সুনামগঞ্জে তিন সন্তানকে হত্যা করে পিতার আত্মহত্যার চেষ্টা
স্বজনদের ভিড় -নিজস্ব ছবি

সুনামগঞ্জে তিন সন্তানকে হত্যা করে পিতার আত্মহত্যার চেষ্টা

ফন্ট সাইজ:

সুনামগঞ্জের তাহিরপুরে পারিবারিক কলহের জের ধরে তিন শিশুসন্তানকে বিষপান করানোর পর নিজেও বিষপান করেছেন এক পিতা। এতে তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় তাদের পিতা সরাফত আলীকে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। শনিবার ভোররাতে উপজেলার সীমান্তবর্তী রজনী লাইন গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। নিহত শিশুরা হলো- সরাফত আলীর মেয়ে মাওয়া আক্তার (১০), ছেলে শামিম মিয়া (৭) ও তামিম মিয়া (২)। হৃদয়বিদারক এ ঘটনায় পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, প্রায় ১২ বছর আগে শ্রীপুর উত্তর ইউনিয়নের লাকমা গ্রামের ভুট্টো মিয়ার মেয়ে ফাতেমা বেগমের সঙ্গে রজনী লাইন গ্রামের সরাফত আলীর বিয়ে হয়। তাদের সংসারে এক মেয়ে ও দুই ছেলে সন্তান জন্ম নেয়। সংসারে সচ্ছলতা ফেরাতে প্রায় তিন বছর আগে ফাতেমা সৌদি আরবে যান। সেখানে থেকে তিনি স্বামীর কাছে প্রায় ১০-১২ লাখ টাকা পাঠান। কিন্তু ফাতেমার পাঠানো টাকা সরাফত মাদক ও অনলাইন জুয়ায় ব্যয় করতেন। এ নিয়ে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে প্রায়ই ঝগড়া-বিবাদ হতো। প্রায় দুই বছর পর দেশে ফিরে সংসারের আর্থিক অবস্থার তেমন পরিবর্তন না দেখে স্বামীর সঙ্গে মনমালিন্য দেখা দেয় ফাতেমার। গত তিনদিন আগে ফাতেমা আবার সৌদি আরব যাওয়ার উদ্দেশ্যে ঢাকা যান। শনিবার রাত ২টার দিকে তিনি ঢাকা বিমানবন্দর থেকে সৌদি আরবের উদ্দেশ্যে রওনা হন। এদিকে রাত দুইটার দিকে এ মর্মান্তিক ঘটনা ঘটান স্বামী সরাফত আলী।

নিহতদের এক দাদি বলেন, সরাফত আলী প্রথমে তিন সন্তানকে লিচুর সঙ্গে বিষ মিশিয়ে খাওয়ান। পরে নিজেও বিষপান করেন। রাত আড়াইটার দিকে তিনি ঢাকায় স্বরুপা বেগম নামে এক ফুফুকে ফোন করে সন্তানদের বিষ খাওয়ানোর কথা জানান। পরে ওই ফুফু বাড়িতে বিষয়টি ফোনে জানালে তারা ঘরের দরজা খুলে তিন শিশুকে মেঝেতে পড়ে থাকতে দেখেন। পরে তাদের চিৎকারে আশপাশের লোকজন ছুটে এসে তাদের উদ্ধার করে বাদাঘাট বাজারের একটি চিকিৎসাকেন্দ্র ও তাহিরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেয়া হলে চিকিৎসকরা তিন শিশুকে মৃত ঘোষণা করেন। গুরুতর অসুস্থ সরাফত আলীকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

শনিবার সকালে শিশুদের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, বাড়িতে বিরাজ করছে সুনসান নীরবতা। স্বজনদের কান্নায় ভারী হয়ে উঠেছে পরিবেশ। একটি ঘর তালাবদ্ধ অবস্থায় ছিল। পরিবারের এক নারী জানান, ওই ঘরেই শিশুদের বিষপান করানো হয়েছে। পরে ঘরটি খোলা হলে ভেতরে বিষাক্ত পদার্থের গন্ধ পাওয়া যায়। ঘরের মেঝেতে ইয়াবা সেবনের সরঞ্জাম ও লিচুর একটি খালি বোতল পড়ে থাকতে দেখা যায়। দুপুরে তাহিরপুর থানার অফিসার ইনচার্জ ফারুক আহমেদ ঘটনাস্থলে গিয়ে ইয়াবা সেবনের সরঞ্জাম ও লিচুর বোতলসহ বিভিন্ন আলামত জব্দ করেন।
প্রতিবেশী রফিকুল ইসলাম বলেন, সরাফত আলী মাদক ও জুয়ায় আসক্ত ছিলেন। তার ঘরে ইয়াবা সেবনের সরঞ্জাম রয়েছে। স্ত্রী বিদেশে চলে যাওয়ার পর তিনি সন্তানদের বিষপান করিয়ে নিজেও বিষপান করেছেন।

তাহিরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. নাসাদ আহমেদ বলেন, সকাল ৮টার দিকে তিন শিশুকে মৃত অবস্থায় হাসপাতালে আনা হয়। পরিবারের সদস্যরা জানান, তাদের বিষপান করানো হয়েছে। পুলিশ লাশ উদ্ধার করে সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতাল মর্গে পাঠিয়েছে।
স্থানীয় চেয়ারম্যান মাসুক মিয়া বলেন, ভোরে নিহত শিশুদের পরিবারের লোকজন তাকে বিষয়টি জানান। তাদের বাবা সন্তানদের বিষ খাইয়ে নিজেও বিষপান করেছেন। শিশুদের মা কয়েকদিন আগে বিদেশ থেকে এসে আবার বিদেশে চলে গেছেন।

তাহিরপুর থানার অফিসার ইনচার্জ ফারুক আহমেদ বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, পারিবারিক কলহের জের ধরে এ ঘটনা ঘটেছে। ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে ঘর থেকে ইয়াবা সেবনের সরঞ্জামসহ বিষ মেশানো লিচুর বোতল জব্দ করা হয়েছে। এ বিষয়ে মামলার প্রস্তুতি চলছে।’