‘বীমা খাতে বিশাল সম্ভাবনা, বাধা আস্থা ও দুর্বল ব্যবস্থাপনা’

‘বীমা খাতে বিশাল সম্ভাবনা, বাধা আস্থা ও দুর্বল ব্যবস্থাপনা’

ফন্ট সাইজ:

বিপদের দিনে পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়েই মানুষের কাছ থেকে বছরের পর বছর টাকা নেয় বীমা কোম্পানি। কিন্তু সেই বিপদ যখন সত্যিই আসে, তখন যদি গ্রাহককে নিজের পাওনা পেতে বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হয়, ভেঙে পড়ে পুরো ব্যবস্থার ওপর আস্থা। বাংলাদেশে এখন ঠিক এমন এক বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। জীবন ও সাধারণ বীমা মিলিয়ে প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকার দাবি অনিষ্পন্ন। অথচ দেশের অর্থনীতির আকার সাড়ে চারশ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি হলেও জিডিপির তুলনায় বীমার বাজার মাত্র ০.৩৩ শতাংশ।

অর্থনীতির আকারের তুলনায় এই বাজার যে অত্যন্ত ছোট, সেটিই উঠে এসেছে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইকোনমিক রিসার্চ (সিএসইআর)-এর বিশ্লেষণে। সংস্থাটি মনে করে, অর্থনীতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে বীমা খাত বড় না হওয়ার পেছনে পণ্যের সীমাবদ্ধতা, দুর্বল বিতরণব্যবস্থা ও সচেতনতার ঘাটতি রয়েছে। তবে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে গ্রাহকের আস্থার সংকট।

বীমা খাতের এই সংকট নিয়ে সম্প্রতি কঠোর অবস্থান নিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তার বক্তব্য, গ্রাহকের বৈধ দাবি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পরিশোধ করতে হবে। কোনো কোম্পানির হাতে নগদ অর্থ না থাকলে প্রয়োজনে জমি বা অন্যান্য সম্পদ বিক্রি করেও পলিসিহোল্ডারের পাওনা পরিশোধ করতে হবে। অর্থমন্ত্রীর এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে সরকারের অগ্রাধিকারও স্পষ্ট হয়েছে। সে অগ্রাধিকার অনুযায়ী প্রথমে গ্রাহকের টাকা, পরে অন্য বিষয়। একই সঙ্গে বীমা খাতের অনিয়ম ও দুর্বল কোম্পানিগুলো মোকাবিলায় আইন সংশোধন এবং সংকটে পড়া প্রতিষ্ঠানের জন্য কার্যকর রেজল্যুশন কাঠামো তৈরির উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। কারণ বছরের পর বছর প্রিমিয়াম দেয়ার পরও যদি গ্রাহক দাবি না পান, তাহলে নতুন গ্রাহক তৈরি করা কঠিন। বীমার বাজার বড় করার প্রথম শর্তই তাই আস্থা ফেরানো। অর্থমন্ত্রী বলেন, দাবি পরিশোধ না করে কোনো কোম্পানি সম্পদ ধরে রাখবে বা নতুন বিনিয়োগ করবে এমন সুযোগও থাকা উচিত নয়। তিনি আরও বলেন, বীমা খাতে অনিয়ম, বিশৃঙ্খলা ও দুর্নীতি গভীরে শিকড় গেড়েছে। গ্রাহক ভবিষ্যতের নিরাপত্তার জন্য কষ্টার্জিত অর্থ দিয়ে পলিসি করেন; কিন্তু দাবি না পেলে পুরো ব্যবস্থার ওপরই আস্থা নষ্ট হয়। এ অবস্থায় সরকার ইনস্যুরেন্স অ্যাক্ট ২০১০ সংশোধন এবং বীমা খাতের সংকট মোকাবিলায় একটি ক্রাইসিস রেজল্যুশন কাঠামো তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে।

বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) চেয়ারম্যান মীর নাদিয়া নিভিন সংকটের গভীরতা তুলে ধরে বলেছেন, জীবন ও সাধারণ বীমা মিলিয়ে প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকার দাবি অনিষ্পন্ন। এর বড় অংশ কয়েকটি দুর্বল কোম্পানিতে আটকে আছে। তিনি বলেন, দাবি নিষ্পত্তিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে আইডিআরএ এখন কোম্পানিগুলোর সম্পদ, এফডিআর ও বিনিয়োগের তথ্য পর্যালোচনা করছে। প্রয়োজন হলে সম্পদ বিক্রি করে গ্রাহকের পাওনা পরিশোধের উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে অবৈধ ও অতিরিক্ত কমিশন বন্ধ, ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি এবং প্রতিটি পলিসির জন্য ইউনিক আইডি চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে। এছাড়া আইডিআরএ-র ডিজিটাল উদ্যোগও সম্প্রতি জোরদার হচ্ছে। অনলাইনে অভিযোগ করা, পলিসির তথ্য যাচাই এবং দাবি নিষ্পত্তির অগ্রগতি জানার সুযোগ বাড়ানো হচ্ছে। লক্ষ্য একটাই, গ্রাহক যেন দালাল বা এজেন্টের ওপর নির্ভর না করে সরাসরি তথ্য পেতে পারেন।

সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইকোনমিক রিসার্চের চেয়ারম্যান ও ল্যাবএইড হাসপাতাল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাকিফ শামীমের বিশ্লেষণে বীমা খাতের সংকটের আরও কয়েকটি কারণ উঠে এসেছে। তার মতে, বাংলাদেশের অর্থনীতি বড় হলেও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার অবকাঠামো হিসেবে বীমা খাত অনেক পিছিয়ে। দেশে বীমা কোম্পানির সংখ্যা অনেক হলেও বাজারের গভীরতা কম। ছোট বাজারে বেশি কোম্পানির উপস্থিতি, অতিরিক্ত কমিশন, পরিচালন ব্যয় এবং বিক্রয়কেন্দ্রিক ব্যবসা কাঠামো খাতটিকে দুর্বল করছে। তিনি বলেন, শুধু নতুন পলিসি বিক্রি করে বীমার বাজার বড় করা যাবে না। গ্রাহকের বাস্তব প্রয়োজন অনুযায়ী স্বাস্থ্য, কৃষি, সম্পত্তি ও জলবায়ুঝুঁকির বীমা বাড়াতে হবে। বিশেষ করে স্বাস্থ্যবীমার বড় সম্ভাবনা রয়েছে। চিকিৎসা ব্যয়ের বড় অংশ মানুষকে নিজের পকেট থেকে বহন করতে হয়। আউট অব পকেট এক্সপেন্ডিচার বেশি হওয়ায় বড় রোগে একটি পরিবারের সঞ্চয় দ্রুত শেষ হয়ে যেতে পারে। তার মতে, হাসপাতাল ও বীমা কোম্পানির মধ্যকার বিরোধ কমাতে অভিন্ন বিলিং ব্যবস্থা, ইলেকট্রনিক দাবি নিষ্পত্তি ও ক্যাশলেস চিকিৎসাসেবা চালু করা দরকার। বীমা খাতের সংস্কারে প্রযুক্তি বড় ভূমিকা রাখতে পারে। অনলাইনে পলিসি, ডিজিটাল প্রিমিয়াম, ইলেকট্রনিক দাবি দাখিল, স্বয়ংক্রিয় যাচাই এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে ভুয়া দাবি শনাক্ত করা গেলে খরচ কমবে, বাড়বে স্বচ্ছতা। একই সঙ্গে ব্যাংক, মোবাইল আর্থিক সেবা ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মকে কাজে লাগিয়ে গ্রাম, কৃষক, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমজীবী মানুষের কাছে বীমা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব। সাকিফ শামীম বলেন, সব মিলিয়ে বাংলাদেশের বীমা খাতের সামনে এখন মূল চ্যালেঞ্জ বাজার বাড়ানো নয়, আগে বিশ্বাস ফিরিয়ে আনা।

সিএসইআর’র বিশ্লেষণ:
সিএসইআর’র চেয়ারম্যান সাকিফ শামীম বীমা খাত নিয়ে সম্প্রতি সংস্থাটির বিশ্লেষণ তুলে ধরে জানান, বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন সাড়ে চারশ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি। অথচ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশের বীমা খাতের মোট প্রিমিয়াম ছিল প্রায় ১৮ হাজার ৫৩৪ কোটি টাকা, যা মোট দেশজ উৎপাদনের মাত্র ০.৩৩ শতাংশ। প্রতিবেশী ভারতেও বীমার অনুপ্রবেশের হার ৩.৭ শতাংশ, যা বৈশ্বিক গড়ের প্রায় অর্ধেক। অর্থাৎ আকারে বাংলাদেশের অর্থনীতি যতটা এগিয়েছে, সেই অর্থনীতির ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার অবকাঠামো হিসেবে বীমা খাত ততটা বিকশিত হতে পারেনি। রপ্তানি, রেমিট্যান্স ও অবকাঠামোগত অগ্রগতির আলোচনা আমরা যতটা করি, সেই অগ্রগতি নানা ধরনের ঝুঁকির মুখে কতটা সুরক্ষিত, তা নিয়ে ততটা ভাবি না। অথচ বীমা মূলত সেই সুরক্ষারই একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিমাপক।

বাংলাদেশে বীমার বাজার ছোট হলেও কোম্পানির সংখ্যা কম নয়। দেশে ৩৫টি জীবন বীমা ও ৪৬টি সাধারণ বীমা প্রতিষ্ঠান কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এত ছোট প্রিমিয়াম ভান্ডারের বিপরীতে এতগুলো প্রতিষ্ঠানের উপস্থিতি বাজারে অস্বাস্থ্যকর মূল্য প্রতিযোগিতা ও অদক্ষতা তৈরি করতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক শক্তি এবং গ্রাহকের আস্থা দুটোকেই দুর্বল করে। দেশের আর্থিক খাতের মোট সম্পদের মধ্যে বীমার অংশও মাত্র ৩ শতাংশ। ফলে আকারে বীমা শিল্পকে বড় মনে হলেও গভীরতার দিক থেকে এটি এখনো অগভীর।
বীমা এমন একটি পণ্য, যেখানে গ্রাহক আজ অর্থ পরিশোধ করেন, কিন্তু এর প্রতিদান পাওয়ার সময় ও প্রয়োজন ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তার সঙ্গে যুক্ত। তাই বীমার প্রকৃত পণ্য হলো এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে বিশ্বাস। আর সেই বিশ্বাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হলো দাবি পরিশোধের সক্ষমতা ও সময়ানুবর্তিতা।

২০২১ সালে দেশে দাবি নিষ্পত্তির অনুপাত আগের বছরের ৮৮ শতাংশ থেকে নেমে ৬৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছিল, যেখানে বৈশ্বিক গড় ছিল ৯৮ শতাংশ। একজন গ্রাহকের দাবি বছরের পর বছর আটকে থাকার ঘটনা কেবল একজন গ্রাহকের আর্থিক ক্ষতি নয়। একটি পরিবার, একটি গ্রাম বা একটি পাড়ায় এমন অভিজ্ঞতার খবর ছড়িয়ে পড়লে তা বহু মানুষের বীমাবিমুখতার কারণ হতে পারে। এভাবেই ‘বীমা মানে ঠকা’ ধরনের ধারণা সমাজে আরও শক্তিশালী হয়। নিয়ন্ত্রক কাঠামোর দুর্বলতাও এই আস্থাহীনতাকে গভীর করেছে।
তবে পরিবর্তনের কিছু উদ্যোগও দেখা যাচ্ছে। নতুন নেতৃত্বের অধীনে বকেয়া দাবি নিষ্পত্তিকে অগ্রাধিকার দেওয়া, আর্থিকভাবে দুর্বল বীমা কোম্পানির সম্পদ বিক্রি করে পলিসিধারীদের পাওনা পরিশোধ, অবৈধ কমিশন বন্ধ, ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি এবং বাধ্যতামূলক ইউনিক পলিসি আইডি চালুর পরিকল্পনা ঘোষণা করা হয়েছে। দিকটি ইতিবাচক। তবে সংস্কার কেবল ঘোষণায় সীমাবদ্ধ থাকলে আস্থা ফিরবে না। এর জন্য প্রয়োজন টেকসই আইনি কাঠামো, নেতৃত্বের স্থিতিশীলতা এবং ধারাবাহিক প্রয়োগ।

আস্থার সংকটের আরেকটি বড় উৎস হলো বীমার বিতরণব্যবস্থা। বাংলাদেশে বীমা মূলত কমিশনভিত্তিক এজেন্ট এবং বিক্রয় লক্ষ্যমাত্রার ওপর নির্ভর করে বিক্রি হয়। অনেক ক্ষেত্রে গ্রাহকের প্রকৃত ঝুঁকি ও প্রয়োজন বোঝার চেয়ে পলিসি বিক্রিই মুখ্য হয়ে ওঠে। বিশ্বব্যাংকের মূল্যায়ন অনুযায়ী, জীবন বীমার ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ পলিসি প্রথম বছরেই বাতিল হয়ে যায়, যা বিশ্বের সর্বোচ্চ হারগুলোর একটি। এর পেছনে দুর্বল তদারকি, সচেতনতার অভাব এবং সীমিত আয়ের মানুষের কাছেও উপযুক্ত মূল্যায়ন ছাড়া পলিসি বিক্রির প্রবণতা ভূমিকা রাখে।
পরিসংখ্যান খতিয়ে দেখলে সংকটের ব্যাপ্তি আরও স্পষ্ট হয়। বীমা শিল্পের আর্থিক স্বাস্থ্য সাধারণত চারটি সূচক দিয়ে বিচার করা হয়। ব্যয়ের অনুপাত (এক্সপেন্স রেশিও), দাবি অনুপাত (ক্লেইম রেশিও), সম্পদ-দাবি অনুপাত (অ্যাসেট-টু-ক্লেইম রেশিও) এবং সম্পদ-দায় অনুপাত (অ্যাসেট-টু-লায়াবিলিটি রেশিও)। চারটি সূচকেই বাংলাদেশের অবস্থান বৈশ্বিক গড় থেকে অনেক দূরে। এক্সপেন্স রেশিও অর্থাৎ প্রিমিয়াম আয়ের কত অংশ পরিচালন ব্যয়, কমিশন ও বিপণনে ব্যয় হয় তা দিয়েই শুরু করা যাক। উন্নত বাজারে এই হার সাধারণত ২০ থেকে ৪০ শতাংশের মধ্যে থাকে। পিডব্লিউসির এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বিশ্বের শীর্ষ বীমাকারীদের গড় ব্যয়ের অনুপাত ২৪ শতাংশ, পিছিয়ে থাকা কোম্পানিগুলোর ক্ষেত্রে তা ৩২ শতাংশ। বাংলাদেশে আইনি সীমাই এর চেয়ে অনেক বেশি। জীবন বীমার প্রথম বছরে প্রতি ১০০ টাকা প্রিমিয়ামের বিপরীতে ৯৫ টাকা পর্যন্ত খরচের অনুমতি রয়েছে, দ্বিতীয় বছরে ২২ টাকা, তৃতীয় বছর থেকে ৫ টাকা। বাস্তবে বহু কোম্পানি এই উদার সীমাও মানে না— ২০২১ সালে ৩৬টি জীবন বীমা কোম্পানির মধ্যে অন্তত ১৭টি নির্ধারিত সীমা ছাড়িয়ে গিয়েছিল। ফলে প্রিমিয়ামের বড় অংশ পলিসিহোল্ডারের জীবনতহবিলে না জমে এজেন্ট কমিশন ও প্রশাসনিক ব্যয়ে চলে যায়। দাবি অনুপাতের চিত্র আরও উদ্বেগজনক। বৈশ্বিক গড় দাবি নিষ্পত্তির হার ৯৭-৯৮ শতাংশ; প্রতিবেশী ভারতে তা প্রায় ৯৮ শতাংশ (২০২২-২৩ অর্থবছর)। বাংলাদেশে জীবন বীমায় এই হার ২০২০ সালের ৮৫ শতাংশ থেকে ক্রমাগত নেমে ২০২৫ সালে দাঁড়িয়েছে ৬৬.০৬ শতাংশে। সাধারণ বীমার পরিস্থিতি আরও খারাপ— আইডিআরএ-র হিসাবে ২০২৫ সালে সারা বছরে মাত্র ২৫ শতাংশ দাবি নিষ্পত্তি হয়েছে, আর ২০২৬ সালের জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে তা নেমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ১১.৩ শতাংশে। অর্থাৎ প্রতি ১০০ টাকার দাবির বিপরীতে গ্রাহক হাতে পাচ্ছেন সাড়ে ১১ টাকারও কম। শিল্প-সংশ্লিষ্টদের মতে একটি স্বাস্থ্যকর দাবি নিষ্পত্তির হার সাধারণত ৮০ শতাংশের ওপরে থাকা উচিত, যেখানে বাংলাদেশ তার অর্ধেকেরও নিচে।

সম্পদ-দাবি অনুপাত দেখলে অবশ্য একটু ভিন্ন চিত্র পাওয়া যায়। ২০২৩ সাল শেষে খাতের মোট সম্পদ ছিল প্রায় ৭২ হাজার ৫৭৬ কোটি টাকা, আর ২০২৫ সাল নাগাদ জীবন ও সাধারণ বীমা মিলিয়ে অনিষ্পন্ন দাবির সম্মিলিত পরিমাণ প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকা। দুটি তথ্য ভিন্ন সময়ের হলেও মোটা দাগে বলা যায়, খাতের মোট সম্পদ অনিষ্পন্ন দাবির প্রায় দশ গুণ। পদ্মা ইসলামী লাইফের জীবনতহবিল ঘাটতি ২০২৬ সালের জুন নাগাদ বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩২৭ কোটি টাকায়। বৈরা লাইফের ঘাটতি প্রায় ৬৫ কোটি, শান্তা লাইফের ১৫-১৭ কোটি ও স্বদেশ লাইফের প্রায় ৫ কোটি টাকা— অন্তত ছয়টি কোম্পানির জীবনতহবিল ক্রমাগত ঋণাত্মক, অর্থাৎ দায় সম্পদকে ছাড়িয়ে গেছে। এই কোম্পানিগুলোর পলিসিহোল্ডারদের জন্য প্রশ্নটা আর বিলম্বে আঁটকে নেই, সম্পদ আদৌ অবশিষ্ট আছে কি না তাতে চলে গেছে। চারটি সূচক একসঙ্গে পড়লে একটি স্পষ্ট চিত্র ফুটে ওঠে। সামগ্রিকভাবে খাতের সম্পদ যথেষ্ট, কিন্তু উচ্চ ব্যয়, নিম্ন দাবি নিষ্পত্তি আর কয়েকটি কোম্পানির প্রকৃত দেউলিয়াত্ব মিলে সামগ্রিক আস্থার সংকট তৈরি করেছে। সমাধানও তাই একমুখী নয়; ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, দাবি নিষ্পত্তির গতি ও দুর্বল কোম্পানিগুলোর কাঠামোগত সংস্কার, তিনটিই একসঙ্গে করতে হবে।

এই প্রতিটি সংকটের সঙ্গেই প্রযুক্তির সরাসরি সম্পর্ক আছে, আর এখানেই ইনস্যুরটেককে অগ্রাধিকার দেওয়ার যুক্তি দাঁড়ায়।
প্রথমত, ব্যয়ের অনুপাত কমানো। স্বয়ংক্রিয় আন্ডাররাইটিং, ডিজিটাল অনবোর্ডিং ও পেপারলেস প্রক্রিয়া ব্যবহারকারী বীমাকারীদের ব্যয়ের অনুপাত প্রতিযোগীদের তুলনায় লক্ষণীয়ভাবে কম থাকে— আগেই উল্লেখ করা পিডব্লিউসির বিশ্লেষণে শীর্ষ ও পিছিয়ে থাকা কোম্পানির মধ্যে আট শতাংশ পয়েন্টের ব্যবধানের একটি বড় কারণ প্রযুক্তি-নির্ভরতা। এজেন্টনির্ভর, কাগজভিত্তিক প্রক্রিয়ার জায়গায় ডিজিটাল বিতরণ ও দাবি-প্রক্রিয়াকরণ চালু করলে বাংলাদেশেও এই ব্যবধান কমানো সম্ভব।
দ্বিতীয়ত, দাবি নিষ্পত্তির গতি ও স্বচ্ছতা। ইলেকট্রনিক দাবি ব্যবস্থাপনা, মোবাইল-ভিত্তিক ডকুমেন্টেশন এবং তথ্য-বিশ্লেষণনির্ভর যাচাই দাবি নিষ্পত্তির সময় দিনের হিসাব থেকে ঘণ্টার হিসাবে নামিয়ে আনতে পারে। এটিই সরাসরি সমাধান সেই সাত হাজার কোটি টাকার অনিষ্পন্ন দাবির সংকটের, যার পেছনে মূলত কাগজপত্রের জটিলতা, পুনর্বিমার বিলম্ব ও ম্যানুয়াল যাচাইয়ের দীর্ঘসূত্রতা কাজ করছে।

তৃতীয়ত, প্রতারণামূলক দাবি শনাক্তকরণ। তথ্য-বিশ্লেষণ ও প্যাটার্ন-শনাক্তকরণ প্রযুক্তি ভুয়া দাবি চিহ্নিত করতে সক্ষম। গ্রুপ স্বাস্থ্যবীমায় ভুয়া দাবির যে সমস্যা বিশ্বব্যাংকের মূল্যায়নে উঠে এসেছে, তার সরাসরি সমাধান এখানে। প্রতারণা কমলে বীমাকারীদের অতিরিক্ত বিলের আশঙ্কাও কমবে, হাসপাতালের পাওনা মেটানোও সহজ হবে। চতুর্থত, বিতরণব্যবস্থার সম্প্রসারণ ও আর্থিক অন্তর্ভুক্তি। মোবাইল আর্থিক সেবা ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ক্ষুদ্রবীমা বিক্রি করা গেলে কমিশনভিত্তিক এজেন্ট মডেলের ওপর নির্ভরতা কমে, আর অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমজীবী মানুষ, কৃষক ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের কাছে কম খরচে পৌঁছানো সম্ভব হয়। এশিয়া ও আফ্রিকার একাধিক উদীয়মান বাজারে মোবাইল-ভিত্তিক ইনস্যুরটেক মডেল এই কাজটিই করে দেখিয়েছে।
তবে সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে বিস্তারের আগে আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে। মানুষকে নতুন পলিসি কেনানোর আগে তাকে বিশ্বাস করাতে হবে যে প্রয়োজনে তার দাবি সময়মতো পরিশোধ করা হবে। একই সঙ্গে কোম্পানিকে আর্থিকভাবে শক্তিশালী, নিয়ন্ত্রককে কার্যকর, এজেন্টকে জবাবদিহিমূলক এবং পণ্যকে মানুষের বাস্তব প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে।
বীমা খাতের ভবিষ্যৎ তাই কেবল আরও পলিসি বিক্রির ওপর নির্ভর করছে না। নির্ভর করছে প্রতিশ্রুতি রক্ষার সক্ষমতার ওপর। যে খাত আজ মানুষের কাছে তার প্রতিশ্রুতি বিশ্বাসযোগ্যভাবে রক্ষা করতে পারবে, আগামী দশকে সেই খাতই বাংলাদেশের অর্থনৈতিক নিরাপত্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হয়ে উঠতে পারে।