এক হাতে কলস, অন্য হাতে বৈঠা। এক কলস সুপেয় পানির জন্য প্রতিদিনই যেন ছুটতে হয় তাদের। কখনো নৌকায়, কখনো কাদামাটির পথ মাড়িয়ে পায়ে হেঁটে যেতে হয় দূরের গ্রামে। চারপাশে থৈ থৈ পানি, অথচ পান করার মতো নিরাপদ পানি নেই। এভাবেই বছরের পর বছর কাটছে সুনামগঞ্জের বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার হাওরপাড়ের লোকমানপুর গ্রামের ৩০টি পরিবারের প্রায় দুই শতাধিক মানুষের জীবন। হাওরবেষ্টিত প্রত্যন্ত এই গ্রামের বাসিন্দাদের অধিকাংশই নিম্নআয়ের জেলে ও কৃষক। স্থানীয়দের দাবি, দীর্ঘ ১৫ থেকে ২০ বছর ধরে তারা সুপেয় পানির সংকটে ভুগছেন। গ্রামে নেই কোনো সরকারি টিউবওয়েল কিংবা নিরাপদ পানির স্থায়ী ব্যবস্থা।
ফলে পাশের বাহাদুরপুর গ্রামের একটি সাবমার্সিবল টিউবওয়েলের ওপর নির্ভর করেই প্রতিদিনের খাবার পানির চাহিদা মেটাতে হচ্ছে তাদের। বর্ষায় চারপাশে থৈ থৈ পানি। নৌকা নিয়ে তখন ছুটতে হয় দূরের গ্রামে। ঝড়-বৃষ্টি শুরু হলে সেই যাত্রাও হয়ে ওঠে ঝুঁকিপূর্ণ। আর হেমন্তে হাওরের পানি শুকিয়ে গেলে নৌকার বদলে শুরু হয় পায়ে হাঁটার পালা। কাদামাটির পথ পেরিয়ে কলস কাঁধে পানি নিয়ে ফিরতে হয় বাড়িতে। মোছা. খুরশেদা আক্তার বলেন, গ্রামের সব পরিবারের মানুষই পাশের বাহাদুরপুর থেকে পানি সংগ্রহ করেন। এখন হাওর শান্ত, ঢেউ নেই। কিন্তু ঝড়-বৃষ্টি হলে পানি আনা যায় না। তখন বাধ্য হয়ে নদীর পানি ব্যবহার করতে হয়। তিনি বলেন, সরকার যদি আমাদের খাবার পানির ব্যবস্থা করে দেয়, তাহলে বাকি জীবন শান্তিতে কাটানো যাবে। লোকমানপুর গ্রামের বয়োজ্যেষ্ঠ চাঁন মিয়া বলেন, গ্রামে কোনো টিউবওয়েল নেই। তাই কাদা-পানি মাড়িয়ে অন্য গ্রাম থেকে পানি সংগ্রহ করতে হয়। বর্ষাকালে নৌকা দিয়ে আর শুকনা মৌসুমে পায়ে হেঁটে পানি আনতে হয়। গ্রামটির নাম যার নামে, সেই লোকমান মিয়া বলেন, বাহাদুরপুর থেকে অনেক সময় নৌকায়, এমনকি সাঁতার কেটেও পানি আনতে হয়। প্রায় ১৫-১৬ বছর ধরে টিউবওয়েলের জন্য আবেদন করে আসছেন। কিন্তু এখনো সেই আবেদন বাস্তবায়ন হয়নি। তার ভাষায়, পানির জন্য খুব কষ্ট করছি। লোকমানপুরের মানুষের পানির কষ্টের সাক্ষী পাশের বাহাদুরপুর গ্রামের বাসিন্দারাও।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বছরের পর বছর ধরে বিভিন্ন দপ্তরে আবেদন-নিবেদন করেও মেলেনি স্থায়ী সমাধান। সরকার আসে, সরকার যায়; কিন্তু তাদের জীবনে কাটেনি সুপেয় পানির সংকট। এ বিষয়ে বিশ্বম্ভরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সকিনা আক্তার বলেন, উপজেলা ওয়াটসান কমিটি বিষয়টি নিয়ে সিদ্ধান্ত নেবে। বাস্তবতার নিরিখে উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী সরজমিন পরিদর্শন করবেন। এরপর ওয়াটসান কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এবং সরকারের বরাদ্দ সাপেক্ষে তাদের জন্য সাবমার্সিবল টিউবওয়েলের ব্যবস্থা করা হবে।
