মাত্র ১৩ বছর বয়স। সপ্তম শ্রেণির ছাত্র ইশিয়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম। ছুটির দিনে মায়ের আইফোন নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলতে বের হয়েছিল। সে আর জীবিত ফিরে আসেনি। একটি শিশুর এমন করুণ মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের অসহনীয় শোক নয়, বাংলাদেশের সামাজিক নিরাপত্তা, পারিবারিক মূল্যবোধ এবং তরুণ প্রজন্মের নৈতিক গঠন নিয়ে গভীর প্রশ্ন।
অপ্রতিম নিখোঁজ হওয়ার পর তার মায়ের আকুতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছিল। সন্তান কোথায়, কী অবস্থায় আছে, সে বেঁচে আছে কি না, একজন মায়ের সেই অসহায় প্রশ্ন শেষ পর্যন্ত পরিণত হয়েছে আজীবনের শূন্যতায়। কিন্তু অপ্রতিমের জন্য শোক প্রকাশ করেই কি আমাদের দায়িত্ব শেষ?
বাংলাদেশ অর্থনীতি, অবকাঠামো, প্রযুক্তি ও যোগাযোগে অনেক দূর এগিয়েছে। মানুষের হাতে স্মার্টফোন এসেছে, পৃথিবী এখন একটি পর্দায়। কিন্তু একটি দেশের উন্নয়ন শুধু মাথাপিছু আয়, সেতু, সড়ক কিংবা প্রযুক্তির বিস্তার দিয়ে বিচার করা যায় না। উন্নয়নের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠির একটি হলো মানুষের নিরাপত্তা। বিশেষ করে একটি শিশু ঘর থেকে বের হয়ে নিরাপদে ফিরে আসতে পারছে কি না। অপ্রতিমের মৃত্যু সেই জায়গাতেই আমাদের আত্মসমালোচনার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। বাংলাদেশের তরুণদের বিশাল অংশ মেধাবী, সৃজনশীল ও সম্ভাবনাময়। তাই পুরো যুবসমাজকে নৈতিক অবক্ষয়ের অভিযোগে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো অন্যায় হবে। কিন্তু একই সঙ্গে অস্বীকার করার সুযোগ নেই যে তরুণদের একটি অংশের মধ্যে সহিংসতা, অসহিষ্ণুতা, বুলিং, অপরাধকে রোমাঞ্চ হিসেবে দেখা এবং অন্যের জীবন ও মর্যাদার প্রতি উদাসীনতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
সামান্য বিরোধ, একটি মোবাইল ফোন, অর্থ, ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব কিংবা সামাজিক আধিপত্যের প্রশ্ন কখনো কখনো ভয়াবহ সহিংসতায় রূপ নিচ্ছে। সমস্যা শুধু অপরাধের সংখ্যা নয়, মানুষের জীবনের মূল্য সম্পর্কে তৈরি হওয়া উদাসীনতা।
কিন্তু এর দায় শুধু তরুণদের নয়। কোনো শিশু অপরাধী মানসিকতা নিয়ে জন্মায় না। তার মূল্যবোধ তৈরি হয় পরিবার, বিদ্যালয়, বন্ধু, সংস্কৃতি, সামাজিক পরিবেশ এবং রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার সম্মিলিত প্রভাবে। তরুণ প্রজন্মের মধ্যে নৈতিক সংকট দেখা দিলে সেটি মূলত বৃহত্তর সমাজের সংকটেরই প্রতিফলন।
আমরা সন্তানকে ভালো স্কুলে পড়াতে চাই, ভালো ফলাফল চাই, ইংরেজি ও প্রযুক্তিতে দক্ষ করতে চাই। ভবিষ্যতে চিকিৎসক, প্রকৌশলী, ব্যাংকার, ব্যবসায়ী কিংবা উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা হিসেবে দেখতে চাই। কিন্তু সে একজন ভালো মানুষ হয়ে উঠছে কি না, অন্যের কষ্ট অনুভব করতে শিখছে কি না, রাগ ও লোভ নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে কি না, দুর্বল মানুষের প্রতি সহমর্মী কি না, সেই প্রশ্নগুলো কি আমরা একই গুরুত্ব দিয়ে করছি? সন্তানের পরীক্ষার ফল খারাপ হলে আমরা উদ্বিগ্ন হই। কিন্তু তার আচরণ নিষ্ঠুর হয়ে উঠলে কতটা উদ্বিগ্ন হই? এই প্রশ্নটি পরিবারকে নিজেদের করতে হবে।
পরিবার নৈতিক শিক্ষার প্রথম বিদ্যালয়। শিশু উপদেশের চেয়ে আচরণ থেকে বেশি শেখে। সে দেখে বাবা মা অন্য মানুষের সঙ্গে কীভাবে কথা বলেন, অন্যায়ের সঙ্গে আপস করেন কি না, অর্থ ও ক্ষমতাকে কীভাবে দেখেন। পরিবারে যদি সততা, সহমর্মিতা, দায়িত্ববোধ ও মানুষের প্রতি সম্মান চর্চা করা হয়, সন্তানও সেই মূল্যবোধ শেখার সুযোগ পায়।
কিন্তু আধুনিক জীবনের ব্যস্ততায় অনেক পরিবারে সন্তান ও অভিভাবকের মধ্যে যোগাযোগের জায়গা সংকুচিত হচ্ছে। আমরা জানি সন্তান কোন স্কুলে পড়ে, পরীক্ষায় কত নম্বর পেয়েছে। কিন্তু তার বন্ধু কারা, কী তাকে রাগিয়ে দেয়, কী নিয়ে সে ভয় পায়, কী ধরনের কনটেন্ট দেখছে কিংবা তার মানসিক জগতে কী পরিবর্তন ঘটছে, অনেক সময় তা জানি না।
একই বাড়িতে থেকেও বাবা মা ও সন্তান আলাদা ডিজিটাল জগতে বসবাস করছে।
প্রযুক্তিকে এজন্য এককভাবে দায়ী করা অর্থহীন। প্রযুক্তি একটি মাধ্যম। সমস্যা তার ব্যবহারে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম তরুণদের পৃথিবীর সঙ্গে যুক্ত করেছে, আবার সহিংসতা, সাইবার বুলিং, বিদ্বেষ এবং ভোগবাদী জীবনের প্রদর্শনও তাদের সামনে সহজলভ্য করেছে। ফলে ডিজিটাল দক্ষতার পাশাপাশি ডিজিটাল নৈতিকতা শেখানো এখন জরুরি।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দায়িত্বও এখানে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় নম্বর, জিপিএ, ভর্তি পরীক্ষা ও চাকরির প্রতিযোগিতা যতটা গুরুত্ব পায়, চরিত্র গঠন অনেক সময় ততটা পায় না। অথচ শিক্ষার উদ্দেশ্য শুধু দক্ষ কর্মী তৈরি করা নয়, দায়িত্বশীল নাগরিক তৈরি করাও।
একজন শিক্ষার্থী গণিতে কত নম্বর পেয়েছে সেটি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সে দুর্বল সহপাঠীর সঙ্গে কেমন আচরণ করে, ভিন্নমত সহ্য করতে পারে কি না, মেয়েদের সম্মান করে কি না, নিজের ভুল স্বীকার করতে শেখে কি না, সেটিও শিক্ষার অংশ।
নৈতিক শিক্ষা তাই পাঠ্যবইয়ের কয়েকটি অধ্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকলে হবে না। বিদ্যালয়ের সংস্কৃতির মধ্যেই তা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। বুলিং, দলবদ্ধ নিপীড়ন, ভয় দেখানো, শারীরিক সহিংসতা এবং অনলাইন হয়রানির বিরুদ্ধে প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কার্যকর ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। শিক্ষার্থীদের আচরণে অস্বাভাবিক পরিবর্তন শনাক্ত করতে শিক্ষক, অভিভাবক ও প্রশিক্ষিত কাউন্সেলরের মধ্যে সমন্বয় দরকার।
সামাজিক নিরাপত্তার ধারণাটিও আমাদের বিস্তৃত করতে হবে। নিরাপত্তা মানে শুধু রাস্তায় পুলিশ কিংবা অপরাধের পর গ্রেপ্তার নয়। একটি শিশু বিকেলে বন্ধুদের সঙ্গে বের হয়ে নিরাপদে বাড়ি ফিরবে, একজন কিশোর সহপাঠীর কাছে নির্যাতিত হবে না, একজন নারী রাতে কর্মস্থল থেকে নিরাপদে ফিরবেন, একজন নাগরিক ছিনতাইয়ের ভয়ে পথ চলবেন না, এগুলোও সামাজিক নিরাপত্তার মৌলিক সূচক।
এখানেই আইনের শাসন অপরিহার্য। অপ্রতিমের মৃত্যুর পূর্ণাঙ্গ, দ্রুত এবং নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। তদন্তে যাদের বিরুদ্ধে গ্রহণযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যাবে, তাদের পরিচয়, পারিবারিক অবস্থান কিংবা সামাজিক প্রভাব বিবেচনা না করে আইন অনুযায়ী বিচার নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কাউকে অপরাধী ঘোষণা করার প্রবণতা থেকেও বিরত থাকতে হবে। ন্যায়বিচার মানে প্রতিশোধ নয়, সত্য উদঘাটন এবং প্রমাণের ভিত্তিতে দায় নির্ধারণ। তবে পুলিশ ও আদালত দিয়ে সমাজের নৈতিক সংকটের সমাধান সম্ভব নয়।
অপরাধের বিচার আদালত করতে পারে, কিন্তু নৈতিক মানুষ তৈরি করতে পারে না। সেই দায়িত্ব পরিবার, শিক্ষা ও সমাজের।
বাংলাদেশের শিশু ও কিশোরদের জীবনে তাই ইতিবাচক সামাজিক পরিসর বাড়ানো জরুরি। খেলাধুলা, পাঠাগার, সাহিত্য, সংগীত, বিতর্ক, বিজ্ঞানচর্চা, স্বেচ্ছাসেবা এবং সামাজিক কর্মকাণ্ড তরুণদের শুধু ব্যস্ত রাখে না, তাদের মধ্যে সহযোগিতা, সহমর্মিতা ও দায়িত্ববোধও গড়ে তোলে। শহরগুলোতে মাঠ ও উন্মুক্ত জায়গা কমিয়ে আমরা যদি কিশোরদের একমাত্র অবসর স্মার্টফোনের পর্দায় ঠেলে দিই, তার সামাজিক মূল্যও একদিন দিতে হতে পারে।
আর সবচেয়ে জরুরি হলো সন্তানদের সঙ্গে কথোপকথন ফিরিয়ে আনা।
শুধু “পরীক্ষায় কত পেয়েছ” জিজ্ঞেস করলে হবে না। জানতে হবে, “তুমি কেমন আছ?” “কেউ তোমাকে কষ্ট দিচ্ছে?” “তুমি কাউকে কষ্ট দিচ্ছ কি?” “কোন বিষয় তোমাকে রাগিয়ে দেয়?” “কোনো ভুল করলে কীভাবে তা সংশোধন করো?”
সন্তানের হাতে দামি ফোন তুলে দেওয়ার আগে তাকে মানুষের জীবনের দাম শেখাতে হবে।
আমাদের সমাজে বস্তুগত সাফল্যের প্রতিযোগিতা ক্রমেই তীব্র হয়েছে। ফোন, গাড়ি, পোশাক, অর্থ এবং সামাজিক মর্যাদা অনেক ক্ষেত্রে মানুষের সাফল্যের প্রতীক হয়ে উঠেছে। এই ভোগবাদী সংস্কৃতির মধ্যে নতুন প্রজন্মকে মনে করিয়ে দেওয়া জরুরি যে মানুষের মূল্য তার ব্যবহৃত ব্র্যান্ডে নয়, তার চরিত্রে।
একজন মানুষের জীবন পৃথিবীর সবচেয়ে দামি ফোনের চেয়েও মূল্যবান। একজন বন্ধুর বিশ্বাস যেকোনো বস্তুগত সম্পদের চেয়ে বড়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জনপ্রিয় হওয়ার চেয়ে মানুষ হিসেবে সম্মানিত হওয়া অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
অপ্রতিম আর ফিরে আসবে না। একটি পরিবার সারাজীবন তার শূন্যতা বহন করবে। কিন্তু তার মৃত্যু যদি কয়েক দিনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ক্ষোভ এবং কয়েকটি সংবাদ শিরোনামের মধ্যেই হারিয়ে যায়, তাহলে আমরা এই ট্র্যাজেডি থেকে কিছুই শিখলাম না।
এই ঘটনার বিচার প্রয়োজন। একই সঙ্গে প্রয়োজন বৃহত্তর সামাজিক প্রতিরোধ। শিশু ও কিশোরদের নিরাপত্তা, স্কুলে বুলিং ও সহিংসতা প্রতিরোধ, কাউন্সেলিং, ডিজিটাল নৈতিকতা, পারিবারিক সচেতনতা এবং তরুণদের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সম্পৃক্ততাকে গুরুত্ব দিতে হবে।
কারণ সামাজিক নিরাপত্তা শুধু পুলিশের দায়িত্ব নয়। এটি পরিবার, বিদ্যালয়, সমাজ এবং রাষ্ট্রের সম্মিলিত দায়িত্ব।
আমরা প্রায়ই বলি, শিশুরাই দেশের ভবিষ্যৎ। কিন্তু ভবিষ্যৎকে শুধু শিক্ষিত ও দক্ষ করে তুললেই হবে না, তাকে মানবিক করে তুলতে হবে এবং নিরাপদ রাখতে হবে।
একটি দেশের উন্নয়ন তখনই অর্থবহ, যখন ১৩ বছরের একটি শিশু বিকেলে ছবি তুলতে ঘর থেকে বের হয়ে নিরাপদে মায়ের কাছে ফিরে আসতে পারে।
অপ্রতিমের মৃত্যু তাই শুধু একটি পরিবারের শোক নয়। এটি আমাদের সামাজিক বিবেকের সামনে রাখা একটি কঠিন প্রশ্ন: আমরা আমাদের সন্তানদের জন্য শুধু একটি সমৃদ্ধ বাংলাদেশ তৈরি করছি, নাকি একটি নিরাপদ, নৈতিক এবং মানবিক বাংলাদেশও তৈরি করছি?
এই প্রশ্নের উত্তর বক্তৃতায় নয়। উত্তর দিতে হবে পরিবারে, বিদ্যালয়ে, সমাজে, আইনের শাসনে এবং আমাদের প্রতিদিনের আচরণে।
অপ্রতিমের জন্য ন্যায়বিচার অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু তার প্রতি আমাদের সবচেয়ে বড় দায় হবে এমন একটি সমাজ গড়ে তোলা, যেখানে আর কোনো মা সন্তানের সন্ধানে অসহায় হয়ে প্রশ্ন করবেন না, “আমার সন্তান কোথায়?”
লেখক: সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বেসরকারি ব্যাংকিং আর্থিক অপরাধ বিশেষজ্ঞ, কলামিস্ট ও কবি।
ই মেইল: [email protected]
