শিক্ষিত তরুণদের ৩৬% বেকার

সহযোগীদের খবর

শিক্ষিত তরুণদের ৩৬% বেকার

ফন্ট সাইজ:

কালের কণ্ঠ

দৈনিক কালের কণ্ঠের প্রধান শিরোনাম ‘শিক্ষিত তরুণদের ৩৬% বেকার’। প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষিত তরুণদের বড় একটি অংশ চাকরি পাচ্ছে না। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী উচ্চশিক্ষিত তরুণদের প্রায় ৩৬ শতাংশই বেকার।

দেশের সামগ্রিক তরুণ বেকারত্বের হার যেখানে প্রায় ১০ শতাংশ, সেখানে উচ্চশিক্ষিত তরুণদের বেকারত্বের হার সাড়ে তিন গুণ। আইএমএফের ‘ফিন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট’ সাময়িকীর সেপ্টেম্বর সংখ্যায় এ গবেষণা প্রকাশ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে এশিয়ার বিভিন্ন দেশের তরুণদের বেকারত্ব পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এতে দেখা যায়, এশিয়াজুড়ে তরুণদের বেকারত্ব একটি বড় সমস্যা হলেও সবচেয়ে বেশি বেকারত্ব দেখা যাচ্ছে উচ্চশিক্ষিত তরুণদের মধ্যে।

দক্ষিণ এশিয়ায় শ্রীলঙ্কায় উচ্চশিক্ষিত তরুণদের বেকারত্ব সবচেয়ে বেশি, প্রায় ৪৩ শতাংশ। ভারতে এই হার প্রায় ৪২ শতাংশ এবং বাংলাদেশে ৩৬ শতাংশ। অন্যদিকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে হার তুলনামূ লক কম। ইন্দোনেশিয়ায় প্রায় ১৮ শতাংশ, ভিয়েতনামে ১৬ শতাংশ, মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ডে ১৩ শতাংশ এবং ফিলিপাইনে প্রায় ১২ শতাংশ উচ্চশিক্ষিত তরুণ বেকার।

সিঙ্গাপুরে এই হার প্রায় ৮ শতাংশ। আইএমএফের হিসাবে, বাংলাদেশে সামগ্রিক তরুণ বেকারত্বের হার প্রায় ১০ শতাংশ। ফলে উচ্চশিক্ষিত তরুণদের বেকারত্বের সঙ্গে সামগ্রিক তরুণ বেকারত্বের বড় ব্যবধান রয়েছে।

বাংলাদেশে শিক্ষিত তরুণদের বেকারত্বের অন্যতম কারণ হিসেবে চাকরির বাজারের সঙ্গে শিক্ষার অসামঞ্জস্যকে চিহ্নিত করা হচ্ছে। দেশের চাকরির বাজারে প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক স্নাতক তরুণ প্রবেশ করলেও তাঁদের যোগ্যতা অনুযায়ী পর্যাপ্ত পেশাগত চাকরি তৈরি হচ্ছে না।

চাকরির অনলাইন প্ল্যাটফর্ম বিডিজবস ডটকমের প্রতিষ্ঠাতা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফাহিম মাশরুর বলেন, গত এক যুগে শ্রমশক্তিতে স্নাতক ডিগ্রিধারীর সংখ্যা দ্রুত বেড়েছে। ২০১০ সালে শ্রমশক্তির মাত্র ৩.৯ শতাংশ স্নাতক ডিগ্রিধারী ছিলেন। ২০২২ সালে তা বেড়ে ৯ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ এক যুগে স্নাতক ডিগ্রিধারী শ্রমশক্তি প্রায় আড়াই গুণ হয়েছে। কিন্তু সেই অনুপাতে নতুন শিল্প-কারখানা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়নি।

তাঁর হিসাবে, প্রতিবছর ২২-২৩ লাখ তরুণ-তরুণী শ্রমবাজারে প্রবেশ করেন। তাঁদের মধ্যে প্রায় সাড়ে সাত লাখ স্নাতক ডিগ্রিধারী।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২৪ সালের শ্রমশক্তি জরিপেও শিক্ষিত বেকারত্বের চিত্র উঠে এসেছে। দেশে মোট বেকারের সংখ্যা ২৬ লাখ ২৪ হাজার। তাঁদের মধ্যে ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী তরুণ-তরুণীর সংখ্যা ২০ লাখ ৩২ হাজার। এই বেকারদের প্রায় ২৯ শতাংশ উচ্চশিক্ষিত বা স্নাতক ডিগ্রিধারী।

বেকার থাকার সময়ও উদ্বেগজনক। উচ্চশিক্ষিত চাকরিপ্রত্যাশীদের ১৭ শতাংশের বেশি দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে বেকার থাকে। আর ১৫ শতাংশের বেশি দু-এক বছর ধরে চাকরি খুঁজছেন। অর্থাৎ উচ্চশিক্ষিত তরুণদের একটি বড় অংশ এক বছরের বেশি সময় ধরে কর্মহীন থাকছেন।

আইএমএফ এ পরিস্থিতিকে ‘গ্র্যাজুয়েট গ্লাট’ বা অতিরিক্ত স্নাতক তৈরির সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করেছে। অর্থাৎ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হওয়া গ্র্যাজুয়েটের সংখ্যা ডিগ্রিনির্ভর পেশাগত চাকরির সংখ্যার চেয়ে বেশি হয়ে যাচ্ছে। এর সঙ্গে নতুন চ্যালেঞ্জ হিসেবে যুক্ত হচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। আইএমএফ বলছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা উৎপাদনশীলতা বাড়াতে পারে। তবে দক্ষতা বাড়ানোর চেয়ে দ্রুত এ প্রযুক্তি গ্রহণ করা হলে তরুণদের শ্রমবাজারে চাপ আরো বাড়তে পারে। জুনিয়র প্রকৌশলী, এনিমেটর ও প্রশাসনিক কর্মীর মতো প্রবেশ পর্যায়ের কিছু কারিগরি পদে মানুষের প্রয়োজনও কমতে পারে।

আইএমএফের এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় বিভাগের পরিচালক কৃষ্ণা শ্রীনিবাসন বলেন, উচ্চশিক্ষিত তরুণ কর্মীরা তাঁদের যোগ্যতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ চাকরি খুঁজে পেতে হিমশিম খাচ্ছেন।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, আগামী এক দশকে উন্নয়নশীল অর্থনীতিগুলোতে প্রায় ১২০ কোটি মানুষ শ্রমবাজারে প্রবেশ করবে। এত বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠীর জন্য পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান তৈরি করা এশিয়ার দেশগুলোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।

প্রথম আলো

‘জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি: জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়বে’—এটি দৈনিক প্রথম আলোর প্রধান শিরোনাম। প্রতিবেদনে বলা হয়, ডিজেলের দাম বাড়ানোর পরদিন গতকাল সোমবার রাজধানীর গাবতলী বাস টার্মিনালে গিয়ে দেখা গেল, দূরত্বভেদে ভাড়া ৫০ থেকে ১০০ টাকা বাড়তি নেওয়া হচ্ছে।

অন্যদিকে কুষ্টিয়ার একজন চালকলমালিক বলছিলেন, আগের দিন যে চাল তিনি ২০ হাজার টাকা ট্রাকভাড়া দিয়ে ঢাকায় পাঠিয়েছেন, গতকাল তা পাঠাতে লেগেছে ২২ হাজার টাকা।

এভাবেই জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে পরিবহন খাতে। বিশ্লেষকেরা বলছেন, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে পরিবহনভাড়া যেমন বাড়বে, তেমনি বাড়বে কৃষির উৎপাদন ব্যয়। কারখানা থেকে পণ্যের সরবরাহ ব্যয় বাড়বে। কিছু ক্ষেত্রে কারখানার পণ্যের উৎপাদন ব্যয়ও বাড়বে।

বিদ্যুৎহীন অথবা লোডশেডিংয়ের সময় যেসব গ্রামীণ পরিবারে কেরোসিনের কুপি জ্বালানো হয়, তাদের খরচ বাড়বে। মোটরসাইকেল ও গাড়ির মালিকদের ব্যয় তো বাড়বেই।

সার্বিকভাবে মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির আশঙ্কা রয়েছে। এতে বিপাকে পড়বেন মূলত গরিব, নিম্ন ও স্বল্প আয়ের মানুষ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক সেলিম রায়হান প্রথম আলোকে বলেন, কয়েক বছর ধরেই মূল্যস্ফীতি বেশি। সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা চাপের মুখে। বাসভাড়া কিছুটা বৃদ্ধি, চাল বা সবজির মূল্যবৃদ্ধি কিংবা রান্নার খরচ বেড়ে যাওয়ায় নিম্ন আয়ের পরিবারের মাসিক বাজেটে বড় চাপ তৈরি করতে পারে। তিনি বলেন, শহরের নিম্ন আয়ের শ্রমজীবী মানুষ, ডিজেলনির্ভর সেচব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল কৃষক পরিবার ও অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিক—তাঁদের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি।

সেলিম রায়হান আরও বলেন, মূল্যবৃদ্ধির পথে হাঁটলে সরকারের হিসাব হয়তো কিছুটা সহজ হবে। কিন্তু নানাভাবে এর মূল্য দিতে হতে পারে—যেমন উচ্চ মূল্যস্ফীতি, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়া, বৈষম্য আরও বেড়ে যাওয়া ইত্যাদি।

মূল্যবৃদ্ধির অতীত

জ্বালানি তেলের দাম এক লাফে সবচেয়ে বেশি বাড়ানো হয় ২০২২ সালের আগস্টে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকার ওই সময় ডিজেলের দাম সাড়ে ৪২ শতাংশ বাড়িয়ে দেয়। লিটারে বেড়ে যায় ৩৪ টাকা। যদিও ব্যাপক সমালোচনার মুখে ২৩ দিনের মাথায় লিটারে ৫ টাকা কমানো হয় দাম।

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর পরই বেড়ে যায় বাস, ট্রাক ও লঞ্চের ভাড়া। পণ্যের পরিবহন ব্যয় ও উৎপাদন খরচ বাড়ে। ওই সময় মূল্যস্ফীতি ২ শতাংশ বেড়ে গিয়েছিল। সাড়ে ৭ শতাংশ থেকে বেড়ে তা হয় সাড়ে ৯ শতাংশ।

২০২২ সাল থেকে দেশে মূল্যস্ফীতি চড়া। তা এখনো ৮ শতাংশের বেশি। এমন সময়ে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম অস্থির। সরকারও লোকসান কমানোর কথা বলে গত রোববার জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়েছে লিটারপ্রতি ২০ টাকা। প্রতি লিটার ডিজেলের দাম এখন ১৩৫ টাকা, পেট্রল ১৬০ টাকা, অকটেন ১৬৫ টাকা এবং কেরোসিন ১৫৫ টাকা।

এর আগে গত ১৮ এপ্রিল ডিজেলের মূল্য লিটারপ্রতি ১৫ টাকা, পেট্রল ১৯ টাকা, অকটেন ২০ টাকা এবং কেরোসিনের দাম ১৮ টাকা বাড়ানো হয়েছিল। গত জুনে পেট্রল, অকটেন ও কেরোসিনের দাম আরও ৫ টাকা করে বাড়ে।

জ্বালানি বিভাগ বলছে, বর্তমানে প্রতি লিটার ডিজেল আমদানিতে তাদের খরচ হচ্ছে ২০৫ টাকা। দাম বাড়ানোর পরও প্রতি লিটারে ৭০ টাকা লোকসান করতে হচ্ছে।

মধ্যপ্রাচ্য সংকটের কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম অব্যাহতভাবে বৃদ্ধির কারণেই দেশে দাম বাড়াতে হয়েছে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। গতকাল সচিবালয়ে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, এই মুহূর্তে জ্বালানি তেলের মূল্য সমন্বয় করা ছাড়া কোনো বিকল্প ছিল না। উপায়হীন না হলে এই অজনপ্রিয় সিদ্ধান্তটি সরকার নিতে চাইবে না কিংবা নেবে না।

এদিকে সোমবার বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমেছে। শনিবার ইরান-সমর্থিত হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার পরও সৌদি আরব থেকে তেল সরবরাহ স্বাভাবিক হবে, এমন সম্ভাবনা রয়েছে। বিনিয়োগকারীরা এখন সেদিকেই নজর রাখছেন।

জ্বালানি তেল সাধারণত দুভাবে বিক্রি হয়। একটি হলো স্পট মার্কেটে, যে বাজার থেকে তাৎক্ষণিকভাবে তেল কেনা যায়, ফলে দাম কিছুটা বেশি পড়ে। আরেকটি হলো আগাম কেনাবেচার বাজার, যাকে বলে ফিউচার মার্কেট। সোমবার আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের নভেম্বর মাসের ফিউচার দর ২ দশমিক ১১ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি ৯৮ ডলারে নেমেছে। ১৫ সেপ্টেম্বর তা ছিল ১০৯ ডলার।

‘চাপটা বাড়ল আমাদের’

রাজধানীর গাবতলী বাস টার্মিনালের কাউন্টারগুলো ঘুরে গতকাল দেখা যায়, টার্মিনাল ছেড়ে যাওয়া বিভিন্ন রুটের বাসে ৫০ থেকে ১০০ টাকা বাড়তি ভাড়া নেওয়া হচ্ছে। শীতাতপনিয়ন্ত্রিত (এসি) ও নন-এসি—সব বাসেই বাড়তি টাকা চাওয়া হচ্ছে।

বাস টার্মিনালে ঈগল পরিবহনের টিকিট কেটেছিলেন মাগুরাগামী যাত্রী মো. রমজান। তিনি বলেন, ‘কালকে (রোববার) ৫০০ টাকা দিয়ে ঢাকায় আসছিলাম। আর এক দিন পর এখন ১০০ টাকা বেশি ভাড়া নিল।’ তিনি বলেন, ‘কদিন আগেও একবার ভাড়া বাড়ছিল। এখন আবার বাড়ায় দিল। সরকার তেলের দাম বাড়াইছে। তাই তারাও ভাড়া বাড়াইছে। চাপটা বাড়ল আমাদের।’

দূরত্বভেদে বিভিন্ন হারে বাড়তি ভাড়া নেওয়া হচ্ছে। জানতে চাইলে বাংলাদেশ বাস-ট্রাক ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান জি আর শহীদ প্রথম আলোকে বলেন, বেশি ভাড়া না নিলে বাসমালিকদের লোকসান দিতে হবে। এমন অবস্থা দু-তিন দিন থাকতে পারে। শিগগিরই ভাড়ার নতুন তালিকা ঠিক করে জানিয়ে দেওয়া হবে।

এদিকে নতুন ভাড়া ঠিক করতে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) কমিটি গতকাল বিকেলে বৈঠক করেছে। বৈঠক সূত্র বলছে, দূর পাল্লার বাসে কিলোমিটারপ্রতি ২০ পয়সা এবং নগরে ১৮ পয়সা বাড়ানোর প্রস্তাব করেছে তারা। সিদ্ধান্ত জানাবে সড়ক মন্ত্রণালয়। আজ মঙ্গলবারের মধ্যে সিদ্ধান্ত আসতে পারে।

ডিজেলের দাম বাড়লে লঞ্চসহ নৌযানের ভাড়া বাড়ে। ট্রেন চালানোর খরচ বাড়ে। তবে ভাড়া বাড়ানোর বিষয়টি নির্ভর করে রেল কর্তৃপক্ষের ওপর।

এদিকে ট্রাকভাড়াও বেড়েছে। একটু দূরের পথে ২ থেকে ৮ হাজার টাকা বাড়তি ভাড়া চাওয়ার খবর পাওয়া গেছে। চট্টগ্রামের পাইকারি ব্যবসাকেন্দ্র খাতুনগঞ্জের আদা-রসুনের আড়ত বরকত ভান্ডারের ব্যবস্থাপক নুরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, রোববার কুষ্টিয়া থেকে এক ট্রাক পণ্য আনতে ভাড়া দিতে হয়েছিল ৩২ হাজার টাকা। তেলের দাম বাড়ার পর একই পথে ট্রাকের ভাড়া চাওয়া হচ্ছে ৪০ হাজার টাকা। বাড়তি খরচ ৮ হাজার টাকা।

নুরুল ইসলাম বলেন, পরিবহন খরচ বাড়লে ব্যবসায়ীরা তো সেই টাকা নিজের পকেট থেকে দিতে পারবেন না। পণ্যের দামের সঙ্গে যোগ হবে।

খাতুনগঞ্জে গতকাল বিকেলে কথা হয় পণ্যবাহী ট্রাকের চালক মোহাম্মদ নাজমুস জামানের সঙ্গে। সাতক্ষীরা থেকে পণ্য নিয়ে গতকাল সকালে চট্টগ্রামে পৌঁছেছেন তিনি। তাঁর হিসাবে, সাতক্ষীরা থেকে চট্টগ্রাম এসে আবার ফিরে যেতে প্রায় ২৩০ লিটার ডিজেল লাগে। এ আসা-যাওয়ায় এখন থেকে তাঁর বাড়তি খরচ হবে ৪ হাজার ৬০০ টাকা।

বেনাপোলের অর্পা-অপ্সরা ট্রান্সপোর্ট এজেন্সির স্বত্বাধিকারী হাফিজুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, বেনাপোল থেকে সাড়ে ১০ টনের কাভার্ড ভ্যানে করে গার্মেন্টস পণ্য ঢাকার কাঁচপুরে নিতে ২২ হাজার টাকা ভাড়া নেওয়া হয়েছে। আগে ভাড়া ছিল ১৮ থেকে ১৯ হাজার টাকা। কুষ্টিয়ার এক বড় চালকলমালিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, এক ট্রাকে ২৬৫ বস্তা চাল পরবিহন করা যায়। এ চাল ঢাকায় পাঠাতে ট্রাকভাড়া ছিল ২০ হাজার টাকা। গতকাল এটি ২ হাজার টাকা বেড়ে ২২ হাজার টাকা হয়েছে।

সেচ খরচ বাড়বে

দেশের অর্থনীতিতে ডিজেলের গুরুত্ব বেশি। পরিবহনের পাশাপাশি কৃষি, শিল্প ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিভিন্ন পর্যায়ে ডিজেলের ব্যবহার হয়। ডিজেলের দাম বাড়লে সেচের খরচ বাড়ে। সরকারি হিসাবে, দেশে ১৩ থেকে ১৫ লাখ ডিজেলচালিত সেচযন্ত্র রয়েছে। ডিজেলের চাহিদা ১৫ শতাংশ সেচ ও কৃষি খাতের।

ডিজেলের দাম বাড়ল জেনারেটর ও বিভিন্ন যন্ত্রপাতি চালানোর ব্যয়ও বেড়ে যায়। এ খরচ পণ্যের দামের মাধ্যমে ভোক্তার ওপর চলে আসে।

বিকল্প ছিল কি

বিশ্লেষকেরা বলছেন, এভাবে বারবার জ্বালানি তেল ও বিদ্যুতের দাম বাড়ালে দেশে দারিদ্র্য বেড়ে যাবে। ইতিমধ্যে দারিদ্র্য বেড়েছে বলে বিভিন্ন সংস্থার গবেষণায় বলা হয়েছে। এমন অবস্থায় সরকারের ব্যয় কমানোর দিকে নজর দিতে হবে।

জ্বালানি তেলের ওপর থাকা উচ্চহারের করের বিষয়টিও ভাবা দরকার বলে মনে করেন কেউ কেউ। পরিশোধিত জ্বালানি তেল থেকে ২৫ শতাংশ ও অপরিশোধিত জ্বালানি তেল থেকে সাড়ে ২৭ শতাংশ শুল্ক-কর নেয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)।

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) সূত্র জানিয়েছে, জ্বালানি তেল আমদানির ট্যারিফ ভ্যালু (শুল্কায়ন মূল্য) ধরে শুল্ক হিসাব করা হতো। এতে বিশ্ববাজারে দাম বাড়লেও শুল্ক-করে চাপ বাড়ত না। জনস্বার্থে এ ব্যবস্থা অব্যাহত রাখতে ২০১৪ সালে একটি আদেশ জারি করেছিল অর্থ মন্ত্রণালয়। যদিও এনবিআর চাইছিল আমদানি মূল্যের ওপর শুল্ক–কর আরোপ করতে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় গত বছরের জুন থেকে আমদানি মূল্যের ওপর শুল্ক নির্ধারণ করা শুরু হয়। এতে প্রতি লিটার তেলে বিপিসির শুল্ক-কর বেড়ে যায়।

বিপিসি সূত্র বলছে, বর্তমানে যে দরে ডিজেল আমদানি করা হচ্ছে, তাতে লিটারপ্রতি ৩৮ টাকা শুল্ক–কর পাচ্ছে সরকার। ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন বাংলাদেশ শিল্প ও বণিক সমিতি ফেডারেশনের (এফবিসিসিআই) প্রশাসক মো. ফজলুল হক প্রথম আলোকে বলেন, জ্বালানির দাম বাড়ানোই সমস্যার একমাত্র সমাধান কি না, সেটি বিবেচনার বিষয়। জ্বালানি সরবরাহ ও বিতরণব্যবস্থার অপচয় এবং ‘সিস্টেম লস’ কমানো গেলে ব্যয় কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। দক্ষতা বাড়ানোর পরিবর্তে মূল্য বাড়ানো তুলনামূলক সহজ পথ হলেও এর অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব বেশি হতে পারে।

যুগান্তর

দৈনিক যুগান্তরের প্রথম পাতার খবর ‘যেসব কারণে দাম বাড়াতে বাধ্য হয়েছে সরকার’। প্রতিবেদনে বলা হয়, মধ্যপ্রাচ্যের সংকট প্রতিদিন নতুন মাত্রায় আবির্ভূত হচ্ছে। এর প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ও জাহাজ ভাড়া বেড়েই চলেছে। বৈশ্বিক বাজারে জ্বালানি তেলের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধিতে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) লোকসানের চাপও বেড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে দাম সমন্বয় করা ছাড়া সরকারের সামনে বিকল্প ছিল না বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। তার মতে, দেশে তুলনামূলক কম দামে তেল বিক্রি অব্যাহত রাখলে একদিকে বিপিসির লোকসান আরও বাড়ত, অন্যদিকে প্রতিবেশী দেশে তেল পাচারের ঝুঁকিও তৈরি হতো। একই সঙ্গে বিপুল ভর্তুকির কারণে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা ছিল।

সোমবার সচিবালয়ে প্রেস ব্রিফিংয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত বিপিসিকে প্রায় ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি টাকা লোকসান গুণতে হয়েছে। বিশ্ব বাজারের সঙ্গে দাম সমন্বয় না করায় প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ৩ হাজার ৮১৩ কোটি টাকা লোকসান হয়েছে।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, বছরে প্রায় ৭০ লাখ টন জ্বালানি তেল আমদানি করতে হয়। এর মধ্যে ডিজেল প্রায় ৪৫ লাখ টন। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি লিটার ডিজেলের গড় দাম প্রায় ২০৫ টাকা। এতদিন দেশে ডিজেল বিক্রি হয়েছে ১১৫ টাকায়। নতুন করে ২০ টাকা বাড়িয়ে ১৩৫ টাকা করা হলেও প্রতি লিটারে সরকারের প্রায় ৭০ টাকা লোকসান থাকবে। দাম সমন্বয় না করলে শুধু ডিজেলেই বছরে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা এবং সব ধরনের জ্বালানি তেলে প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা লোকসান হতো।

এদিকে, সরকারের নতুন সিদ্ধান্তে ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রোল ও অকটেনের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা করে বাড়ানোয় নতুন দরে ডিজেল ১৩৫ টাকা, কেরোসিন ১৫৫ টাকা, পেট্রোল ১৬০ টাকা এবং অকটেন ১৬৫ টাকা। ২১ সেপ্টেম্বর থেকে নতুন দর কার্যকর হয়েছে। জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, বর্তমান আন্তর্জাতিক বাজারদরে শুধু ডিজেলেই বিপিসির লিটারপ্রতি প্রায় ৮৯ টাকা লোকসান হচ্ছিল। দৈনিক লোকসান ছিল প্রায় ১০৯ কোটি টাকা। এ হারে এক বছরে শুধু ডিজেলেই প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা লোকসানের আশঙ্কা ছিল। লিটারপ্রতি ২০ টাকা দাম বাড়ানোর ফলে বছরে বিপিসির লোকসান প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা কমানো সম্ভব হবে বলে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

বিপিসির চেয়ারম্যান ড. মো. রফিকুল ইসলামও জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় বেশি দামে তেল কিনতে হচ্ছে। ফলে বিপিসিকে প্রতি মাসে হাজার হাজার কোটি টাকা লোকসান দিতে হচ্ছে। এ অবস্থায় আমদানি ও সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে মূল্য সমন্বয় প্রয়োজন হয়েছে।

দাম বাড়িয়েও থাকছে বড় ভর্তুকি: দাম সমন্বয়ের পরও সরকার পুরো আন্তর্জাতিক মূল্য ভোক্তার ওপর চাপিয়ে দেয়নি। প্রতিমন্ত্রী অমিতের দেওয়া হিসাবে, স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে আন্তর্জাতিক বাজারদর পুরোপুরি কার্যকর করলে ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি প্রায় ২০৫ টাকা হতো। কিন্তু সাধারণ মানুষ, গণপরিবহণ ও কৃষকের কথা বিবেচনা করে সরকার এর চেয়ে অনেক কম দামে ডিজেল বিক্রির সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ফলে দাম বাড়ানোর পরও প্রতি লিটারে বড় অঙ্কের ভর্তুকি বহন করতে হচ্ছে।

এখানেই নতুন মূল্য সমন্বয়ের আরেকটি দিক সামনে এসেছে। জ্বালানি খাতে অতিরিক্ত ভর্তুকি অব্যাহত রাখলে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির ওপর চাপ বাড়তে পারে। বিশেষ করে অসচ্ছল পরিবারকে পারিবারিক কার্ডের আওতায় আনার পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সরকারের অর্থের প্রয়োজন রয়েছে। প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, জ্বালানি খাতে ভর্তুকি দিতে গিয়ে সামাজিক সুরক্ষার অর্থ সংকুচিত করার চেয়ে উভয় খাতের মধ্যে ভারসাম্য রাখাই এখন সরকারের লক্ষ্য।

কম দামের সুযোগে পাচারের ঝুঁকি: দাম সমন্বয়ের পেছনে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে দামের ব্যবধানও বড় কারণ বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। প্রতিমন্ত্রীর দেওয়া তথ্যে, কলকাতায় প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ১৩৪ টাকা ৭৬ পয়সা, মিয়ানমারে ১৬৪ টাকা ৮৩ পয়সা, নেপালে ১৬১ টাকা ২৪ পয়সা এবং শ্রীলংকায় ১৭৯ টাকা ৪২ পয়সা। ফলে বাংলাদেশে অনেক কম দামে তেল বিক্রি হলে সীমান্তপথে পাচারের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছিল। সরকারের যুক্তি, বিদেশ থেকে বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করে আমদানি করা জ্বালানি দেশের বাইরে পাচার হয়ে গেলে তা অর্থনীতি ও জ্বালানি নিরাপত্তা-দুই দিকেই ক্ষতি তৈরি করবে। মূল্য ব্যবধান কিছুটা কমিয়ে পাচারের সুযোগ সীমিত করার পাশাপাশি বিপিসির আর্থিক চাপও কমানো যাবে। এছাড়া বাংলাদেশে ২০২৪ সালের মার্চ থেকে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয়ের স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতি চালু রয়েছে। এ ব্যবস্থায় আন্তর্জাতিক বাজারদর, আমদানি ব্যয়, শুল্ক-কর, ডলারের বিনিময় হার, বিপিসির মার্জিন, ভ্যাট ও বিতরণ ব্যয় বিবেচনায় নেওয়া হয়।

তবে এবারের পরিস্থিতি স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় আলাদা। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও পরিবহণ ব্যয় দ্রুত বেড়েছে। মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত বিপিসির লোকসান দাঁড়িয়েছে ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। এ অবস্থায় দাম একেবারে অপরিবর্তিত রাখলে বিপিসির আর্থিক সক্ষমতা আরও দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা ছিল। প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত আরও বলেন, সামনে কোনো বিকল্প না থাকায় এই কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। একই সঙ্গে জনগণের ওপর এর প্রভাবের বিষয়টি স্বীকার করে তিনি দুঃখ প্রকাশ করেছেন। তবে দাম বাড়ানোর অভিঘাত যাতে পরিবহণ ভাড়া বা পণ্যের বাজারে অযৌক্তিকভাবে না পড়ে, সে বিষয়ে সরকার নজরদারি জোরদার করেছে বলেও জানান তিনি। সরকারের এই মূল্য সমন্বয়ের মূল লক্ষ্য তাই শুধু তেলের দাম বাড়ানো নয়; বরং আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য, বিপিসির লোকসান নিয়ন্ত্রণ, জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা, পাচারের ঝুঁকি কমানো এবং একই সঙ্গে সামাজিক সুরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের জোগান ধরে রাখা। তবে এর সুফল পেতে হলে বাজারে অতিরিক্ত ভাড়া বা অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি ঠেকাতে নজরদারি কার্যকর রাখাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

সমকাল

‘পণ্য, গণপরিবহনে ব্যয় বাড়ছে’—এটি দৈনিক সমকালের প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধিতে বাসের ভাড়া বাড়ছে। গত রোববার মধ্যরাতে ডিজেলের বর্ধিত দাম কার্যকরের পর বেড়ে গেছে পরিবহন ব্যয়। বেসরকারি কনটেইনার ডিপো মালিকদের সংগঠন বিকডা ৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ ‘ফুয়েল সারচার্জ’ আরোপ করেছে।

সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) যাত্রীবাহী বাসের ভাড়া কিলোমিটারে দূরপাল্লায় ২০ পয়সা এবং নগর পরিবহনে ১৮ পয়সা বৃদ্ধির প্রস্তাব করেছে। যদিও আসনবিন্যাসের কারণে ভাড়া বাড়বে আরও বেশি। তবে সরকারের অনুমোদন পাওয়ার আগেই গতকাল সোমবার বিভিন্ন রুটের বাসে বাড়তি ভাড়া আদায় করা হয়। লঞ্চের ভাড়ার বিষয়ে সরকারি সিদ্ধান্তের আগেই খেয়া ও নৌপথে পণ্য পরিবহনে খরচ বেড়েছে।

রাজধানী ঢাকার কিছু বাসে গতকালই বর্ধিত ভাড়া নেওয়া হয়। রাজধানীর ফার্মগেট থেকে যাত্রাবাড়ী হয়ে সাইনবোর্ডের দূরত্ব ১৪ দশমিক ৪ কিলোমিটার। কিলোমিটারে দুই টাকা ৫৩ পয়সা হিসাবে এ পথের ভাড়া ৩৭ টাকা। তবে এই রুটের লাব্বাইক পরিবহনে আগেই নেওয়া হতো ৪০-৪৫ টাকা। ডিজেলের দাম বৃদ্ধিতে গতকাল নেওয়া হয় ৫০ টাকা। দূরপাল্লার বাসেও ভাড়া বৃদ্ধির খবর মিলেছে। দক্ষিণবঙ্গ থেকে ঢাকার রুটের বাসে গতকাল যাত্রীপ্রতি ৫০ টাকা বেশি নেওয়া হয়।

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার কারণে ট্রাকে পণ্য পরিবহনেও অতিরিক্ত ভাড়া গুনতে হচ্ছে। ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সবজিসহ পণ্য ট্রাকে ঢাকায় আনতে খরচ বেড়েছে। এতে চাপ পড়বে ভোক্তা পর্যায়ে।

ডিজেল-পেট্রোলের দামে রেকর্ড

ইরান যুদ্ধের পর সৌদি আরব ও ইয়েমেনের তেহরানপন্থি হুতি বিদ্রোহীদের সংঘাতে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বেড়েছে। এর প্রভাবে রোববার রাতে ডিজেল, পেট্রোল, অকটেন ও কেরোসিনের দাম বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। ডিজেলের দাম লিটারে ২০ টাকা বাড়িয়ে ১৩৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে, যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। গত ২১ এপ্রিল ডিজেলে ১৫ টাকা বৃদ্ধি করে ১১৫ টাকা নির্ধারণ করেছিল সরকার। এর আগে ২০২২ সালের ৬ আগস্ট ডিজেলের দাম ৮০ থেকে বৃদ্ধি করে ১১৪ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল। পরে কয়েক ধাপে দাম কমে।

গত এপ্রিলে পেট্রোলের দাম ১১৬ থেকে ১৩৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়। জুনে তা হয় ১৪০ টাকা। এবার হয়েছে ১৬০ টাকা। অকটেনের দাম এপ্রিলে ১২০ থেকে ১৪০ টাকা হয়েছিল। জুনে হয় ১৪৫ টাকা। এবার হয়েছে ১৬৫ টাকা।

২০২২ সালের আগস্টে পেট্রোলের দাম ৮৭ টাকা লিটার থেকে বেড়ে ১৩০ টাকা করা হয়। ৮৯ টাকার অকেটন হয়েছিল ১৩৫ টাকা। পরে কয়েক দফায় কমে পেট্রোল ও অকটেনের দাম প্রায় দুই বছর ১১৬ ও ১২০ টাকায় স্থিতিশীল ছিল। মোটরসাইকেল, প্রাইভেটকারের মতো যানবাহন চলে অকটেন ও পেট্রোলে। বাস, ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান, লঞ্চ, ট্রেন, ইঞ্জিনচালিত নৌকার মতো বাণিজ্যিক যানবাহন চলে ডিজেলে। রেল ছাড়াও যাত্রীবাহী বাস ও লঞ্চের ভাড়া সরকার নির্ধারণ করে। বাকি যানবাহন চলে চুক্তিতে। পরিবহন খাতে ব্যবহৃত জ্বালানির ৯০ শতাংশ ডিজেল।

ভাড়া বৃদ্ধিতে দেনদরবার

বাসের ভাড়া বৃদ্ধির জন্য গতকাল দুপুরে সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) কাছে প্রস্তাব করে বাস মালিকদের সংগঠন সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি। মালিকপক্ষ ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরে চলা বাসে ভাড়া কিলোমিটারে দুই টাকা ৫৩ পয়সা থেকে বাড়িয়ে দুই টাকা ৭৩ পয়সা নির্ধারণের প্রস্তাব করে। দূরপাল্লার ৫১ আসনের বাস ভাড়া দুই টাকা ২৩ পয়সা থেকে বাড়িয়ে দুই টাকা ৪৩ পয়সা নির্ধারণের প্রস্তাব করে। উভয় ক্ষেত্রে এর সঙ্গে ২০২২ সাল থেকে ডলারের দাম যত শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, ভাড়াও তত শতাংশ বৃদ্ধির দাবি করে। এতে ভাড়া দ্বিগুণ হয়ে যেত।

সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব সাইফুল আলম সমকালকে বলেন, ২০২২ সালের পর ভাড়া পুনর্নির্ধারণে জ্বালানি তেল ছাড়া কোনো কিছুই বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। এই সময়ে ডলারের দাম ৮৬ টাকা থেকে বেড়ে ১২৩ টাকা হয়েছে। এ কারণে বাসের প্রতিটি যন্ত্রাংশ এবং আমদানি ব্যয় বেড়েছে। গত এপ্রিলে ডিজেলের দাম লিটারে ১৫ টাকা বৃদ্ধিতে ভাড়া ১১ পয়সা বাড়ানো হয়। যদিও বিআরটিএর ব্যয় বিশ্লেষণ কমিটির প্রস্তাব ছিল ২২ পয়সা ভাড়া বৃদ্ধির। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা ছিল, দেশের আর্থিক পরিস্থিতির কারণে শুধু তেলের দাম সমন্বয় করার। তেলের দাম কমলে অন্যান্য ব্যয় সমন্বয় করে ভাড়া পুনর্নির্ধারণ করা হবে। মালিকরা তা মেনে নিয়েছিলেন। এখনও আর্থিক অবস্থা ঠিক হয়নি। তাই ডিজেলের দাম ২০ টাকা বৃদ্ধিতে ২০ পয়সা ভাড়া বৃদ্ধির প্রস্তাব মালিকরা মেনে নিয়েছেন।

ভাড়া কত বাড়তে পারে, তা নিয়ে বিআরটিএর ভাড়া নির্ধারণ কমিটি গতকাল সংস্থাটির বনানী সদর কার্যালয়ে পরিবহন মালিকদের সঙ্গে বৈঠক করে। সংস্থাটি জানিয়েছে, যৌক্তিক হারে ভাড়া বৃদ্ধির জন্য সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ে সুপারিশ করা হবে। মন্ত্রণালয় তা গ্রহণ করলে আজ মঙ্গলবার এ-সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারির পর বর্ধিত ভাড়া কার্যকর হবে। মালিকরা অবশ্য সোমবার রাতেই প্রজ্ঞাপন জারির প্রস্তাব করেন।

ভাড়া বাড়বে বেশি

কিলোমিটারে ২০ এবং ১৮ পয়সা ভাড়া বাড়ানোর প্রস্তাব করা হলেও প্রকৃতপক্ষে ভাড়া বাড়বে আরও বেশি। বর্তমানে ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরে বাসের ভাড়া কিলোমিটারপ্রতি দুই টাকা ৫৩ পয়সা। মিনিবাসের ভাড়া ২ টাকা ৪২ পয়সা। অন্যদিকে দূরপাল্লার পথে ৫২ আসনের বাসে কিলোমিটারপ্রতি ভাড়া দুই টাকা ২৩ পয়সা। ভাড়া নির্ধারণ কমিটির এক সদস্য জানিয়েছেন, তারা নগর পরিবহনের ভাড়া ১৮ পয়সা এবং দূরপাল্লার বাসে ২০ পয়সা বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছেন। মন্ত্রণালয় তা থেকে কিছু কমাতে পারে।

দূরপাল্লায় ৫২ আসন ধরে বাস ভাড়া নির্ধারণ করা হলেও অধিকাংশ বাস ৪০ আসনের। আরামদায়ক যাত্রার জন্য অনেক বাসে আসন সংখ্যা ৩২ থেকে ৩৬। আসন কমলে ভাড়া বাড়ে। ফলে দূরপাল্লার নন-এসি ৫২ আসনের বাসে কিলোমিটারে সরকার নির্ধারিত ভাড়া দুই টাকা ২৩ পয়সা হলেও ৪০ আসনে তা দুই টাকা ৯০ পয়সা। ৫২ আসনের বাসে দুই টাকা ৪৩ পয়সা নির্ধারণ করা হলে ৪০ আসনের ক্ষেত্রে তা হবে তিন টাকা ১৬ পয়সা। এসি বাসের ভাড়া সরকার নির্ধারণ করে না।

কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ে ‘ফুয়েল সারচার্জ’

চট্টগ্রাম ব্যুরো জানিয়েছে, ডিজেলের দাম বাড়ানোয় বেসরকারি কনটেইনার ডিপো মালিকদের সংগঠন বিকডা ৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ ‘ফুয়েল সারচার্জ’ আরোপ করেছে। কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ে এই চার্জ কার্যকর করা হবে বলে গতকাল বিকডার মহাসচিব স্বাক্ষরিত সার্কুলারে জানানো হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ডিজেলের দাম ১৭ দশমিক ৪ শতাংশ বাড়ানোয় সারচার্জ আরোপ করা হয়েছে, যা গতকাল থেকেই কার্যকর করার ঘোষণা দেন তারা।

একই পথে হাঁটছে বার্থ অপারেটরস শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটরস অ্যান্ড টার্মিনাল অপারেটরস ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন। তারাও দর বাড়ানোর প্রক্রিয়া শুরু করেছে। সংগঠনের সভাপতি ফজলে ইকরাম চৌধুরী চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান বরাবর জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয় করে নতুন দর নির্ধারণের জন্য চিঠি দিয়েছেন। তবে ব্যবসায়ীরা হঠাৎ দর বাড়ানোর এমন প্রচেষ্টাকে অযৌক্তিক বলে মন্তব্য করেছেন।

বাংলাদেশ ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপোস অ্যাসোসিয়েশনের (বিকডা) মহাসচিব রুহুল আমিন সিকদার জানান, তেলের দাম বাড়ানোয় বাধ্য হয়ে মূল্য সমন্বয় করেছেন তারা। বিষয়টি আইসিডি ব্যবহারকারীদের জানিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।

বিকডা জানায়, তাদের ফুয়েল সারচার্জের মধ্যে রয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর এবং আইসিডির মধ্যে খালি কনটেইনার পরিবহন চার্জ, পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল (পিসিটি) এবং আইসিডির মধ্যে খালি কনটেইনার পরিবহন চার্জ, খালি কনটেইনার লিফট-অন বা লিফট-অফ চার্জ, রপ্তানি পণ্য স্টাফিং/হ্যান্ডলিং প্যাকেজ চার্জ, রপ্তানি পণ্যবাহী কনটেইনারের ভিজিএম চার্জ, আমদানি পণ্য ডেলিভারি প্যাকেজ চার্জ।

রপ্তানি পণ্য স্টাফিং বা হ্যান্ডলিং প্যাকেজ চার্জের মধ্যে রয়েছে– স্টাফিংয়ের পর লোড ইয়ার্ডে রপ্তানি পণ্যবাহী কনটেইনার পরিবহন, লোড ইয়ার্ডে রপ্তানি পণ্যবাহী কনটেইনার লিফট-অফ, এম্পটি ইয়ার্ডে খালি কনটেইনার লিফট-অন, এম্পটি ইয়ার্ড থেকে সিএফএস শেড পর্যন্ত খালি কনটেইনার পরিবহন, খালি কনটেইনারে রপ্তানি পণ্য স্টাফিং, ভেসেল বা জাহাজ নির্ধারণের পর লোড ইয়ার্ডে রপ্তানি পণ্যবাহী কনটেইনার লিফট-অন এবং চট্টগ্রাম বন্দর বা পিসিটিতে রপ্তানি পণ্যবাহী কনটেইনার পরিবহন।

আমদানি করা পণ্য ডেলিভারি প্যাকেজ চার্জের মধ্যে রয়েছে আইসিডিতে কনটেইনার নামানো (লিফট-অফ), আমদানি ডেলিভারি ইয়ার্ডে কনটেইনার রাখা এবং কনটেইনার থেকে ট্রাকে আমদানি পণ্য খালাস ও ডেলিভারি (শ্রমিকসহ) এবং চট্টগ্রাম বন্দর বা পিসিটি থেকে আইসিডিতে আমদানি পণ্যবাহী কনটেইনার পরিবহন।

শুধু বন্দর নয়, চট্টগ্রাম নগরের বিভিন্ন রুটে গণপরিবহনের ভাড়া বাড়িয়ে দিয়েছেন চালক ও হেলপাররা। কোনো কোনো রুটে নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে ৩ থেকে ১০ টাকা পর্যন্ত বেশি নেওয়া হচ্ছে।

নগরের ১০ নম্বর রুটের একটি বাসে ২ নম্বর গেট থেকে আগ্রাবাদ যাওয়ার সময় ২০ টাকা ভাড়া নেওয়া হয় বলে জানান শিক্ষিকা হাসনা হেনা। তিনি বলেন, ‘আগে এই দূরত্বের ভাড়া ১৫ টাকা দিয়েছি। আজ (গতকাল) ২০ টাকা চাওয়া হয়েছে।’

ইত্তেফাক

দৈনিক ইত্তেফাকের প্রধান শিরোনাম ‘আবারও দ্রব্যমূল্য বাড়ার আশঙ্কা’। প্রতিবেদনে বলা হয়, নিত্যপণ্যের দামে চাপে থাকা বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় নতুন করে মূল্যবৃদ্ধির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এখনো অধিকাংশ পণ্যের দামে এর সরাসরি প্রভাব পড়েনি; তবে পরিবহন ও সরবরাহ ব্যয় বাড়লে সামনে নিত্যপণ্যের দাম আরো বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ী ও ক্রেতারা। এদিকে জ্বালানি তেলের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়ানোর একদিনের মধ্যেই রাজধানী ও আশপাশের বিভিন্ন রুটে গণপরিবহনের ভাড়া বেড়েছে। একই সঙ্গে পণ্য পরিবহন ও রাইডশেয়ারিংয়েও অতিরিক্ত ভাড়া চাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। হঠাত্ এই ভাড়া বৃদ্ধিতে চরম চাপে পড়েছেন নিয়মিত যাত্রীরা। ঢাকার বাইরে বিভিন্ন স্থানে গ্রাহকদের সঙ্গে অপ্রীতিকর ঘটনার তথ্য পাওয়া গেছে। রাত ১২টার পর বর্ধিত দাম কার্যকর হওয়ার আগেই বিভিন্ন পাম্পে গ্রাহক পর্যায়ে সরবরাহ কমিয়ে দেয়। এতে করে জ্বালানি নিতে আসা গ্রাহকদের সঙ্গে ফিলিং স্টেশনের কর্মীদের মারামারির ঘটনাও ঘটেছে।

সোমবার রাজধানীর খুচরা ও পাইকারি বাজার ঘুরে দেখা গেছে, এখন পর্যন্ত জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার কারণে পণ্যের দামে কোনো পরিবর্তন আসেনি। তবে পণ্য আনা-নেওয়ার খরচ যদি বাড়ে, তাহলে সামনে কিছু পণ্যের দাম বাড়তে পারে। খুচরা বিক্রেতারা বলছেন, আমরা পাইকারি বাজার থেকে যে দামে পণ্য কিনি, পরিবহন খরচ বাড়লে সেই খরচও শেষ পর্যন্ত পণ্যের দামের সঙ্গে যুক্ত হয়। তবে এখনই বলা যাচ্ছে না কোন পণ্যের দাম কতটা বাড়বে।

তবে যাত্রীবাহী পরিবহনে এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। রাজধানীর প্রবেশমুখ চিটাগং রোড, সাইনবোর্ড, যাত্রাবাড়ী ও সায়েদাবাদ থেকে চলাচলকারী বাস ও লেগুনায় রুটভেদে ৫ থেকে ১০ টাকা পর্যন্ত বাড়তি ভাড়া আদায় করা হচ্ছে। দূরপাল্লার রুটেও লেগেছে এর প্রভাব। সায়েদাবাদ থেকে খুলনা, বরিশাল, শরীয়তপুর ও মাদারীপুরগামী বাসে ৫০ টাকা পর্যন্ত এবং চট্টগ্রামগামী লোকাল বাসে ১০০ টাকা পর্যন্ত ভাড়া বাড়ানো হয়েছে বলে যাত্রীরা জানিয়েছেন।

হঠাত্ ভাড়া বাড়ায় অতিরিক্ত খরচের চাপে পড়েছেন প্রতিদিন কর্মস্থলে যাতায়াতকারী সাধারণ মানুষেরা। এতে মাস শেষে পরিবহন ব্যয় অনেকটাই বেড়ে যাবে বলে আশঙ্কা করছেন তারা। যাত্রীরা বলছেন, গণপরিবহনের পাশাপাশি জ্বালানি খরচ বেড়ে যাওয়ায় রাইডশেয়ারিং সেবাতেও বাড়তি ভাড়া চাচ্ছেন চালকরা। তবে এতে যাত্রী হারানোর আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এদিকে পণ্য পরিবহনেও ভাড়া বাড়ানোর কথা জানিয়েছেন ট্রাক ও পিকআপ চালকরা। উল্লেখ্য, গত সোমবার দিবাগত রাত ১২টা থেকে জ্বালানি তেলের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা করে বাড়ানো হয়। এরপর থেকেই গণপরিবহন ও পণ্য পরিবহনে বাড়তি ভাড়া আদায় শুরু হয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্য সংকটের কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম অব্যাহতভাবে বৃদ্ধির কারণেই দেশে দাম বাড়াতে হয়েছে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুত্, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্য সংকট প্রতিদিন নতুন মাত্রায় আবির্ভূত হচ্ছে। তেলের দাম বাড়ছে, জাহাজভাড়া বাড়ছে। এই মুহূর্তে জ্বালানি তেলের মূল্য সমন্বয় করা ছাড়া কোনো বিকল্প ছিল না। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে সোমবার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। এ সময় তিনি বলেন, উপায়হীন না হলে এই অজনপ্রিয় সিদ্ধান্তটি সরকার নিতে চাইবে না কিংবা নেবে না।

জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী বলেন, গত মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি টাকা লোকসান দিতে হয়েছে। বিশ্ববাজারের সঙ্গে মিল রেখে দাম সমন্বয় না করায় প্রতি মাসে ৩ হাজার ৮১৩ কোটি টাকা লোকসান করতে হয়েছে। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিতে সাধারণ মানুষের যে কষ্ট হবে, রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে তা উপলব্ধি করতে পারেন তিনি। তাই জনগণের কাছে দুঃখ প্রকাশ করেন প্রতিমন্ত্রী।

অনিন্দ্য ইসলাম অমিত জানান, বছরে প্রায় ৭০ লাখ টন জ্বালানি তেল আমদানি করতে হয়, যার মধ্যে ৪৫ লাখ টন ডিজেল। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি লিটার ডিজেলের মূল্য গড়ে ২০৫ টাকা। এ দফায় সমন্বয়ের আগে ডিজেল বিক্রি হয়েছে ১১৫ টাকায়। দাম সমন্বয়ের পরও প্রতি লিটারে লোকসান করতে হচ্ছে ৭০ টাকা। আগে এ লোকসান ছিল ৯০ টাকা। দাম সমন্বয় না হলে শুধু ডিজেলে বছরে ৪০ হাজার কোটি টাকা লোকসান দিতে হতো। সব তেল মিলে এটি হতো ৫০ হাজার কোটি টাকা।

নয়া দিগন্ত

‘নিরুপায় সরকার, দুর্ভোগ বাড়বে সাধারণ মানুষের’—এটি দৈনিক নয়া দিগন্তের প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) লোকসান সামাল দিতে দেশের বাজারে সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম এক লাফে লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়িয়েছে সরকার। ২১ সেপ্টেম্বর থেকে নতুন দামে ডিজেল বিক্রি হচ্ছে ১৩৫ টাকা লিটার, যা আগে ছিল ১১৫ টাকা। কেরোসিনের দাম ১৩৫ থেকে বেড়ে হয়েছে ১৫৫ টাকা, পেট্রোল ১৪০ থেকে ১৬০ টাকা এবং অকটেন ১৪৫ থেকে ১৬৫ টাকা।

জ্বালানি তেলের এই মূল্যবৃদ্ধি শুধু পরিবহন খাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; কৃষি, শিল্প, পণ্য পরিবহন, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ব্যয়েও এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে ডিজেলের দাম বাড়ায় এর প্রভাব অর্থনীতির বিভিন্ন স্তরে ছড়িয়ে পড়তে পারে। কারণ দেশের মোট পেট্রোলিয়াম ব্যবহারের প্রায় ৬৪ শতাংশই ডিজেল এবং এর সবচেয়ে বড় ব্যবহার পরিবহন খাতে; কৃষি, বিদ্যুৎ ও শিল্পেও এর উল্লেখযোগ্য ব্যবহার রয়েছে।

ইতোমধ্যে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পরিবহন ভাড়া বাড়ানোর প্রবণতা দেখা দিয়েছে। ফলে উচ্চ মূল্যস্ফীতির মধ্যে থাকা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরো বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, সরকার একদিকে বিপিসির বড় অঙ্কের আর্থিক ক্ষতি সামাল দিতে চাচ্ছে, অন্য দিকে আন্তর্জাতিক বাজারের বাড়তি ব্যয়ের পুরোটা ভোক্তার ওপর না চাপিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করছে। তবে হঠাৎ করে ২০ টাকা বাড়ানোর ফলে অর্থনীতিতে এর ‘দ্বিতীয় দফার’ প্রভাব, বিশেষ করে পরিবহন, কৃষি ও খাদ্যপণ্যের দামে দেখা দিতে পারে।

‘সরকার নিরুপায় হয়েই দাম বাড়িয়েছে’

নতুন থিংক ট্যাঙ্ক ‘নলেজ হাব ইনস্টিটিউট ট্রাস্ট’-এর প্রেসিডেন্ট অর্থনীতিবিদ ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, সরকার অনেকটা নিরুপায় হয়েই জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়েছে। কারণ সরকারের বর্তমান আর্থিক সক্ষমতা দিয়ে দীর্ঘ সময় বড় অঙ্কের ভর্তুকি বহন করা কঠিন। তার মতে, আন্তর্জাতিক বাজারের বাড়তি দাম এবং বিপিসির ক্রমবর্ধমান লোকসানের কারণে সরকারকে শেষ পর্যন্ত মূল্য সমন্বয়ের পথে যেতে হয়েছে।

তবে তিনি মনে করেন, এর নেতিবাচক প্রভাব মূল্যস্ফীতিতে পড়বে। ডিজেলের দাম বাড়ার কারণে পরিবহন ব্যয় যেমন বাড়বে, তেমনি কৃষকের সেচ ব্যয়ও বাড়বে। ফলে খাদ্য ও অন্যান্য পণ্যের দামেও এর প্রভাব পড়তে পারে।

সরকারের মূল্য সমন্বয়ের সিদ্ধান্তের পেছনে আন্তর্জাতিক বাজারের পরিস্থিতি বড় ভূমিকা রেখেছে। জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ জানিয়েছে, মার্চ থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেল ও ফ্রেইটের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এ সময় দেশীয় বাজারে পুরোপুরি মূল্য সমন্বয় না করায় মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত বিপিসির প্রায় ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি ৬৬ লাখ টাকা লোকসান হয়েছে।

ছয় মাসে বিপিসির লোকসান ২৩ হাজার কোটি টাকা

সরকারের হিসাবে, বর্তমান আন্তর্জাতিক বাজারদরে প্রতি লিটার ডিজেলে বিপিসির লোকসান প্রায় ৮৯ টাকা পর্যন্ত দাঁড়িয়েছিল। এর ফলে দৈনিক লোকসান প্রায় ১০৯ কোটি টাকা এবং একই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে শুধু ডিজেলেই বছরে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা লোকসান হতে পারত। নতুন মূল্য সমন্বয়ের ফলে বিপিসির বার্ষিক লোকসান প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা কমবে বলে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে।

বিপিসির চেয়ারম্যানের পক্ষ থেকেও বলা হয়েছে, প্রতি লিটার ডিজেলে সংস্থাটির প্রায় ৯০ টাকা পর্যন্ত লোকসান হচ্ছিল। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারের সাথে সামঞ্জস্য না রেখে দীর্ঘ সময় একই দামে জ্বালানি বিক্রি করা কঠিন হয়ে পড়েছিল। সরকারের আরেকটি যুক্তি হলো সীমান্তপথে জ্বালানি পাচার। প্রতিবেশী কয়েকটি দেশে ডিজেলের দাম বাংলাদেশের তুলনায় বেশি হওয়ায় দেশের তুলনামূলক কম দামের জ্বালানি পাচারের ঝুঁকি সৃষ্টি হচ্ছিল। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিতও বলেছেন, বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করে আমদানি করা জ্বালানি দেশের অভ্যন্তরে তুলনামূলক কম দামে বিক্রি হওয়ায় পাচারের ঝুঁকি বাড়ছিল।

অর্থনীতির ওপর বহুমুখী চাপ

জ্বালানি তেল অর্থনীতির প্রায় প্রতিটি উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থার সাথে যুক্ত। ফলে এর দাম বাড়লে সরাসরি ও পরোক্ষ- দুই ধরনের প্রভাবই তৈরি হয়।

মূল্যস্ফীতির নতুন চাপ: ডিজেলের দাম বৃদ্ধির সাথে বাস, ট্রাক, লঞ্চসহ বিভিন্ন পরিবহন ব্যবস্থার পরিচালন ব্যয় বাড়বে। পণ্য পরিবহনের ব্যয় বাড়লে উৎপাদক থেকে পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে তার প্রভাব পড়তে পারে। এর ফলে চাল, ডাল, সবজি, মাছ, গোশতসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ার চাপ সৃষ্টি হতে পারে। অর্থনীতিবিদ ফাহমিদা খাতুনও সতর্ক করেছেন যে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি জীবনযাত্রার ব্যয় ও মূল্যস্ফীতির ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

কৃষিতে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে: দেশের কৃষি খাত সেচ, জমি প্রস্তুত, ফসল পরিবহনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ডিজেলের ওপর নির্ভরশীল। ডিজেলের দাম বাড়ায় সেচযন্ত্র, ট্রাক্টর ও পণ্য পরিবহনের ব্যয় বাড়বে। এর ফলে কৃষকের উৎপাদন ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি বাজারে খাদ্যপণ্যের দামেও এর প্রভাব পড়তে পারে।

বণিক বার্তা

দৈনিক বণিক বার্তার প্রধান শিরোনাম ‘বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেল সর্বোচ্চ রেকর্ডে নয়, দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ দাম’। প্রতিবেদনে বলা হয়, আন্তর্জাতিক বাজারে এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহের রেকর্ডের পর দাম দ্রুত কমে আসে। ১৭ এপ্রিল ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের ভবিষ্যৎ সরবরাহ মূল্য ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৯০ ডলারে নেমেছিল।

বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম এখন ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে নেই। অথচ বাংলাদেশে ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রল ও অকটেন—চার ধরনের জ্বালানি তেলের দামই পৌঁছেছে সর্বকালের সর্বোচ্চ পর্যায়ে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও সরবরাহ সংকটে চলতি মাসে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি সর্বোচ্চ প্রায় ১১০ ডলারে উঠলেও তা চলতি বছরের এপ্রিল কিংবা ২০০৮ সালের রেকর্ড দামের তুলনায় অনেক কম। অতীতের বড় বৈশ্বিক জ্বালানি তেল সংকটের সময় আন্তর্জাতিক বাজারে দাম রেকর্ড বা রেকর্ডের কাছাকাছি পৌঁছার পর দেশে বড় মূল্য সমন্বয় করা হয়েছিল। এবার বিশ্ববাজার সেই পর্যায়ে না উঠতেই সরকার চার ধরনের জ্বালানির দাম একসঙ্গে লিটারে ২০ টাকা করে বাড়িয়েছে। এ নিয়ে চলতি বছর তিন দফায় মূল্য সমন্বয়ের পর ডিজেলের দাম মোট ৩৫ টাকা, কেরোসিন ৪৩, পেট্রল ৪৪ ও অকটেন ৪৫ টাকা বেড়েছে। এপ্রিলের আগের দামের তুলনায় এখন এসব জ্বালানির মূল্য প্রায় ৩৫ থেকে ৩৮ শতাংশ বেশি।

সরকারের সর্বশেষ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, গতকাল থেকে প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ১১৫ থেকে ১৩৫ টাকা, কেরোসিন ১৩৫ থেকে ১৫৫, পেট্রল ১৪০ থেকে ১৬০ ও অকটেন ১৪৫ থেকে ১৬৫ টাকা হয়েছে। শতাংশের হিসাবে ডিজেলের দাম ১৭ দশমিক ৪, কেরোসিন ১৪ দশমিক ৮, পেট্রল ১৪ দশমিক ৩ ও অকটেন ১৩ দশমিক ৮ শতাংশ বেড়েছে।

দেশে যখন এ মূল্যবৃদ্ধি কার্যকর হয়েছে, তখন আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম ঐতিহাসিক সর্বোচ্চ অবস্থানে ছিল না। সৌদি আরবের ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনে হামলা এবং মধ্যপ্রাচ্যে সরবরাহ নিয়ে নতুন উদ্বেগের কারণে চলতি মাসের মাঝামাঝি ব্রেন্টের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১১০ ডলারের দিকে উঠেছিল। তবে ১৮ সেপ্টেম্বর আবার কমে ১০৪ ডলারে নামে। এমনকি গতকাল রাত ৯টার দিকে ব্যারেলপ্রতি ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ছিল ৯৯ ডলার। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম সর্বোচ্চ রেকর্ডে না থাকলেও দেশে ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রল ও অকটেনে দাম বাড়ানো হয়েছে। এতে চার পণ্যের খুচরা মূল্যই দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।

এ বিষয়ে সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. নাজনীন আহমেদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম ২০০৮ বা ২০২২ সালের সর্বোচ্চ পর্যায়ের মতো নয়। তবে চার ধরনের জ্বালানির দাম একসঙ্গে লিটারে ২০ টাকা বাড়ানোর বিষয়টি শুধু আন্তর্জাতিক বাজারের মূল্য দিয়ে ব্যাখ্যা করলে পুরো চিত্র পাওয়া যাবে না। এখানে বিপিসির আর্থিক চাপ ও সরকারের ভর্তুকি ব্যবস্থাপনার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। তবে আমার বিবেচনায়, একবারে সব ধরনের জ্বালানির দাম একই পরিমাণে না বাড়িয়ে আরো পরিমিত ও লক্ষ্যভিত্তিক পদ্ধতি নেয়া যেত।’

ডিজেল বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রায় সব খাতকে প্রভাবিত করে জানিয়ে তিনি আরো বলেন, ‘দেশে মোট পেট্রোলিয়াম পণ্য ব্যবহারের প্রায় ৬৪ শতাংশই ডিজেল। এর বড় অংশ পরিবহন, কৃষি ও অন্যান্য উৎপাদনমূলক কর্মকাণ্ডে ব্যবহৃত হয়। ফলে ডিজেলের দাম প্রায় ১৭ দশমিক ৪ শতাংশ বাড়ানোর প্রভাব শুধু পরিবহন ভাড়ায় সীমাবদ্ধ থাকবে না; কৃষি উৎপাদন, পণ্য পরিবহন, শিল্পের উৎপাদন ও বিপণন ব্যয়ের মধ্য দিয়ে তা পুরো অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়তে পারে। আপাতত ডিজেল ও কেরোসিনের দাম অপরিবর্তিত রেখে পেট্রল ও অকটেনের ক্ষেত্রে তুলনামূলক বেশি সমন্বয় করা যেত। আবার ভর্তুকি কমানোর প্রয়োজন থাকলে সেটিও ধাপে ধাপে করা সম্ভব ছিল। একই সঙ্গে জ্বালানির ওপর বিদ্যমান কর ও শুল্ক কাঠামো সাময়িকভাবে যৌক্তিকীকরণের সুযোগ আছে কিনা সেটিও বিবেচনা করা প্রয়োজন ছিল।’

পাঁচ মাস আগে আন্তর্জাতিক বাজারে পরিস্থিতি ছিল আরো সংকটপূর্ণ। ইরান যুদ্ধ ও হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি তেল পরিবহন ব্যাহত হওয়ার পর তাৎক্ষণিক সরবরাহযোগ্য অপরিশোধিত ব্রেন্টের দাম ব্যারেলপ্রতি রেকর্ড ১৪৪ দশমিক ৪২ ডলারে ওঠে। ওই মাসেই ফিউচার মার্কেটে ব্রেন্টের দামও ১২৬ ডলার পর্যন্ত উঠেছিল। অর্থাৎ সেপ্টেম্বরে বিশ্ববাজারে যে চড়া মূল্য দেখা গেছে, তা এপ্রিলের রেকর্ড মূল্যের অনেক নিচে।

তবে মূল্যবৃদ্ধির যৌক্তিকতা তুলে ধরে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম দ্বিগুণের বেশি বাড়লেও জনস্বার্থে এতদিন দেশে দাম বাড়ানো হয়নি। এছাড়া দেশে জ্বালানি তেলের দাম কম থাকায় প্রতিবেশী দেশগুলোতে পাচারের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এ অবস্থায় জ্বালানি তেল পাচার রোধ, বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় এবং বিপিসির লোকসান কমাতে দাম সমন্বয় করা হয়।

আজকের পত্রিকা

‘জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি: বাড়তি ব্যয়ের শঙ্কা জনজীবনে’—এটি দৈনিক আজকের পত্রিকার প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, নিরুপায় হওয়ার যুক্তি দিয়ে সরকার সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম উল্লেখযোগ্য হারে বাড়িয়েছে। এর ফলে জ্বালানি তেলের দাম দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠেছে। গণপরিবহন খাতসহ প্রত্যক্ষভাবে জ্বালানি তেল ব্যবহারকারী নাগরিক সমাজের মধ্যে তাৎক্ষণিকভাবে এতে উদ্বেগ ও ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে। কিন্তু জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব পেট্রলপাম্পে সীমিত থাকে না। সব ধরনের পণ্য পরিবহন, কৃষি, শিল্প, বিদ্যুৎ উৎপাদনসহ অর্থনীতির সব ক্ষেত্রে ব্যয় বেড়ে মানুষের দৈনন্দিন জীবনে চাপ সৃষ্টি করে।

ইতিমধ্যেই সরকারি কর্মচারীদের বড় ধরনের বেতন বৃদ্ধির প্রভাবে দ্রব্যমূল্যের গতিপ্রকৃতি নিয়ে জনমনে উদ্বেগ রয়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে জ্বালানি তেলের দাম এতটা বাড়ানোর ফলে নিত্যপণ্যের দাম তথা জীবনযাত্রার সামগ্রিক খরচ আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কায় রয়েছে নির্ধারিত আয়ের মানুষ। আয় একই হারে না বাড়লে কমে যেতে পারে প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা। সব মিলিয়ে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, চলমান উচ্চ মূল্যস্ফীতির মধ্যেই জ্বালানি তেলের এই মূল্যবৃদ্ধিতে সবচেয়ে বেশি চাপে পড়তে পারেন নিম্ন ও সীমিত আয়ের মানুষ। গণপরিবহন খাতে ডিজেলের ব্যবহার ব্যাপক হওয়ায় বাস, ট্রাক ও পণ্যবাহী যান চলাচলের ব্যয় বাড়বে। এর প্রভাব পড়তে পারে কৃষিপণ্যসহ বিভিন্ন পণ্যের পরিবহন ও সরবরাহ-ব্যবস্থায়। ডিজেলচালিত সেচ ও কৃষিযন্ত্রের ওপর নির্ভরশীল কৃষকের খরচ বাড়লে তার উৎপাদন ব্যয়ও বাড়বে। একইভাবে শিল্পকারখানার জেনারেটর, পরিবহন ও বিভিন্ন যন্ত্রপাতির পরিচালন ব্যয় বাড়লে উৎপাদন খরচ বৃদ্ধির আশঙ্কা রয়েছে। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো বাড়তি ব্যয়ের একটি অংশ পণ্যের দামে স্থানান্তর করলে শেষ পর্যন্ত চাপ পড়বে ভোক্তার ওপর।

এ বিষয়ে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশেষ ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন আজকের পত্রিকাকে বলেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় পরিবহন, কৃষি, শিল্প ও ব্যবসার খরচ বাড়বে। এর প্রভাব ধীরে ধীরে চাল, সবজি ও অন্যান্য নিত্যপণ্যের দামে পড়তে পারে। ফলে মূল্যস্ফীতিও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। উৎপাদন খরচ বাড়লে দেশীয় শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ও বিনিয়োগও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। সবচেয়ে বেশি চাপে পড়বে নিম্ন ও নির্দিষ্ট আয়ের মানুষ।

ফাহমিদা খাতুন সরকারকে পরিবহন ভাড়া যৌক্তিকভাবে নির্ধারণ, বাজার তদারকি এবং দরিদ্র পরিবার, কৃষক ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা দেওয়ার পরামর্শ দেন। তাঁর মতে, একই সঙ্গে জ্বালানি আমদানির ওপর কর ও অন্যান্য ব্যয় পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।

গত রোববার সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা করে বাড়ানোর ঘোষণা দেয় সরকার, যা সেদিন মধ্যরাতের পর থেকেই কার্যকর হয়েছে। ডিজেলের দাম ১৩৫ টাকা, কেরোসিন ১৫৫, পেট্রল ১৬০ এবং অকটেন ১৬৫ টাকা লিটার নির্ধারণ করা হয়েছে। এর আগে দাম ছিল যথাক্রমে ১১৫, ১৩৫, ১৪০ ও ১৪৫ টাকা।

এদিকে গতকাল আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৮ ডলার কমেছে, যা দেশীয় মুদ্রায় প্রায় এক হাজার টাকা। এক ব্যারেল অপরিশোধিত তেল হচ্ছে ১৫৯ লিটার। কয়েক বছর ধরে সরকার আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সংগতি রেখে মাসওয়ারিভাবে জ্বালানির দাম কমানো-বাড়ানোর নীতি অনুসরণ করে আসছিল। তবে এবার মূল্যবৃদ্ধির পেছনে সরকার সাম্প্রতিককালের ভর্তুকির বোঝা কমানোর যুক্তি দিয়েছে।

বিএনপি সরকার গত ফেব্রুয়ারি মাসে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে সাত মাসে চার ধরনের জ্বালানি তেলের দাম তিন দফায় ৩৫ থেকে ৪৫ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। সরকার প্রথম থেকেই মূল্যস্ফীতি কমানোর ওপর জোর দেওয়ার কথা বলে আসছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত তা কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে নামেনি। সবশেষ আগস্টের শেষে দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ২৬ শতাংশ।

এর আগে ২০২২ সালের আগস্টে জ্বালানি তেলের দাম এক দফায় বড় হারে বাড়ানো হয়েছিল। তখন ডিজেলের দাম ৮০ টাকা থেকে ১১৪, পেট্রল ৮৬ থেকে ১৩০ এবং অকটেন ৮৯ থেকে ১৩৫ টাকা করা হয়। একই সময়ে সার্বিক মূল্যস্ফীতি জুলাইয়ের ৭ দশমিক ৪৮ শতাংশ থেকে আগস্টে বেড়ে ৯ দশমিক ৫২ শতাংশে ওঠে। তবে ওই সময় মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির পেছনে জ্বালানির দাম ছাড়াও আন্তর্জাতিক বাজার, আমদানি ব্যয়, জাহাজভাড়া, ডলার-সংকটসহ বিভিন্ন কারণ ছিল।

দেশ রূপান্তর

দৈনিক দেশ রূপান্তরের প্রথম পাতার খবর ‘বিরূপ প্রভাব নানা খাতে, জনমনে উদ্বেগ’। প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রায় ছয় মাসে সব ধরনের নিত্য ব্যবহার্য জ্বালানি তেলের দাম ৩৩ থেকে ৩৮ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। সর্বশেষ গত রবিবার দাম বৃদ্ধির পর সরকার বলছে, মধ্যপ্রাচ্য-সংকটজনিত পরিস্থিতিতে লোকসান কমাতে বাধ্য হয়ে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়েছে। আর বিশ্লেষকরা আশঙ্কা করছেন, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিতে বিরূপ প্রভাব পড়বে নানা খাতে। পণ্য ও সেবার দাম বেড়ে যাবে। একই সঙ্গে বাড়তি খরচ জোগানোর চিন্তায় জনমনে বাড়ছে উদ্বেগ। অন্যদিকে সরকারের হাতে পরিশোধন ক্ষমতা না থাকায় জ্বালানি তেলের দাম নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয় বলে মনে করা হচ্ছে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল প্রথম ইরানে হামলা চালায়। মার্চজুড়ে হামলা ও পাল্টা হামলায় মধ্যপ্রাচ্য অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে। এতে জ্বালানি তেলের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। এরপর যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শান্তি আলোচনা শুরু হলে তেলের বাজার আবার নিম্নমুখী হয়। শান্তি আলোচনা ভেস্তে গেলে গত ২১ জুন যুক্তরাষ্ট্র ফের ইরানের তিনটি পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালায়। ইরানও মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের ওপর পাল্টা হামলা চালায়। ফলে বিশ্বের জ্বালানি তেলের বড় অংশের জোগানদাতা এসব দেশ অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে। গত ১৭ এপ্রিল রাতে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর সময় সরকারের তরফ থেকে বলা হয়েছিল, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় সরকার বাধ্য হয়ে জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়েছে। পরে দাম কমলে তা সমন্বয় করা হবে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত জনগণের কাছে এজন্য দুঃখ প্রকাশ করেন। গতকাল প্রতিমন্ত্রী দাম বাড়ানোর পর একই কথা বলেছেন। তিনি বলেন, ‘জ্বালানি তেলে ভর্তুকি অব্যাহত রাখতে হলে সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি ঝুঁকিতে পড়বে।’

মাত্র ছয় মাসে ৪০ শতাংশের কাছাকাছি জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিতে শঙ্কিত সাধারণ মানুষ। কারণ পণ্য ও সেবার দামে এর সরাসরি প্রভাব পড়বে। এপ্রিলে তেলের দাম বাড়ায় ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরে বাস ও মিনিবাসের ভাড়া প্রতি কিলোমিটারে ২ টাকা ৪২ পয়সা থেকে বেড়ে হয় ২ টাকা ৫৩ পয়সা। দূরপাল্লার পথে বাস ভাড়া কিলোমিটারে ২ টাকা ১২ পয়সা থেকে বেড়ে ২ টাকা ২৩ পয়সা হয়। একই পরিমাণ তেলের দাম আবার বাড়ায় আবারও বাস ভাড়া বাড়ানোর দাবি তুলেছেন পরিবহন মালিকরা। ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধিতে কেবল বাসের ভাড়া নয়, সব পণ্যের পরিবহন ব্যয়ও বাড়াবে, যার প্রভাব পড়বে পণ্যের দরে।

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) ভাইস প্রেসিডেন্ট নাজের হোসাইন বলেন, ‘জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে শিল্প-কারখানা, ব্যবসা-বাণিজ্য, গণপরিবহন ও পণ্যপরিবহনের খরচ বাড়বে। শেষ পর্যন্ত এর চাপ পড়বে ভোক্তার ওপর। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও সেবার দামও আরেক দফা বাড়তে পারে।’

তিনি বলেন, আগেও বিভিন্ন অজুহাতে ব্যবসায়ীরা পণ্যের দাম বাড়িয়েছে। এবারও তেলের দাম বাড়ায় পণ্যের দাম বাড়ার শঙ্কা রয়েছে। সংকট মোকাবিলায় বিপিসির অতীতের মুনাফার অর্থের ব্যবহার ও জ্বালানি খাতের অপচয়-অনিয়ম বন্ধের বিষয়টি বিবেচনা করা উচিত।

শোধিত জ্বালানি তেলের পার্থক্য: বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের একজন কর্মকর্তা গতকাল নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, গত ফেব্রুয়ারিতে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে বিপিসি প্রতি ব্যারেল ডিজেল কিনেছে ৮৬ ডলারে। আগস্টে ডিজেলের ব্যারেলপ্রতি দাম ছিল ১৪৮ দশমিক ৫৭ ডলার। গত ফেব্রুয়ারিতে অকটেনের দাম ব্যারেলপ্রতি ছিল ৭৪ দশমিক ৩ ডলার, আগস্টে যা ছিল ১০৮ দশমিক ৩২ ডলার। ফার্নেস অয়েলের দাম ছিল প্রতি টন ৪২৮ দশমিক ০৮ ডলার, আগস্টে যা ছিল ৫৭৭ দশমিক ৫০ ডলার। দেশে মোট জ্বালানি তেলের চাহিদা ৭০ লাখ টনের বিপরীতে দেশের পরিশোধন ক্ষমতা ১৫ লাখ টন। তবে গড়ে ১২ লাখ টন তেল পরিশোধন করা হয়। অর্থাৎ ৫৮ লাখ টনই পরিশোধিত তেল কেনা হয়। পরিশোধিত তেল কিনতে সরকারকে বাড়তি মূল্য গুনতে হয়।

বাংলাদেশ কেন জ্বালানি তেলের দাম নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না: আন্তর্জাতিক বাজারে গত ফেব্রুয়ারিতে ইরান-সংকটের আগে ব্যারেলপ্রতি অশোধিত তেলের (ক্রুড অয়েল) গড় দাম ছিল ৭১ দশমিক ১৫ ডলার। মার্চে দাম বেড়ে হয় ১০৩ দশমিক ৮৯ ডলার, এপ্রিলে ছিল ১২১ দশমিক ৬৭ ডলার, মে মাসে ছিল ১০৭ দশমিক ৫৫ ডলার, জুনে ৮৫ দশমিক ৪৭ ডলার, জুলাই মাসে ৮৩ দশমিক ৪১ ডলার, আগস্টে বেড়ে হয় ৯০ ডলার এবং সেপ্টেম্বরে এখন পর্যন্ত গড় দাম ৬৭ দশমিক ৪৩ ডলার। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক বাজারে অশোধিত তেলের দাম কমেছে। তাহলে দেশে কেন দাম বাড়ে?

এমন প্রশ্নে বিপিসির ওই কর্মকর্তা জানান, ফেব্রুয়ারিতে মেরিন ফুয়েলের দাম ছিল টনপ্রতি ৪৭০ দশমিক ৪৩ ডলার, এখন যা বেড়ে হয়েছে ৫৭৭ দশমিক ৫০ ডলার। তেল আনার জাহাজ ভাড়াও বেড়ে গেছে। তেলের বাজারমূল্য বাড়ায় ইন্স্যুরেন্স চার্জও বেড়েছে। বেড়েছে প্রিমিয়াম। সব কিছু যোগ করলে শোধিত জ্বালানির দাম অনেকাংশে বেড়েছে।

তিনি বলেন, ‘আমাদের পরিশোধন ক্ষমতা কম, তেল সংরক্ষণ ক্ষমতাও কম। আমরা তিন মাসের তেলও সংরক্ষণ করতে পারি না। কিন্তু অনেক দেশ এক বছরের বেশি তেল মজুদ রাখতে পারে। সেসব দেশের পরিশোধন ক্ষমতা বেশি। বিশ্ববাজারে যখন অশোধিত তেলের দাম কম থাকে, তখন তারা বেশি করে তেল কিনে পরিশোধন করে রাখে। বিপরীতে বিপিসির না আছে পরিশোধন ক্ষমতা, না আছে মজুদের ক্ষমতা। ফলে তেলের দাম বছরের কোনো সময়ে কমলে বাংলাদেশ বিশেষ কোনো সুবিধা নিতে পারে না।’

বাংলাদেশ প্রতিদিন

‘দুই ব্যক্তি ঘিরে রহস্য’—এটি দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিনের প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, দ্বিতীয় স্ত্রী মোছাম্মৎ মরিয়ম খাতুনের লাশ উদ্ধারের ঘটনায় নারীকাণ্ডের বিতর্কিত এমপি গাজী নজরুল ইসলামের ভূমিকা নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে আপত্তিকর ভিডিও ভাইরালের পর থেকে সম্পর্কের অবনতি, মরিয়মের মামার সঙ্গে দ্বন্দ্ব এবং প্রথম স্ত্রীকে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়গুলো মরিয়মের মনে ধীরে ধীরে চরম ক্ষোভ জন্ম নেয় বলে জানা গেছে। মৃত্যুর আগে মরিয়মের লিখে যাওয়া চিরকুট ও বাবার কাছে ফোন করে জানানো অভিযোগগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে-চরম মানসিক ট্রমায় সংসার চালিয়ে যাচ্ছিলেন মরিয়ম।

তবে এসব কিছু ছাপিয়ে রহস্যের জন্ম দিয়েছে সাতক্ষীরার দুই ব্যক্তি। সাতক্ষীরার মানুষ মঞ্জু সরদার ও সোবহান গাজী নামের এই দুই ব্যক্তিকে গাজী নজরুল ইসলামের ডান ও বাঁ-হাত হিসেবেই চেনে। একাধিক সূত্র বলেছে, গাজী নজরুলের যত অপকর্মের সাক্ষী হলেন এই দুই ব্যক্তি। ন্যাম ভবনের ওই বাসায় আসাযাওয়া ছিল এই দুজনের। ঘটনার দুই দিন আগে তাঁরা ন্যাম ভবনে এমপি নজরুলের বাসভবনে আসেন। মরিয়মের মৃত্যুর ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পরই তাঁরা লাপাত্তা। একাধিক সূত্র বলেছে, তাঁরা দুজন কেন ওই বাসায় এসেছিলেন-সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে গোয়েন্দারা। তাঁদের দুজনকে আটক করার চেষ্টা চলছে বলে নিশ্চিত করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটি সূত্র। এমপি নজরুলের ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো বলছে, মঞ্জু সরদার ও সোবহান গাজীর সঙ্গে কোনো রক্তের সম্পর্ক না থাকলেও নজরুলের সব গোপন কাজের সাক্ষী ছিলেন তাঁরা। গোয়েন্দারা এখন এই দুই ব্যক্তির খোঁজ করছে।

সাতক্ষীরার শ্যামনগরের বাসিন্দারাও এই দুইজনকে এমপির ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি হিসেবেই চেনেন। প্রায়ই তাঁরা ঢাকার ন্যাম ভবনে নজরুলের বাসায় আসতেন। ঘটনার দিন সকালে গাজী নজরুল ইসলাম আদালতে যাওয়ার পরেও ওই দুই ব্যক্তি বাসাতেই ছিলেন। রহস্যজনক কারণে ঘটনার পর থেকে তাঁরা হাওয়া হয়ে যান। গোয়েন্দা সূত্র জানিয়েছে, ওই দুজনকে আটক করা গেলে মরিয়মের মৃত্যুরহস্যের জট খুলতে পারে। কারণ তাঁদের ওই বাসায় অবস্থান করা ও হুট করেই লাপাত্তা হয়ে যাওয়া সন্দেহের জন্ম দিয়েছে। তাঁদের আটক করে এমপি নজরুলের মুখোমুখি করা হতে পারে বলে জানা গেছে। এদিকে বিভিন্ন কারণে পারিবারিক কলহের বিষয়টি প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করেছেন গাজী নজরুল ইসলাম। তাঁর প্রথম স্ত্রী মোছাম্মৎ মাকছুদা ইসলাম কৌশলে এড়িয়ে যাচ্ছেন তাঁর দায়। তবে মরিয়মকে দূরে রাখতে তিনিও ভূমিকা রেখেছেন বলে ধারণা করছে পুলিশ। গতকাল তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

এদিকে মেয়ের মৃত্যুর পেছনে জড়িতদের সর্বোচ্চ শাস্তি চেয়েছেন মরিয়মের বাবা এস এম মাসুম বিল্লাহ। গতকাল শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গের সামনে আহাজারি করতে করতে এমপি নজরুলসহ অন্যদের বিচার দাবি করেন তিনি। এ সময় মরিয়মের মাকেও আহাজারি করতে দেখা যায়। মাসুম বিল্লাহ বলেন, সঠিক তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত দোষীরা যেন শাস্তি পায়। এ ঘটনার জন্য নিজের শ্যালক ওবায়দুর রহমানকে (মামলার আসামি) দায়ী করে মাসুম বিল্লাহ বলেন, ‘মরিয়ম বলত, আমি বাইরে মুখ দেখাব কীভাবে। সে আমার মামা, আমার এত বড় ক্ষতি করবে আমি বুঝতে পারিনি। আমি বাপের থেকে তাঁকে বেশি বিশ্বাস করতাম। বিশ্বাস করে আজকে আমি ওই পরিণতি ভোগ করতেছি।’ ময়নাতদন্ত শেষে লাশ গ্রামের বাড়ি সাতক্ষীরার শ্যামনগরে নেওয়া হয়। তবে অ্যাম্বুলেন্স ভাড়ার ১৭ হাজার টাকা ধার করেন মরিয়মের বাবা। এই বিপদের সময়েও এমপি নজরুলের পরিবার তাঁদের কোনো খোঁজ নেয়নি বলেও অভিযোগ করেন মাসুম বিল্লাহ। তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর থেকেই মরিয়ম খাতুনের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি হয় এমপি গাজী নজরুল ইসলামের। এরপর এমপি, তাঁর প্রথম স্ত্রী-এমনকি পিএস হাসান মরিয়মকে কটু কথা বলতেন। অনেক সময় গালিগালাজও করতেন। বাসাতে তিনটি বেড রুম থাকলেও দুই বউকে নিয়ে একই রুমে থাকতেন গাজী নজরুল। এটিতে মরিয়ম চরম আপত্তি জানান। তিন রুমের একটিতে মাঝেমধ্যে থাকতেন পিএস হাসান। ওই রুমে মরিয়মকে থাকতে বলা হয়। এতে মরিয়ম রাজি হননি। পরে যে রুমে ঝুলন্ত লাশ পাওয়া যায় সেই রুম মরিয়মকে দেওয়া হয়। কয়েক দিন ধরে ওই রুমে থাকছিলেন মরিয়ম। রুম আলাদা হওয়ার পর এমপি গাজী নজরুলের সঙ্গে তাঁর দূরত্ব বাড়তে থাকে। যা তাঁর মনে চরম ক্ষোভের জন্ম দেয় এবং বাসাটি তাঁর কাছে একপ্রকার মানসিক টর্চার সেল হয়ে ওঠে। ঘটনার দিন সকাল ৭টায় বাসা থেকে বের হয়ে আদালতে যান গাজী নজরুল। ফেরেন বেলা আড়াইটার দিকে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গাজী নজরুল পুলিশকে জানিয়েছেন, দুপুরে একসঙ্গে দুই স্ত্রীকে নিয়ে খাবার খেয়েছেন। বেলা সাড়ে ৩টার দিকে মরিয়ম নিজ রুমে চলে যান। এর ঘণ্টাখানেক পর ডাকাডাকি করে কোনো সাড়া না পেয়ে জানালা দিয়ে ঝুলন্ত লাশ দেখতে পান।

করা হতো শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন

লাশ উদ্ধারের পর গত রবিবার রাতেই গাজী নজরুল, তাঁর প্রথম স্ত্রী মাকছুদা ও শ্যালক ওবায়দুর রহমানকে আসামি করে আত্মহত্যার প্ররোচনার মামলা করেন মরিয়মের বাবা। মামলার এজাহারে মাসুম বিল্লাহ অভিযোগ করেন, গত জুনে তাঁর শ্যালক ওবায়দুর রহমানের প্রত্যক্ষ প্ররোচনায় সংসদ সদস্য গাজী নজরুলের সঙ্গে বাদীর বড় মেয়ে মরিয়মের বিয়ে হয়। সংসদ ভবনের বিপরীত পাশে সরকারি ন্যাম ভবনের ৫ নম্বর ভবনের তৃতীয় তলার ২০৩ নম্বর ফ্ল্যাটে নজরুল ও মাকছুদার সঙ্গে থাকতেন মরিয়ম। বিয়ের পর থেকেই বিভিন্ন বিষয় নিয়ে নজরুল ও মাকছুদা শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করতেন বলে মরিয়ম তাঁদের ফোন করে জানাতেন। এরই মধ্যে রবিবার বিকাল সাড়ে ৫টার দিকে নজরুল মোবাইল ফোনে শ্বশুরকে দ্রুত বাসায় যেতে বলেন। সেখানে গিয়ে মরিয়মকে গলায় ফাঁস দিয়ে ঝুলে থাকতে দেখেন। মাসুম বিল্লাহর ধারণা, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যা করেছেন মরিয়ম। মামলার তদন্ত বিষয়ে শেরেবাংলা নগর থানার ওসি মো. মনিরুল ইসলাম বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘কিছু ক্লু আমরা পেয়েছি। তদন্তের স্বার্থে বলতে চাচ্ছি না। রিমান্ডের জিজ্ঞাসাবাদে মরিয়মের মৃত্যুর রহস্য বেরিয়ে আসবে বলে আশা করছি।’