বিয়ে বিতর্কের রেশ কাটতে না কাটতেই সাতক্ষীরা-৪ আসনের এমপি গাজী নজরুল ইসলামের দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম খাতুনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। গতকাল রাজধানীর সংসদ ভবন এলাকার ন্যাম ভবনের ফ্ল্যাট থেকে তার লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। রোববার সন্ধ্যায় ন্যাম ভবনের-৫ নম্বর বিল্ডিংয়ের ২০৩ নম্বর ফ্ল্যাট থেকে ঝুলন্ত অবস্থায় লাশটি উদ্ধার করে পুলিশ। তার এই মৃত্যু ঘিরে রহস্য দেখা দিয়েছে। এটি হত্যা নাকি আত্মহত্যা এ নিয়ে তদন্তে নেমেছে পুলিশ। বিয়ে কাণ্ডের ঘটনায় গাজী নজরুলের বিরুদ্ধে পল্লবী থানায় তার গাড়িচালকের দায়ের করা মামলায় স্থায়ী জামিন নেয়ার দিনেই তার স্ত্রীর লাশ উদ্ধারের ঘটনা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। মরিয়ম আত্মহত্যা করেছেন নাকি তাকে হত্যা করা হয়েছে, আত্মহত্যা করে থাকলে নেপথ্যে কারণ কি এ নিয়ে প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে।
মরিয়মের লাশ উদ্ধারের বিষয়টি নিশ্চিত করে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ- ডিএমপি’র তেজগাঁও বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) ইবনে মিজান মানবজমিনকে বলেন, সংসদ সদস্যদের জন্য বরাদ্দকৃত ন্যাম ভবন থেকে আমাদের কাছে খবর আসে- ৫ নম্বর ভবনের ২০৩ নম্বর ফ্ল্যাটের রুমের মধ্যে একজন নারীর লাশ ঝুলছে। এরপর শেরে বাংলা থানা পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে নিয়ে আমরা ঘটনাস্থলে যাই। আমরা গিয়েও ওই ভবনের জানালা দিয়ে দেখি মরিয়মের লাশ ফ্যানের সঙ্গে ঝুলন্ত অবস্থায় রয়েছে। পরে পিবিআই ও সিআইডি’র ফরেনসিক দলকে ডাকা হয়। তারা আসার পর থানা পুলিশ ওই ফ্ল্যাটের রুমে প্রবেশ করে লাশ উদ্ধার করে।
তবে তিনি আত্মহত্যা করেছেন না কি তাকে হত্যা করা হয়েছে এ বিষয়ে এখনই কিছু বলা যাচ্ছে না। ময়নাতদন্তের পরই এই বিষয়ে বিস্তারিত বলা যাবে। আমরা পুরো বিষয়টি তদন্ত করে দেখছি। ডিসি বলেন, এই ন্যাম ভবনে তো যে কেউ থাকতে পারে না। শুধুমাত্র জাতীয় সংসদ সদস্যরাই এই ন্যাম ভবনের ফ্ল্যাট বরাদ্দ পান। যেই ফ্ল্যাট থেকে লাশ উদ্ধার করা হয়েছে সেটাও একজন এমপি’র নামেই বরাদ্দ দেয়া। যতদূর আমরা জেনেছি- ফ্ল্যাটটি সাতক্ষীরার-৪ আসনের সংসদ সদস্য জিএম নজরুল ইসলামের নামে বরাদ্দ রয়েছে। আশপাশের বাসিন্দারা বলেছেন- এখানে নজরুলের প্রথম স্ত্রী বা পরিবারের তেমন কেউ আসতেন না। মাঝে মধ্যে আসতেন। বর্তমানে ফ্ল্যাটটিতে তার দ্বিতীয় স্ত্রী মোছাঃ মরিয়ম খাতুন থাকতেন।
এর আগে গত জুলাইয়ে মরিয়মের সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় মজলিসের শূরা সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের একান্ত মুহূর্তের ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। আলোচনা-সমালোচনা শুরু হলে সাতক্ষীরা জেলা জামায়াতের মিডিয়া সেল থেকে দাবি করা হয়- সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো ভিডিওটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির সাহায্যে তৈরি করা একটি ভুয়া ভিডিও। পরদিন কয়েকটি ফ্যাক্ট চেকিং প্রতিষ্ঠান দাবি করে, ভিডিও এআই দিয়ে বানানো নয়। এসব নিয়ে বিতর্কের মধ্যেই গাজী নজরুল নিজেই দাবি করেন, ভিডিওতে দেখা যাওয়া ওই তরুণী (মরিয়ম) তার দ্বিতীয় স্ত্রী এবং তাকে তিনি তার প্রথম স্ত্রীর সম্মতিতে বিয়ে করেছেন।
আলোচনার মাঝেই গত ২২শে জুলাই অনৈতিক সম্পর্কের প্রতিবাদ ও ভিডিও ফাঁসের সন্দেহে নজরুল তার গাড়িচালক ওবায়দুর রহমানকে মারধর ও শ্বাসরোধে হত্যাচেষ্টার অভিযোগে গাজী নজরুলসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে রাজধানীর পল্লবী থানায় মামলা দায়ের হয়। ওই মামলায় গ্রেপ্তার এক আসামিকে কারাগারেও পাঠায় আদালত। তবে নজরুল হাইকোর্ট থেকে আগাম জামিন নেন। এসব অভিযোগের প্রেক্ষিতে গাজী নজরুল ইসলামকে দল থেকে বহিষ্কার করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। তখন দলটি দাবি করে, তাকে ঘিরে সম্প্রতি প্রকাশিত বিভিন্ন ঘটনার বিষয়ে সাংগঠনিক তদন্তে তার ‘নৈতিক স্খলন’ প্রমাণিত হয়েছে। সেজন্য গঠনতন্ত্রের ৬২ নম্বর ধারা অনুযায়ী এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। বহিষ্কারের পর গাজী নজরুল আর দলের কেউ নন। তাকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত জানিয়ে সংসদ সচিবালয় ও নির্বাচন কমিশনে (ইসি) চিঠি দেয়া হয়েছে।
উল্লেখ্য, গাড়িচালক ওবায়দুর রহমানকে মারধর ও শ্বাসরোধে হত্যাচেষ্টার অভিযোগে পল্লবী থানায় দায়ের করা মামলায় হাইকোর্ট থেকে ৮ সপ্তাহের জামিন পাওয়ার পর গতকালই সশরীরে উপস্থিত হয়ে ঢাকার আদালতে জামিননামা দাখিল করেন গাজী নজরুল ইসলাম।
