সাবেক সাত এমপি’র বিরুদ্ধে দুদকের মামলা

সাবেক সাত এমপি’র বিরুদ্ধে দুদকের মামলা

ফন্ট সাইজ:

অবৈধ সম্পদ অর্জন, সম্পদের তথ্য গোপন ও সন্দেহজনক আর্থিক লেনদেনের অভিযোগে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাবেক সাত সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে মামলার অনুমোদন দিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। একইসঙ্গে তাদের স্বজনদের বিরুদ্ধেও পৃথক মামলা অনুমোদন করা হয়েছে। গতকাল দুদকের পক্ষ থেকে এসব তথ্য জানা গেছে। এ বিষয়ে কমিশনের সহকারী পরিচালক মো. তানজির আহমেদ বলেন, সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও সাতক্ষীরা-৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য অধ্যাপক ডা. আ ফ ম রুহুল হক, কুষ্টিয়া-৪ আসনের সাবেক এমপি সেলিম আলতাফ জর্জ, কুষ্টিয়া-১ আসনের সাবেক এমপি মো. রেজাউল হক চৌধুরী ও একই আসনের সাবেক এমপি আবদুর রউফ, হবিগঞ্জ-৩ আসনের সাবেক এমপি মো. আবু জাহির, ফেনী-৩ আসনের সাবেক এমপি হাজী রহম উল্লাহ, লক্ষ্মীপুর-২ আসনের সাবেক এমপি নুর উদ্দিন চৌধুরী নয়নের বিরুদ্ধে মামলা অনুমোদন করা হয়েছে। একইসঙ্গে নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জের সাবেক মেয়র আবদুল কাদের মির্জাসহ আরও কয়েকজন জনপ্রতিনিধি ও তাদের স্বজনের বিরুদ্ধেও মামলা হয়েছে।

সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী অধ্যাপক ডা. আ ফ ম রুহুল হক এবং তার ছেলে জিয়াউল হকের বিরুদ্ধে পৃথক দুটি মামলা করেছে দুদক। আসামিদের বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়ের উৎসের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ সম্পদ অর্জন ও ভোগদখলে রাখা এবং ব্যাংক হিসাবে সন্দেহজনক লেনদেনের অভিযোগ আনা হয়েছে। এজাহারে রুহুল হকের বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়ের উৎসের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ ১৯ কোটি ১৪ লাখ ৭৯ হাজার ২০ টাকার সম্পদ অর্জনের অভিযোগ আনা হয়েছে। পাশাপাশি তার নামে ৩৯টি ব্যাংক হিসাবে মোট ১১৬ কোটি ২০ লাখ ৮৮ হাজার ৬৫৯ টাকার সন্দেহজনক লেনদেনের তথ্য পেয়েছে সংস্থাটি।

অন্যদিকে, জিয়াউল হকের বিরুদ্ধে ৮ কোটি ৫২ লাখ ৮৪ হাজার ৮২০ টাকার জ্ঞাত আয়ের উৎসবহির্ভূত সম্পদ অর্জন ও ভোগদখলে রাখার অভিযোগ করা হয়েছে। তার নামে ১৫টি ব্যাংক হিসাবে মোট ৩৩ কোটি ৮৪ লাখ ৩৫ হাজার ৩১৩ টাকার সন্দেহজনক লেনদেনেরও অভিযোগ রয়েছে।
এজাহারে বলা হয়, রুহুল হক ৮ কোটি ৪৭ লাখ ২৯ হাজার ৮৬২ টাকা মূল্যের স্থাবর এবং ৩০ কোটি ৮৩ লাখ ২৩ হাজার ৭৮৩ টাকা মূল্যের অস্থাবর সম্পদসহ মোট ৩৯ কোটি ৩০ লাখ ৫৩ হাজার ৬৪৫ টাকার সম্পদ অর্জন করেছেন। এ সময়ে তার পারিবারিক ও অন্যান্য ব্যয় পাওয়া গেছে ৫ কোটি ৭২ লাখ ৭২ হাজার ১১২ টাকা। ব্যয়সহ তার নামে প্রাপ্ত নিট সম্পদের পরিমাণ দাঁড়ায় ৪৫ কোটি ৩ লাখ ২৫ হাজার ৭৫৭ টাকা। দুদকের অনুসন্ধানে রুহুল হকের গ্রহণযোগ্য বৈধ আয়ের উৎস পাওয়া গেছে ২৫ কোটি ৮৮ লাখ ৪৬ হাজার ৭৩৭ টাকা। সংস্থাটির হিসাব অনুযায়ী, বৈধ আয়ের তুলনায় তার সম্পদের অসঙ্গতি ১৯ কোটি ১৪ লাখ ৭৯ হাজার ২০ টাকা।

এ ছাড়া দুদকের অভিযোগ, রুহুল হক নিজের নামে থাকা ৩৯টি ব্যাংক হিসাবে ১১৬ কোটি ২০ লাখ ৮৮ হাজার ৬৫৯ টাকার সন্দেহজনক লেনদেন করেছেন। এসব অর্থের হস্তান্তর, রূপান্তর ও স্থানান্তরের মাধ্যমে অর্থের অবস্থান গোপন করে তা বৈধতা দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। অন্য মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, জিয়াউল হক ২ কোটি ৪ লাখ ৫১ হাজার ৪৫০ টাকা মূল্যের স্থাবর এবং ১৭ কোটি ৬৮ লাখ ৮৯ হাজার ৩৯৩ টাকা মূল্যের অস্থাবর সম্পদসহ মোট ১৯ কোটি ৭৩ লাখ ৪০ হাজার ৮৪৩ টাকার সম্পদ অর্জন করেছেন। তার পারিবারিক ও অন্যান্য ব্যয় পাওয়া গেছে ৫ কোটি ৪২ লাখ ৪৯ হাজার ৬১৫ টাকা। ব্যয়সহ তার নামে প্রাপ্ত নিট সম্পদের পরিমাণ ২৫ কোটি ১৫ লাখ ৯২ হাজার ৪৫৮ টাকা। বিপরীতে জিয়াউল হকের গ্রহণযোগ্য বৈধ আয়ের উৎস পাওয়া গেছে ১৬ কোটি ৬৩ লাখ ৫ হাজার ৬৩৮ টাকা। দুদকের হিসাবে, তার জ্ঞাত-আয়ের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ সম্পদের পরিমাণ ৮ কোটি ৫২ লাখ ৮৪ হাজার ৮২০ টাকা। এজাহারে আরও বলা হয়, জিয়াউল হক নিজের নামে থাকা ১৫টি ব্যাংক হিসাবে মোট ৩৩ কোটি ৮৪ লাখ ৩৫ হাজার ৩১৩ টাকার সন্দেহজনক লেনদেন করেছেন। এসব অর্থের হস্তান্তর, রূপান্তর ও স্থানান্তরের মাধ্যমে এর অবস্থান গোপন করে ছদ্মাবরণে বৈধতা দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে দুদক।

দুদকের অভিযোগ অনুযায়ী, কুষ্টিয়া-৪ আসনের সাবেক এমপি সেলিম আলতাফ জর্জের দাখিল করা সম্পদ বিবরণীতে ৬৪ লাখ ৪৮ হাজার ৪৭৮ টাকার সম্পদের তথ্য কম দেখানোর প্রমাণ পাওয়া গেছে। একইসঙ্গে ১ কোটি ১ লাখ ৬৪ হাজার ৩ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন ও ভোগদখলে রাখার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
একই আসনের সাবেক এমপি আবদুর রউফের বিরুদ্ধে ২ কোটি ৬৫ লাখ ১০ হাজার ৬০৫ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ আনা হয়েছে। তার স্ত্রী জান্নাতুন নাহারের বিরুদ্ধেও ১ কোটি ৩৯ লাখ ৯৯ হাজার ২৯২ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে পৃথক মামলা অনুমোদন করেছে দুদক।

কুষ্টিয়া-১ আসনের সাবেক এমপি মো. রেজাউল হক চৌধুরীর বিরুদ্ধে সম্পদ বিবরণীতে ৩৭ লাখ ২৬ হাজার ৬০০ টাকার সম্পদের তথ্য গোপন এবং ২ কোটি ৪৬ লাখ ৯২ হাজার ৫৩৫ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ রয়েছে। তার ছোট ভাই দৌলতপুর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মো. বুলবুল আহমেদ টোকেন চৌধুরীর বিরুদ্ধেও ৩৪ লাখ ১৪ হাজার টাকা সম্পদের তথ্য গোপন এবং ১ কোটি ৭৯ লাখ ৩৫ হাজার ২৬৮ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে মামলা অনুমোদন করা হয়েছে।

সবচেয়ে বড় অঙ্কের অভিযোগগুলোর একটি রয়েছে হবিগঞ্জ-৩ আসনের সাবেক এমপি মো. আবু জাহিরের বিরুদ্ধে। দুদকের হিসাবে, তার সম্পদ বিবরণীতে ৭ কোটি ২৭ লাখ ৩৬ হাজার ৬২৭ টাকার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের তথ্য গোপনের অভিযোগ রয়েছে। পাশাপাশি তার নামে ৯ কোটি ৩২ লাখ ৭১ হাজার ৫৫৯ টাকার জ্ঞাত আয়ের উৎসের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ সম্পদ থাকার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ ছাড়া চারটি ব্যাংক হিসাবে ২২ কোটি ৫৬ লাখ ৩ হাজার ৭৫৬ টাকা স্থানান্তর, হস্তান্তর ও রূপান্তরের অভিযোগও রয়েছে। এসব অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন এবং মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের সংশ্লিষ্ট ধারায় মামলা অনুমোদন করা হয়েছে।

ফেনী-৩ আসনের সাবেক এমপি হাজী রহম উল্লাহ’র বিরুদ্ধে ৩ কোটি ৮৪ লাখ ৪৬ হাজার ৫২১ টাকার জ্ঞাত আয়ের উৎসের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ রয়েছে। এ অভিযোগে দুদক আইনের ২৭(১) ধারায় মামলা অনুমোদন করেছে কমিশন।
লক্ষ্মীপুর-২ আসনের সাবেক এমপি নুর উদ্দিন চৌধুরী নয়নের বিরুদ্ধে ৭৯ লাখ ৯৯ হাজার ৬৪২ টাকার জ্ঞাত আয়ের উৎসের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ রয়েছে। তার স্ত্রী চৌধুরী রুবিনা ইয়াছমিন লুবনার বিরুদ্ধেও ১ কোটি ৮২ লাখ ৫১ হাজার ৫৮৯ টাকার একই ধরনের অভিযোগে পৃথক মামলা অনুমোদন করা হয়েছে।

নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জের সাবেক মেয়র আবদুল কাদের মির্জার বিরুদ্ধেও ১ কোটি ১৯ লাখ ৯৬ হাজার ৯৫০ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে মামলা অনুমোদন করেছে দুদক। তার স্ত্রী আখতার জাহান বকুল এবং ছেলে মির্জা মাসরুর কাদের তাশিকের বিরুদ্ধেও পৃথক মামলা হয়েছে। এ ছাড়া যশোর পৌরসভার সাবেক মেয়র জহিরুল ইসলাম চাকলাদার এবং খুলনা জেলা পরিষদের সাবেক প্রশাসনিক কর্মকর্তা এস এম মাহাবুবুর রহমানের বিরুদ্ধেও সম্পদসংক্রান্ত অভিযোগে মামলা অনুমোদনের তথ্য দিয়েছে দুদক।

নঈম নিজাম ও ফরিদা ইয়াসমিনের বিরুদ্ধে মামলা
এদিকে বাংলাদেশ প্রতিদিনের সাবেক সম্পাদক নঈম নিজাম ও তার স্ত্রী সংরক্ষিত নারী আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ফরিদা ইয়াসমিনের বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন ও মানিলন্ডারিংয়ের অভিযোগে পৃথক দুটি মামলা দায়ের করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। দুদকের তথ্য অনুযায়ী, নঈম নিজাম ২ কোটি ৮ লাখ ৫০ হাজার ১৩৫ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন করে ভোগদখলে রেখেছেন। এ ছাড়া তার স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নামে পরিচালিত ১৯টি ব্যাংক হিসাবে ৩৯ কোটি ৩৯ লাখ ৬১ হাজার ৯১৩ টাকা লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে।
অন্যদিকে, ফরিদা ইয়াসমিন ২ কোটি ৭৪ লাখ ১৩ হাজার ১৮০ টাকা মূল্যের জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন করেছেন বলে দুদকের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। তার স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নামে পরিচালিত ১৭টি ব্যাংক হিসাবে ২১ কোটি ৯ লাখ ৩৪ হাজার ৮১৪ টাকা লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে।

দুদকের অভিযোগ, এসব অর্থ ঘুষ ও দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত এবং অর্থের অবৈধ উৎস গোপন বা আড়াল করার উদ্দেশ্যে তা স্থানান্তর, হস্তান্তর ও রূপান্তর করা হয়েছে। নঈম নিজামের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪-এর ২৭(১) এবং মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২-এর ৪(২) ও ৪(৩) ধারায় মামলা করা হয়েছে। ফরিদা ইয়াসমিনের বিরুদ্ধে একই আইনের পাশাপাশি দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭-এর ৫(২) ধারায় মামলা করা হয়েছে।