চাওয়া একটু পানি একটি ঘর

চাওয়া একটু পানি একটি ঘর

ফন্ট সাইজ:

‘মুই মরলে মোর জাগা নাই মাটি দিবার। পানি খোয়াইয়ার মানুষ নাই। মোর দুঃখ কোন মাইষোক কোইম।’ ৭০ বছরের ফাতেমা বেগমের কণ্ঠে যেন জমে আছে দীর্ঘ জীবনের একাকিত্ব। মানুষের বাড়িতে কাজ করে খাবার জোটে। কাজ না থাকলে ভিক্ষা করতে হয়। অথচ জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তার পাশে দাঁড়ানোর মতো মানুষ নেই। তার পাশের ঘরেই ৮০ বছরের সালেহা বেগমের জীবনও প্রায় একই। মেয়ে শাহিদা বেগমকে নিয়ে থাকেন ছোট্ট একটি জীর্ণ টিনের ঘরে। ঘরেই রান্না, ঘরেই খাওয়া, ঘরেই সব। কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার নাজিমখান ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের রাঘব মৌজার ঝাড়িঝাড় গ্রামের দুই বিধবার জীবনের গল্প যেন একই সুতোয় বাঁধা। একজনের বয়স ৮০, অন্যজনের ৭০। দু’জনেরই ঠিকানা জীর্ণ টিনের ঘর। নেই বিদ্যুৎ, নলকূপ, শৌচাগার এবং ঘর থেকে বের হওয়ার নিজস্ব রাস্তা। একটি পুকুরের পাশে এক শতাংশ জমির উপর দাঁড়িয়ে আছে সালেহা বেগমের ঘরটি। দূর থেকে দেখলে সাধারণ একটি টিনের ঘর মনে হলেও কাছে গেলেই চোখে পড়ে তার জীবন সংগ্রাম। টিনের বেড়া জুড়ে অসংখ্য ছিদ্র। দিনে সূর্যের আলো ঢোকে এসব ছিদ্র দিয়ে, আবার বৃষ্টি হলে সেই পথেই পানি ঢুকে পড়ে ঘরের ভেতর। ঘরে নেই কোনো জানালা। একটি দরজা দিয়েই আলো-বাতাস ও চলাচল।

এক পাশে রান্নার জায়গা, অন্য পাশে একটি চৌকি। সেই চৌকিতেই মা-মেয়ে থাকেন এবং একই ঘরে তাদের সঙ্গী হয়ে থাকে একটি ছাগল। ঘরের ভেতর টিনের বেড়ার ফাঁকে তারা গুঁজে রেখেছেন কাপড়-চোপড়। ভুক্তভোগী সালেহা বেগমের ভাষ্য, ‘এই ঘরোত দুই মায়-ছায় থাকি। আন্দি-বাড়ি খাই। ছাগল থাকে, হমরাও থাকি একসঙ্গে।’ বয়সের ভারে সালেহা এখন আর আগের মতো কাজ করতে পারেন না। তাই সংসারের দায়িত্ব অনেকটাই মেয়ে শাহিদার কাঁধে। অন্যের বাড়িতে কাজ করেন তিনি। কখনো কাজের বিনিময়ে চাল পান, কখনো সামান্য টাকা। আর মা ভিক্ষা করে যা পান, তা দিয়েই কোনোভাবে চলে তাদের সংসার। শাহিদা বেগম বলেছেন, ভিক্ষা করি খাই। ‘কল নাই, টয়লেট নাই। মানুষের বাড়িতে যাই, মানুষ চৌদ্দকুড়ি কথা কয়। আবাদ-সুবাদ নাই, কী করি খাই। মোর মাক কোটে ফেলে দেইম, বুকোত ধরিয়া থাকোং।’ শুধু থাকার কষ্ট নয়, ঘর থেকে বাইরে বের হওয়াও তাদের জন্য সহজ নয়। নিজস্ব কোনো রাস্তা নেই। অন্যের জমি ও বাড়ির ভেতর দিয়ে তৈরি সরু পথই তাদের চলাচলের একমাত্র ভরসা। বৃষ্টি হলে সেই পথ কাদায় পরিণত হয়। সালেহা বেগমের ঘরের পাশেই ফাতেমা বেগমের ঘর। এক শতাংশ জমির উপর জীর্ণ টিনের ঘরটিতে বছরের পর বছর একাই বসবাস করছেন তিনি। ঘরে নেই বিদ্যুৎ, নলকূপ ও শৌচাগার। পানির জন্য যেতে হয় অন্যের বাড়িতে। তার ভাষ্য, ‘মাইষের বাড়িত কর্ম করি। কাম না করবার পাইলে ভিক্ষা করি আনি খাই। মুই মরলে মোর জাগা নাই মাটি দিবার। পানি খাওয়াইয়া মানুষ নাই। মোর দুঃখ কোন মাইষোক কোইম।’

প্রতিবেশী মজিদ মিয়া বললেন, তিনি এক ঘরেই রান্না করে, ওখানেই খায়, ওখানেই থাকে। ওই ঘরেই দুটি ভেড়া থাকে। মানুষের বাড়িতে কাজ করে খায়। দোলেনা বেগমের কথায় আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে তাদের অভাবের চিত্র। তিনি বললেন, মানুষ যখন খেতে দেয়, তখন খেতে পায়; না দিলে না খেয়ে থাকে। দুই বিধবার জীবনেই তাই অভাব যেন স্থায়ী ঠিকানা। নিরাপদ ঘর নেই, বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা নেই, নেই শৌচাগার কিংবা চলাচলের নিজস্ব পথ। শেষ বয়সে এসে দু’জনেরই ভরসা কখনো মানুষের বাড়ির কাজ, কখনো ভিক্ষা। এ বিষয়ে রাজারহাট উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা এস.এম. হাবিবুর রহমান বলেছেন, সালেহা ও ফাতেমার মানবেতর জীবনযাপন করছেন। সমাজসেবা অধিদপ্তর থেকে যদি কোনো গৃহনির্মাণের বরাদ্দ পাওয়া যায়, তাহলে তাদের অগ্রাধিকার দেয়া হবে। তারা যদি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আবেদন করে থাকেন, তবে তাদের বিষয়টি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিবেচনা করবো।