পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি ক্ষমতায় আসার আগেই নারীদের জন্য মাসে ৩,০০০ রুপি দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। ক্ষমতায় আসার পর তৃণমূল কংগ্রেস সরকার আমলের লক্ষ্মীর ভান্ডারের পরিবর্তে বিজেপি সরকার নাম বদলে অন্নপূর্ণা যোজনা চালু করে। কিন্তু সেই যোজনা চালু হওয়ার চার মাস পরেও হাজার হাজার নারী তাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে অর্থ পাননি বলে অভিযোগ করেছেন।
দুর্গাপূজা আসন্ন এবং ৬ই অক্টোবরের বিধানসভা উপনির্বাচনের আর মাত্র দুই সপ্তাহ বাকি থাকায় ক্ষুব্ধ মহিলারা রাজ্য জুড়ে বিভিন্ন স্থানে রাস্তা অবরোধ এবং ব্লক উন্নয়ন অফিসের বাইরে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেছেন। এই ধরনের বড় বিক্ষোভগুলো হাওড়ার উদয়নারায়ণপুর, বর্ধমানের খণ্ডঘোষ, জলপাইগুড়ি শহর, উত্তর ২৪ পরগনার বসিরহাট ও বাগদা এবং কোচবিহারের কিছু এলাকায় অনুষ্ঠিত হয়েছে। এই বিক্ষোভে যোগ দিয়েছে বিজেপির বহু অনুগামী ও সমর্থকও। ফলে বিজেপি সরকারের এই প্রধান নারী-কেন্দ্রিক কল্যাণ প্রকল্পের বাস্তবায়ন নিয়ে নতুন করে সংশয় তৈরি হয়েছে।
এই প্রকল্প চালুর শুরু থেকেই বিতর্ক তৈরি হয়েছে। পূর্ববতী সরকারের আমলে পাওয়া বহু নারীর নাম অবৈধ হিসেবে বাদ দেয়া হয়েছে। সরকার জানিয়েছে, ১.৫৮ কোটি নারী সেপ্টেম্বর মাসের ৩,০০০ রুপির কিস্তি পেয়েছেন, কিন্তু এখনও পর্যন্ত কতজন অর্থ পাননি এমন সব যোগ্য মহিলার রাজ্যব্যাপী সমন্বিত পরিসংখ্যান প্রকাশ করা হয়নি। যাচাই-বাছাইয়ের পরেও অনেক আবেদন 'প্রক্রিয়াধীন', 'তদন্তাধীন' বা 'বাতিল' হিসেবে রয়ে গেছে।
আগস্ট মাসে প্রায় ১ কোটি ৪৫ লাখ নারী এই সুবিধা পেয়েছিলেন। এর আগে সরকার জানিয়েছিল, যাচাই-বাছাইয়ের সময় ২৭ লাখ ৮০ হাজার আবেদন বাতিল করা হয়েছিল এবং এই প্রকল্প সংক্রান্ত প্রায় ৪ লাখ ৫০ হাজার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
বিক্ষোভকারীরা জানিয়েছেন, ব্লক উন্নয়ন অফিস ও গ্রাম পঞ্চায়েতে বারবার যাওয়া সত্ত্বেও তাদের আবেদনপত্রগুলোর অবস্থা এখনও ‘প্রক্রিয়াধীন’ বা তদন্তাধীন হিসেবেই দেখাচ্ছে। আর তাই বিক্ষোভকারী নারীরা রাস্তা অবরোধ করেছেন। পরে অবশ্য বিষয়টি খতিয়ে দেখার বিষয়ে প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও পুলিশের আশ্বাসের পর অবরোধ তুলে নেয়া হয়েছে।
হাওড়ায় এক নারীর দুর্ঘটনায় শারীরিকভাবে অক্ষম হয়ে পড়া স্বামীও বিক্ষোভে অংশ নিয়েছিলেন। তিনি বলেছেন, “আমার স্ত্রী যদি ‘অন্নপূর্ণা যোজনা’ প্রকল্পের সুবিধা না পান, যা তার স্ত্রী আগে পেতেন, তবে আমাকে আত্মহত্যা করতে হবে। তার দাবি, তার সব নথিপত্রই আসল। একই নথিপত্র ব্যবহার করে তিনি বাড়ি ও ‘স্বাস্থ্য সাথী’-র মতো সরকারি সুবিধা পেয়েছেন। তাহলে এই সুবিধাটি পেতে তাকে কী বাধা দিচ্ছে? আমি শারীরিকভাবে অক্ষম এবং বেঁচে থাকার জন্য সরকারি সহায়তার ওপর নির্ভরশীল।”
বিভিন্ন জেলার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন যে, কিছুটা দেরি হলেও যোগ্য নারীরা এই প্রকল্পের সুবিধা পাবেন। তথ্য যাচাই-বাছাই, আবেদনকারীদের দেয়া ভুল তথ্য, আধার ও ব্যাংক অ্যাকাউন্টের সংযোগ না থাকা এবং অন্যান্য অসংগতির কারণে এই বিলম্ব হয়েছে বলে তারা জানিয়েছেন।
গত ১৯ মে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষিত এবং ৩ জুন চালু হওয়া এই প্রকল্পের আওতায় ২৫ থেকে ৬০ বছর বয়সী যোগ্য নারীদের মাসে ৩,০০০ রুপি দেয়া হচ্ছে। যোগ্যতার শর্তাবলী পূরণ সাপেক্ষে, পূর্বতন সরকারের আমলের ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’ প্রকল্পের বর্তমান সুবিধাভোগীদের এই নতুন প্রকল্পে স্থানান্তরিত হওয়ার কথা ছিল।
'লক্ষ্মীর ভাণ্ডার' মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জনকল্যাণমুখী রাজনীতির একটি প্রধান উপাদানে পরিণত হয়েছিল। একটি সমীক্ষা অনুযায়ী, ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে ৫০ শতাংশ নারী ভোটার তৃণমূলকে সমর্থন করেছিলেন, যেখানে পুরুষ ভোটারদের ক্ষেত্রে এই হার ছিল ৪৬ শতাংশ। বিশেষজ্ঞরা দলের প্রতি নারীদের সমর্থন সুদৃঢ় করার ক্ষেত্রে এই প্রকল্পের ভূমিকা ছিল বলে মনে করেন।
পশ্চিমবঙ্গের মোট ভোটারের প্রায় অর্ধেকই নারী। এমতাবস্থায় ‘অন্নপূর্ণা যোজনা’-র অর্থ প্রদানে বিলম্ব নিয়ে ক্রমবর্ধমান অভিযোগের জেরে এই প্রকল্পের বাস্তবায়ন বিজেপি সরকারের সামনে এক জরুরি রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পরীক্ষার মুখোমুখি ফেলেছে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।
