ক´দিন আগে দৈনিক মানবজমিনে একই বিষয়ের উপর আমার একটি লেখা এবং ফেইসবুকে একটি পোস্ট ছাপা হয়। ক্যাবিনেট মিশন প্ল্যানে ভারতকে যে এ, বি, সি এই তিন ভাগে ভাগ করার কথা বলা হয়েছিল, কিছু পাঠক এ সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চেয়েছেন। কেউ কেউ অতীতের এই বিষয়টাকে এখন হঠাৎ করে সামনে আনার উদ্দেশ্য সম্পর্কেও যৌক্তিক প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন।
প্রশ্নটা উত্থাপিত হয়েছে ডাকসুতে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর সাম্প্রতিক ছবি প্রদর্শনকে কেন্দ্র করে। সকলেই জানেন, সাদিক কায়েমদের নেতৃত্বাধীন ডাকসুতে এখন কারা আছেন। ডাকসুতে একচ্ছত্র বিজয়ী শিবির আসলে জামায়াতে ইসলামীর ছাত্র সংগঠন। জামায়াত যে জিন্নাহ এবং পাকিস্তান সৃষ্টির বিরোধী ছিল তা ভুলিয়ে দিতেই তারা জিন্নাহর ছবি সামনে নিয়ে আসে। এ ব্যাপারে বিরোধিতা শুরু হলে অবস্থা বেগতিক দেখে তারা সুর পাল্টিয়ে বলে জিন্নাহর ”বাংলা ভাষা বিরোধী” অবস্থান তুলে ধরতেই ডাকসু জিন্নাহর ছবিটি ব্যবহার করতে চেয়েছিল। মনে করার কারণ নেই যে তারা অকারণে এই ইস্যুটি সামনে এনেছে। পত্রপত্রিকায় রিপোর্ট ছাপা হয়েছে, সাদেক কায়িম ঢাকার মেয়র পদে জামাতের পক্ষ থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। জিন্নাহর ছবি প্রদর্শনের মাধ্যমে তারা ৪৭-এর অবস্থানকে ভুলিয়ে দিতে চাইছেন। কিন্তু প্রতিবাদের মুখে অবস্থান পাল্টিয়ে এবার তারা ৭১ সালের অবস্থানও ভুলাতে চাচ্ছেন। দু ক্ষেত্রেই তারা চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছেন। আসলে সুবিধাবাদী অবস্থান নিয়ে বেশী দিন এগোনো যায় না। ভুল করলে তা স্বীকার এবং ক্ষমা চেয়ে শোধরাতে হয়।
অতীত যদি কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে সামনে আনে তাহলে তাকে এড়িয়ে না গিয়ে মোকাবিলা করতে হয়। কারণ অতীত আমাদের বর্তমানের ভিত। আর বর্তমান হচ্ছে ভবিষ্যতের ভিত। সেই হিসেবে জিন্নাহর প্রসঙ্গ যখন সামনে এসেছে তখন তার সম্পর্কে সত্যটা আমাদের জানতে হবে। জিন্নাহ কত বড় নেতা ছিলেন তা বোঝাতে আমি স্যার এডওয়ার্ড মুন-এর একটি বই থেকে এই উদ্ধৃতিটুকু তুলে ধরছি ”The creation of somewhat moth-eaten Pakistan has become certain. Jinnah got some satisfaction. … This victory was not a historical accident, rather it was the result of one extra-ordinary man`s unbending pledge. It was only Jinnah who could unite personalities like Fazlul Haque, Sikander Hayat and Khijir Hayat Khan. The Muslims of Bengal and Punjab were united under his leadership on Pakistan issue. There was not another leader who could even try it- the question of success was a far cry.” লর্ড মাউন্ট ব্যাটেন তাঁর মূল্যায়ন করতে গিয়ে লিখেন “ It could be said that a single man held the future of India in the palm of his hand in 1947, that man was Mohammad Ali Jinnah.”
জিন্নাহ কিন্তু ভারতকে একটা শিথিল ফেডারেশনের আকারে অখণ্ড রাখার সুযোগটি অটুট রেখেছিলেন ক্যাবিনেট মিশন প্ল্যানটি সামগ্রিকভাবে মেনে নিয়ে। এতে বলা হয়েছিল ভারতে একটি ইউনিয়ন (ফেডারেল পদ্ধতির ইউনিয়ন) সরকার গঠিত হবে। এর হাতে শুধু পররাষ্ট্র, প্রতিরক্ষা ও যোগাযোগ মন্ত্রণালয় থাকবে। বাকী সব বিষয় স্বায়ত্তশাসিত প্রদেশগুলো নিয়ন্ত্রণ করবে। ভারতকে এ, বি, এবং সি, এই তিনটি প্রাদেশিক সেকশান বা গ্রুপে ভাগ করা হবে। “এ” গ্রুপে থাকবে মাদ্রাজ, বোম্বাই, ইউ পি, বিহার, মধ্যপ্রদেশ এবং উড়িষ্যা। “বি” গ্রুপ গঠিত হবে পাঞ্জাব, উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ এবং সিন্ধু নিয়ে। এবং “সি” গ্রুপ হবে বাংলা এবং আসাম নিয়ে। এই ভাগ অনুযায়ী একটি গ্রুপ (সেকশান-এ) হবে হিন্দু-প্রধান এবং বাকী দুটো গ্রুপ (সেকশান বি ও সি) হবে মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ। গ্রুপগুলো তাদের নিজেদের জন্য সংবিধান প্রণয়ন করতে পারবে এবং যে-কোনো প্রদেশ ১০ বছর পর নিজের গ্রুপ থেকে বেরিয়ে যেতে পারবে। এই মৌলিক বিষয়গুলোর আলোকে ভারতের জন্য একটি সংবিধান প্রণয়ন কমিটি গঠন করা হবে। ব্রিটিশরা শর্ত দেয় এই প্ল্যান গ্রহণ করতে হবে সামগ্রিকভাবে, আংশিকভাবে নয়। জিন্নাহ ভারতকে ভাগ করার দীর্ঘদিনের দাবি পরিত্যাগ করে সামগ্রিকভাবেই ক্যাবিনেট মিশনের প্ল্যান গ্রহণ করেন। কয়েকদিন অপেক্ষার পর কংগ্রেস সভাপতি জওহরলাল নেহেরু এক প্রকাশ্য বিবৃতি দিয়ে বলেন, কংগ্রেস এবং তিনি শুধু সংবিধান প্রণয়ন কমিটি গঠনের প্রস্তাবটিই মানেন। প্রদেশগুলোর জন্য স্বায়ত্তশাসন, প্রাদেশিক গ্রুপ গঠনসহ বাকী বিষয়গুলো মানেন না। সেগুলো সাংবিধানিক কমিটিই ঠিক করবে। জিন্নাহ এতে প্রমাদ গুনেন। জবাবে তিনি বলেন ব্রিটিশদের থাকা অবস্থায়ই যদি কংগ্রেস এই অবস্থান গ্রহণ করে তাহলে তারা চলে যাবার পর কংগ্রেস কি করবে তা ভেবে তিনি শঙ্কিত। তিনি কংগ্রেসের প্রস্তাবকে প্রত্যাখান করেন। এভাবেই ক্যাবিনেট মিশন প্ল্যান বাতিল হয়ে যায় এবং ভারত বিভক্তি অনিবার্য হয়ে পড়ে। কায়েদে আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর আশঙ্কা যে অমূলক ছিল না, আজকে ভারতের মুসলমানদের অবস্থা তারই প্রমাণ।
একথা নিঃসন্দেহে বলা যায়, কংগ্রেস ক্যাবিনেট মিশন প্রস্তাবাবলি পুরোপুরিভাবে গ্রহণ করলে অর্থাৎ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশ বা এলাকাগুলোর সর্বোচ্চ স্বায়ত্তশাসন মেনে নিলে ভারত অন্তত তখন ভাগ হয় না। একইভাবে, রাওয়ালপিন্ডির পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী পূর্ববঙ্গের বাঙালিদের তথা তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের অধিবাসীদের সর্বাধিক স্বায়ত্তশাসনের দাবি মেনে নিলে অন্তত তখন পাকিস্তানও ভাঙে না। পূর্বাপর ঘটনা পর্যালোচনা করে বলা হয়, পাকিস্তান ছিল ইতিহাসের অনিবার্য পরিণতি। বাংলাদেশও কিন্তু একইভাবে ইতিহাসের অনিবার্য পরিণতি।
আনিসুর রহমান বর্তমানে সুইডেনে বসবাসরত একজন সিনিয়র বাংলাদেশি সাংবাদিক।
জিন্নাহ–ডাকসু–ছাত্রদল (২)
আনিসুর রহমান
মত-মতান্তর
১ ঘন্টা আগে
২০ সেপ্টেম্বর (রবিবার), ২০২৬, ১১ঃ১২ (পূর্বাহ্ণ)
লিংক কপি হয়েছে!
ফন্ট সাইজ:
100%
