হঠাৎ করে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয়ে। পরিবহন ভাড়া বাড়ানো হয়েছে। পরিবহন ভাড়া ভাড়ায় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামে এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। জ্বালানির দাম বাড়ায় উৎপাদন খাতে নতুন হিসাবনিকাশ শুরু হয়েছে। খাদ্যপণ্য উৎপাদন করে এমন প্রতিষ্ঠান উৎপাদিত পণ্যের দাম নিয়ে ভাবছে।
এর আগে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোয় বেশির ভাগ গ্রাহকেরই মাসের ব্যয়ে বাড়তি খরচ যুক্ত হয়। দাম বাড়লেও লোডশেডিং এর কারণে ভোগান্তি রয়েছে। এ ছাড়া মাঝে গ্যাস সংকট বাড়ায় অনেক গ্রাহককে রান্নার জন্যও বাড়তি খরচ করতে হয়েছে। এই অবস্থার মধ্যেই জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোয় সাধারণ মানুষের জন্য নতুন চাপ তৈরি হয়েছে। সাধারণ মোটর বাইকে করে যারা কর্মস্থলে যান বা শেয়ার রাইডে উপার্জন করে চলেন এমন মানুষজনও বিপাকে পড়েছেন। তাদের জ্বালানি খরচ অনেক বেড়ে গেছে। কয়েকটি পাম্পে অবস্থান করে দেখা গেছে জ্বালানি নিতে আসা লোকজনের কেউ কেউ আগের বাজেট ঠিক রেখে আগের চেয়ে কম জ্বালানি নিচ্ছেন।
পণ্য পরিবহনের বাড়তি ব্যয়ের চাপ পাইকারি বিক্রেতাদের ওপর পড়লেও ওই চাপ গিয়ে ঠেকছে খুচরা বাজারে। গতকাল রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে পাইকারি ও খুচরা পণ্যের দোকান ঘুরে নিত্যপণ্যের বাজার দরের ঊর্ধমুখিতা দেখা গেছে। বিভিন্ন সবজির দাম ইতিমধ্যেই বেড়ে গেছে। দু’একদিনের মধ্যে সব রকমের পণ্যের দাম বাড়বে বলে জানিয়েছেন বিক্রেতারা।
ওদিকে বাস ও লঞ্চের ভাড়া বাড়ানো হয়েছে। গতকাল এই ভাড়া বাড়ানোর প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। এখন থেকে এই দুই গণ পরিবহনে বাড়তি ভাড়া গুনতে হবে যাত্রীদের। যা মানুষের প্রতিদিনের ব্যয়ে নতুন বোঝা হিসেবে যুক্ত হবে।
গত ৫ মাসে দুই দফায় জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে। এপ্রিলে বাড়ানো হয়েছিল ১৫ থেকে ২০ টাকা। তখন বাস ভাড়া বেড়েছিল কিলোমিটারে ১১ পয়সা। বেড়েছিল ট্রাক ভাড়াও। এই ৫ মাসে ডিজেলের মূল্য বেড়েছে লিটারে ৩৫ টাকা। ডিজেলের দাম বাড়ার ফলে যাত্রীবাহী বাস, ট্রেন, লঞ্চ, পণ্যবাহী ট্রাক-কাভার্ডভ্যান, জাহাজসহ প্রায় সব যানবাহনেই বেড়ে যায় খরচ। বন্দরসহ দেশের বিভিন্ন রুটে ট্রাক ও কাভার্ডভ্যানের ভাড়া বেড়েছে ২ হাজার থেকে ৮ হাজার টাকা পর্যন্ত। ফলে পণ্য পরিবহনে বাড়তি টাকা গুনতে হচ্ছে ব্যবসায়ীদের। বেনাপোল ও হিলি স্থলবন্দর থেকে ভাড়া কয়েক হাজার টাকা বেড়েছে। চট্টগ্রামে বেসরকারি ইনল্যান্ড কন্টেইনার ডিপোগুলোতে কন্টেইনার হ্যান্ডলিং চার্জ বাড়ানো হয়েছে ৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ। ব্যবসায়ীরা বলছেন, বগুড়া থেকে ঢাকায় একটি ট্রাকের ভাড়া ১৮ থেকে ২০ হাজার টাকা ছিল। এখন আরও ২ থেকে ৩ হাজার টাকা বেশি নেয়া হচ্ছে।
গতকাল দেশের বৃহত্তর কাঁচা তরকারি ও মুদি পণ্যের বাজার- কাওরান বাজারের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ইতিমধ্যেই বেড়ে গেছে কাঁচা তরকারির দাম। বেশ কিছু মুদি পণ্যের দাম বেড়েছে, তবে চালসহ অন্যান্য মুদি পণ্যের বাজারে এখনো পুরোপুরি প্রভাব পড়েনি। কেননা মুদি পণ্যের বেশির ভাগ মালামালই কয়েকদিন আগে অর্থাৎ তেলের দাম বৃদ্ধির আগে সংগ্রহ করা হয়েছে। তবে, প্রতিদিনই আনা-নেয়া হচ্ছে কাঁচা তরকারি। ফলে শাক-সবজি থেকে শুরু করে কাঁচা তরকারির দাম বেড়েছে।
বাজার ঘুরে দেখা গেছে, বর্তমানে প্রতি কেজি শিম বিক্রি হচ্ছে ২০০ টাকায়। আগে এর দাম ছিল ১৬০ থেকে ১৭০ টাকা। অর্থাৎ কেজিতে সর্বোচ্চ ৪০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে শিমের দাম। এ ছাড়া, টমেটো ১০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে, যা আগের দামে ছিল প্রতিকেজি ৮০ থেকে ৯০ টাকা। শসা ৫০ টাকা থেকে বেড়ে ৬০ টাকা, করলা ৬০ থেকে ৭০ টাকা, বেগুন ৮০ থেকে ১০০ টাকা, লাউ ৭০ থেকে ৮০ টাকা প্রতি পিস এবং মূলা ৫০ থেকে ৬০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। পটোলের দাম ৫০ টাকা থেকে বেড়ে ৭০ টাকা, ধুন্দল ৬৫ থেকে ৭০ টাকা, বরবটি ৬০ থেকে ৮০ টাকা এবং ঝিঙা ৬০ থেকে বেড়ে ৭০ টাকা কেজি হয়েছে।
সবজি ব্যবসায়ীরা বলছেন, দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে রাজধানীতে সবজি আনতে ট্রাক ও পিকআপসহ বিভিন্ন পরিবহনের ওপর নির্ভর করতে হয়। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় এসব যানবাহনের ভাড়া বেড়েছে। ফলে আড়ত থেকে খুচরা বাজার পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে বাড়তি পরিবহন ব্যয় যুক্ত হচ্ছে।
কাওরান বাজারের ব্যবসায়ী সবুজ মিয়া বলেন, সবজির দাম সব সময়ই ওঠানামার মধ্যে থাকে। এখন ট্রাকভাড়া বেড়েছে, দামতো স্বভাবতই বাড়বে। ফজলুল মিয়া নামের আরেক ব্যবসায়ী বলেন, জ্বালানির দাম বাড়ার পর সবজি আনতে পরিবহন খরচ বেড়েছে। মোকামে মালের দাম বাড়তি। তাই বাধ্য হয়ে কিছু সবজির দাম বাড়াতে হয়েছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কাওরান বাজারের একজন পাইকারি বিক্রেতা বলেন, আমরা বাধ্য দাম বাড়াতে।
কাওরান বাজারের কিচেন মার্কেটের বিক্রেতারা জানিয়েছেন, চালের দামে এখনও প্রভাব পড়েনি, কারণ আড়তে চালের বস্তা বেশিরভাগই আগে থেকে স্টক করা ছিল। তবে আগামী দু’-একদিনের মধ্যেই বাড়বে চালসহ ভারি মুদিপণ্যের দাম।
বাজার ঘুরে দেখা গেছে, সবচেয়ে বেশি বেড়েছে মরিচের দাম। বিক্রেতারা জানান, দুই প্রকারের শুকনো মরিচের দামের কেজিতে ১০০ টাকা করে বেড়েছে। ২২০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হওয়া মরিচ এখন ৩২০ টাকা, ২৭০ টাকার মরিচ ৩৬০ থেকে ৩৭০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বেড়েছে আটার দামও। বিক্রেতারা জানিয়েছেন, আটা-ময়দার মধ্যে ২ কেজি মোড়কজাত ময়দা ১৩০ টাকা বিক্রি হলেও এখন ১৪০ থেকে ১৫০ টাকা বিক্রি হচ্ছে। আটার দাম প্যাকেটে বেড়েছে ৪০ টাকা। ২ কেজি ওজনের এক প্যাকেট আটা ১৪০ টাকা ছিল; এখন ১৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। কেজিতে দুই ধরনের মসুরের ডালের দাম বেড়েছে ৫ থেকে ৭ টাকা।
সাইফ জেনারেল স্টোরের স্বত্বাধিকারী রাকিব বলেন, দেশে এমনিতেই কোনো কিছুর দাম বাড়লে সেটি আর কমে না। গত বছর কিছুটা স্বস্তি থাকলেও এই বছর দফায় দফায় বাড়ছে দাম। এই বছর নিত্যপণ্যের দাম ১০০ থেকে দেড়শ’ টাকাও বেড়েছে। হাজী ইসমাইল অ্যান্ড সন্সের স্বত্বাধিকারী আরেক বিক্রেতা বলেন, তেলের দাম বাড়লে তো নিত্যপণ্যের দাম বাড়বেই। পরিবহন খরচের এই বাড়তি বোঝা তো ব্যবসায়ীরা তাদের পকেট থেকে দেবে না, অবশ্যই নিত্যপণ্যের উপর দিয়েই উসুল করতে হবে। চালের পাইকারি দোকান বাহার ট্রেডার্সের মো. বাহার মিয়া বলেন, আমার দোকানের সব চালের বস্তা আগে নিয়ে এসেছি। যেহেতু তেলের দাম বাড়িয়েছে দুই থেকে তিনদিন হচ্ছে। যেসব দোকানে পণ্য স্টক আছে সেগুলো দুই-একদিনের মধ্যেই শেষ হয়ে যাবে। নতুন পণ্য এলেই দাম বেড়ে যাবে।
নিত্যপণ্যের বাড়তি দামের ফলে বিপাকে পড়ে গেছেন বিভিন্ন শ্রেণির মানুষ। বিশেষ করে গত কয়েকদিন লোডশেডিংয়ের ফলে পণ্যের বাড়তি দাম, বাসা-বাড়িতে গ্যাসের সংকটের উপর তিন ধরনের তেলের দাম বৃদ্ধিতে ভোগান্তিতে পড়েছেন মানুষজন। মগবাজারের বাসিন্দা আল-মামুন বলেন, আয় বাড়ছে না, কিন্তু দিনের পর দিন নিত্যপণ্যের দাম বাড়ছেই। এরই মধ্যে তেলের দাম বাড়া যেন মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা! মিরপুরের পীরেরবাগের গৃহিণী তাসমিয়াহ আমিন মানবজমিনকে বলেন, দীর্ঘদিন ধরেই গ্যাস আর বিদ্যুতের সংকটে নাকাল অবস্থা। এখন তেলের দাম বাড়ছে, তার মানে প্রায় সব পণ্যের দামই বাড়ছে। আমাদের আয় সীমিত। আয়ের সুযোগও দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে। একজনের আয় দিয়ে সংসার চালানো দুর্বিষহ হয়ে পড়েছে। আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের ভারসাম্য রক্ষা করতে গিয়ে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছি।
এবার বাড়লো লঞ্চ ভাড়া: জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির পর ভাড়া বেড়েছে গণপরিবহনের। এরই ধারাবাহিকতায় লঞ্চের ভাড়া বাড়ানো হয়েছে। প্রথম ১০০ কিলোমিটারের প্রতি কিলোমিটারে ২৩ পয়সা ভাড়া বাড়ানো হয়েছে। এ ছাড়া ১০০ কিলোমিটারের বেশি দূরত্বে ভাড়া বাড়ানো হয়েছে ২০ পয়সা। এ ছাড়া, লঞ্চের সর্বনিম্ন ভাড়া ৩৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। গতকাল বুধবার লঞ্চ মালিকদের সঙ্গে বৈঠকের পর নৌপরিবহন মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম নৌপথের ভাড়া বৃদ্ধির কথা জানান।
এর আগে, গত মঙ্গলবার প্রতি কিলোমিটারে ১৭ পয়সা বাড়ানো হয় বাসের ভাড়া। দূরপাল্লার বাসে প্রতি কিলোমিটারে ভাড়া ২ টাকা ২৩ পয়সা থেকে বেড়ে ২ টাকা ৪০ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে। এ ছাড়া ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরে প্রতি কিলোমিটারে ভাড়া ২ টাকা ৫৩ পয়সা থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ টাকা ৭০ পয়সা। যদিও বিআরটিএ যাত্রীবাহী বাসের ভাড়া দূরপাল্লার পথে কিলোমিটারে ২০ পয়সা এবং নগর পরিবহনে ১৮ পয়সা বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছিল বাস মালিকদের সংগঠনগুলো।
