যেভাবে ককটেল নিক্ষেপ ও গাড়িতে আগুন দেয় দুর্বৃত্তরা

যেভাবে ককটেল নিক্ষেপ ও গাড়িতে আগুন দেয় দুর্বৃত্তরা

ফন্ট সাইজ:

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় গত শুক্রবার দিনভর একের পর এক ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। ওইদিন দুপুর থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত রাজধানীর সাতটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ১৪টি ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। মালিবাগ, আগারগাঁও, মহাখালী, যাত্রাবাড়ী, বাবুবাজার, বিটিভি ভবনের সামনে ও মগবাজার মোড়ে ককটেল বিস্ফোরিত হয়। একইদিন কাফরুল থানার সামনে মিরপুর সুপার লিংক পরিবহনের একটি বাসে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। শুক্রবার রাত ১০টা ১৪ মিনিটে বাসে আগুন লাগার খবর পায় ফায়ার সার্ভিস। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের দু’টি ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। এ সকল ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। পুলিশ বলছে, সবগুলো স্থানের সিসি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করে তদন্ত করা হচ্ছে। এর মধ্যে কিছু ঘটনায় জড়িতদের শনাক্ত করতে পেরেছে পুলিশ তাদের গ্রেপ্তারে অভিযান চালানো হচ্ছে। বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা গেছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ফ্লাইওভারের উপর থেকে মোটরসাইকেলযোগে ককটেল নিক্ষেপ করে দুর্বৃত্তরা।

পুলিশ ও স্থানীয়রা বলছেন, শুক্রবার সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে রাজধানীর যাত্রাবাড়ী থানার ফটক ও যাত্রবাড়ী চৌরাস্তা পুলিশ বক্সের সামনে মোট ৫টি ককটেল নিক্ষেপ করে দুর্বৃত্তরা। এতে ইবাদুর রহমান নামে এক রিকশাচালক আহত হন। প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, ককটেলগুলো হানিফ ফ্লাইওভারের উপর থেকে নিক্ষেপ করা হয়। হঠাৎ পরপর কয়েকটি ককটেল বিস্ফোরণে পথচারীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। দিগ্বিদিক ছুটতে থাকে পথচারীরা। অনেকে আশপাশের দোকানে আশ্রয় নেন। যখন থানার ফটকের সামনে ককটেল নিক্ষেপ করা হয় তখন সড়কের পাশে চা বিক্রি করছিলেন দোকানি হাসান। তিনি বলেন, আমি তখন একজনকে চা দিচ্ছিলাম। ঠিক এমন সময় ফ্লাইওভারের উপর থেকে থানার ফটকে একটি ককটেল নিক্ষেপ করা হয়। এতে আমরা আতঙ্কিত হয়ে ফটকের ডান পাশে চলে যাই। এর ঠিক কয়েক মিনিট পর চৌরাস্তায় আরও ৩টি ককটেল বিস্ফোরিত হয়। ককটেলগুলো ফ্লাইওভারের উপর থেকে নিক্ষেপ করা হয়েছিল।

এ ঘটনায় আহত রিকশাচালক ইবাদুর রহমান বলেন, তখন আমি রিকশা নিয়ে যাত্রাবাড়ী থানার সামনে চৌরাস্তায় সিগন্যালে আটকা পড়ি। এ সময় পরপর ৩টির মতো ককটেল বিস্ফোরিত হয়। কিছুক্ষণ পর দেখি ককটেলের স্প্লিন্টার আমার কোমড়ের পেছনে লেগে রক্ত ঝরছে। পরে আমাকে চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেলে নিয়ে আসা হয়। যাত্রাবাড়ী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ রাজু মানবজমিনকে বলেন, ককটেল বিস্ফোরণে একজন অটোরিকশা চালক আহত হয়েছেন। তাকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। দুর্বৃত্তরা মোটরসাইকেলযোগে ফ্লাইওভারের উপর থেকে ককটেল নিক্ষেপ করে। তাদের শনাক্তে ডিবি এবং আমরা কাজ করছি। জড়িতদের শনাক্ত করতে পেরেছি আশা করছি খুব শিগগিই তাদের গ্রেপ্তার করতে পারবো।

শুক্রবার রাত ৮টার দিকে মোটরসাইকেলযোগে এসে দুই যুবক বাবুবাজার ব্রিজের উপর থেকে ককটেল নিক্ষেপ করে। সেগুলো পড়ে ব্রিজের নিচে মাজারের সামনে বিস্ফোরিত হয়। এখানে সড়কের পাশে ফল বিক্রি করছিলেন জসিম। তিনি বলেন, রাত ৮টার দিকে উপর থেকে একটি ককটেল পড়ে বিকট শব্দে সেটি বিস্ফোরিত হয়। তবে এতে কেউ আহত হয়নি। কোতোয়ালি জোনের এডিসি (অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার) মো. নাজিম উদ্দিন আল আজাদ মানবজমিনকে বলেন, এ ঘটনায় দু’জনকে আমরা প্রথমিকভাবে শনাক্ত করতে পেরেছি। তারা মোটরসাইকেলযোগে এসে ককটেল নিক্ষেপ করে। মোটরসাইকেলটির নম্বর এখনো শনাক্ত করা যায়নি তবে সেটির সন্ধান পেয়েছি।

শুক্রবার রাত সোয়া ৯টার দিকে মগবাজার মোড় জামে মসজিদের পাশে একটি হাতবোমা (ককটেল) বিস্ফোরণ হয়। তবে কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। সরজমিন মগবাজারের হাতবোমা বিস্ফোরণের স্থান ঘুরে সেখানকার প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে কথা বলে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনার বর্ণনা জানা গেছে। মগবাজার চৌরাস্তা জামে মসজিদটি মগবাজার সিগন্যালে অবস্থিত। মসজিদের পেছনের অংশে মগবাজার-মহাখালী সংযোগ সড়কটি। মহাখালী থেকে মগবাজার সিগন্যালে পৌঁছালে হাতের বামপাশে ফুটপাথের নিচেই ককটেল বিস্ফোরণ হয়। ঘটস্থলে গিয়ে দেখা যায়, ককটেল বিস্ফোরণ স্থানের আশপাশে দু’টো টঙের চায়ের দোকান রয়েছে। ঘটনাস্থলের ঠিক দশ কদম আগে-পরে মনিহারি, মিষ্টান্ন ইত্যাদির দোকান রয়েছে।

প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয়রা বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে, এশারের নামাজ শেষ হওয়ার পর কে বা কারা ফ্লাইওভার থেকে ককটেলটি ছুড়ে। ওই মুহূর্তে ককটেল পড়ার জায়গায় কেউ ছিল না বলে ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। ককটেল বিস্ফোরণের সময় বিস্ফোরণের স্থানের কেন্দ্রে থাকা টঙের চায়ের দোকান দু’টো সে সময় বন্ধ ছিল। ফলে তাদেরও ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। ককটেল বিস্ফোরণের বিকট শব্দে আশপাশের মানুষজন আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। বিস্ফোরণের পর হাতিরঝিল থানার পুলিশের টিম ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয় বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।

মগবাজার চৌরাস্তার ব্যবসায়ী মো. সেলিম ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী। তিনি মানবজমিনকে বলেন, আমি এশারের নামাজ পড়ে দোকানে কেবল বসলাম। ক্রেতারা ছিল বেশ কয়েকজন। হঠাৎ করে বিকট শব্দে বোমা ফাটলো। আতঙ্কিত হয়ে দোকানের ক্রেতারা সবাই বের হয়ে যায় দোকান থেকে। সেলিম বলেন, মগবাজারে একাধিকবার এমন ঘটনা ঘটলেও কে বা কারা ঘটাচ্ছে এসব, কেউ ধরতে পারছে না। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক দোকানি বলেন, আমি নিজে দোকান বন্ধ করে ফেলি ঘটনার সময়। কিন্তু মগবাজারেই ছিলাম। ৯টার দিকে সম্ভবত এটি ঘটেছে। আমরা অন্য একটি দোকানে ছিলাম। কটটেল যখন বিস্ফোরণ হয়, আমরা ভাবলাম এত জোরে বিস্ফোরণ হয়েছে হয়তো কোনো গাড়ির চাকা বিস্ফোরণ করেছে। তিনি বলেন, এর আগে আমার মগবাজার এলাকার তিনটি ঘটনার সঙ্গে পরিচয় হয়েছে। এর একটি ঘটনায় তো ফ্লাইওভার থেকে ফেলা বোমায় একজন মগজ বের হয়ে ঘটনাস্থলেই মারা যায় পথচারী।

শুক্রবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে মালিবাগে ফ্লাইওভারের নিচে পর পর দুইটি ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। স্থানীয় ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্র জানিয়েছে, ফ্লাইওভার থেকে পর পর দুইটি ককটেল প্রধান সড়কে ছুড়ে মারে দুর্বৃত্তরা। প্রথম ককটেল মারা হয় মালিবাগের সোহাগ বাস কাউন্টারের বিপরীত দিকের সড়কে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, ককটেল বিস্ফোরণের সময় তিনটি শিশু সেখানে দাঁড়িয়ে ছিল। পুলিশ সদস্যরাও একটু দূরে ছিলেন। ককটেল বিস্ফোরণ হলে তটস্থ হয়ে তিনটি শিশু ঘটনাস্থল থেকে দৌড়ে সরে যায়। ফলে ওই স্থানেও হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। তার ১০০ মিটার দূরে, অর্থাৎ মৌচাক মোড়ের দিকে এগিয়ে আসলে একই পাশে আরেকটি ককটেল ছুড়ে মারে দুর্বৃত্তরা। ওই ককটেল একটি দোকানের সামনে পড়ে বিস্ফোরিত হয়। যদিও কথা বললে ওই দোকানের কর্মচারীরা ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেনি বলে জানায়। তবে স্থানীয় অন্যান্য দোকানের কর্মচারীরাসহ প্রত্যক্ষদর্শীরা ওই নির্দিষ্ট দোকানের সামনেই ককটেলটি বিস্ফোরিত হয়েছে বলে জানান।

সরজমিন ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, প্রথম ককটেল একটি ফুটপাথের নিচে পড়েছে। তার সঙ্গেই একটি নির্মাণাধীন ভবনে কাজ চলছিলো। ঘটনার ৫ কদম দূরেই আল্টিমেট অর্গানিক নামের একটি মেডিসিন শপ রয়েছে। সড়কের বিপরীত পাশে সোহাগ বাস কাউন্টার ও সফেনা উইমেন্স মেডিকেল কলেজ নামের একটি চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। দ্বিতীয় ককটেল বিস্ফোরণের স্থানে আশপাশে বিভিন্ন দোকানপাট রয়েছে। মালিবাগ রেলগেইট থেকে মৌচাক হয়ে যে ফ্লাইওভারটি চলে গেছে তার এক প্রান্ত রাজারবাগ ও অন্যপ্রান্ত শান্তিনগর এলাকায় নেমেছে। দুর্বৃত্তরা এই দু’টি রুটই ব্যবহার করেছে পালিয়ে যাওয়ার জন্য। স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, ককটেল বিস্ফোরণের পর উপস্থিত পুলিশ সদস্যরা ফ্লাইওভারের মুখে দুর্বৃত্তদের ধরতে চেষ্টা করলেও তারা ব্যর্থ হন।

ইব্রাহিম নামের এক প্রত্যক্ষদর্শী মানবজমিনকে বলেন, শুক্রবারের ককটেলটি সম্ভবত শক্তিশালী ছিল। আগে একবার আমাদের দোকানের সামনে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। তখন এতো আতঙ্ক লাগেনি। কিন্তু শুক্রবার দোকান থেকে কিছু দূরে বিস্ফোরণ হলেও আমরা ভয় পেয়ে গেছি। ঘটনাস্থলে তিনটি শিশু ছিল। সৃষ্টিকর্তা বাচ্চাগুলোকে বাঁচিয়েছে। তারা চিৎকার দিয়ে চলে এসেছে। তবে এই ঘটনা কারা ঘটিয়েছে তা এখনও শনাক্ত করতে পারেনি সংশ্লিষ্ট থানার পুলিশ। শনিবার বিকালে শাহজাহানপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. আমিরুল ইসলাম মানবজমিনকে বলেন, মালিবাগে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনায় কাউকে শনাক্ত করতে পারিনি। তবে অজ্ঞাতনামাদের আসামি করে মামলা দেয়া হয়েছে। আমাদের অভিযান চলমান আছে।

কাফরুল থানার সামনে বাসে আগুন: শুক্রবার রাত ১০টার পর কাফরুল থানার সামনে মিরপুর লিংক পরিবহনের একটি ফাঁকা বাসে আগুন দেয় দুর্বৃত্তরা। পরে ফায়ার সার্ভিস গিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। বাসটি খালি থাকায় এই ঘটনায়ও কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। কাফরুল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সইফুল ইসলাম মানবজমিনকে বলেন, আমরা ইতিমধ্যে দুষ্কৃতকারীদের শনাক্ত করেছি। তাদের গ্রেপ্তার করতে আমাদের একাধিক টিম কাজ করছে। তদন্তের স্বার্থে কারও নাম প্রকাশ করতে পারছি না। তদন্ত শেষে বিস্তারিত জানানো হবে।

আরও বিভিন্ন স্থানে ঘটেছে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা: রাত ১১টার দিকে রামপুরায় বাংলাদেশ টেলিভিশন ভবনের সামনের সড়কে জোড়া ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, রামপুরা এলাকার ইউল্যাপের উপর থেকে একটি মোটরসাইকেলে করে দু’জন দুর্বৃত্ত দু’টি ককটেল নিচের দিকে ফেলে পালিয়ে যান। সঙ্গে সঙ্গে দু’বার প্রচণ্ড শব্দ হয়। ওই স্থানে কেউ না থাকায় হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। হাতিরঝিল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. আসাদুজ্জামান মানবজমিনকে বলেন, এ ঘটনা এখন পর্যন্ত আমরা কাউকে শনাক্ত করতে পারিনি। পুলিশ তদন্ত করছে। দ্রুত দুষ্কৃতকারীদের শনাক্ত করে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

রাত সোয়া ১১টার দিকে রাজধানীর ঢাকা কলেজের সামনে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। এরপর ঘটনাস্থলে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এবং বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিটের সদস্যরা যান। এ বিষয়ে নিউ মার্কেট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আইয়ুব মানবজমিনকে বলেন, বিস্ফোরণের ঘটনায় এখন পর্যন্ত কাউকে শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। এ ঘটনায় পুলিশের একাধিক টিম কাজ করছে। তদন্ত শেষে বিস্তারিত জানানো হবে।

সার্বিক বিষয়ে ডিএমপি’র মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার নিয়াজ মেহেদী মানবজমিনকে বলেন, বিস্ফোরণের ঘটনাগুলো নিয়ে তদন্ত চলছে। নগরবাসীর নিরাপত্তার স্বার্থে ইতিমধ্যে বিভিন্ন স্থানে চেকপোস্ট বসানো হয়েছে। আমাদের প্রতিটি ইউনিট দুষ্কৃতকারীদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তার করতে কাজ করছে। কোনো দুষ্কৃতকারীকে ছাড় দেয়া হবে না। তদন্ত শেষে বিস্তারিত জানানো হবে।