বাংলাদেশের কূটনৈতিক ইতিহাসে ২০২৬ সাল এক বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্বের ধারাবাহিকতায় একটি বিরল ও ঐতিহাসিক অধ্যায় সংযোজিত হতে যাচ্ছে। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান প্রেসিডেন্ট হিসেবে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এবং ২০২৬ সালে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে বাংলাদেশের পক্ষে ভাষণ প্রদান করতে যাচ্ছেন। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের ইতিহাসে একই পরিবারের তিনজন সদস্য রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানের দায়িত্বে থেকে বিশ্বের প্রধান বহুপাক্ষিক কূটনৈতিক মঞ্চে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করার একটি উল্লেখযোগ্য নজির তৈরি হচ্ছে। চার দশকেরও বেশি সময়জুড়ে বিস্তৃত এই ধারাবাহিকতা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের প্রতিনিধিত্বের ইতিহাসেও একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ শুধু বিশ্বের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানদের বার্ষিক সমাবেশ নয়; এটি এমন একটি বৈশ্বিক মঞ্চ, যেখানে আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, মানবাধিকার, জলবায়ু পরিবর্তন, দারিদ্র্য, উন্নয়ন, প্রযুক্তি এবং বৈশ্বিক সংকট নিয়ে রাষ্ট্রগুলো তাদের অবস্থান তুলে ধরে। জাতিসংঘে একটি দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানের ভাষণ তাই নিছক আনুষ্ঠানিক বক্তব্য নয়; এর মধ্য দিয়ে সংশ্লিষ্ট দেশের জাতীয় অগ্রাধিকার, আন্তর্জাতিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং বৈশ্বিক ব্যবস্থায় তার অবস্থান প্রকাশ পায়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ স্বাধীনতার পর থেকে দেশের কূটনৈতিক অবস্থান তুলে ধরার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করেছে।
এই ধারাবাহিকতায় শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের জাতিসংঘে উপস্থিতি ছিল বাংলাদেশের কূটনৈতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ১৯৮০ সালের ২৬ আগস্ট জাতিসংঘের একাদশ বিশেষ অধিবেশনে বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট হিসেবে তিনি ভাষণ দেন। জাতিসংঘের সরকারি নথিতে তাঁর বক্তব্য সংরক্ষিত রয়েছে। সে সময় বিশ্ব অর্থনীতি ছিল গভীর অস্থিরতার মধ্যে এবং উন্নত ও উন্নয়নশীল বিশ্বের মধ্যে অর্থনৈতিক বৈষম্য ছিল আন্তর্জাতিক আলোচনার অন্যতম প্রধান বিষয়। জিয়াউর রহমান তাঁর ভাষণে “new international economic order” প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর ন্যায়সংগত অর্থনৈতিক অধিকারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
জিয়াউর রহমানের এই আন্তর্জাতিক অবস্থানের সঙ্গে তাঁর রাষ্ট্রচিন্তারও একটি সুস্পষ্ট যোগসূত্র ছিল। ১৯৭৮ সালে প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে তিনি জাতীয়তাবাদ, স্বনির্ভরতা, উৎপাদন বৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক উন্নয়নকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন। জাতিসংঘের ভাষণেও উন্নয়নশীল দেশগুলোর নিজস্ব সক্ষমতা বৃদ্ধি, সম্পদের কার্যকর ব্যবহার এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার একটি অধিকতর ন্যায়সংগত কাঠামোর প্রয়োজনীয়তা প্রতিফলিত হয়। ফলে তাঁর ভাষণটি শুধু বাংলাদেশের তৎকালীন অর্থনৈতিক বাস্তবতার প্রতিফলন নয়; বরং উন্নয়নশীল বিশ্বের পক্ষে বাংলাদেশের একটি স্বতন্ত্র কূটনৈতিক অবস্থানও তুলে ধরে।
এরপর বাংলাদেশের জাতিসংঘ কূটনীতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় যুক্ত হয় বেগম খালেদা জিয়ার মাধ্যমে। ১৯৯১ সালে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার পর প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাঁর নেতৃত্বে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে গণতন্ত্র, উন্নয়ন, মানবাধিকার ও বহুপাক্ষিক সহযোগিতার প্রশ্ন নতুন গুরুত্ব পায়। ১৯৯৩ সালে জাতিসংঘের ৪৮তম সাধারণ অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাঁর বক্তব্য জাতিসংঘের সরকারি নথিতে সংরক্ষিত রয়েছে। সেই ভাষণে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ গণতান্ত্রিক রূপান্তরের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ন্যায়বিচার, উন্নয়ন ও সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তার বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়। জাতিসংঘের নথিতে তাঁর বক্তব্যের সঙ্গে গণতন্ত্রসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ইস্যুর সংশ্লিষ্টতাও প্রতিফলিত হয়েছে।
বেগম খালেদা জিয়ার জাতিসংঘ কূটনীতির একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য ছিল বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থকে বৃহত্তর বৈশ্বিক এজেন্ডার সঙ্গে সংযুক্ত করা। ১৯৯৫ সালের ২৩ অক্টোবর জাতিসংঘের ৫০তম বার্ষিকী উপলক্ষে অনুষ্ঠিত বিশেষ অধিবেশনে তিনি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বক্তব্য দেন। তাঁর বক্তব্যে জাতিসংঘের ৫০ বছরের অর্জন ও ভবিষ্যৎ ভূমিকা, শান্তি, উন্নয়ন, ন্যায়বিচার এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার পাশাপাশি বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পরিবেশ ও পানি-সম্পর্কিত বিষয়ও স্থান পায়। জাতিসংঘের সরকারি রেকর্ডে ওই অধিবেশনে তাঁকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বক্তৃতাদানকারী হিসেবে নথিভুক্ত করা হয়েছে।
২০০৫ সালে দ্বিতীয়বার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বেগম খালেদা জিয়া আবার জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের মঞ্চে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন। ১৭ সেপ্টেম্বর ২০০৫-এ ৬০তম সাধারণ অধিবেশনের সাধারণ বিতর্কে তাঁর বক্তব্যে জাতিসংঘ সংস্কার, আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ, শান্তি, উন্নয়ন, মানবাধিকার ও বৈশ্বিক সহযোগিতার বিষয় বিশেষ গুরুত্ব পায়। তিনি বিশ্বায়নের বাস্তবতায় কোনো রাষ্ট্রের এককভাবে বিচ্ছিন্ন থাকার সুযোগ নেই এবং আন্তর্জাতিক শান্তি, ন্যায় ও উন্নয়নের ক্ষেত্রে জাতিসংঘের ভূমিকা অপরিহার্য-এমন অবস্থান তুলে ধরেন। জাতিসংঘের সরকারি প্রতিবেদনে তাঁর বক্তব্যে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের অবস্থান, গণতন্ত্র ও উন্নয়নের অগ্রগতি এবং জাতিসংঘ সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার বিষয়গুলো স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে।
এই তিন পর্যায়ের বক্তব্য পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বেগম খালেদা জিয়ার জাতিসংঘ কূটনীতি কেবল বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রতিফলন ছিল না; বরং বাংলাদেশের উন্নয়ন-অগ্রাধিকার, শান্তি, নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার ও বহুপাক্ষিক সহযোগিতাকে বৈশ্বিক আলোচনার সঙ্গে যুক্ত করার একটি ধারাবাহিক প্রচেষ্টা হিসেবেও তা বিবেচিত হতে পারে। ১৯৯০-এর দশকে গণতন্ত্র ও উন্নয়নের প্রশ্ন, ১৯৯৫ সালে জাতিসংঘের ভবিষ্যৎ ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, আর ২০০৫ সালে সন্ত্রাসবাদ, উন্নয়ন ও জাতিসংঘ সংস্কার-এই পরিবর্তিত বৈশ্বিক বাস্তবতার মধ্য দিয়েই বাংলাদেশের অবস্থানকে তিনি আন্তর্জাতিক মঞ্চে উপস্থাপন করেছেন।
জিয়াউর রহমান ও বেগম খালেদা জিয়ার জাতিসংঘ-সম্পৃক্ততার পর ২০২৬ সালে এই ধারাবাহিকতার নতুন অধ্যায় যুক্ত হতে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের উচ্চপর্যায়ের সপ্তাহ ২২ থেকে ২৮ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত হচ্ছে এবং সাধারণ বিতর্কের মূল পর্বও ২২ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হচ্ছে। জাতিসংঘের বর্তমান কর্মসূচিতে ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ সাধারণ বিতর্কের তৃতীয় দিনের অধিবেশন নির্ধারিত রয়েছে। ফলে ২০২৬ সালের এই অধিবেশন বাংলাদেশের জাতিসংঘ কূটনীতির ইতিহাসে বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে-কারণ পূর্ববর্তী দুই প্রজন্মের পর একই পরিবারের তৃতীয় প্রজন্মের একজন সরকারপ্রধান হিসেবে তারেক রহমানের জাতিসংঘের মঞ্চে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করার ঘটনা এই ধারাবাহিকতাকে একটি নতুন ঐতিহাসিক মাত্রা দিচ্ছে।
তারেক রহমানের জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে প্রথম ভাষণ এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, যখন আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা দ্রুত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বহু মেরু কেন্দ্রিকতার বিকাশ, চলমান আঞ্চলিক সংঘাত, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, জলবায়ু পরিবর্তনের ক্রমবর্ধমান অভিঘাত, প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত রূপান্তর এবং বহুপাক্ষিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা ও সংস্কার-সব মিলিয়ে বর্তমান বিশ্বরাজনীতির সামনে একাধিক নতুন প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। এই পরিবর্তিত বাস্তবতায় বাংলাদেশের জন্যও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, বিনিয়োগ, বাণিজ্য, প্রযুক্তি, জলবায়ু অভিযোজন ও জলবায়ু অর্থায়ন, দারিদ্র্য হ্রাস, রোহিঙ্গা সংকট এবং আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শান্তি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক অগ্রাধিকার হিসেবে সামনে এসেছে। তথ্যানুযায়ি, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁর প্রথম জাতিসংঘ ভাষণে বাংলাদেশের নতুন দৃষ্টিভঙ্গি ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে তুলে ধরবেন; একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তন, জলবায়ু অর্থায়ন, অর্থনৈতিক সম্ভাবনা, বৈশ্বিক শান্তি এবং রোহিঙ্গা সংকটের মতো বিষয় গুরুত্ব পেতে পারে।
এই প্রেক্ষাপটে ২০২৬ সালের জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ বাংলাদেশের জন্য আরও একটি বিশেষ মাত্রা তৈরি করেছে। জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। এই অধিবেশনের প্রতিপাদ্য বিষয় হচ্ছে “ Restoring Trust, Managing Transformation: A United Nations That Delivers for All”, বর্তমান আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার সংকট ও পরিবর্তনের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। তাঁর কর্মসূচিতে শান্তি ও নিরাপত্তা, টেকসই উন্নয়ন, জলবায়ু ও পরিবেশ, মানবাধিকার ও মানবিক কার্যক্রম, ডিজিটাল প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অন্তর্ভুক্তিমূলক শাসন এবং জাতিসংঘের সংস্কার ও বহুপাক্ষিকতার পুনর্গঠনের মতো ছয়টি আন্তঃসম্পর্কিত অগ্রাধিকার নির্ধারিত হয়েছে।
জিয়াউর রহমান, খালেদা জিয়া এবং তারেক রহমানের জাতিসংঘ-সম্পৃক্ততাকে পাশাপাশি রাখলে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক কূটনীতির পরিবর্তনশীল অগ্রাধিকারের একটি দীর্ঘ সময়রেখা স্পষ্ট হয়। ১৯৮০ সালে জিয়াউর রহমানের বক্তব্যে উন্নয়নশীল বিশ্বের অর্থনৈতিক বৈষম্য ও ন্যায়সংগত আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার প্রশ্ন গুরুত্ব পায়। ১৯৯০-এর দশকে খালেদা জিয়ার বক্তব্যে গণতন্ত্র, মানবাধিকার, উন্নয়ন, আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার এবং বাংলাদেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় সামনে আসে। ২০০৫ সালে তাঁর বক্তব্যে সন্ত্রাসবাদ, জাতিসংঘ সংস্কার, শান্তি, পরিবেশ ও উন্নয়নের মতো নতুন বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ গুরুত্ব পায়। আর ২০২৬ সালে তারেক রহমানের সামনে রয়েছে জলবায়ু পরিবর্তন, প্রযুক্তি, বিনিয়োগ, অর্থনৈতিক রূপান্তর, রোহিঙ্গা সংকট এবং পরিবর্তিত ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতার সমন্বিত চ্যালেঞ্জ।
এই ধারাবাহিকতার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো-একই পরিবারের তিনজন সদস্য ভিন্ন ভিন্ন সময়ে বাংলাদেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান হিসেবে জাতিসংঘের মঞ্চে দেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। জিয়াউর রহমানের ১৯৮০ সালের রাষ্ট্রপতি হিসেবে উপস্থিতি থেকে খালেদা জিয়ার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ১৯৯৩, ১৯৯৫ ও ২০০৫ সালের প্রতিনিধিত্ব এবং ২০২৬ সালে তারেক রহমানের নির্ধারিত ভাষণ-এই সময়রেখা চার দশকেরও বেশি সময়জুড়ে বিস্তৃত একটি স্বতন্ত্র ধারাবাহিকতা নির্দেশ করে।
তবে এর তাৎপর্য কেবল পারিবারিক রাজনৈতিক ইতিহাসে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদী রাজনীতি ও বিএনপির দীর্ঘ রাজনৈতিক ধারাবাহিকতার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিকও যুক্ত রয়েছে। জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে ১৯৭৮ সালে প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) বাংলাদেশের রাজনীতিতে জাতীয়তাবাদ, রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব, স্বনির্ভরতা, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং বহুমাত্রিক আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ওপর গুরুত্বারোপ করে। পরবর্তী সময়ে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি সংসদীয় গণতন্ত্রের রাজনীতিতে দীর্ঘ সময় রাষ্ট্র পরিচালনার অভিজ্ঞতা অর্জন করে এবং আন্তর্জাতিক পরিসরেও বাংলাদেশের স্বার্থকে উপস্থাপন করে। ২০২৬ সালে তারেক রহমানের জাতিসংঘের মঞ্চে প্রতিনিধিত্ব সেই রাজনৈতিক ধারাবাহিকতার একটি নতুন প্রজন্মের প্রকাশ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। ফলে তিনটি ভিন্ন সময়ের জাতিসংঘ-সম্পৃক্ততাকে পাশাপাশি রাখলে বিএনপির নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা, রাজনৈতিক উত্তরাধিকার এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরার দীর্ঘ অভিজ্ঞতার একটি বিশেষ চিত্রও প্রতিফলিত হয়।
অতএব, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে নির্ধারিত ভাষণ বাংলাদেশের কূটনৈতিক ইতিহাসে একটি নতুন অধ্যায় সংযোজন করতে যাচ্ছে। একই পরিবারের তিন সদস্যের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান হিসেবে জাতিসংঘের মঞ্চে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্বের এই ধারাবাহিকতা যেমন একটি স্বতন্ত্র ঐতিহাসিক ঘটনা, তেমনি এটি বিএনপির নেতৃত্বের দীর্ঘ রাজনৈতিক ধারাবাহিকতা ও উত্তরাধিকারের সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত। তবে এর বৃহত্তর ঐতিহাসিক তাৎপর্য আরও বিস্তৃত পরিসরে নিহিত। জিয়াউর রহমানের সময়ের জাতীয়তাবাদ, রাষ্ট্রের স্বনির্ভরতা ও জাতীয় স্বার্থের ধারণা, বেগম খালেদা জিয়ার সময়ের গণতন্ত্র, উন্নয়ন ও বহুপাক্ষিক কূটনীতির অভিজ্ঞতা এবং বর্তমান পরিবর্তিত বিশ্বব্যবস্থায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্ব-এই তিন পর্যায়ে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ, রাষ্ট্রচিন্তা ও আন্তর্জাতিক অবস্থান কীভাবে জাতিসংঘের সর্বজনীন মঞ্চে উপস্থাপিত হয়েছে এবং ভবিষ্যতে কীভাবে উপস্থাপিত হবে, তার মধ্যেই এই ধারাবাহিকতার বিশেষ ঐতিহাসিক তাৎপর্য নিহিত।
লেখক: অধ্যাপক, ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং চেয়ারম্যান, ফাউন্ডেশন ফর জিওইন্টেলিজেন্স পলিসি সাপোর্ট।
