দীর্ঘ সাড়ে পাঁচ বছর ধরে ডলারের বিপরীতে টাকার যে অবমূল্যায়নের ধারা চলছিল, চলতি বছর এসে তাতে পরিবর্তন দেখা দিয়েছে। গত এক বছরের হিসাবে জুন পর্যন্ত টাকার মান দশমিক ০৬ শতাংশ বেড়েছে। এর পর আগস্টের শেষ থেকে সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়েও ডলারের বিপরীতে আরও দশমিক ৭৭ শতাংশ শক্তিশালী হয়েছে টাকা। রোববার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেশের মুদ্রাবাজারের এ চিত্র উঠে এসেছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সাল থেকে চলতি বছরের ১৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ডলারের বিপরীতে ধারাবাহিকভাবে দুর্বল হয়েছে টাকা। এ সময়ে এক ডলারের দাম ৮৫ টাকা ৮০ পয়সা থেকে বেড়ে সর্বোচ্চ ১২৩ টাকা ৯৫ পয়সায় উঠেছিল। অর্থাৎ প্রায় সাড়ে পাঁচ বছরে ডলারের দাম বেড়েছে ৩৮ টাকা ২০ পয়সা বা ৪৫ দশমিক ০৫ শতাংশ।
তবে চলতি বছরের দ্বিতীয়ার্ধে এসে সেই প্রবণতায় পরিবর্তন দেখা যায়। গত ৩০ আগস্ট ডলারের দর ১২৩ টাকা ৯৫ পয়সায় ওঠার পর ১৭ সেপ্টেম্বর তা কমে ১২৩ টাকায় নেমে আসে। অর্থাৎ মাত্র ১৮ দিনের ব্যবধানে ডলারের দাম কমেছে ৯৫ পয়সা এবং টাকার মান বেড়েছে দশমিক ৭৭ শতাংশ।
যেভাবে দুর্বল হয়েছে টাকা
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৯ সালের ডিসেম্বর শেষে প্রতি ডলারের দর ছিল ৮৪ টাকা ৯০ পয়সা। ২০২০ সালের ডিসেম্বর শেষে তা ৮৪ টাকা ৮০ পয়সায় নেমে আসে। ফলে ওই এক বছরে ডলারের দর ১০ পয়সা কমার বিপরীতে টাকার মান বেড়েছিল দশমিক ১২ শতাংশ।
করোনাভাইরাসের সংক্রমণের সময়ে দেশে আমদানি কমে যাওয়া, আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দাম তুলনামূলক কম থাকা এবং রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ায় ডলারের চাহিদা ও সংকট কম ছিল। এর ফলে ওই সময়ে টাকার মান কিছুটা শক্তিশালী হয়।
পরিস্থিতি পাল্টে যায় ২০২১ সাল থেকে। আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দাম বাড়ার পাশাপাশি দেশে আমদানিও বাড়তে থাকে। ওই বছরের ডিসেম্বর শেষে ডলারের দর বেড়ে ৮৫ টাকা ৮০ পয়সায় দাঁড়ায়। এতে এক বছরে টাকার মান কমে যায় ১ দশমিক ১৮ শতাংশ।
২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তোলে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ও অন্যান্য পণ্যের দাম ব্যাপক বেড়ে যাওয়ায় বাংলাদেশের আমদানি ব্যয় বাড়ে। একই সময়ে রেমিট্যান্স ও রপ্তানি আয় কমে যাওয়ায় ডলারের সংকট আরও তীব্র হয়।
এর প্রভাবে ২০২২ সালের ডিসেম্বর শেষে ডলারের দর এক লাফে বেড়ে ১০৫ টাকা ৮৫ পয়সায় দাঁড়ায়। এক বছরে ডলারের দাম বেড়েছিল ২০ টাকা ৫ পয়সা বা ২৩ দশমিক ৩৭ শতাংশ। একই সময়ে টাকার মানও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।
এর পরের বছরগুলোতেও টাকার ওপর চাপ অব্যাহত থাকে। ২০২৩ সালের ডিসেম্বর শেষে ডলারের দর ১১০ টাকায় ওঠে, যা এক বছরে ৪ টাকা ১৫ পয়সা বা ৩ দশমিক ৯২ শতাংশ বৃদ্ধি। ২০২৪ সালের শেষে তা আরও ১০ টাকা বেড়ে ১২০ টাকায় দাঁড়ায়। ওই বছর টাকার মান কমে ৯ দশমিক ০৯ শতাংশ।
২০২৫ সালেও অবমূল্যায়নের ধারা পুরোপুরি থামেনি। বছরের শেষে ডলারের দর বেড়ে ১২২ টাকা ৩৩ পয়সায় দাঁড়ায়। এক বছরে দর বেড়েছিল ২ টাকা ৩৩ পয়সা বা ১ দশমিক ৯৪ শতাংশ।
এবার দেখা যাচ্ছে উল্টো প্রবণতা
চলতি বছর এসে ডলারের বিপরীতে টাকার দরপতনের ধারায় প্রথমবারের মতো পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। গত বছরের জুন থেকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত এক বছরের হিসাবে টাকার মান কমার পরিবর্তে বেড়েছে দশমিক ০৬ শতাংশ।
এরপর আগস্টের শেষ দিকে ডলারের দর সাময়িকভাবে বাড়লেও সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি তা আবার কমে আসে। ৩০ আগস্ট যেখানে এক ডলারের দাম ১২৩ টাকা ৯৫ পয়সা ছিল, ১৭ সেপ্টেম্বর তা নেমে আসে ১২৩ টাকায়। এ সময়ে টাকার মান বেড়েছে দশমিক ৭৭ শতাংশ।
আঞ্চলিক মুদ্রার তুলনায় বাংলাদেশ
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে এ সময়ে বিভিন্ন দেশের মুদ্রার গতিপ্রকৃতিও তুলে ধরা হয়েছে। গত বছরের জুনের তুলনায় চলতি বছরের জুনে ভারতের রুপির মান কমেছে প্রায় সাড়ে ৯ শতাংশ। শ্রীলঙ্কার মুদ্রার অবমূল্যায়ন হয়েছে ১০ শতাংশের বেশি এবং ইন্দোনেশিয়ার রুপিয়াহর মান কমেছে প্রায় ৯ শতাংশ। অন্যদিকে একই সময়ে মালয়েশিয়ার রিঙ্গিত ও চীনের ইউয়ানের মান বেড়েছে প্রায় ৪ শতাংশ করে। পাকিস্তানি রুপির মান বেড়েছে প্রায় ২ শতাংশ। অর্থাৎ দীর্ঘ সময় ধরে অবমূল্যায়নের পর সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশি টাকা ডলারের বিপরীতে শক্তিশালী হওয়ার প্রবণতা দেখাচ্ছে।
টাকার দরপতনে যে প্রভাব পড়ে
ডলারের বিপরীতে টাকার মান কমলে সবচেয়ে সরাসরি প্রভাব পড়ে আমদানি ব্যয়ে। একই পরিমাণ ডলার কিনতে আমদানিকারকদের বেশি টাকা ব্যয় করতে হয়। ফলে জ্বালানি, শিল্পের কাঁচামাল, খাদ্যপণ্যসহ আমদানিনির্ভর বিভিন্ন পণ্যের ব্যয় বেড়ে যায়।
পরবর্তীতে এই বাড়তি ব্যয়ের প্রভাব ভোক্তা পর্যায়েও পড়ে। পণ্যের দাম বাড়ার সঙ্গে মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়তে পারে এবং মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমে যেতে পারে। বিশেষ করে স্বল্প ও মধ্যম আয়ের মানুষের ওপর এর প্রভাব তুলনামূলক বেশি পড়ে।
এ ছাড়া বৈদেশিক মুদ্রায় নেওয়া ঋণের বিপরীতে টাকার হিসাবে পরিশোধযোগ্য অর্থও বেড়ে যায়। ফলে টাকার অবমূল্যায়নের সঙ্গে দেশের বৈদেশিক ঋণের টাকার অঙ্কের দায় বাড়ে।
উল্টোভাবে টাকার মান শক্তিশালী হলে আমদানি ব্যয় ও বৈদেশিক ঋণ পরিশোধে টাকার হিসাবে চাপ কিছুটা কমতে পারে। তবে এর সুফল কতটা টেকসই হবে, তা নির্ভর করবে আমদানি-রপ্তানি পরিস্থিতি, রেমিট্যান্স প্রবাহ, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এবং আন্তর্জাতিক বাজারের গতিপ্রকৃতির ওপর।
