২৬শে সেপ্টেম্বর থেকে হামের বিশেষ টিকা ক্যাম্পেইন, টার্গেট ৩৪ লাখ শিশু

২৬শে সেপ্টেম্বর থেকে হামের বিশেষ টিকা ক্যাম্পেইন, টার্গেট ৩৪ লাখ শিশু

ফন্ট সাইজ:

দেশে হামের টিকা থেকে বাদ পড়া এবং নতুন করে টিকাদানের বয়সে আসা প্রায় ৩৪ লাখ শিশুকে টিকার আওতায় আনার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। আগামী ২৬শে সেপ্টেম্বর থেকে ৩১শে অক্টোবর পর্যন্ত সারা দেশে বিশেষ টিকাদান কর্মসূচির মাধ্যমে এসব শিশুকে হামের টিকা দেয়া হবে।
রোববার সচিবালয়ে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে হামের বিশেষ টিকাদান ক্যাম্পেইন উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, ২৬শে সেপ্টেম্বর সকাল ১০টা থেকে সারা দেশে একযোগে এ বিশেষ টিকাদান কার্যক্রম শুরু হবে। শুরুতে কার্যক্রমটি এক মাস চালানোর কথা বলা হলেও পরে ৩১শে অক্টোবর পর্যন্ত সময় ধরে কর্মসূচি চালানোর কথা জানান তিনি। এ সময় শুধু নির্ধারিত টিকাদান কেন্দ্রে শিশুদের নিয়ে আসার অপেক্ষায় না থেকে গ্রামের ভেতরে গিয়ে শিশুদের খুঁজে বের করে টিকার আওতায় আনার ওপর গুরুত্ব দেয়া হবে।
তিনি বলেন, বর্তমানে প্রয়োজনীয় টিকার পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। হাতে থাকা টিকা ও নতুন করে পাওয়া টিকা মিলিয়ে মোট ৫৮ লাখ ডোজের কথা উল্লেখ করে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, টিকার অপচয় হিসাব করার পরও প্রায় ৫২ লাখ ডোজ থাকবে। এর বিপরীতে বিশেষ কার্যক্রমে প্রাথমিকভাবে প্রয়োজন হবে প্রায় ৩৪ লাখ ডোজ। ফলে ৩৪ লাখ শিশুকে টিকা দেয়ার লক্ষ্যমাত্রা পূরণের পরও হাতে টিকা থাকবে এবং সেই টিকা ব্যবহার করে বাদ পড়া শিশুদের খুঁজে বের করার কাজ অব্যাহত রাখা হবে।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, বিশেষ কার্যক্রম শুরুর দিন কোনো শিশুর বয়স ছয় মাস পূর্ণ না হলে তাকে তখন টিকা দেয়া সম্ভব হবে না। কিন্তু কয়েক দিন পরই সেই শিশুর বয়স ছয় মাস পূর্ণ হতে পারে। এ কারণে এমন শিশুদেরও পরবর্তী সময়ে টিকার আওতায় আনার জন্য নজরদারি রাখা হবে। একটি শিশুও যেন টিকাবিহীন না থাকে, সে লক্ষ্যেই এবার কার্যক্রমটি গভীরভাবে মনিটরিং করা হবে।
কর্মসূচিতে জেলা প্রশাসক, সিভিল সার্জন, সুপারিনটেনডেন্ট, ইউএইচএফপিও এবং ইউএনওসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা সম্পৃক্ত থাকবেন বলে জানান স্বাস্থ্যমন্ত্রী। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারাও বিভিন্ন টিকাদান কেন্দ্রে উপস্থিত থাকবেন। গণমাধ্যমকর্মীদেরও কার্যক্রমে সহযোগিতা করার আহ্বান জানান তিনি।

হামের পরিস্থিতি নিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে হাসপাতালে যেসব শিশু হামে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিচ্ছে, তাদের মধ্যে প্রায় সবাই টিকাবিহীন। বিশেষ করে ছয় মাসের কম বয়সী শিশুদের টিকা দেয়ার সুযোগ থাকে না। তবে ছয় মাস বয়স পার হওয়ার পরও কোনো কোনো শিশু টিকা না পাওয়ার কারণে আক্রান্ত হচ্ছে। টিকা না নেয়ার কারণ হিসেবে কোনো কোনো মা-বাবা কাজে থাকার কারণে শিশুকে টিকাকেন্দ্রে নিয়ে যাওয়ার লোক না থাকার কথা জানিয়েছেন বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, হামের কারণে শিশুদের নিউমোনিয়া হলে পরিস্থিতি জটিল হয়ে যেতে পারে। অপুষ্টিতে থাকা শিশু এবং পর্যাপ্ত বুকের দুধ না পাওয়া শিশুদের ক্ষেত্রে এ ধরনের জটিলতা বেশি দেখা যাচ্ছে বলে চিকিৎসকদের মতামতের কথা উল্লেখ করেন তিনি। নিউমোনিয়ার ক্ষেত্রে অক্সিজেনের প্রয়োজন হতে পারে এবং গুরুতর অবস্থায় সিপ্যাপ দেয়ার কথাও জানান তিনি। দেশে তৈরি স্বল্পমূল্যের সিপ্যাপ ব্যবহারের মাধ্যমে বহু শিশুর জীবন রক্ষা পেয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

হামের চিকিৎসা প্রসঙ্গে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, হামের জন্য নতুন কোনো নির্দিষ্ট চিকিৎসা প্রটোকল নেই। নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হলে প্রয়োজন অনুযায়ী ভেন্টিলেটর, সিপ্যাপ, জ্বরের ওষুধসহ চিকিৎসা দিতে হয়। এ বিষয়ে চিকিৎসকদের বিভিন্ন সংগঠনের মাধ্যমে চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণ ও প্রয়োজনীয় শিক্ষা দেয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
তিনি বলেন, হামের আক্রান্ত রোগীদের বড় একটি অংশ পাঁচ বছরের নিচের শিশু। হাসপাতালের অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে তিনি জানান, চিকিৎসা নিতে আসা আক্রান্ত শিশুদের প্রায় সবাই টিকাবিহীন। একই সঙ্গে ছয় মাস বয়স পার হওয়ার পর প্রতিদিন নতুন শিশু টিকাদানের বয়সসীমায় প্রবেশ করছে। ফলে একটি বিশেষ টিকাদান কার্যক্রম শেষ করলেও পরবর্তী সময়ে নতুন করে বয়সসীমায় আসা শিশুদের টিকার আওতায় আনতে হবে। এ কারণেই ৩১শে অক্টোবরের পরও মপআপ কার্যক্রম চালু রাখার পরিকল্পনার কথা জানান তিনি।

বিশেষ কার্যক্রমের ৩৪ লাখ শিশুর লক্ষ্যমাত্রা কীভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে, সে ব্যাখ্যাও দেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তিনি জানান, এর আগে ২ কোটি ২৩ লাখ শিশুকে ভিটামিন এ দেয়া হয়েছিল। এর মধ্যে প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ শিশুকে দেয়ার পর আরও প্রায় ৪৩ লাখ শিশু বাদ থাকার হিসাব পাওয়া যায়। পরে আরও ১৯ লাখ শিশুকে ভিটামিন এ দেয়া হয়। অবশিষ্ট ২৪ লাখের সঙ্গে ছয় মাস বয়স পূর্ণ করা নতুন প্রায় ১০ লাখ শিশুকে যোগ করে মোট ৩৪ লাখ শিশুর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, জনসংখ্যার সঠিক পরিসংখ্যান শতভাগ নির্ভুলভাবে পাওয়া সম্ভব নয়। তাই ভিটামিন এ কার্যক্রমে পাওয়া তথ্য এবং জনসংখ্যার বৃদ্ধির হার বিবেচনায় নিয়ে টিকার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। তিনি জানান, ৩৪ লাখ শিশুকে টিকা দেয়ার পরও যদি আরও শিশু বাদ পড়ে থাকে, তাদের খুঁজে বের করে টিকা দেয়া হবে।
হামের পাশাপাশি ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবিলায়ও প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে বলে জানান স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, চার মাস আগে থেকেই জেলা সদর, সিটি করপোরেশন ও পৌরসভাগুলোতে পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালানো হচ্ছে। মশা নিয়ন্ত্রণে স্প্রে ও ওষুধ ব্যবহারের কথাও জানান তিনি। বিভিন্ন জায়গায় ব্যবহৃত ওষুধ পরীক্ষা করে তা উচ্চমানের পাওয়া গেছে বলেও দাবি করেন তিনি।

দেশব্যাপী পরিচ্ছন্নতা অভিযান প্রসঙ্গে তিনি জানান, সংসদ ভবন থেকে দেশব্যাপী পরিচ্ছন্নতা অভিযানের ডাক দেয়া হয়েছে এবং প্রতি শনিবার সারা দেশে এ অভিযান চলছে। এটি ১২ ডিসেম্বর পর্যন্ত চলবে বলে জানান তিনি।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, বিভিন্ন স্থানে পানি জমে থাকলে সেখানে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে লার্ভা তৈরি হতে পারে। ডাবের খোসা, খানা-খন্দক, টবসহ বিভিন্ন জায়গায় জমে থাকা পানিতে মশার লার্ভা সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কার কথা উল্লেখ করে তিনি পরিচ্ছন্নতার ওপর গুরুত্ব দেন।
ডেঙ্গু রোগীর চিকিৎসা প্রসঙ্গে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ডেঙ্গুর চিকিৎসায় স্যালাইন দেয়া, জ্বরের ওষুধ দেয়া এবং প্লাজমা লিকেজ হচ্ছে কি না তা পর্যবেক্ষণের মতো চিকিৎসা উপজেলা পর্যায়েও করা সম্ভব। কিন্তু অনেক রোগী চিকিৎসার জন্য সরাসরি উচ্চতর বা তৃতীয় স্তরের হাসপাতালে চলে আসছেন। এতে বড় হাসপাতালগুলোর ওপর চাপ বাড়ছে বলে জানান তিনি।

যেকোনো সময় রোগীর সংখ্যা বেড়ে গেলে পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে বলেও জানান স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, জেলা শহর ও বড় শহরগুলোতে মোবাইল হাসপাতাল প্রস্তুত রাখা হয়েছে এবং সেনাবাহিনীকেও প্রয়োজন অনুযায়ী প্রস্তুত রাখা হয়েছে। স্যালাইন ও ওষুধের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে এবং রোগীর সংখ্যা দ্বিগুণ হলেও স্যালাইনের সংকট হবে না বলে জানান তিনি।
হামের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, এটি একটি ছোঁয়াচে রোগ এবং আক্রান্ত শিশুর সঙ্গে অন্য শিশুদের থাকলে সংক্রমণের ঝুঁকি থাকে। হাসপাতালে এমন ঘটনাও দেখেছেন বলে জানান তিনি, যেখানে একটি শিশু হামে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর তার সঙ্গে আরও দুই শিশু ছিল।
তিনি বলেন, হামের সংক্রমণ ঠেকানোর ক্ষেত্রে টিকাদান চালিয়ে যাওয়াই প্রধান চেষ্টা। একই সঙ্গে অতীতে নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রম চালু থাকলে বর্তমান পরিস্থিতি তৈরি হতো না বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তার বক্তব্য অনুযায়ী, ২০২০ সালের পর দায়িত্ব নেয়ার সময় টিকাদান কার্যক্রমে ঘাটতি ছিল এবং পরে তা আবার চালু করা হয়।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী আরও বলেন, আগে হাম হলেও অনেকেই মারা যেতেন না, কারণ তখন শিশুদের শারীরিক পুষ্টি পরিস্থিতি ভিন্ন ছিল। বর্তমানে অপুষ্টি, মায়েদের পুষ্টির ঘাটতি এবং শিশুদের পর্যাপ্ত বুকের দুধ না পাওয়ার বিষয়টি হামের পর নিউমোনিয়াসহ জটিলতা বাড়ানোর কারণ হিসেবে চিকিৎসকদের অভিজ্ঞতায় উঠে এসেছে বলে জানান তিনি।
তিনি বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে টিকাদান কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা অব্যাহত থাকবে। ছয় মাস বয়স পূর্ণ করা শিশুদের টিকার আওতায় আনা এবং বাদ পড়া শিশুদের খুঁজে বের করার পাশাপাশি মপআপ কার্যক্রমও চালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, টিকা দেয়ার পর শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরি হতে তিন থেকে চার সপ্তাহ সময় লাগে। তাই টিকাদান কার্যক্রমের পাশাপাশি ধারাবাহিকভাবে নতুন করে টিকার বয়সে আসা শিশুদেরও টিকার আওতায় আনার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হবে।