ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ছেই। দিন দিন মৃত্যুর তালিকাও লম্বা হচ্ছে। সারা দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে আরও ৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে নতুন করে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ৫৯৩ জন। পুরো আগস্ট মাসে যত মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছে, সেপ্টেম্বরের ২০ দিনেই তার প্রায় দ্বিগুণ আক্রান্তের তথ্য পাওয়া গেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ডেঙ্গুতে আক্রান্তদের মধ্যে পুরুষের সংখ্যা বেশি হলেও মৃত্যুর ক্ষেত্রে নারীর সংখ্যা বেশি। আবার বয়সভিত্তিক হিসাবে ১৬ থেকে ৩৫ বছর বয়সী তরুণদের আক্রান্তের হার অস্বাভাবিক।
বিশ্লেষকদের মতে, তরুণদের বড় একটি অংশ শিক্ষার্থী বা কর্মজীবী। দিনের বড় সময় তাদের ঘরের বাইরে কাটাতে হয়। বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ, অফিস-আদালত, নির্মাণস্থলসহ বিভিন্ন জায়গায় চলাচলের সময় মশার কামড়ের ঝুঁকিও বাড়ে। এসব স্থানে মশক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা দুর্বল থাকলে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা আরও বাড়ে। তবে হাসপাতালে বা পরীক্ষার আওতায় আসার প্রবণতার কারণেও তরুণ ও পুরুষদের আক্রান্তের সংখ্যা তুলনামূলক বেশি। অন্যদিকে, ডেঙ্গুতে নারীর মৃত্যুহার বেশি হওয়ার পেছনে হাসপাতালে দেরিতে আসা, গর্ভাবস্থা, রক্তপাত ও রক্তস্বল্পতার মতো বিষয়গুলোকে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।
আক্রান্তদের বয়স অনুপাতে ভাগ করে দেখা গেছে, ১৬ থেকে ৩৫ বছরের তরুণরাই বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন। মৃত্যুও এই বয়সীদের মধ্যে বেশি দেখা যাচ্ছে। দেশের কিটতত্ত্ববিদ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশার বলেন, তরুণদের আক্রান্ত হওয়ার কারণ যদি বিবেচনা করেন, তাহলে মূল বিষয় হচ্ছে-দেশের জনসংখ্যায় তরুণদের শতাংশই বেশি। জনসংখ্যার অনুপাতে আক্রান্তের অনুপাতটাও তেমনি হবে। এ ছাড়াও তরুণ সমপ্রদায় বাইরে মুভমেন্ট করে বেশি, বিভিন্ন জায়গায় যাতায়াত করে; সেজন্য তাদের চান্স অব ইনফেকশন বা মশার কামড়ের হারটা বেশি এবং আক্রান্ত মশার কামড় খাওয়ার চান্সও বেশি।
এজন্য তরুণরা বেশি আক্রান্ত হয়। নারীরা কম আক্রান্ত হয় কারণ নারীদের মধ্যে অনেক অংশই আছে যারা বাসায় থাকেন, একটি জায়গাতেই থাকেন; তাদের বিভিন্ন জায়গায় মুভমেন্ট কম থাকার কারণে তাদের চান্স অব ইনফেকশনটা কম থাকে। আবার নারীরা শরীরের বেশির ভাগ জায়গা আবৃত রাখে, যে কারণেও মশার কামড়ের সম্ভাবনা কিছুটা কম থাকে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
অন্যদিকে নারী মৃত্যুর হার বেশি হওয়ার কারণ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, নারীদের হাসপাতালে দেরিতে ভর্তি হওয়ার একটি প্রবণতা থাকে; তারা স্বামী-সংসারকে প্রাধান্য দিয়ে নিজের রোগকে খুব বেশি গুরুত্ব দেয় না, তারা হয়তো পরিবারকে জানায় না যে, জ্বর আসছে, সঠিক সময়ে পরীক্ষা না করায় এবং সঠিক সময়ে চিকিৎসা নেয় না। এ ছাড়াও নারীদের ইমিউন সিস্টেম পুরুষদের তুলনায় দুর্বল। আর নারীদের একটি মাসিক সাইকেলেও ইমিউন সিস্টেমের মধ্যে কিছুটা দুর্বলতা থাকে। আবার নারী যারা প্রেগন্যান্ট, তাদের ক্ষেত্রেও ইমিউন সিস্টেম দুর্বল থাকে। এই সবকিছু মিলিয়ে ডেঙ্গু আক্রান্ত নারীদের মৃত্যুর হার বেশি।
ডেঙ্গুতে আরও ৬ জনের মৃত্যু: সারা দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে আরও ৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে নতুন করে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ৫৯৩ জন। রোববার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুম থেকে পাঠানো ডেঙ্গু বিষয়ক বিজ্ঞপ্তিতে এই তথ্য জানানো হয়। এতে বলা হয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর মধ্যে বরিশাল বিভাগে ১৫৪ জন, চট্টগ্রাম বিভাগে ১৬৭ জন, ঢাকা বিভাগে (সিটি করপোরেশনের বাইরে) ৩৮৪ জন, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে ১৭১ জন, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ১৩২ জন, খুলনা বিভাগে ২৯২ জন, ময়মনসিংহ বিভাগে ৮২ জন, রাজশাহী বিভাগে ১৩৭ জন, রংপুর বিভাগে ৬৫ জন এবং সিলেট বিভাগে ৯ জন রয়েছেন। এ নিয়ে চলতি বছরে ১৮৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ সময় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৬১ হাজার ৯৭২ জন।
