে। যুক্তরাষ্ট্র সরকার দেশটির কোম্পানিগুলোর ওপর ব্যাপক বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। ফলে তারা চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে উন্নত মাইক্রোচিপ বিক্রি করতে পারে না। অত্যাধুনিক এআই মডেল তৈরিতে এসব চিপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চিপের ওপর বিধিনিষেধ থাকা সত্ত্বেও দুই দেশেই প্রায় প্রতি মাসে নতুন নতুন এআই মডেল আসছে। তবে এআই প্রতিযোগিতায় ‘জয়ী হওয়া’ আসলে কী বোঝায়, কিংবা এই প্রতিযোগিতার আদৌ কোনো শেষ সীমা আছে কি না, তা স্পষ্ট নয়। অনেক কোম্পানি কৃত্রিম সাধারণ বুদ্ধিমত্তা বা এজিআই তৈরির প্রতিযোগিতায় রয়েছে। এটি এআইয়ের একটি তাত্ত্বিক রূপ, যা মানুষের সমপর্যায়ে বা তার চেয়েও বেশি দক্ষতায় শিখতে, যুক্তি প্রয়োগ করতে এবং বিস্তৃত ধরনের কাজ করতে সক্ষম হবে।

এ পর্যন্ত চীনের এআই শিল্প মূলত ফ্রন্টিয়ার মডেল তৈরির বদলে তথাকথিত ‘ওপেন-ওয়েট মডেল’ প্রকাশের দিকে বেশি মনোযোগ দিয়েছে। এসব মডেল ডাউনলোড করে প্রয়োজন অনুযায়ী পরিবর্তন করা যায়, অনেকটা ওপেন-সোর্স সফটওয়্যারের মতো। এর বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্রের অনেক প্রতিষ্ঠান মূলত নিজস্ব মালিকানাধীন মডেলের ওপর গুরুত্ব দেয়, যেগুলো পেইড সাবস্ক্রিপশন বা কোম্পানির প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ব্যবহার করতে হয়। চীনের ওপেন-ওয়েট মডেলগুলো দ্রুতগতিতে প্রকাশ করা হচ্ছে। বিভিন্ন বেঞ্চমার্কে দেখা যাচ্ছে, দেশটির শীর্ষ মডেলগুলো সক্ষমতার দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিদ্বন্দ্বী মডেলগুলোর চেয়ে মাত্র কয়েক মাস পিছিয়ে। মুনশট এআইয়ের কিমি কে৩-এর মতো মডেল চীন ও বিদেশে জনপ্রিয় হয়েছে। কারণ এসব মডেলের সক্ষমতা ফ্রন্টিয়ার মডেলের কাছাকাছি হলেও এগুলো বিনামূল্যে ডাউনলোড ও প্রয়োজন অনুযায়ী পরিবর্তন করা যায়।

এশিয়া সোসাইটি পলিসি ইনস্টিটিউটের চীনবিষয়ক বিশ্লেষক লিজি লি বলেন, বেইজিংয়ের মূল লক্ষ্য হচ্ছে দেশটির অর্থনীতিজুড়ে এআই প্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহার নিশ্চিত করা। তিনি বলেন, এআই কোনো চাঁদে অবতরণের বিষয় নয়। যুক্তরাষ্ট্র ফ্রন্টিয়ারে নেতৃত্ব দিতে পারে। কিন্তু সক্ষম এআইকে সস্তা, উন্মুক্ত এবং সর্বব্যাপী করে তোলার মাধ্যমে চীন বিপুল অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক প্রভাব অর্জন করতে পারে। এআই ব্যবহারে বিপুল পরিমাণ জ্বালানির প্রয়োজন হয়।

এ ক্ষেত্রেও চীন বেশ সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে বলে বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসের ‘টেক লাইফ’কে রেবেকা আরচেসাতি জানিয়েছেন। তিনি বলেন, চীনের এআই কোম্পানিগুলো অনেক কম খরচে প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ পেতে পারে। আর এটি সত্যিই একটি সুবিধা। রোবোটিকসের ক্ষেত্রেও- যা এআইয়ের এমন একটি শাখা, যেটিকে কেউ কেউ বিশ্ব পরিবর্তনকারী প্রযুক্তি হিসেবে মনে করেন, চীন বিশ্বের সবচেয়ে বড় রোবট প্রস্তুতকারক দেশে পরিণত হয়েছে। ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব রোবোটিকসের হিসাব অনুযায়ী, দেশটির কারখানাগুলোতে ২০ লাখের বেশি রোবট কাজ করছে। চীন বিশ্বের সবচেয়ে বড় হিউম্যানয়েড রোবট প্রস্তুতকারক দেশও। স্বাধীন নীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠান চ্যাথাম হাউসের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথমার্ধে বিশ্বব্যাপী হিউম্যানয়েড রোবট সরবরাহের ৯০ শতাংশের বেশি এসেছে চীন থেকে।

প্রযুক্তিবিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ওমডিয়ার বিশ্লেষক লিয়ান জে সু বলেন, উন্নত মার্কিন চিপের সংকট সত্ত্বেও চীনের এআই নির্মাতারা অসাধারণ দৃঢ়তা ও উদ্ভাবনী সক্ষমতা দেখিয়েছে। তবে মার্কিন কর্মকর্তা ও এআই কোম্পানিগুলো অভিযোগ করেছে, চীনা নির্মাতারা ‘ডিস্টিলেশন’ নামের একটি প্রযুক্তি ব্যবহার করে ব্যবধান কমিয়েছে। এই কৌশলের মাধ্যমে অপেক্ষাকৃত উন্নত প্ল্যাটফর্ম থেকে মডেল শেখার সুযোগ পাওয়া যায়। জবাবে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, দেশটির এআই উন্নয়ন ‘ব্যাপক পরামর্শ এবং অভিন্ন কল্যাণের জন্য যৌথ অবদান’-এর দৃষ্টিভঙ্গি দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে।

চীন ও যুক্তরাষ্ট্র তীব্র প্রতিযোগিতায় থাকলেও এআইয়ের নিরাপত্তা নিয়ে দুই দেশের সরকারের দৃষ্টিভঙ্গিতে বড় পার্থক্য রয়েছে। এআই মানবজাতির অস্তিত্বের জন্য হুমকি তৈরি করতে পারে বলে শিল্পটির কিছু বিশেষজ্ঞ সম্প্রতি সতর্ক করেছেন। তবে চীনা গবেষকরা এ নিয়ে তুলনামূলকভাবে কম উদ্বিগ্ন বলে মনে হচ্ছে। তারা বরং এআইয়ের অপব্যবহার এবং সাইবার যুদ্ধের সম্ভাবনা নিয়ে বেশি চিন্তিত। এআই নিয়ে উদ্বেগের জবাবে ট্রাম্প বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রে ইতিমধ্যে পর্যাপ্ত নিয়মকানুন রয়েছে। তার মতে, এআইয়ের প্রয়োজনীয় একমাত্র নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা হলো একজন ‘উচ্চ আইকিউসম্পন্ন’ প্রেসিডেন্ট।

চলতি সপ্তাহে ট্রাম্প বলেন, আমরা এখন চীনের চেয়ে অনেক এগিয়ে রয়েছি। অন্য সবার চেয়েও এগিয়ে আছি এবং আমরা এই অবস্থান ধরে রাখব। তিনি আরও বলেন, শিল্পবিপ্লবের চেয়েও বড় হয়ে উঠতে পারে এমন কোনো প্রযুক্তির বিকাশকে যুক্তরাষ্ট্র ‘দমিয়ে রাখবে না’। সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান চেক পয়েন্ট সফটওয়্যার টেকনোলজিসের তথ্য নিরাপত্তা কর্মকর্তা জয়ন্ত ডেভ বলেন, মার্কিন ল্যাবগুলোকে এগিয়ে রাখতে ওয়াশিংটন উদ্ভাবনকে অগ্রাধিকার দিয়েছে এবং নিয়ন্ত্রণ কমানোর চেষ্টা করেছে। বেইজিং যুক্তরাষ্ট্রের এই তুলনামূলক নিয়ন্ত্রণমুক্ত পদ্ধতির চেয়ে ভিন্ন কৌশল নিয়েছে। শি দেশটির নেতাদের এআইয়ের ঝুঁকির ওপর ঘনিষ্ঠ নজর রাখতে এবং প্রযুক্তিটি যেন সবসময় ‘মানুষের নিয়ন্ত্রণে’ থাকে তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন।