দীর্ঘ কোনো সফর নয়। নেই একাধিক শহর ভ্রমণের কর্মসূচি। নিজের প্রথম জাতিসংঘ সফরটি মাত্র পাঁচদিনে সীমাবদ্ধ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সফরের পুরোটা জুড়েই থাকছে জাতিসংঘ। ছোট্ট একটি বহর নিয়ে আজ সোমবার ভোরে ঢাকা ছাড়ছেন তিনি। বাবা সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার পর আগামী ২৪শে সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে বাংলায় ভাষণ দেবেন ছেলে তারেক রহমান। বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক নবযাত্রার বার্তা দেয়ার পাশাপাশি রোহিঙ্গা সংকট, জলবায়ু পরিবর্তন, বিশ্ব শান্তি ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার বিষয়গুলো তুলে ধরবেন প্রধানমন্ত্রী।
গতকাল পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এক ব্রিফিংয়ে এসব তথ্য তুলে ধরেন পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম। তার দেয়া তথ্যমতে, প্রধানমন্ত্রীর এবারের নিউ ইয়র্ক সফরসঙ্গীর সংখ্যা সীমিত রাখা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে সফরসঙ্গী মাত্র ৩৫ জন। এরমধ্যে পররাষ্ট্রমন্ত্রীসহ জাতিসংঘে বাংলাদেশের প্রতিনিধিরাও রয়েছেন। যারা সেখান থেকেই যোগ দেবেন। সফরসঙ্গীর মধ্যে মন্ত্রী রয়েছেন চারজন ও প্রতিমন্ত্রী রয়েছেন দুজন। তারা হলেন- অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত। প্রতিমন্ত্রীরা হলেন- পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির ও শামা ওবায়েদ। রাজনৈতিক অঙ্গনের প্রতিনিধিদের মধ্যে থাকছেন বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক এবং জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের মহাসচিব গোলাম মহিউদ্দিন।
ঢাকার আন্তর্জাতিক হযরত শাহজালাল বিমানবন্দর থেকে তার্কিশ এয়ারলাইন্সের টিকে-৭২৫ ফ্লাইটে সোমবার ভোর ৫টা ৫০ মিনিটে নিউ ইয়র্কের উদ্দেশ্যে যাত্রা করবেন তারেক রহমান। একইদিনে নিউ ইয়র্কের জন এফ. কেনেডি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নামার কথা রয়েছে তার। সেখানে পৌঁছে ২২ সেপ্টেম্বর থেকে আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি শুরু করবেন। প্রথম দিনেই থাকছে ব্যস্ততা। সকালে জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেসের আয়োজনে রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানদের স্বাগত প্রাতঃরাশে যোগ দেবেন তিনি। এরপর অংশ নেবেন সাধারণ পরিষদের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে। সন্ধ্যায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের আয়োজনে রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান এবং তাদের সহধর্মিণীদের সম্মানে দেয়া অভ্যর্থনায় যোগ দেবেন প্রধানমন্ত্রী ও তার স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান।
এবারের সফরের গুরুত্বও আলাদা। তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের জন্য জাতিসংঘের সর্বোচ্চ বৈশ্বিক মঞ্চে এটিই প্রথম উপস্থিতি। এর মধ্যদিয়ে বিশ্ববাসীর সামনে সরকারের রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের রূপরেখা তুলে ধরার সুযোগ থাকছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরও একটি বিরল বিষয়। এবারের জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। ফলে তারেক রহমানের প্রথম জাতিসংঘ সফরেই একই অধিবেশনে বাংলাদেশের একজন মন্ত্রী সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন।
পরদিনও ব্যস্ত সময় কাটবে তার। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক দাতব্য ও মানবিক সংস্থার প্রতিনিধিদের সঙ্গে প্রাতঃরাশ বৈঠক করবেন প্রধানমন্ত্রী। পরে ব্রাজিল, দক্ষিণ আফ্রিকা, নরওয়ে ও স্পেনের আয়োজনে বৈশ্বিক বৈষম্য সংকট মোকাবিলা নিয়ে একটি সভায় বক্তব্য দেবেন। বিকালে জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের উদ্যোগে আয়োজিত ‘ক্লাইমেট অ্যাকশন অ্যান্ড দ্য জাস্ট ট্রানজিশন’ শীর্ষক উচ্চ পর্যায়ের সভায় যোগ দেবেন তিনি।
২৪শে সেপ্টেম্বর হবে সফরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিন। এদিন সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে সৃষ্ট অস্তিত্বগত হুমকি মোকাবিলা বিষয়ক উচ্চ পর্যায়ের সভায় উদ্বোধনী বক্তব্য দেবেন প্রধানমন্ত্রী। জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরবেন তিনি। জলবায়ু অর্থায়ন, অভিযোজন, প্রযুক্তি হস্তান্তর, ক্ষয়ক্ষতির ক্ষতিপূরণ এবং জলবায়ু ন্যায়বিচারের দাবি জানাবেন।
বিকালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সাধারণ বিতর্কে ভাষণ দেবেন প্রধানমন্ত্রী। বাংলায় দেয়া সেই ভাষণে উঠে আসবে নতুন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক নবযাত্রা, আইনের শাসন ও জবাবদিহিতার বার্তা। বিশ্ব শান্তি ও নিরাপত্তার কথাও বলবেন। থাকবে জলবায়ু পরিবর্তন, টেকসই উন্নয়ন, অর্থনৈতিক সহযোগিতা, যুব ও নারীর ক্ষমতায়ন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য এবং রোহিঙ্গা সংকটের বিষয়। বহুপক্ষীয় ব্যবস্থার সংস্কার এবং আধুনিক প্রযুক্তির ন্যায়সঙ্গত ব্যবহারের বিষয়টিও গুরুত্ব পাবে।
জাতিসংঘের কর্মসূচির ফাঁকে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকও করবেন প্রধানমন্ত্রী। কুয়েতের ক্রাউন প্রিন্স শেখ সাবাহ আল-খালেদ আল-সাবাহর সঙ্গে বৈঠক করবেন তিনি। বৈঠক হবে ক্রোয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আন্দ্রেজ প্লেনকোভিচ, ভুটানের প্রধানমন্ত্রী শেরিং তোবগে, থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী অনুতিন চার্নভিরাকুল এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরীফের সঙ্গেও। এসব বৈঠকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্কের পাশাপাশি বাণিজ্য, বিনিয়োগ, উন্নয়ন সহযোগিতা ও রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আলোচনা হবে।
আন্তর্জাতিক সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গেও বৈঠক করবেন প্রধানমন্ত্রী। জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের সঙ্গে তার সাক্ষাৎ হবে। বৈঠক করবেন ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট আন্তোনিও কস্তা এবং বিশ্বব্যাংক গ্রুপের প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙ্গার সঙ্গেও। জাতিসংঘের মিয়ানমার বিষয়ক বিশেষ দূত, শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনার বারহাম সালিহ এবং মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনার ভলকার তুর্কের সঙ্গেও তার সাক্ষাৎ করার কথা রয়েছে।
সফরে গুরুত্ব পাচ্ছে অর্থনৈতিক কূটনীতিও। ওয়াল স্ট্রিট ও মেটাসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করবেন প্রধানমন্ত্রী। আলোচনায় থাকবে বাংলাদেশের বিনিয়োগ সম্ভাবনা। থাকবে উৎপাদন, অবকাঠামো ও প্রযুক্তি খাত। গুরুত্ব পাবে দক্ষতা উন্নয়ন ও তরুণদের কর্মসংস্থান।
রোহিঙ্গা সংকট নিয়েও সরব থাকবেন প্রধানমন্ত্রী। ২৩শে সেপ্টেম্বর বাংলাদেশের আয়োজনে রোহিঙ্গা সংকট বিষয়ক একটি সাইড ইভেন্টে অংশ নেবেন তিনি। রোহিঙ্গাদের দ্রুত মিয়ানমারে ফেরাতে আন্তর্জাতিক সমপ্রদায়ের কার্যকর সহযোগিতা চাইবেন। মাতৃ ও নবজাতকের স্বাস্থ্য নিয়েও কথা বলবেন প্রধানমন্ত্রী। ২৪শে সেপ্টেম্বর এ বিষয়ে আয়োজিত আরেকটি সাইড ইভেন্টে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেবেন তিনি। তুলে ধরবেন মা ও শিশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সরকারের উদ্যোগ ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা। গুরুত্ব দেবেন দক্ষ ও প্রশিক্ষিত ধাত্রীসেবার ওপর।
প্রধানমন্ত্রীর সফরটি সংক্ষিপ্ত করা হয়েছে। বিগত সরকারগুলোর সফরের দৈর্ঘের তুলনায় তারেক রহমানের এই সফরটি বেশ কম সময়ের। কেন সফরটি সংক্ষিপ্ত করা হলো- জানতে চাইলে পররাষ্ট্র সচিব বলেন, কার্যকর সফরের জন্য যে সময় দরকার, প্রধানমন্ত্রী নিউ ইয়র্কে সে সময়টুকুই থাকছেন। এর আগে সরকারি একটি সূত্র জানিয়েছে, রাষ্ট্রীয় ব্যয় কমাতেই প্রধানমন্ত্রী এবার বহর ছোট এবং সময় কমিয়ে নিয়ে এসেছেন। এ লক্ষ্যে জাতিসংঘের কর্মসূচি শেষে ক্যালিফোর্নিয়ার সানফ্রান্সিসকো সফর বাতিল করা হয়। পররাষ্ট্র সচিব জানান, প্রধানমন্ত্রীর পরিবর্তে সেখানে মন্ত্রী পর্যায়ের একটি প্রতিনিধিদল যাবে। ২৫শে সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্র বিএনপি’র উদ্যোগে আয়োজিত নাগরিক সংবর্ধনায় অংশ নেয়ার কথা রয়েছে। এই কর্মসূচি শেষে ওইদিনই ঢাকার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হবেন প্রধানমন্ত্রী।
