জ্বালানি তেলের দাম এক লাফে লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়ায় নতুন করে চাপে পড়েছে সাধারণ মানুষ। রোববার রাতে জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ থেকে নতুন মূল্য ঘোষণা করার পর সোমবার থেকেই এর প্রভাব পড়েছে জনজীবনে। পরিবহন ব্যয় থেকে শুরু করে পণ্য উৎপাদন ও সরবরাহ-অর্থনীতির প্রায় প্রতিটি খাতেই বাড়তি খরচের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত নিত্যপণ্যের বাজারে গিয়ে পড়বে। ব্যয় বাড়বে সামগ্রিক ক্ষেত্রে। সোমবার থেকে জ্বালানির নতুন দাম কার্যকর হয়েছে। এতে ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ১১৫ টাকা থেকে বেড়ে ১৩৫ টাকা, কেরোসিন ১৩৫ থেকে ১৫৫ টাকা, পেট্রোল ১৪০ থেকে ১৬০ টাকা এবং অকটেন ১৪৫ থেকে ১৬৫ টাকা হয়েছে।
এই মূল্যবৃদ্ধির তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়েছে পরিবহন খাতে। ডিজেলনির্ভর বাস, ট্রাক, কাভার্ডভ্যানসহ পণ্যবাহী যানবাহনের পরিচালন ব্যয় বাড়ায় পরিবহন ভাড়া সমন্বয়ের চাপ তৈরি হয়েছে। ইতিমধ্যেই বিভিন্ন স্থানে বাড়তি ভাড়া আদায়ের অভিযোগও উঠেছে। সিএনজি অটোরিকশা ও রাইড শেয়ারিং চালক থেকে শুরু করে সাধারণ পথচারী— সবাই অতিরিক্ত যাতায়াত খরচের চাপে দিশাহারা হয়ে পড়েছেন।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, দাম বাড়ার ফলে একদিকে মূল্যস্ফীতি বাড়বে, অপরদিকে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা আরও কমে যাবে। এককথায় সামগ্রিকভাবে অর্থনীতি নানামুখী চাপে পড়বে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, জ্বালানির দাম বাড়ার ধাক্কা কৃষকের মাঠ থেকে আড়ত, সেখান থেকে পাইকারি বাজার এবং পরে খুচরা দোকান—প্রতিটি পর্যায়েই পড়ে। কৃষির সেচ, যান্ত্রিক চাষাবাদে ও কৃষিপণ্য পরিবহনে ডিজেল ব্যবহৃত হওয়ায় জ্বালানির দাম বাড়লে কৃষকের উৎপাদন ব্যয় বাড়বে। উৎপাদন খরচ বাড়লে বাজারে খাদ্যপণ্যের দামও বড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
জ্বালানির দাম বাড়ায় শিল্প খাতেও বাড়তি ব্যয়ের আশঙ্কা রয়েছে। পরিবহন ও লজিস্টিকসের পাশাপাশি জেনারেটর ব্যবহারের খরচ বাড়বে। এতে উৎপাদন ব্যয় বাড়ার সঙ্গে ব্যবসার মুনাফা ও প্রতিযোগিতা সক্ষমতায় চাপ তৈরি হতে পারে। বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পারভেজ উদ্বেগ প্রকাশ করে জানান, তেলের দাম বাড়লে শিল্প, লজিস্টিকস ও সেবা খাতের উৎপাদন খরচ বাড়বে। এতে অভ্যন্তরীণ ব্যবসা সংকুচিত হওয়ার পাশাপাশি রপ্তানিমুখী শিল্পের আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার সক্ষমতায় নেতিবাচক চাপ তৈরি হতে পারে।
অর্থনীতিবিদ ড. সেলিম রায়হান সতর্ক করে বলেছেন, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি পরিবহন, শিল্প উৎপাদন ও সামগ্রিক সরবরাহ ব্যবস্থার পরিচালন ব্যয় বাড়িয়ে দেবে। এর ফলে দেশের চলমান মূল্যস্ফীতির উপর নতুন করে তীব্র চাপ তৈরি হবে, যার শেষ ভার বহন করতে হবে ভোক্তাকেই। বিশেষ করে দরিদ্র ও নিম্ন-মধ্যম আয়ের পরিবারগুলো আয়ের বড় অংশ জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতে গিয়ে সবচেয়ে বেশি সংকটে পড়বে।
সিপিডি গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, বিগত দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে সাধারণ মানুষ এমনিতেই উচ্চ মূল্যস্ফীতির মধ্যে রয়েছে। জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির ফলে পরিবহন, উৎপাদন ও যাতায়াত খরচ বাড়বে, যা খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভূত উভয় ক্ষেত্রেই মূল্যস্ফীতি আরও বাড়িয়ে দেবে। তিনি বলেন, জ্বালানি তেলের দাম যতটুকু বাড়ে, পরিবহন ভাড়া ও নিত্যপণ্যের দাম বাস্তবে তার চেয়েও বেশিমাত্রায় বাড়িয়ে দেয়া হয়। তাই জ্বালানির দামের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে যেন আনুপাতিক হারেই মূল্য সমন্বয় করা দরকার এবং অসাধু সুযোগ যেন না নেয়া হয়, সে বিষয়ে সরকারের কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। তার মতে, হঠাৎ করে দাম পরিবর্তন না করে বিশ্ববাজারের সঙ্গে সমন্বয় রেখে স্বয়ংক্রিয় উপায়ে (যেমন বিইআরসি চালু করেছিল) দাম নির্ধারণের ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়া উচিত। এতে বিশ্ববাজারে দাম কমলে জনগণ সুফল পাবে এবং দাম বাড়লে আগে থেকেই প্রস্তুত থাকতে পারবে।
কনজ্যুমারস এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন সরকারের এই সিদ্ধান্তকে ‘অপরিণামদর্শী’ ও অযৌক্তিক বলে মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, অতীতে বিপিএসি প্রচুর লাভ করেছে, সেই অর্থ বা অপচয়-দুর্নীতি বন্ধের বিকল্প পথ ব্যবহার না করে একবারে ২০ টাকা দাম বাড়ানো সাধারণ মানুষের জন্য ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এদিকে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকেও এই সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের দাবি জানানো হয়েছে।
তেলের দাম বাড়ানোর পক্ষে সরকারের তরফ থেকে যুক্তি দিয়ে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্য ও ফ্রেইট চার্জ বৃদ্ধি পাওয়া এবং বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) বিপুল পরিমাণ আর্থিক ক্ষতি (মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত প্রায় ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি টাকা) কমানো ও সীমান্তপথে জ্বালানি পাচার ঠেকানোর জন্য এই মূল্য সমন্বয় জরুরি ছিল।
খুচরা বিক্রেতা ও বাজারসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, জ্বালানি তেলের বাড়তি দাম পরিবহন খরচে পুরোপুরি হিসাব মেলাতে কিছুটা সময় লাগবে। তবে ইতিমধ্যে পরিবহনের ভাড়া বেড়ে গেছে। যার প্রভাব পড়তে শুরু করেছে পণ্যের দামে।
জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির প্রভাব পড়েছে যশোরের বেনাপোল স্থলবন্দরে। সেখান থেকে অভ্যন্তরীণ পণ্য পরিবহনে গুনতে হচ্ছে বাড়তি ভাড়া। স্থানভেদে ট্রাকপ্রতি ভাড়া পাঁচ থেকে আট হাজার টাকা পর্যন্ত বেড়েছে বলে পরিবহন মালিক ও শ্রমিকরা জানিয়েছেন।
বেনাপোল বন্দর দিয়ে প্রতিদিন শ শ আমদানি-রপ্তানি ট্রাক চলাচল করে। প্রতিদিন অন্তত পাঁচ শতাধিক ট্রাক বন্দর থেকে আমদানি পণ্য নিয়ে দেশের অভ্যন্তরে যায়। পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায় আমদানিকারক ও ব্যবসায়ীরা বিপাকে পড়েছেন। বেনাপোল ল্যান্ড পোর্ট ইমপোর্টার অ্যান্ড এক্সপোর্টার এসোসিয়েশনের সভাপতি মতিয়ার রহমান জানান, তেলের দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ট্রাকমালিকরাও ভাড়া বাড়িয়েছেন পাঁচ থেকে ছয় হাজার টাকা। এতে করে ব্যবসায়ীরা চরম বিপাকে পড়েছেন। রোববার বেনাপোল থেকে ঢাকায় ১৫ টন পণ্য পরিবহনে জন্য ট্রাকভাড়া ছিল ২১-২২ হাজার টাকা। মধ্যরাত থেকে ডিজেলের দাম বাড়ার কারণে এখন ভাড়া চাওয়া হচ্ছে ২৫ থেকে ২৬ হাজার টাকা। পরিবহন খরচ বাড়ার কারণে শেষ পর্যন্ত নিত্যপ্রয়োজনীয় ও আমদানিকৃত পণ্যের পরিবহন খরচ যুক্ত হয়ে পণ্যের দাম সাধারণ ভোক্তার ওপর পড়বে বলে মনে করছেন বেনাপোলের আমদানি-রপ্তানিকারক সমিতির নেতারা।
