৭৩ লাখ টাকা খুইয়ে জানলেন

কাল্পনিক চরিত্রে তার মামাতো বোন

ফন্ট সাইজ:

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ইনস্টাগ্রামে প্রেমের ছলনা ও রূপের মিথ্যা মায়াজালে ফেলে নেদারল্যান্ডস প্রবাসী এক বাংলাদেশি ফ্রিল্যান্সারের কাছ থেকে ৭৩ লাখ ৪১ হাজার ৫০০ টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ উঠেছে। ঘটনার সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর দিক হলো- ভুয়া পরিচয়ে প্রেমের অভিনয় করে অর্থ হাতিয়ে নেয়া চক্রটির মূল পরিকল্পনাকারী আর কেউ নন, ভুক্তভোগীর নিজের মামাতো বোন। সম্প্রতি এই ঘটনায় ভুক্তভোগী সানজিদ রহমান শিমুল বাদী হয়ে চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত, ঢাকায় একটি সি আর মামলা দায়ের করেছেন। মামলায় প্রতারণা, অপরাধমূলক বিশ্বাসভঙ্গ ও হুমকির দায়ে পেনাল কোডের কয়েকটি ধারায় অভিযোগ এনে মামাতো বোন নাফিসা তাবাসসুম সহ ৪ জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতনামা আরও কয়েকজনকে আসামি করা হয়েছে।

যেভাবে পাতা হয় প্রতারণার ফাঁদ: মামলার নথি অনুযায়ী, সানজিদ রহমান শিমুল পড়াশোনা ও ফ্রিল্যান্সিংয়ের সূত্রে দীর্ঘদিন নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগ শহরে অবস্থান করছিলেন। ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে ইনস্টাগ্রামে ‘অফৎরঃধ অফড়ৎ’ (ধফৎরঃধথধফড়ৎথ) নামের একটি ভুয়া আইডি থেকে সানজিদের সঙ্গে যোগাযোগ গড়ে তোলা হয়। নিজেকে তরুণী পরিচয় দিয়ে দীর্ঘদিন আবেগঘন চ্যাট, বার্তা আদান-প্রদান এবং ভয়েস কলের মাধ্যমে সানজিদের অন্ধ বিশ্বাস ও মন জয় করে নেয় ওই আইডি পরিচালনাকারী। প্রবাসী শিমুল তখন জানতেনই না, তার অত্যন্ত বিশ্বস্ত মামাতো বোন নাফিসা তাবাসসুম পর্দার আড়ালে থেকে চক্রের সহযোগীদের নিয়ে এই ভুয়া পরিচয় পরিচালনা করছেন। পারিবারিক সম্পর্কের সূত্র ধরে নাফিসা নিজেও সানজিদকে নিশ্চিত করেন যে ‘অদ্রিতা’ একজন প্রকৃত ব্যক্তি এবং তার ঘনিষ্ঠ বান্ধবী।

মিথ্যা গল্পে ১১৭ দফায় অর্থ স্থানান্তর: আস্থা অর্জনের পর শুরু হয় অর্থ হাতিয়ে নেয়ার কৌশল। কথিত অদ্রিতার বাবার জটিল অসুখ, পারিবারিক অর্থ সংকট, ভিসা প্রসেসিং, ব্যবসা এবং ‘ই-স্পোর্টস ইনভেস্টমেন্ট ও স্পন্সরশিপ’র মতো নানা সাজানো সংকটের কথা বলে সানজিদের কাছ থেকে দফায় দফায় টাকা ধার চাওয়া হয়। পারিবারিক আস্থা ও প্রেমের টানে সানজিদ ২০২৫ সালের জুন থেকে ২০২৬ সালের মে মাস পর্যন্ত তার বিদেশি ‘রেভোলুট’ (জবাড়ষঁঃ) অ্যাকাউন্ট থেকে বাংলাদেশের বিভিন্ন বিকাশ নম্বরে মোট ১১৭টি ট্রানজেকশনে ৭৩ লাখ ৪১ হাজার ৫০০ টাকা পাঠান।

অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়, আসামি নাফিসা ছদ্মনামে বিভিন্ন বিকাশ নম্বরে (যার একটির নথিভুক্ত নাম ‘সুরাইয়া আক্তার’) ২৮টি ট্রান্সফারে প্রায় ১৩ লাখ ৪৪ হাজার টাকা নেন। চক্রের সহযোগী তৌফিকুল হাসান জিসানের বিকাশ নম্বরে যায় ১ লাখ ৩১ হাজার টাকা। জিসান মূলত ‘ই-স্পোর্টস’ টুর্নামেন্টের নামে অর্থ লেনদেনের দিকটি তদারকি করতেন। সামিয়া মিলনের বিকাশ নম্বরে ৩ লাখ ২২ হাজার ৫০০ টাকা পাঠানো হয়। তিনি অদ্রিতা সেজে সানজিদের সঙ্গে ফোনে কথা বলে পুরো আয়োজনটিকে বিশ্বাসযোগ্য রাখতেন। শাহাদাত হোসেনের নম্বরে পাঠানো হয় ১ লাখ ৩ হাজার টাকা। বাকি অর্থ চক্রের নির্দেশনায় আরও ৩৫টি বিকাশ অ্যাকাউন্টে বিভিন্ন সময়ে গ্রহণ করা হয়।

গোমর ফাঁস ও প্রাণনাশের হুমকি: ২০২৬ সালের মে মাসের শুরুতে সানজিদের মনে প্রথম সন্দেহের উদ্রেক হয়। তিনি লক্ষ্য করেন, তিনি ব্যক্তিগতভাবে তার মামাতো বোন নাফিসাকে যেসব গোপন তথ্য বলেছিলেন, কাল্পনিক ‘অদ্রিতা’ হুবহু সেই তথ্যগুলো কথোপকথনে উল্লেখ করছে। সন্দেহ তীব্র হলে তিনি ট্রু-কলার ও ডিজিটাল লেনদেনের আলামত পর্যালোচনা করে দেখেন- বিকাশ ও যোগাযোগের নম্বরগুলোর নেপথ্যে রয়েছেন তার বোন নাফিসা এবং তারই বন্ধুমহল। ধরা পড়ে যাওয়ার পর আসামিরা ঘটনার সত্যতা আংশিক স্বীকার করলেও টাকা ফেরত দিতে অস্বীকৃতি জানায়। পরবর্তীতে ২০২৬ সালের জুলাইয়ে সানজিদ দেশে ফিরে সরাসরি টাকা ফেরত চাইলে তাকে প্রাণনাশের হুমকি ও ভয়ভীতি দেখানো হয়। এমনকি গত ৮ই সেপ্টেম্বর সর্বশেষ টাকা ফেরত চাইতে গেলে নাফিসার বাবা উল্টো সানজিদের পরিবারকে ক্ষতি করার হুমকি দেন বলে এজাহারে উল্লেখ রয়েছে। এর আগে ভুক্তভোগীর মা ওয়ারী থানায় এ সংক্রান্ত একটি সাধারণ ডায়েরিও (জিডি) করেন। পরে থানায় মামলা না নেয়ায় অবশেষে আদালতের শরণাপন্ন হন এই তরুণ প্রবাসী।

এ বিষয়ে ভুক্তভোগীকে আইনি সহায়তা প্রদানকারী এডভোকেট অর্পূব মজুমদার মানবজমিনকে বলেন, এটি শুধু আর্থিক বিরোধ নয়; পারিবারিক আস্থা ও বিশ্বাসকে কাজে লাগিয়ে পরিকল্পিতভাবে অর্থ হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ রয়েছে। আইনজীবীর দাবি, বিষয়টি আদালতে নেয়ার আগে পারিবারিকভাবে একাধিকবার সমাধানের চেষ্টা করা হয়। পরে আইনজীবীর মাধ্যমে লিগ্যাল নোটিশ পাঠিয়ে অর্থ ফেরত ও হিসাব চাওয়া হলেও অভিযোগের যথাযথ সমাধান হয়নি। অর্থ ফেরত চাওয়ার পর হুমকি ও ভয়ভীতির অভিযোগে থানায় সাধারণ ডায়েরিও করা হয়। তবে থানায় মামলা গ্রহণের উদ্যোগ সফল না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত আদালতের শরণাপন্ন হন ভুক্তভোগী। এডভোকেট অর্পূব মজুমদার বলেন, ডিজিটাল যোগাযোগ, আর্থিক লেনদেন, কল রেকর্ড, মেসেজ ও মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের তথ্যসহ অন্যান্য ইলেকট্রনিক আলামত নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা হলে প্রকৃত ঘটনা বেরিয়ে আসবে।

ঢাকা জেলা ও দায়রা জজ আদালতের আইনজীবী আব্দুল্লাহ আল নাহিয়ান মানবজমিনকে বলেন, বর্তমানে প্রবাসীদের ঘিরে অনলাইনে বেশ কয়েকটি গ্রুপ সক্রিয়। তারা নানাভাবে ফাঁদে ফেলে অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে। দেশে অর্থ পাঠানোর ক্ষেত্রে প্রবাসীদের আরও সতর্ক ও সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, মোটা অঙ্কের অর্থ লেনদেনের ক্ষেত্রে নগদ লেনদেন এড়িয়ে সব সময় ব্যাংক বা বৈধ মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের (এমএফএস) মাধ্যমে লেনদেন করার পরামর্শ দেন তিনি।