বাংলাদেশে বিশ্ব পর্যটন দিবস

বাংলাদেশে বিশ্ব পর্যটন দিবস

ফন্ট সাইজ:

একসময় আমরা পর্যটন দিবস, পর্যটন সপ্তাহ এমনকি পর্যটন মাসও পালন করতাম। এখন আমরা আর সেসব পালনের মধ্যে নেই। কেন নেই, তার সুনির্দিষ্ট কারণও অজানা। হয়তো এসব আয়োজনের মাধ্যমে প্রচার-প্রচারণার আর তেমন প্রয়োজন নেই, অথবা পর্যটন তার কাঙিক্ষত উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছে গেছে!
কারণ যাই হোক, একটি বিষয় স্পষ্ট- আমরা এখন আন্তর্জাতিকতাকে নিজেদের প্রচার-প্রচারণার কাজে ব্যবহার করতেই বেশি আগ্রহী, কিংবা এতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি। ফলে বিশ্ব পর্যটন দিবসই এখন আমাদের কাছে একমাত্র গুরুত্বপূর্ণ দিবস হিসেবে টিকে আছে। শুধু তাই নয়, এই একটি দিবসকে ঘিরেই যেন গোটা বছরের অপেক্ষার পালা শেষ হয়; আর আমরা হঠাৎ করেই নড়েচড়ে বসি।

১৯৭৯ সালের এক সিদ্ধান্তের পর ১৯৮০ সাল থেকে বিশ্ব পর্যটন দিবস পালিত হয়ে আসছে। বাংলাদেশেও দিবসটি পালনের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। কিন্তু প্রাকৃতিক কারণে কোনো কোনো বছর আয়োজন না হওয়া থেকে শুরু করে অধিকাংশ সময়ই তা দায়সারা গোছের আনুষ্ঠানিকতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকেছে। অথচ বিশ্ব পর্যটন দিবস যে উদ্দেশ্যে পালিত হয় এবং যেভাবে পালন করার কথা, তার কোনোটির সঙ্গেই আমরা যথার্থভাবে তাল মেলাতে পারিনি।
বিশ্ব পর্যটন দিবস পালনের মূল উদ্দেশ্য হলো- অন্তত একটি দিন বিশ্বজুড়ে পর্যটনকে আন্দোলিত করে এর সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব সম্পর্কে সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি করা।

তাই প্রতিপাদ্য নির্বাচনের ক্ষেত্রেও গুরুত্ব দেওয়া হয় পর্যটনের এমন কোনো অনুষঙ্গ বা বিষয়কে, যা সমকালীন বাস্তবতায় গুরুত্বপূর্ণ, সর্বজনগ্রাহ্য এবং কার্যকরভাবে প্রয়োগযোগ্য। এজন্য জাতিসংঘের বিশ্ব পর্যটন সংস্থা বা ইউএন ট্যুরিজমের পক্ষ থেকে ধারণাপত্রের মাধ্যমে প্রতিপাদ্যের বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেওয়া হয়। সংস্থার মহাসচিব তাঁর বাণীতেও বিষয়টির তাৎপর্য তুলে ধরেন। উদ্দেশ্য একটাই- বিশ্বব্যাপী বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করা এবং সেই চর্চাকে পরবর্তী এক বছর, অর্থাৎ পরবর্তী বিশ্ব পর্যটন দিবস পর্যন্ত অব্যাহত রাখা।
এভাবেই একটি প্রতিপাদ্য সংশ্লিষ্ট দেশে ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠা পায়। এখানেই নিহিত প্রতিপাদ্য নির্বাচনের সার্থকতা এবং চর্চার মাধ্যমে এর প্রত্যক্ষ প্রাপ্তি।

এরই ধারাবাহিকতায় ২০২৬ সালের বিশ্ব পর্যটন দিবসের জন্যও এমন একটি বিষয়কে বেছে নেওয়া হয়েছে, যা বর্তমান সময়ের বাস্তবতায় বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। ঘোষণায় বলা হয়েছে, এই প্রতিপাদ্যের মূল লক্ষ্য হলো প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যথাযথ ব্যবহারের মাধ্যমে পর্যটন খাতকে আরও আধুনিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সময়োপযোগী করে গড়ে তোলা।
তাই এবারের প্রতিপাদ্য- "Digital Agenda and Artificial Intelligence to Redesign Tourism" অর্থাৎ- “ডিজিটাল রূপান্তর ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় আগামীর পর্যটন।"
ইউএন ট্যুরিজমের বক্তব্য অনুযায়ী, বিশ্ব পর্যটন দিবস ২০২৬-এ খতিয়ে দেখা হবে কীভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া ও দক্ষতা জোরদার করার পাশাপাশি পর্যটন গন্তব্যের অভিজ্ঞতা ও ব্যবস্থাপনার মান উন্নয়নের মাধ্যমে আরও স্মার্ট, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই পর্যটন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারে।

এজন্য নির্ধারিত উদ্দেশ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে- প্রযুক্তির ব্যবহার করে পর্যটন কেন্দ্রগুলোকে আরও আকর্ষণীয় ও স্মার্ট করে তোলা; সঠিক তথ্য-উপাত্তের ব্যবহারের মাধ্যমে পরিবেশবান্ধব ও টেকসই পর্যটনচর্চা নিশ্চিত করা; এবং ডিজিটাল পরিচয় ও অনলাইন পেমেন্ট ব্যবস্থার মাধ্যমে পর্যটকদের ভ্রমণ প্রক্রিয়াকে আরও সহজ ও ঝামেলামুক্ত করা।
শুধু তাই নয়, উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে ইউএন ট্যুরিজম সদস্য রাষ্ট্র, পর্যটন ব্যবসায়ী ও পর্যটকদের জন্য নির্দিষ্ট পরামর্শ, নির্দেশনা ও নীতিগত দিকনির্দেশনাও দিয়েছে।
সরকারি খাত ও নীতিনির্ধারকদের পর্যটন উন্নয়ন পরিকল্পনায় স্থানীয় জনগোষ্ঠী- বিশেষ করে নারী, তরুণ ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ এবং কর্মসংস্থান নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে পর্যটন খাতের কর্মীদের, বিশেষ করে তরুণদের আধুনিক প্রযুক্তি ও হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিষয়ে উচ্চতর প্রশিক্ষণের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

অন্যদিকে বেসরকারি খাত ও পর্যটন ব্যবসায়ীদের বুকিং, পেমেন্ট এবং পর্যটন গন্তব্য ব্যবস্থাপনায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর আহ্বান জানানো হয়েছে। পাশাপাশি ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, স্থানীয় স্টার্টআপ, হস্তশিল্প ব্যবসায়ী ও ট্যুর গাইডদের বড় এজেন্সির সঙ্গে সমান সুযোগ দেওয়ার জন্য বিশেষ ব্যবসায়িক মডেল তৈরির পরামর্শও রয়েছে।
সর্বোপরি, ইউএন ট্যুরিজমের ধারণাপত্রে পরিষ্কার করে বলা হয়েছে- এটি কেবল পড়ে জানার মতো কোনো উদযাপন নয়; বরং এমন একটি আয়োজন, যার বাস্তব প্রয়োগ ও কার্যকারিতা সরাসরি দেখানোর কথা। আয়োজক দেশ এল সালভাদরের রাজধানী সান সালভাদরে মন্ত্রী ও পর্যটন শিল্পের শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিদের অংশগ্রহণে এআইয়ের কার্যকারিতা শুধু আলোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বাস্তব প্রয়োগের মাধ্যমে প্রদর্শনের পরিকল্পনা রয়েছে।
অর্থাৎ এবারের বিশ্ব পর্যটন দিবস কেবল একটি দিনের আনুষ্ঠানিকতা নয়; এর লক্ষ্য এমন একটি যৌথ অবস্থান ও অভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির ভিত্তি তৈরি করা, যা পরবর্তী সময়েও পর্যটন খাতকে এগিয়ে নিয়ে যাবে।

আর এখানেই এবারের প্রতিপাদ্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকটি। ইউএন ট্যুরিজমের ভাষায়, এবারের প্রতিপাদ্য এমন কোনো বিষয় নয়, যা পর্যটন খাত কেবল পর্যবেক্ষণ করবে; বরং এটি এমন একটি বিষয়, যার জবাব পর্যটন খাতকে দিতেই হবে।
আমরা জানি, বিশ্ব পর্যটন দিবসের প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে দিনটি পালনের জন্য একটি বিশেষ আবহ তৈরি করা হয়। কিন্তু সেই আবহটি কী? আবহটি হলো- প্রতিপাদ্যকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার চেষ্টা, অর্থাৎ এক ধরনের মহড়া।
এবারের প্রতিপাদ্যের আলোকে একজন ভ্রমণার্থী কোথায় থাকবেন কী খাবেন, কোথায় যাবেন কী দেখবেন, এসবের পরিকল্পনা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহায়তায় করতে পারবেন। তবে এজন্য সংশ্লিষ্ট পর্যটন গন্তব্যগুলোর নিজেদের মতামত ও কণ্ঠস্বরও থাকা বাঞ্ছনীয়।

অবশ্য এবারের মহড়ায় নতুন একটি মাত্রা যুক্ত হয়েছে। আর তা হলো-এই মহড়া অনেকটা বিশ্ব পর্যটন দিবসের আগেই শুরু হয়ে যাচ্ছে। কারণ আলোচিত প্রযুক্তিই ইতোমধ্যে পর্যটন খাতকে নতুনভাবে রূপ দিতে শুরু করেছে; এমনকি কোন গন্তব্য একজন ভ্রমণকারী দেখতে পাবেন, সেটিও প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থার মাধ্যমে ক্রমশ প্রভাবিত হচ্ছে।
এই যখন বৈশ্বিক বাস্তবতা, তখন আমাদের বাংলাদেশ কী ভাবছে? কী প্রস্তুতি নিচ্ছে? এবার সেদিকে একটু দৃষ্টি ফেরানো যাক।
বাংলাদেশ নানা কারণে বিশ্ব পর্যটন দিবসকে সামনে নিয়ে আসে বটে, কিন্তু দিবসটি পালনের প্রকৃত গুরুত্ব আমরা কখনো সেই অর্থে অনুধাবন করিনি, এখনো করছি না।
দিবসটির প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে যদি গোটা একটি বছর ধারাবাহিকভাবে চর্চা করা যেত, তাহলে এতদিনে পর্যটনের বহু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আমরা অনেকটাই এগিয়ে যেতে পারতাম। কিন্তু তা হয়নি। ফলে পর্যটনের সম্ভাবনাকেও আমরা যথাযথভাবে কাজে লাগাতে পারিনি; অর্থাৎ পর্যটনকে সেই অর্থে 'ক্যাশ' করতেও পারিনি।

এ কারণেই বহু বছর ধরে বিশ্ব পর্যটন দিবসের প্রতিপাদ্যের বাংলা রূপান্তর পর্যন্ত লেজেগোবরে করে ফেলা হয়েছে। এবার অন্তত তা হয়নি- সম্ভবত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কল্যাণেই!
কিন্তু প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে এর উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্য আয়োজক সংস্থার যেসব নির্দেশনা ও পরামর্শ থাকে, তার আলোকে কর্মসূচি নির্ধারণ এবং যথাযথভাবে তা বাস্তবায়নের মাধ্যমে পর্যটনকে বৈশ্বিক গতিপথে রেখে শুধু প্রচার-প্রচারণা নয়, উন্নয়নের কাজটিও এগিয়ে নেওয়ার যে সুযোগ ছিল, আমরা কখনো তা কাজে লাগাতে পারিনি। এমনকি এবারও যে পারব না, তা দিবসটির কর্মসূচি দেখলেই অনেকটা পরিষ্কার হয়ে যায়।

কর্মসূচিতে রয়েছে ঢাকাসহ দেশের সব জেলায় জেলা প্রশাসনের নেতৃত্বে একযোগে র‍্যালি, আলোচনা সভা ও পর্যটন মেলা; বাংলাদেশে নিযুক্ত বিভিন্ন দেশের কূটনীতিক ও বিদেশি অতিথিদের সম্মানে লাইভ কুকিং শো ও বিশেষ রন্ধন প্রতিযোগিতা; দেশের প্রধান পর্যটন কেন্দ্র ও দর্শনীয় স্থানে লোকসংস্কৃতি, কারুশিল্প ও ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক পরিবেশনা; বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের প্রস্তুত করা পর্যটন বিজ্ঞাপন বা টিভিসি জনবহুল ও গুরুত্বপূর্ণ পাবলিক প্লেসে ডিজিটাল স্ক্রিনের মাধ্যমে প্রদর্শন; এবং সাংস্কৃতিক পর্যটনকে ত্বরান্বিত করতে পর্যটন মন্ত্রণালয় ও সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মধ্যে যৌথ সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর। এর সঙ্গে মহাপরিকল্পনা ও নীতিমালা প্রণয়নের খবর প্রচার তো রয়েছেই। তবে এখানেই শেষ নয়।

এবার বিশ্ব পর্যটন দিবসের কর্মসূচির সঙ্গে দেশে প্রথমবারের মতো "বাংলাদেশ পর্যটন পুরস্কার-২০২৬” প্রদানের উদ্যোগও যুক্ত করা হয়েছে। উদ্যোগটি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক হতে পারত- যদি এর বিষয় ও শ্রেণিবিন্যাস যথাযথ পেশাগত জ্ঞান, পর্যটন শিল্পের বাস্তব কাঠামো এবং আন্তর্জাতিক পুরস্কার প্রদানের প্রচলিত নীতিমালার আলোকে নির্ধারণ করা হতো। দুঃখজনকভাবে, বিষয় নির্বাচনের ক্ষেত্রে যে অসংগতি ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা হয়েছে, তা নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
পুরস্কার প্রদান নিছক আনুষ্ঠানিকতা নয়। একটি জাতীয় পর্যটন পুরস্কারের বিভিন্ন ক্যাটাগরি আসলে দেশের পর্যটন শিল্পের কাঠামো, শ্রেণিবিন্যাস, পেশাগত পরিচয় এবং অগ্রাধিকারেরই প্রতিফলন ঘটায়। ফলে সেখানে কোনো অস্পষ্টতা বা অসংগতি থাকলে তা শুধু একটি পুরস্কার আয়োজনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং পুরো পর্যটন খাত সম্পর্কে একটি ভুল বার্তা দিতে পারে।

এই পুরস্কারের বিষয় ও শ্রেণিবিন্যাসে সেই ঝুঁকিটিই দেখা যাচ্ছে। পর্যটনের বিভিন্ন খাত, উপখাত এবং ব্যবসা ও পেশাকে যথাযথভাবে চিহ্নিত ও পৃথক করার পরিবর্তে সেগুলোকে এমনভাবে একত্রিত করা হয়েছে, যাতে শ্রেণিবিন্যাসের স্বাভাবিক কাঠামোই প্রশ্নের মুখে পড়ে।
এটি যে বা যাদের পরিকল্পনা থেকেই হয়ে থাকুক না কেন, একটি জাতীয় পর্যটন পুরস্কারের ক্ষেত্রে এমন অসংগতি মোটেই কাম্য নয়। কারণ পুরস্কারের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত যোগ্যতা, উদ্ভাবন, সেবা, পেশাগত উৎকর্ষ ও অবদানের স্বীকৃতি দেওয়া- কোনো রকমের লোক দেখানো আয়োজন সৃষ্টি করা নয়।

বরং প্রথমবারের একটি জাতীয় পর্যটন পুরস্কার হওয়ায় এর মানদণ্ড, শ্রেণিবিন্যাস ও নির্বাচন প্রক্রিয়াই হওয়া উচিত ছিল সবচেয়ে বেশি নির্ভুল, স্বচ্ছ এবং পেশাদার ভিত্তিক। ভবিষ্যতে এই পুরস্কারকে একটি মর্যাদাপূর্ণ জাতীয় স্বীকৃতিতে পরিণত করতে চাইলে শুরুতেই ভুল কাঠামোর ভিত্তি তৈরি করা উচিত নয়।
এর পাশাপাশি ঢাকার বাইরে অন্তত দুটি উল্লেখযোগ্য পর্যটন গন্তব্যের কর্মসূচির দিকেও নজর দেওয়া যেতে পারে-একটি পর্যটনের রাজধানী কক্সবাজার এবং অন্যটি আধ্যাত্মিক শহর সিলেট।
কক্সবাজারের কর্মসূচিতে রয়েছে র‍্যালি, হোটেল-মোটেল-রিসোর্টে বিশেষ ছাড়, বিচ কার্নিভ্যাল ও মেলার আয়োজন, অভ্যর্থনা ও পরিচ্ছন্নতা অভিযান এবং অক্টোবর মাসে কক্সবাজার বিমানবন্দর উদ্বোধন উপলক্ষে আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের আনুষ্ঠানিক রোডম্যাপ ও অগ্রগতি প্রদর্শন।

অন্যদিকে সিলেটে রয়েছে র‍্যালি, প্রধান পর্যটন স্পটগুলোতে বিশেষ পরিচ্ছন্নতা অভিযান, বাউল সংগীতের আয়োজন, চা-বাগানগুলোতে ইকো-ট্যুরিজমের প্রচার এবং তরুণ গাইড ও আতিথেয়তা কর্মীদের জন্য ডিজিটাল মার্কেটিং ও ইকো-ট্যুরিজম বিষয়ে প্রশিক্ষণ কর্মসূচির উদ্বোধন।
এখন প্রশ্ন হলো- রাজধানী ঢাকা এবং দেশের অন্যান্য জেলার এসব কর্মসূচির সঙ্গে বিশ্ব পর্যটন দিবসের মূল আয়োজক সংস্থা ইউএন ট্যুরিজমের নির্ধারিত প্রতিপাদ্য, উদ্দেশ্য, করণীয় এবং বিশেষ করে ধারণাপত্রে প্রতিপাদ্যকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার যে দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়েছে, তার কতটুকু সাদৃশ্য রয়েছে?
উত্তরটি খুব সহজ। সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া কঠিন। কারণ প্রতিপাদ্য নিয়ে আয়োজক সংস্থার যে আবেদন, সদস্য দেশগুলোকে নিয়ে যে উচ্চাকাঙক্ষা এবং প্রযুক্তিনির্ভর ভবিষ্যৎ পর্যটন ব্যবস্থার যে রূপরেখা সেখানে তুলে ধরা হয়েছে, তার ধারেকাছেও আমাদের এবারের আয়োজন নেই।

অবশ্য এই অবস্থা নতুন কিছু নয়। বলা যায়, এটি আগের আয়োজনগুলোরই পুনরাবৃত্তি- একদিকে লোকদেখানো, অন্যদিকে দায়সারা। তাহলে প্রশ্ন উঠতেই পারে- পর্যটন দিবস, পর্যটন সপ্তাহ ও পর্যটন মাসের মতো ধারাবাহিক আয়োজন বন্ধ করে দিয়ে শুধু একটি বিশ্ব পর্যটন দিবস পালন কি শেষ পর্যন্ত অর্থবহ থাকে?
যদি একটি আন্তর্জাতিক দিবসের প্রতিপাদ্যকে কেন্দ্র করে কোনো দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা তৈরি না হয়, যদি তার আলোকে বাস্তব উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালিত না হয় এবং যদি বছরের বাকি সময়টিতে সেই প্রতিপাদ্যের কোনো চর্চাই না থাকে, তাহলে পুরো আয়োজন শেষ পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে। এতে পর্যটন শিল্পের কাঙিক্ষত কোনো স্থায়ী ফলাফল আসবে না; বরং অবিবেচনাপ্রসূত পরিকল্পনা ও অজ্ঞতাই প্রতিষ্ঠা পাবে।
এর জন্য দায়ী মূলত এমন কিছু অতিউৎসাহী কর্মকর্তা, যাদের পর্যটন সম্পর্কে পেশাগত জ্ঞান, আন্তরিকতা, দায়বদ্ধতা এবং খাতটির প্রতি প্রকৃত অঙ্গীকার নিয়েই প্রশ্ন ওঠে।

কারণ পর্যটন উন্নয়নের পরিবর্তে যদি লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায় সরকারকে খুশি রাখা, জনসাধারণকে স্বপ্ন দেখানো এবং আনুষ্ঠানিকতার মাধ্যমে সাফল্য প্রদর্শন করা, তাহলে কোনোভাবেই একটি সম্ভাবনাময় পর্যটন শিল্পকে তার কাঙিক্ষত জায়গায় নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়।
এমতাবস্থায় সরকারি ও বেসরকারি-উভয় খাতকেই আরও সতর্ক হতে হবে। এসব অপচর্চা থেকে বেরিয়ে এসে বিশ্ব পর্যটন দিবসের প্রকৃত উদ্দেশ্য অনুধাবন করতে হবে।

সময় নষ্ট না করে ভুলগুলো চিহ্নিত ও সংশোধন করে যা সঠিক, সেটিই করতে হবে। কারণ বাংলাদেশের পর্যটন শিল্প সম্ভাবনাময়- কিন্তু সম্ভাবনা নিজে নিজে বাস্তবে রূপ নেয় না। তার জন্য প্রয়োজন সঠিক পরিকল্পনা, ব্যবস্থাপনা, পেশাগত জ্ঞান, দীর্ঘমেয়াদি কর্মসূচি, দক্ষ নেতৃত্ব এবং সর্বোপরি দায়িত্বশীলতার সঙ্গে বাস্তবায়ন।
তা না হলে কাঙিক্ষত উন্নয়ন তো দূরের কথা, একসময় আমাদের সম্ভাবনাময় পর্যটন শিল্পই অস্তিত্বের সংকটে পড়তে পারে। অতএব-সাধু সাবধান। আর বিশেষ করে যারা দায়িত্বে আছেন, তাদের আরও বেশি।

লেখক: চেয়ারম্যান, সেন্টার ফর ট্যুরিজম স্টাডিজ (সিটিএস)