আইফোন কাল হলো অপ্রতিমের

হত্যার লোমহর্ষক বর্ণনা, খুনিরা কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য

আইফোন কাল হলো অপ্রতিমের

ফন্ট সাইজ:

দেশ জুড়ে আলোচিত ঘটনা শিশু অপ্রতিম হত্যাকাণ্ড। একটি আইফোনের জন্য অপ্রতিমকে হত্যা করে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা। আইফোনটি দিতে রাজি হয়নি ১৩ বছরের অপ্রতিম। পাহাড়ঘেরা নির্জন বনের মধ্যে তাকে ঘিরে ধরে তিন তরুণ। ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে বাঁশের শক্ত লাঠি দিয়ে মাথায় উপর্যুপরি আঘাত করা হয়। মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পর তার আইফোন নিয়ে ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায় তারা। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকপুত্র ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের তদন্তে পুলিশের কাছে এমনই লোমহর্ষক তথ্য উঠে এসেছে। গ্রেপ্তার তুহিনের স্বীকারোক্তির বরাতে পুলিশ বলছে, আইফোন ছিনিয়ে নিতেই পরিকল্পনা করে অপ্রতিমকে নির্জন স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। এ ঘটনায় তুহিন, ফাহাদ ও কামরুলকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সিয়াম নামে আরও একজনকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।

অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের পর নতুন করে আলোচনায় এসেছে কুমিল্লার কোটবাড়ি-সালমানপুর এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা। স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে ওই এলাকায় কিশোরদের বিভিন্ন গ্রুপের দাপট রয়েছে। ছিনতাইসহ নানা অপরাধের অভিযোগ থাকলেও অনেক ক্ষেত্রেই কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। স্থানীয়দের কেউ কেউ দাবি করছেন, এসব গ্যাংয়ের সদস্যদের পেছনে প্রভাবশালী মহলের আশ্রয়-প্রশ্রয় রয়েছে।

ঘটনার পর অপ্রতিমের পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছেন কুমিল্লা-৬ আসনের সংসদ সদস্য মনিরুল হক চৌধুরী। তিনি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে দ্রুত হত্যাকাণ্ডের বিচার নিশ্চিত করার আশ্বাস দেন এবং পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে সান্ত্বনা জানান। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. শরীফুল করিমও ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে এ হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবি করেন।

যেভাবে হারিয়ে গেল অপ্রতিম: শুক্রবার বিকাল সাড়ে ৩টার দিকে কোটবাড়ির গন্ধমতী এলাকার বাসা থেকে বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তোলার কথা বলে মায়ের আইফোন নিয়ে বের হয় অপ্রতিম। এরপর আর বাসায় ফেরেনি। সন্ধ্যা ৬টা ১৫ মিনিট পর্যন্ত তার মুঠোফোনের অবস্থান গন্ধমতী এলাকায় শনাক্ত হলেও এরপর ফোনটির আর কোনো অবস্থান পাওয়া যায়নি।
ছেলের খোঁজ না পেয়ে পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় সাধারণ ডায়েরি করা হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছেলের সন্ধান চেয়ে আকুতি জানান অপ্রতিমের মা ও কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগম।

নিখোঁজের প্রায় ২১ ঘণ্টা পর শনিবার দুপুরে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের পার্শ্ববর্তী লালমাই সানন্দা পাহাড় এলাকার একটি নির্জন জঙ্গল থেকে অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। সুরতহাল প্রতিবেদনে তার মাথায় গুরুতর আঘাত এবং শরীরের বিভিন্ন স্থানে জখমের চিহ্ন পাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়। পরে ময়নাতদন্ত শেষে রাতে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। অপ্রতিম ছিল বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী। ড. নাহিদা বেগম ও কে এম ফিরোজ শাহরিয়ারের একমাত্র সন্তান ছিল সে।

আইফোনের জন্যই হত্যা: পুলিশের তদন্তে বেরিয়ে এসেছে, অপ্রতিমের সঙ্গে থাকা আইফোনটিই ছিল হত্যাকাণ্ডের মূল লক্ষ্য। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনার দিন বিকাল ৫টা থেকে ৬টার মধ্যে কুমিল্লার সানন্দা এলাকার পাহাড়ঘেরা নির্জন বনের ভেতর অপ্রতিমের আইফোন ছিনিয়ে নেয়ার চেষ্টা করে তারা। এতে বাধা দিলে অপ্রতিমের সঙ্গে তাদের ধস্তাধস্তি হয়। একপর্যায়ে তুহিন এবং পরে ফাহাদ ও কামরুল বাঁশের শক্ত লাঠি দিয়ে অপ্রতিমের মাথায় উপর্যুপরি আঘাত করে। মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পর তুহিন আইফোনটি নিয়ে ফাহাদ ও কামরুলসহ ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায় বলে জানিয়েছে পুলিশ।

নিখোঁজ ঘটনায় করা জিডি’র সূত্র ধরে তদন্ত শুরু করে পুলিশ। বিভিন্ন স্থানের সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে তুহিনের চলাফেরার তথ্য পাওয়া যায়। পরে তাকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তার দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে তুহিনের বাড়ি থেকে অপ্রতিমের আইফোন উদ্ধার করা হয়। হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত বিভিন্ন আলামতও উদ্ধার করা হয়েছে।

সালমানপুরের বাসিন্দা মামুন বলেন, তুহিন এর আগেও নানা অপকর্মে জড়িত। তার পরিবার থেকে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। এর আগে সে মোটরসাইকেল চুরি করেছে। নিয়মিত নেশা করে তুহিন।
স্থানীয়রা আরও অভিযোগ করেন, তুহিন ও অভি নামে দুজনের পৃথক কিশোর গ্যাং রয়েছে। তাদের কয়েকজনকে এলাকার প্রভাবশালী ব্যক্তি আশ্রয়-প্রশ্রয় দেন।

তুহিনের বিরুদ্ধে এর আগেও মোটরসাইকেল আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছিল বলে দাবি করেছেন আসাদুল্লাহ সোহাগ নামে এক যুবক। তার অভিযোগ, পূর্বপরিচয়ের সুযোগ নিয়ে তুহিন তার মোটরসাইকেল নিয়ে আর ফেরত দেননি। ২০২৫ সালের এ ঘটনায় থানায় লিখিত অভিযোগ দেয়া হলেও মামলা না নিয়ে জিডি করা হয়েছিল বলে দাবি করেন তিনি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অভিযোগের কপি প্রকাশ করে সোহাগ বলেন, ছোট অপরাধে শাস্তি না পাওয়ার কারণেই অপরাধীরা পরবর্তীতে বড় অপরাধ করার সাহস পায়।

‘কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে মিশতো’: অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের পর কোটবাড়ি এলাকার বাসিন্দা ইসরাফিল হোসেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি পোস্ট দেন। সেখানে তিনি দাবি করেন, অপ্রতিমের পরিচিতদের মধ্য থেকেই কয়েকজন এ হত্যাকাণ্ডে জড়িত। তার ভাষ্য অনুযায়ী, অপ্রতিমের বয়স কম হলেও সে কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে মিশতো। যাদের সঙ্গে সে আড্ডা দিতো, তাদের কয়েকজনই হত্যাকাণ্ডে জড়িত। রোববার সকাল ১০টায় কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদের মাঠে অপ্রতিমের প্রথম জানাজা হয়। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা ও শিক্ষার্থীরা অংশ নেন। জানাজার আগে আবেগাপ্লুত হয়ে অপ্রতিমের বাবা কে এম ফিরোজ শাহরিয়ার বলেন, ‘আপনাদের ছেলে আপনাদের ভালোবাসায় বড় হয়েছিল। আমি ওর বাবা হিসেবে সবার কাছে ক্ষমা চাচ্ছি। ও যদি কোনো ভুল করে থাকে, তাহলে ক্ষমা করে দেবেন এবং তার জন্য দোয়া করবেন।’ পরে গন্ধমতী ঈদগাহ মাঠে দ্বিতীয় জানাজা শেষে বেলা সাড়ে ১১টার দিকে গন্ধমতী কবরস্থানে অপ্রতিমকে দাফন করা হয়।

বিক্ষোভে উত্তাল কুবি: অপ্রতিম হত্যার ঘটনায় ক্ষোভে ফুঁসছেন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। জানাজা শেষে তারা বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ করেন। এ সময় ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’, ‘আমার ভাই কবরে, খুনি কেন বাইরে’সহ বিভিন্ন স্লোগান দেন তারা।
এদিকে অপ্রতিম হত্যার পর কোটবাড়ি-সালমানপুর এলাকার নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস ও পর্যটনকেন্দ্রঘেঁষা এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা কতোটা বিস্তৃত, তাদের পেছনে কারা রয়েছে এবং আগের অপরাধের অভিযোগগুলো কেন কার্যকরভাবে তদন্ত হয়নি-এসব প্রশ্ন সামনে এসেছে।
পুলিশ জানিয়েছে, গতকাল কুমিল্লার পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান বলেন, একটানা জিজ্ঞাসাবাদে অভিযুক্ত তুহিন স্বীকার করে যে, অপ্রতিমের আইফোনটি ছিনিয়ে নেয়ার উদ্দেশ্যে পরিকল্পনা করে তাকে নির্জন ঘটনাস্থলে নিয়ে যায়। এই ঘটনায় ফাহাদ এবং তার আরেক এক বন্ধু জড়িত। তুহিনের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী আমরা তাৎক্ষণিকভাবে অভিযান পরিচালনা করি এবং ফাহাদকে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করি।

জিজ্ঞাসাবাদে ফাহাদ জানায়, এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তার আরেক বন্ধু কামরুলও জড়িত। পরে কামরুলকেও হেফাজতে নেয়া হয়। তুহিন প্রথমে মিসগাইড করেছিল। আইফোনটি পেতে তিন জায়গায় আমরা অভিযান চালাই। কোথাও না পেয়ে অবশেষে তার স্বীকারোক্তি অনুযায়ী তার বাসার ভেতরে অভিযান পরিচালনা করা হয়। তোষকের নিচ থেকে আইফোনটি উদ্ধার করা হয়।’ তিনি বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে আমরা জানতে পেরেছি-ঘটনার দিন বিকাল ৫টা থেকে ৬টার মধ্যে সানন্দ নামক স্থানে চারপাশে পাহাড় ঘেরা নির্জন বনের ভেতরে অপ্রতিমের আইফোনটি ছিনিয়ে নেয়ার চেষ্টা করে আসামিরা। অপ্রতিম তাতে বাধা দেয়। এক পর্যায়ে তাদের মধ্যে ধস্তাধস্তি হয়। এ সময় প্রথমে তুহিন, পরবর্তীতে ফাহাদ ও কামরুল বাঁশের শক্ত লাঠি দিয়ে অপ্রতিমের মাথায় উপর্যুপরি আঘাত করে। এক পর্যায়ে মৃত্যু নিশ্চিত হলে তুহিন অপ্রতিমের আইফোনটি নিয়ে ফাহাদ ও কামরুলসহ ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায়।

তিনি বলেন, ‘এ ছাড়াও আমরা সিয়াম নামে আরেকজনকে আটক করেছি। তার বিরুদ্ধে প্রাপ্ত তথ্য যাচাই-বাছাই করছি। আমরা ইতিমধ্যে ঘটনার সঙ্গে জড়িত তুহিন, ফাহাদ ও কামরুলকে এই হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার করেছি। বিচার প্রসঙ্গে পুলিশ সুপার বলেন, ‘হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্‌ঘাটন এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুতই পুলিশ প্রতিবেদন বা চার্জশিট বিজ্ঞ আদালতে দাখিল করা হবে। রামিসা হত্যার মামলায় যেমন দ্রুত রায় এসেছে, এই মামলাটির জন্যও দ্রুত আমরা বিজ্ঞ আদালতের কাছে আবেদন রাখবো।’

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি ড. শরীফুল করিম মানবজমিনকে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের অদূরেই আমাদের শিশুটির লাশ পাওয়া গেছে। বিশ্ববিদ্যালয় পরিবার বিষয়টি নিয়ে গভীর উদ্বেগে আছে। নিখোঁজ হওয়ার খবর পাওয়ার পর থেকেই শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও প্রশাসনের সদস্যরা সম্মিলিতভাবে অপ্রতিমকে খুঁজতে চেষ্টা করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের আশপাশে পর্যটনকেন্দ্র থাকায় নিয়মিতই বিপুলসংখ্যক মানুষের সমাগম হয়। এ কারণে পুরো বিষয়টি নিয়ে নিরাপত্তা ও নজরদারির বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন।

চিরনিদ্রায় অপ্রতিম, শোকে স্তব্ধ মানুষ: কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগমের ঘরে এখন শুধুই নীরবতা। যে ছেলেটি বিকালে মায়ের মোবাইল ফোন নিয়ে ছবি তুলতে বের হয়েছে, সেই ইশরাত শাহরিয়ার অপ্রতিম আর কোনোদিন ফিরবে না এই সত্যটা মেনে নিতে পারছেন না মা। প্রতিবেশীরা বলছেন, ছেলেকে হারানোর পর থেকে তিনি প্রায় নির্বাক। মাত্র তেরো বছর বয়সেই ফুরিয়ে গেল একটি জীবন।
রোববার সকাল ১১টায় কুমিল্লার গন্ধমতিতে দ্বিতীয় জানাজা শেষে বাড়ির পাশের কবরস্থানে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয় অপ্রতিমকে। জানাজায় আত্মীয়স্বজনের পাশাপাশি উপস্থিত ছিলেন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী, শিক্ষার্থী ও এলাকাবাসী। কান্নায় ভেঙে পড়ে বাবা বলেন, তার একমাত্র সন্তান ছিল অপ্রতিম, সবার ভালোবাসাতেই সে বড় হচ্ছিল কারও মনে কষ্ট দিয়ে থাকলে যেন তাকে ক্ষমা করা হয়, আর সবাই যেন তার জন্য দোয়া করেন।