জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন

মুনাফা থেকে লোকসানে বিপিসি

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন

ফন্ট সাইজ:

দেশে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধিতে সর্বত্র এর প্রভাব পড়েছে। দাম বাড়ানোর প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) লোকসানের যে দাবি করেছে তাও ভোক্তাদের সংগঠন ক্যাব’র কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। উচ্চ শুল্ক করে ছাড়ের বিকল্প পথ না খুঁজে দাম বাড়ানোর সহজ রাস্তা বেছে নেয়ারও সমালোচনা করেছেন খাত সংশ্লিষ্টরা।

জ্বালানি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ-আগস্ট পর্যন্ত ছয় মাসে বিপিসি’র লোকসান হয়েছে প্রায় ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। আন্তর্জাতিক বাজারের বর্তমান দরের সঙ্গে পুরোপুরি সমন্বয় করা হলে ডিজেলের মূল্য লিটার প্রতি প্রায় ২০৫ টাকা হওয়ার কথা। তবে সাধারণ মানুষ, গণপরিবহন এবং সেচনির্ভর কৃষকের আর্থিক সক্ষমতার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সরকার এর চেয়ে অনেক কম দামে ডিজেল সরবরাহ করছে। ফলে মূল্য সমন্বয়ের পরও প্রতি লিটার ডিজেলে সরকারের পক্ষ থেকে প্রায় ৭০ টাকা ভর্তুকি দিতে হচ্ছে।

কনজ্যুমারস এসোশিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)-এর জ্বালানিবিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম জ্বালানির দাম বাড়ানো প্রসঙ্গে মানবজমিনকে বলেন, জ্বালানি তেলের দাম নির্ধারণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনে (বিইআরসি) কোনো গণশুনানি হয়নি। ভোক্তারা যাচাই-বাছাই করার সুযোগ পায়নি। বিপিএস তারা একটি পক্ষ হিসেবে দাম নির্ধারণ করে দিয়েছে, যা গ্রহণযোগ্য নয়। তারা ব্যবসা করছে। দাম বৃদ্ধির ক্ষেত্রে আইনানুগ প্রক্রিয়া অনুসরণ করেনি। তাই তারা টাকার অঙ্ক যাই বলুক, এটা গ্রহণযোগ্য না। আইন ও সংবিধান লঙ্ঘন করেছে।

জ্বালানি বিভাগের হিসাবে, বাংলাদেশে বছরে প্রায় ৭০ লাখ টন জ্বালানি তেল আমদানি হয়, যার মধ্যে ডিজেল প্রায় ৪৫ লাখ টন। আন্তর্জাতিক বাজারের বর্তমান দরের সঙ্গে দেশের বাজারের দামের বড় ব্যবধান বিপিসি’র আর্থিক চাপ আরও বাড়িয়ে তুলছিল। মূল্য সমন্বয় না করা হলে শুধু ডিজেলেই বার্ষিক লোকসান প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারতো।

বিপিসি’র চেয়ারম্যান ড. মো. রফিকুল ইসলাম মানবজমিনকে বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং জাহাজ ভাড়া বহুগুণ বেড়ে যাওয়ায় বাধ্য হয়েই দেশে তেলের মূল্য সমন্বয় করতে হয়েছে। চেয়ারম্যান জানান, গত ছয় মাসে বিপিসি’র মোট লোকসানের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৩ হাজার কোটি টাকা। লোকসানের এই ধারা অব্যাহত থাকলে দেশের জ্বালানি খাতের ওপর তৈরি হতো মারাত্মক সংকট। রফিকুল ইসলাম বলেন, তেলের মূল দামের পাশাপাশি এটি হ্যান্ডেলিংয়ের খরচ অভূতপূর্ব হারে বেড়েছে। আগে যেখানে জাহাজ ভাড়া ছিল ৩ থেকে ৪ ডলার, তা বেড়ে ১৫ থেকে ১৭ ডলারে দাঁড়িয়েছে। ফলে সমন্বয় না করে বিদ্যমান অবস্থান ধরে রাখলে বিপিসি’র প্রতি মাসে গড়ে ৩ হাজার ৮০০ থেকে ৪ হাজার কোটি টাকা লোকসান দিতে হতো। তিনি জানান, জ্বালানি তেল আমদামিতে কখনো ট্যারিফ ভেল্যু বা কখনো ইনভয়েজ ভেল্যুর ওপর ৩০ শতাংশ বা ৩৫ শতাংশ আমদানি শুল্ক-কর দিতে হয়।

উচ্চ শুল্ককরে ছাড় না দিয়ে বাড়ানো হয় দাম: বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) লোকসান ও ভর্তুকির চাপ কমানোর চেষ্টা করছে সরকার। অথচ তথ্য বলছে, গত এক দশকে জ্বালানি তেল বিক্রি করে ৫৫ হাজার কোটি টাকার বেশি নিট মুনাফা করে প্রায় ৩৪ হাজার কোটি টাকা সরকারি কোষাগারে দিয়েছে বিপিসি। এরপরেও ভর্তুকি চাইছে বিপিসি। এখন সেই লোকসান কমানোর নামে বাড়ানো হয়েছে জ্বালানির দাম।

এদিকে আমদানি পর্যায়ে একক পণ্য হিসেবে সরকারের সবচেয়ে বেশি আয় আসে ডিজেল থেকে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) হিসাবে, গত অর্থবছরে শুধু ডিজেল আমদানিতেই বিপিসি সরকারকে ১১ হাজার ২২৮ কোটি টাকা শুল্ককর দিয়েছে। এনবিআর তথ্য বলছে, ডিজেল, পেট্রোল ও অকটেনে বর্তমানে প্রায় ৩১.৮৫ শতাংশ শুল্ককরসহ প্রায় ৩৩ টাকা পায় সরকার।

অর্থনীতি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্তমানে বাংলাদেশের রাজস্ব আদায় কম হওয়ায় সরকার দীর্ঘ সময় বড় ধরনের ভর্তুকি দেয়ার অবস্থায় নেই। উচ্চ শুল্ককর কমানোর মতো বিকল্প নিয়েও ভাবতে পারতো সরকার।
বিপিসি’র হিসাবে, ২০১৬-১৭ থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছর পর্যন্ত ১০ বছরে জ্বালানি তেল আমদানিতে শুল্ককর বাবদ সরকারকে প্রায় ১ লাখ ১৯ হাজার ৫০০ কোটি টাকা দিয়েছে সংস্থাটি। এই শুল্ককর দেয়ার পরও দীর্ঘ সময় মুনাফায় ছিল বিপিসি। ২০১৪-১৫ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত নিরীক্ষিত হিসাবে মাত্র ১ বছর লোকসান হয়েছে সংস্থাটির। সেই লোকসান বাদ দিয়ে বাকি ১০ বছরে সংস্থাটির নিট মুনাফা টিকেছে ৫৩ হাজার ১৩২ কোটি টাকা। ১০ বছরের শুল্ককর ও মুনাফার দুই অঙ্ক যোগ করলে পরিমাণ দাঁড়ায় ১ লাখ ৭২ হাজার ৬৩২ কোটি টাকা। এই অর্থ এসেছে ভোক্তার কাছে জ্বালানি বিক্রির আয় থেকে।

এদিকে বিপিসি’র নিরীক্ষিত হিসাব অনুযায়ী, ২০১৪-১৫ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের মধ্যে শুধু ২০২১-২২ অর্থবছরে সংস্থাটি ২ হাজার ৭০৫ কোটি টাকা লোকসান করেছে। অন্য বছরগুলোতে মুনাফা হয়েছে। বিপিসি একইসঙ্গে জ্বালানি তেলের উপর শুল্ক কমানোর প্রস্তাব দিয়েছিল। কিন্তু সরকার শুল্ক কমানোর পরিবর্তে দাম বাড়ানোর পথ বেছে নিয়েছে।
এনবিআর তথ্য অনুযায়ী, ডিজেল, পেট্রোল ও অকটেনে বর্তমানে প্রায় ৩১.৮৫ শতাংশ শুল্ককর রয়েছে। এর মধ্যে আমদানি শুল্ক ৬ শতাংশ, ভ্যাট ১৫ শতাংশ, অগ্রিম আয়কর ২ শতাংশ এবং অগ্রিম কর সাড়ে ৭ শতাংশ। এর বাইরে বিতরণ পর্যায়েও রয়েছে ২.১৫ শতাংশ ভ্যাট এবং ইনভয়েস ভ্যালুর উপর লিটারপ্রতি ১ টাকা শুল্ক।

এনবিআরের তথ্য বলছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জ্বালানি তেল থেকে সরকারের রাজস্ব ছিল প্রায় ১০ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৩ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরে রাজস্ব বেড়েছে প্রায় ৩ হাজার ১০০ কোটি টাকা বা প্রায় ২৯ শতাংশ। এদিকে চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে জ্বালানি তেল ও এলপিজি থেকে প্রায় ৩ হাজার ৮০০ কোটি টাকা রাজস্ব এসেছে। আগের বছরের একই সময়ে যা ছিল প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ জ্বালানির দাম ও আমদানি মূল্য বাড়ার সঙ্গে সরকারের রাজস্ব আদায়ের প্রবণতাও বেড়েছে। অন্যান্য জ্বালানি তেলে শুল্ককর আরও বেশি। এর মধ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত ফার্নেস অয়েলে শুল্ককর ৩৬.৭৫ শতাংশ এবং অন্যান্য জ্বালানিতে ৬১.২৫ শতাংশ।

সদ্যবিদায়ী অর্থবছরেও লোকসান হয়েছে বলে জানিয়েছে বিপিসি, যদিও নিরীক্ষিত হিসাব এখনো প্রকাশিত হয়নি। সংস্থাটির প্রাথমিক হিসাবে, মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত আন্তর্জাতিক বাজারে উচ্চমূল্যে তেল কিনে দেশে নিয়ন্ত্রিত দামে বিক্রি করায় প্রায় ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি টাকার ঘাটতি হয়েছে।
সিপিডি’র গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, বিপিসি’র মুনাফার বড় অংশ সরকারি কোষাগারে নেয়া হয়েছে। কিন্তু সংকটের সময়ে তার একটি অংশ ফেরত দেয়া দরকার ছিল। এতে ভোক্তার ওপর চাপ কমানো যেতো। কারণ, জ্বালানির দাম বাড়লে উৎপাদন, কৃষি ও পণ্য পরিবহনের খরচ বেড়ে শেষ পর্যন্ত চাপ পড়ে ভোক্তার ওপর।

সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, দাম বাড়ানোর ফলে বিপিসি’র লোকসান কমবে। প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান জানিয়েছেন, প্রতি লিটার জ্বালানির দাম ২০ টাকা বাড়ানোর ফলে বছরে সরকারের ভর্তুকির চাপ প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা কমতে পারে।
এদিকে জাতীয় এ সংকটের মধ্যেও বিপিসি’র গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে সাম্প্রতিক সময়ে দেশে আলোচিত সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের অধীনে থাকা পাঁচ ব্যাংক। দুই বছর ধরে ব্যাংকগুলোতে আটকে আছে বিপিসি’র সাড়ে ১৩শ’ কোটি টাকার বেশি তহবিল।

তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকে ১৩শ’ ৫৫ কোটি টাকার মতো তহবিল অবরুদ্ধ রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের ৭৫৩ কোটি টাকা। পাশাপাশি ইউনিয়ন ব্যাংকে ২২৭ কোটি টাকা, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকে ২০৯ কোটি টাকা, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকে ১০ কোটি টাকা ও এক্সিম ব্যাংকে ১৫৭ কোটি টাকা রয়েছে। এর বাইরে বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকে প্রায় ২২ কোটি, ন্যাশনাল ব্যাংকে ১৪৮ কোটি টাকা, আইসিবি ইসলামী ব্যাংকে ১৩৩ কোটি টাকা এবং ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের কাছে অবরুদ্ধ রয়েছে ২২৯ কোটি টাকা।